গদ্য

ছোট থেকে বড়ো | সুভাষ মুখোপাধ্যায় | ফিরে পড়া

একটা পাতলা এক্সাইজের বুকের পাতায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা এক গোছা
কবিতা।
শক্ত শক্ত ভারী শব্দ।
তার মানে সবাই জানে না। ছন্দে বিলক্ষণ পাকা হাতের খাতাটা আমাদের হাতে হাতে ঘুরতে থাকে। যার কাছে যায় সেই অবাক হয়। বলে নিশ্চয়ই এর পেছনে বড়দের কারো হাত আছে।
মনোজ লুকিয়ে লুকিয়ে বেনামীতে কবির্তা লেখে নাকি? খাতাটা তার কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি। মনোজ কিন্তু প্রবলভাবে মাথা নেড়ে অস্বীকার করে। বলে, দেখছো না নাম লেখা আছে। ও আমার খুড়তুতো ভাই। ক্লাস এইটে পড়ে।
শুনে আমরা বিশ্বাস করি নি।

হেঁদুয়ার ধারে এক চায়ের দোকানে ছিল আমাদের দিন-দুপুরের আড্ডা। মনোজ একদিন সেখানে সটান তার ভাইকে এনে হাজির করে।
শরীরে যত্ন নেই। রোগা ময়লা চেহারা। মোটা ঠোটের কোণে অদ্ভুত একটা সলজ্জ হাসি। মুখচোরা হলে কি হয় তার চোখ দুটো যেন সমস্তক্ষণ ডেকে ডেকে কথা বলছে।
যে তার চোখের দিকে তাকাবে সেই বুঝবে এমন কিছু সে দেখতে পাচ্ছে যা আর কারো চোখে পড়ে না।
তাকে দেখলে ভালো না বেসে পারা যায় না।
আমরাও তাই সুকান্তকে সেইদিনই ভালোবেসে ফেললাম।

তখন সময়টা ছিল অন্য রকমের। সবে লড়াই বেধেছে। হাতের শিকল ভাঙহার জন্যে সারা দেশ তখন মরিয়া হয়ে উঠেছে।
রাস্তায় তখন রোজই প্রায় ছাত্রদের মিছিল আর কথায় কথায় ব্যারিকেড্,। ঘরের কোণে বসে থাকার সময় নেই।
আমরা ঘর ছেড়ে কেবলি রাস্তায় ঘুরি।

সুকান্তর সঙ্গে তারপর কদিন দেখা নেই। মাঝে মাঝে গোটা অক্ষরে লেখা ‘তার কবিতার খাতাটা মনে পড়ে।
কবিতার ছত্রে- ছত্রে তার বিষ বেদনা। আমাদেরই মনের কথা। শুধু আমাদের কেন সারা দেশের মনের সুর তখন সেই পর্যায়ে বাঁধা। ‘পূর্বাভাস’ বইতে সেই কবিতাগুলি আছে।
কে জানতো ছোট্ট সুকান্ত সেদিন একটু দূরে ছোট পা ফেলে রাস্তায় রাস্তায় আমাদেরই অনুসরণ করছিল।

হঠাৎ একদিন অন্নদার পাণে সুকান্তকে আবিষ্কার করলাম। অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য তখন ছাত্র ফেডারেশনের সম্পাদক।
বাংলাদেশে তারই উৎসাহে ছোটদের একটা বিরাট সংগঠন গড়ে উঠেছে – ‘বাংলার কিশোর বাহিনী’।
দেখতে দেখতে সুকান্ত হয়ে উঠল সেই কিশোর বাহিনীর প্রাণ। সারা কলকাতা সে চষে বেড়ায়। ছোটদের নিয়ে শুধু দল গড়ে না, গান বাঁধে, নাটক লেখে।
দিকে দিকে উৎসাহের বান ডাকায়। দুর্গত মানুষের সেবায় ছোটদের দল নিয়ে
সে ঝাঁপিয়ে পড়ে সুকান্তর কবিতার সুরও সেই সঙ্গে বদলে যায়।
নিজেকে সে আর অসহায় মনে করে না।
দেশের কোটি কোটি মানুষ তার সঙ্গে আছে। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে
হতাশার অন্ধকার সরিয়ে দিয়ে নতুন আশার স্বপ্ন দেখে সে।

ছোটদের পথ দেখাতে গিয়ে বড়দেরও সে পথের নিশানা দেয়। সুকান্ত ছোট থেকে বড়ো হয়।
একদিন দেখা যায়, সেই কবি কিশোর সারা দেশের হৃদয় জয় করে ফেলেছে। লোকের মুখে মুখে ফিরছে তার কবিতা।
পৃথিবীর আর কে কোথায় দেখেছে-একটি কিশোরকে হারিয়ে আজও সারা দেশ কাঁদছে।

প্রচ্ছদ : সুকান্তর মৃত্যুর এক বছর পরে শ্রী অশোক ভট্টাচার্য ও শ্রী দিব্যনারায়ণ ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘নতুন দিন’ সাময়িক পত্রের, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ, ১৩৫৫সংখ্যার (প্রথম বর্ষ: প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যা) ২৩ পৃষ্ঠায় কবি সুকান্তর একটি স্কেচটি মুদ্রিত হয়। সেই স্কেচ অবলম্বনে এই লেখার প্রচ্ছদ করা হয়েছে এআইয়ের সাহায্যে।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field