অনুবাদ কবিতা বিশ্বসাহিত্য

মাসুদুজ্জামান অনূদিত বুকাউস্কির তিনটি কবিতা | তীরন্দাজ

চার্লস বুকাউস্কি | জন্ম ১৬ আগস্ট ১৯২০, মৃত্যু ৯ মার্চ ১৯৯৪

এক প্রেমিকা ঘরে এল,
আমার বিছানাটা ঠিক করল,
রান্নাঘরের মেঝে ঘষে-মেজে একেবারে চকচকে তকতকে করে তুলল,
দেওয়ালগুলো পরিষ্কার করল, ভ্যাকিউম করল,
টয়লেট আর বাথটাব সাফ-ছুতরো করল,
বাথরুমের মেঝে ঝকঝকে করে মাজল,
এমনকি কেটে দিল আমার পায়ের নখ
আর মাথার চুলও।
তারপর,
ঠিক একই দিনে
মিস্ত্রি এসে ঠিকঠাক করে দিয়ে গেল রান্নাঘরের ট্যাপ আর টয়লেট,
গ্যাস অফিসের লোকটা ঠিক করল হিটারটা,
টেলিফোনের লোক এসে ঠিক করে দিল ফোনের কানেকশন।
এখন এই নিখুঁত পরিপাটি আয়োজনের মাঝে আমি গাঁট হয়ে বসে আছি।
চারপাশটা কী সুনসান, শান্ত।
আমার তিন প্রেমিকার সঙ্গেই আমি সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেছি।
সবকিছু যখন এলোমেলো থাকত তখনই আমি বেশ ভালো বোধ করতাম।
আমাকে আবার আগের সেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে
কয়েক মাস লেগে যাবে :
এমনকি এখন একটা আরশোলাও খুঁজে পাচ্ছি না যার সঙ্গে একটু মনের ভাব-বিনিময় করব।
আমি আমার ছন্দ হারিয়ে ফেলেছি।
ঘুমাতে পারছি না,
খেতেও পারছি না।
আমার সেই নোংরা পরিবেশ কে যেন
চুরি করে নিয়ে গেছে।

কাজটা এবার দাঁড়িয়ে করার চেষ্টা করলাম।
সাধারণত যদিও এভাবে কাজ হয় না,
তবে এবার হবে মনে হলো…
সে বারবার বলছিল,
“হায় আল্লাহ, তোমার পা দুইটা তো দারুণ সুন্দর!”
যতক্ষণ না সে মাটি থেকে পা দুটো তুলে নিয়ে
আমার কোমর পেঁচিয়ে ধরল,
সবই ঠিকঠাক ছিল,
“হায় আল্লাহ, তোমার পা দুটো তো ভারি সুন্দর!”
তার ওজন ছিল প্রায় ১৩৮ পাউন্ডের মতো, আর আমি যখন সেই কাজটা করে যাচ্ছি তখনই সে ওইভাবে ঝুলে রইল।
চরম মুহূর্তে
আমি হাড়ে হাড়ে টের পেলাম কষ্টটা—
সোজা আমার মেরুদণ্ড বেয়ে
তীব্র যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল।
ওকে সোফায় একেবারে ধপ করে ফেলে দিয়ে
আমি ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করতে থাকলাম।
যন্ত্রণা কিন্তু থেকেই গেল।
“শোনো,” তাকে বললাম,
“তোমার এখন যাওয়া উচিত।
আমাকে ডার্করুমের কিছু ফিল্ম ডেভেলপ করতে হবে।”
সে জামাকাপড় পরে চলে গেল
আর আমি রান্নাঘরে গেলাম এক গ্লাস
পানি খেতে।
আমার বাঁ হাতে গ্লাস ভর্তি পানি,
যন্ত্রণাটা সাঁই করে কানের পেছন পর্যন্ত পৌঁছে গেল,
হাত থেকে গ্লাসটা পড়ে খান খান করে
মেঝেতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
গরম পানি আর এপসম লবণ সল্ট দিয়ে বাথটাব পূর্ণ করে
আমি তাতে নেমে পড়লাম।
শরীরটা যখন একটু সোজা করেছি,
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
পিঠটা সোজা করার চেষ্টা করতেই
যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল ঘাড় আর দুই বাহুতে।
হুড়মুড় করে কোনোমতে বাথটাবের দু-পাশ চেপে ধরে বাইরে এলাম,
চোখের সামনে তখন সবুজ-হলুদ-লাল আলো বোঁ বোঁ করে ঘুরছে।
ফোনটা বাজছে তো বাজছেই।
আমি রিসিভারটা তুললাম।
“হ্যালো?”
“আমি তোমাকে ভালোবাসি!” সে বলল।
“ধন্যবাদ,” আমি বললাম।
“তোমার কি শুধু এইটুকু বলার আছে?”
“হ্যাঁ, তাই।”
“গোল্লায় যাও” বলে সে ফোনটা রেখে দিল।
বাথরুমের দিকে ফিরতে ফিরতে ভাবলাম,
বীর্যের মতোই দ্রুত
ভালোবাসাও শুকিয়ে যায়।

এই তো তিনি :
চোখে-মুখে নেই কোনো হ্যাংওভারের চিহ্ন,
নারীদের সঙ্গে খুব বেশি ফষ্টিনষ্টি করার অতীত নেই,
গাড়ির চাকাও পাংচার হয়নি তেমন,
আত্মহত্যা করার চিন্তা তো মাথায় আসেইনি কখনো।
তিনবারের বেশি দাঁত ব্যথাও হয়নি,
কোনো বেলাতেই খাবার না-খাওয়ার ঘটনা ঘটেনি
জেলেও যেতে হয়নি কখনো,
প্রেমেও পড়েননি।
চার জোড়া জুতো, কলেজে পড়া একটা ছেলে, মাত্র এক বছরের পুরোনো গাড়ি,
ইন্স্যুরেন্সের কত সুবিধা,
যেন একদম সবুজ-ছাটা ঘাসের লন আর শক্ত করে ঢাকনা দেওয়া ডাস্টবিন—
হ্যাঁ, এই লোকটাই ভোটে
জিতবেন।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field