চির তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পর্কে আবেগ এবং আতিশয্য প্রকাশ শেষ হয়েছে, তাই সুকান্ত সম্বন্ধে দেশবাসী তথা পাঠক মহলে একটি স্থির প্রত্যয় এবং যথার্থ বিচারবোধ সম্ভব হয়েছে।
সুকান্তের কবিতায় রাজনৈতিক গন্ধ অনেকে পেয়েছেন, জীবনের একটি দিকের উচ্চকিত ঘোষণার কথা আছে – তাঁরা বলেন; বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থনপুষ্ট বলেই সুকান্তের কাব্যে কিছু উচ্ছ্বাস আছে ইত্যাদি ধরনের অভিযোগও
শুনেছি। এসব অভিযোগের উত্তর দেবার দরকার মনে করি না, কারণ সুকান্ত যে যথার্থ কবি – তা তর্ক করার প্রতীক্ষা করার অপেক্ষা রাখে না, তাঁর যেকোনো একটি কবিতা পাঠই তাঁর কবিত্বের পরিচয় দেবার পক্ষে যথেষ্ট।
রাজনৈতিক চিন্তার দ্বারা কবির মন ও মনন আবিষ্ট হতে পারে, কিন্তু তাঁর লেখা যদি যথার্থ কাব্য হয় – তা সর্বসাধারণের সম্পদ হয়; সাহিত্য-লক্ষ্মী তাঁর অক্ষয় ভাণ্ডারে তা যত্নের সঙ্গে তুলে রাখেন। সুকান্তের কাব্যসাহিত্য লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে অক্ষয় সম্পদ হিসাবে স্থান পেয়েছে-সে কথা বলাই বাহুল্য।
সুকান্ত সম্পর্কে নানা আলোচনা হয়েছে; তাঁর প্রতিষ্ঠা যে দেশের সকল শ্রেণির সকল মানুষের মনে শ্রদ্ধার সঙ্গে গণ্য – সে নিয়ে আজ আর কারুর মনে সংশয় নেই।
সুকান্ত যে সজাগ শিল্পী ছিলেন – সে সম্পর্কে দু-একটি কথাই শুধু বলবো। সকল কবির একটি পরিচয় হল তাঁর লেখার দু-একটি পঙক্তি প্রবচনের মতো জনসাধারণের ঠোঁটে ঠোঁটে ঘোরে। সুকান্ত বেশি লেখার সুযোগ পান নি, সমাজ তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব পালন করতে পারে নি, তবু সুকান্ত তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনকালের মধ্যে এমন ক্ষমতার পরিচয় রেখেছেন- যাতে তাঁকে সজাগ শিল্পী না বলে উপায় নেই। তাঁর অনেক পঙক্তিই আজ প্রবচনের মতো বাঙালীর মুখে মুখে! “পূর্ণিমা-চাদ যেন ঝলসানো রুটি”-পঙক্তিটির মধ্যে শুধু নতুনত্ব নেই, সমাজ-জীবনের একটি নিগূঢ় বেদনার বাঙ্ময় পরিচয় মূর্ত হয়েছে। বাস্তববাদী কবি চাঁদের মধ্যে পলায়ন তৎপর জীবন-চেতনার রোমান্টিক আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেন নি। শোষক সমাজের ক্ষুধিত মানুষের মনে যে চিন্তা স্বাভাবিক – তারই প্রকাশ ঘটেছে কবির সদা-সজাগ দৃষ্টিতে।
সুকান্ত সুবিধাবাদী সম্প্রদায়ের মুষ্টিমেয় মানুষকে তুষ্ট করার জন্যে কলম ধরেন নি, কিংবা নিজেকে শোষিত জনসাধারণের থেকে আলাদাও করে নেন নি। বঞ্চিত সর্বহারার বেদনা তাঁর কাব্যে স্বাভাবিকভাবেই মূর্ত হয়ে উঠেছে। অনেকে এই বেদনাকে রূপ দিতে গিয়ে পোস্টার রচনা করে থাকেন, কিন্তু সুকান্তের কাব্যে উচ্চগ্রামের ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও শুধু পোস্টারের বিজ্ঞাপনে পরিণত হয় নি তাঁর কাব্য। ‘চিল’ কবিতাটি কিংবা ‘একটি মোরগের কাহিনী’ কবিতার কথা মনে করা যাক। সুন্দর রূপকথার আড়ালে গভীর তত্ত্ব তিনি পরিবেশন করেছেন; ফলে লেখাগুলি বক্তব্য না হয়ে কাব্য হয়েছে।
যিনি সজাগ শিল্পী হয়ে জন্ম নেন, তাঁর মনে বস্তুজগৎ থেকে পালাবার মোহ আগাগোড়াই অনুপস্থিত থাকে। সমাজ-ব্যবস্থার চাপে বা অসম বণ্টনব্যবস্থার ফলে উদ্ভূত যে বাস্তবতা, সে সম্পর্কে তিনি চিন্তা না করে পারেন না।
তরুণ সুকান্তের বয়স এমন কিছু বেশি ছিল না তবু তাঁর প্রত্যেকটি লেখায় সমাজের মধ্যে অনুষ্ঠিত শোষণের বিরুদ্ধে ধ্বনিত হয়েছে, এই পাপ এবং অপকর্মের জন্যে তাঁর সংবেদনশীল মন গভীরভাবে বেদনা ভরপুর হয়ে উঠেছে এবং তিনি কান্নায় ভেঙে না পড়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন – এই দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্যে। এইখানেই বড় বৈশিষ্ট্য। সুকান্তের কলম যে কাহিনী লিখেছে, সে-কাহিনী পলায়নমুখী সুবিধাভোগী শ্রেণির প্রচলিত ইতিহাস নিয়ে নয়, সে কাহিনীকে সুকান্ত ধিক্কার জানিয়েছেন তার ‘কলম’ কবিতায় –
কলম, শুধু বারংবার,
আনত ক’রে ক্লান্ত ঘাড়
গিয়েছো লিখে স্বপ্ন আর পুরানো কত কথা,
সাহিত্যের দাসত্বের ক্ষুধিত বশ্যতা।
ভগ্ন নিব, রুগ্ন দেহ জলের মতো কালি
কলম, তুমি নিরপরাধ তবু গালাগালি
খেয়েছো আর সয়েছো কত লেখকদের ঘৃণা,
কলম, তুমি চেষ্টা করো, দাঁড়াতে পারো কি না।
সুকান্ত চাঁদকে যেমন ঝলসানো রুটি ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারেন নি, তেমনিই সূর্যকেও এক জলন্ত অগ্নিপিণ্ড ছাড়া অন্য কিছু কল্পনা করেন নি, যে-অগ্নিপিণ্ড আমাদের নিরুত্তাপ রৌদ্রপিপাসু স্যাঁতসেতে দেহে উত্তপ দেবে, শীতের দিনে রাস্তার ধারের উলঙ্গ ছেলেটাকে পর্যন্ত গরম করবে! সুকান্ত লিখেছে –
শুনেছি তুমি এক জলন্ত অগ্নিপিণ্ড,
তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে
একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকে এক-একটা জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ডে
পরিণত হবো,
তার পর সেই উত্তাপে যখন পুড়বে আমাদের জড়তা,
তখন হয়তো গরম কাপড়ে ঢেকে দিতে পারবো
রাস্তার ধারের ঐ উলঙ্গ ছেলেটাকে।
আজ কিন্তু আমরা তোমার অকৃপণ উত্তাপের প্রার্থী।
সুকান্ত সম্পর্কে তাই সংক্ষেপে শুধু সজাগ শিল্পী বিশেষণটি অতি সহজেই সার্থকতার সঙ্গে বসানো চলে।
প্রচ্ছদ : সুকান্তর মৃত্যুর এক বছর পরে শ্রী অশোক ভট্টাচার্য ও শ্রী দিব্যনারায়ণ ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘নতুন দিন’ সাময়িক পত্রের, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ, ১৩৫৫সংখ্যার (প্রথম বর্ষ: প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যা) ২৩ পৃষ্ঠায় কবি সুকান্তর একটি স্কেচটি মুদ্রিত হয়। সেই স্কেচ অবলম্বনে এই লেখার প্রচ্ছদ করা হয়েছে এআইয়ের সাহায্যে।


Leave feedback about this