প্রশ্ন: ফরিদপুরে আপনার ছেলেবেলা কেটেছে। জানতে ইচ্ছে করে, ফরিদপুরের ছবি কখনও এঁকেছেন?
উত্তর: আসলে, পরে যে-সব ছবি এঁকেছি, আর্ট কলেজে গিয়েও, সে-সব কাজে ফরিদপুরের স্মৃতি রয়েছে। কলেজে ফাস্ট ইয়ার এবং সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাসে মন থেকে ছবি আঁকতে হতো। সে-সব ছবিতে ফরিদপুরের ছায়া এসে পড়েছে।
ফরিদপুরের কথা বলতে গেলে অনেক কিছুই এসে পড়বে। স্মৃতিতে অনেক কিছুই ভেসে উঠছে। কিন্তু কোন স্মৃতিটি আগে আর কোনটা পরের, তা আর এত বছর পর সঠিকভাবে মান করতে পারি না। সবার আগে, কেমন ছিল সেদিনের ফরিদপুর, তার পরিবেশ, সে-কথা বলি। এও বলে রাখি, কথাসূত্রে আত্মীয় পরিজনদের কথাও এসে পড়বে, কেননা, তাঁরা প্রায় সকলেই আমাদের বাড়ির আশেপাশেই থাকতেন। জানো তো, আমি অনেকবার ড্রয়িং করে দেখিয়েছি আমাদের গ্রামটা কেমন ছিল। আমাদের গ্রামের কেন্দ্রে ছিল একটা মস্ত দিঘি। আয়তনে প্রায় তিনশো ফিট লম্বা, আর এক-দেড়শো ফিট চওড়া। দিঘির চারপাশ দিয়ে হাঁটা যেত। আর ছিল দিঘি লাগোয়া সিমেন্টের একটা ঘাট। গ্রামের সকলে সেই ঘাটে এসে স্নান করতেন। এছাড়াও ছোটো বড়ো আরও অনেক পুকুর ছিল। আমাদের পরিবার-আত্মীয়স্বজনেরা সেই পুকুরগুলিকেও ব্যবহার করতেন।
ওই গ্রামকে ঘিরে আমাদের প্রায় সাড়ে চারশো বছরের জমিদারি। এই জমিদারিকে ঘিরেও একটা ইতিহাস আছে। আমাদের পরিবার এসেছিল কনৌজ থেকে। যদি পদবির কথা বলতে হয়, আমরা ছিলাম ‘মিশ্র’। সুদূর অতীতে উত্তর প্রদেশের পাঁচ মিশ্র ব্রাহ্মণ এখানে এসেছিলেন। এখানে আসার পর আমাদের পদবি হয়ে যায় চক্রবর্তী। আমাদের পরিবার এখানে আসে রাজা বিক্রমাদিত্যের আমলে। এই অঞ্চলের তৎকালীন রাজা আমাদের নিয়ে আসেন, পুজোআচ্চা করানোর জন্য। সেই থেকে আমাদের পরিবার ওখানেই থেকে যায়। জমি আমরা যৌতুকে পেয়েছি, দখল করে নয়। আমাদের জমিদারি ছিল ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া-ডহরপাড়া এলাকায়। আবার অনেকগুলো গ্রাম নিয়ে এই কোটালিপাড়া। ‘বৈদিক শ্রেণির ইতিহাস’ বইটি পড়লেও জানতে পারি দক্ষিণের বাড়ি, পশ্চিমপার এবং আরও বেশ কিছু গ্রাম একত্র করে তৈরি হয়েছিল এই ‘কোটালিপাড়া’, এখানেই আমাদের বংশের জমিদারি ছিল।
আবার পদবির কথায় আসি। মিশ্র থেকে চক্রবর্তী হলাম, তারপর এখানেই চক্রবর্তী থেকে চৌধুরী হলাম আমরা। যখন জমিজমা হল, তখন এই নতুন উপাধিও যুক্ত হল আমাদের সঙ্গে। যতটা হিসেবের মধ্যে আছে, ঠাকুরদা, পরে বাবার সময়েও, প্রায় আড়াই হাজার বিঘে নিয়ে
ছিল আমাদের জমিদারি। তবে এই জমির সবটাই যে স্থলভাগ তা নয়। আবার ওরই মধ্যে ছিল ‘প্রজা বিলি’ জমিও। মোট পঞ্চাশ-ষাট প্রজা-পরিবার ছিল। প্রজাদের এই পরিবারগুলি ছিল আবার ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ছড়ানো। ঠাকুরদা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন। ফলে তাঁর সঙ্গে প্রজাদের কেমন সম্পর্ক ছিল তা আমরা দেখি নি। কিন্তু বাবাকে দেখেছি বছরে কয়েকবার প্রজাদের কাছে যেতেন। আবার প্রজারাও আসত। তবে খাজনা আদায়ের সময় সঙ্গে কয়েকজন লোক নিয়ে বাবা যেতেন, নৌকোয় করে।
প্রশ্ন: তখন আপনি তো খুব ছোটো। খাজনা আদায় ব্যাপারটা কী, কিংবা লোকজন নিয়ে আপনার বাবা কোথায় কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন, এসব নিয়ে কোনো কৌতূহল ছিল আপনার?
উত্তর: (হেসে) ছিল তো। তবে তখন আমি খুবই ছোটো। পুব বাংলা ছেড়ে চলে আসি মাত্র সাত বছর বয়সে। একটা অভিজ্ঞতার কথা তাহলে বলি। এক ধরনের নৌকো আছে না, ছইওয়ালা নৌকো যার গলুইয়ের ভেতর খাবারদাবার জিনিসপত্তর রাখা যায়- আমি করেছি কী, বাবা সেদিন রওনা হবেন, চট করে ওই গলুইয়ে লুকিয়ে পড়েছি।
একটা কথা বলে নেওয়া ভালো, বর্ষাকালেই খাজনা আদায়ের জন্য বাবা বেরোতেন। বাংলাদেশ এমনিতেই নদীমাতৃক। আর ফরিদপুর, বরিশালে নদীর সংখ্যা এত বেশি যে, তখন কোনো রেললাইনই ছিল না। সে-কারণেই, বরিশালে সম্ভবত এখনও কোনো রেললাইন নেই। বছরের অন্যান্য সময়, অন্যত্র আত্মীয়-কুটুম্বদের বাড়িতে যাওয়ার সময় আমাদের হাঁটা পথেই যেতে হতো। সে ছিল এক দীর্ঘ যাত্রা। হাঁটা পথ তো সোজাসুজি হয় না। ঘুর পথে যেতে হত আমাদের। কিন্তু বর্ষার সময় নদীগুলো ভরাট থাকত। আর, নৌকো করে সোজা পথেই যাওয়া যেত। বাবার ওই রকমই একটি অভিযানে কারোকে কিছু বুঝতে না দিয়ে, নিছক কী হয় দেখার কৌতূহলে আমি সেই নৌকোর তলায় লুকিয়ে পড়েছিলাম। নৌকোয় বাবা, খাজনা আদায়ের অন্য লোকজন, মাঝি-মাল্লা সকলেই ছিলেন। সকলকে নিয়ে নৌকো যথারীতি যাত্রা শুরু করে দিল। যাত্রা শুরু হতেই আমি সচেতন হয়ে উঠলাম। দিঘি-পার্শ্ববর্তী একটি ছোটো পুকুর ছিল, ফুলপুকুর। সেই পুকুরের কোণ বরাবর একটি সরু খাল ছিল, যেখান দিয়ে ওই পুকুরের অতিরিক্ত জল বাইরে চলে আসতে পারত আর তার সংলগ্ন ছিল একটি বাঁশবন। বাঁশবন পেরোলেই নৌকো অনেক দূরে চলে যাবে আর তখন আমাকে নিয়ে সকলে সমস্যায় পড়তে পারেন ভেবে আমি নৌকোর ভেতর থেকে অবিলম্বে উঠে পড়লাম। আমাকে দেখে সকলেই হতচকিত। বিস্তর বকাবকির পর আমাকে নামিয়ে দেওয়া হল বাঁশবাগানে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটেই আমি ফিরে এলাম। বাবা আর তার লোকজনের কর্মকাণ্ড দেখার সৌভাগ্য আমার আর হল না।

প্রশ্ন: পরবর্তীকালে নিশ্চয়ই ফরিদপুরে আবারও গিয়েছেন আপনি?
উত্তর: ‘৯৩ সালে গিয়েছিলাম। সেই বাঁশবাগান তখনও ছিল। তবে দ্বিতীয়বার যখন যাই বিষণ্ণ হয়ে পড়ি। কারণ তখন জায়ণাটা সম্পূর্ণ বদলে নিয়েছে। ১৯৯৩ সালে একটি বিশেষ কাজের সূত্রে আমার বাংলাদেশ যাওয়া। দিল্লির আইসিসিআর সারা ভারতবর্ষের শিল্পীদের কাজ নিয়ে একটি প্রদর্শনীর জন্য আমাকে পাঠিয়েছিল। তখন বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা করে দেয় যাতে আমি আমার পুরোনো দেশ ঘুরে দেখাতে পারি। দু’জনের ওপর আমাকে গাইড করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওরাই আমাকে আমার দেশে নিয়ে গিয়ে হাজির করল। আমি আমার অতীতের ফরিদপুরের সঙ্গে বর্তমানের ফরিদপুর মিলিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম। তবে আমাদের ওই ঘরবাড়িগুলো তখন আর কিছু ছিল না। এমনকী সিমেন্টের বাড়িটাড়ি, মন্দির, কালীবাড়ি সবই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এক ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেদিন আমরা যে কাঠের বাড়িতে থাকতাম সেই দিকে নির্বাক তাকিয়ে ছিলাম। ফরিদপুরের মাটি নরম। সিমেন্টের ঘর তৈরি করা যেখানে খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মোটা মোটা সেগুন কাঠের ফ্রেমের ওপর টিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল আমাদের বাড়ির চাল, এমনকী দেওয়ালটাও ছিল টিনের। বাড়িটি ছিল দোতলা। ওপর তলায় কাঠের পাটাতন বিছানো। মূলত বাড়ির স্টোরেজ হিসেবে একে ভাবা হলেও, দোতলাটা কিন্তু ছিল অনেকখানি পরিসর জুড়ে। ফলে, বহুদিন এমনও হয়েছে, কোনো কারণে বা অকারণে হয়তো ওপর তলায় উঠেছি, অনেকক্ষণ রয়েছি, ঘুম পেলে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছি। বহু পুরোনো দরকারি জিনিসপত্তর সেখানে রাখা থাকত।
আর ছিল একটা ঝুলবারান্দা। আমার বড়দা সেখানে বসে বসে পড়াশোনা করত। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার সময়ও ওই ঝুলবারান্দাই ছিল বড়দার প্রস্তুতির ঘর। মাঝে মাঝে আমরা ওপরের ঘরে যেতাম। দেখতাম ওই স্টোরেজ রুমে থিয়েটারের কত সাজ-সরঞ্জাম। হালকা টিনের তরোয়াল, মুকুট, ঢাল, পোশাক আরও কত সামগ্রী। ওই সব সামগ্রীকে ঘিরে আমার ভেতরে একরকম মজা, কৌতূহল গড়ে উঠেছিল। আসলে আমাদের বাড়িতে থিয়েটারের চল ছিল। দিঘির সমান্তরালে ছিল প্রায় দুশো ফিটের আটচালা। মেঝেটা ছিল শাল কাঠের। তবে কোনো দেওয়াল ছিল না। তার কিছুটা দূরেই দুর্গা প্রতিমা মণ্ডপ। এই দুর্গা মণ্ডপের সমান্তরালে ছিল থিয়েটারের জায়গাটা। তার পাশে গড়ে তোলা হয়েছিল পাঠশালা। এসবের ভিত মাটির হলেও পুজো মণ্ডপ ছিল অন্য সবের চেয়ে বেশ খানিকটা উঁচু। থিয়েটারের পাশাপাশি রাসযাত্রা, মহাভারতের গল্প – এইসব পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে যাত্রাও হতো। বিষয়ের দিক থেকে যাত্রা এবং নাটকের খুব একটা পার্থক্য ছিল না। মূলত সীতাকে কেন্দ্র করেই নাটক হতো। তবে কর্ণার্জুন পালা নিয়ে আমাদের আকর্ষণের শেষ ছিল না। ওই সব যাত্রা-থিয়েটারে বড়ো বড়ো ব্যাকড্রপ লাগানো হতো। কোনো ব্যাকড্রপে রাজবাড়ির অন্দরমহলের ছবি, তো কোনো ব্যাকড্রপ থেকে হয়তো রাস্তা বের হয়ে এল। তবে সে-সব ব্যাকড্রপে যে ছবি আঁকা হতো, ওই বয়সে আমার দেখতে ভালো লাগলেও এখন বুঝি সে-সব ছবির পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সময়ই কিছু ত্রুটি থাকত।
প্রশ্ন: আপনার বাবাও কখনো-সখনো ওই ব্যাকড্রপে ছবি আঁকতেন, তাই না?
উত্তর: বাবা এঁকেছিলেন ড্রপসিন। কালীয় দমনের। সাপের মাথায় নৃত্যরত ভঙ্গিমায় শ্রীকৃষ্ণ। প্রেক্ষাপটে সমুদ্র। বলা যেতে পারে, ওই কাজটাই ছিল বাবার প্রধান শিল্পকর্ম। আমার এখনও চোখে ভাসে – দু’জন দু’পাশ থেকে সেই ড্রপসিন টেনে ওঠাচ্ছেন আবার পালা শেষে নামিয়ে দিচ্ছেন।
তখনকার দিনে সমস্ত বর্ধিষ্ণু গ্রামেই যাত্রা বা নাটকের একরকম রেওয়াজ ছিল। একেকটি গ্রামকে ঘিরে কত শিক্ষিত লোক, তাঁদের কত নিজস্ব ভাবনা। বিনোদনের মধ্যে তাঁদের শিল্পভাবনার বীজ ছড়ানো থাকত।
এই যাত্রা-থিয়েটার মূলত হতো পুজোর সময়। ওই সময় কলকাতা থেকে একঝাঁক আত্মীয়-কুটস্ব আমাদের বাড়িতে চলে আসতেন। কলকাতা তো কাজের জায়গা। পড়াশুনো শেখার জায়গা। কিন্তু পুজোর সময় দেশের বাড়ির জলবাতাস না পেলে কারুর স্বস্তি হতো না। পুজোর প্রায় পনেরো দিন ওই লক্ষ্মী পুজো অব্দি দেশের বাড়িতে কাটিয়ে সকলে কলকাতা চলে যেতেন। বাড়িতে একরকম ভিড় লেগে যেত। বাড়ির লোকেরাই যাত্রা বা থিয়েটার করতেন। বাবাও অংশ নিতেন। তখনকার দিনে তো আবার মেয়েরা যাত্রায় পার্ট করতেন না। ছেলেরাই যাত্রাপালায় অবতীর্ণ হতেন নারী চরিত্রে। বাবা একবার কুন্তী সেজে দারুণ জমিয়ে দিয়েছিলেন।
তখনকার দিনে সমস্ত বর্ধিষ্ণু গ্রামেই যাত্রা বা নাটকের একরকম রেওয়াজ ছিল। একেকটি গ্রামকে ঘিরে কত শিক্ষিত লোক, তাঁদের কত নিজস্ব ভাবনা। বিনোদনের মধ্যে তাঁদের শিল্পভাবনার বীজ ছড়ানো থাকত। আর আমরা, যারা বৈদিক শ্রেণিভুক্ত, পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত বেদ চর্চা করতাম। স্বনামধন্য। হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ, যিনি মহাভারতের টীকা-টিপ্পনী লিখে খ্যাত, তিনি ছিলেন আমাদের জ্ঞাতি। ভাবা যায়, সঙ্গীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী ছিলেন আমার কাকিমার জামাইবাবু।
প্রশ্ন: এইরকম সুন্দর পরিবেশে কীভাবে দিন কাটত আপনার?
উত্তর: কলকাতার থেকে একেবারেই ভিন্ন ছিল আমাদের গ্রামের পরিবেশ। গ্রামে যে আমরা সারাক্ষণ পড়াশোনা করে কাটাতাম, তা একেবারেই নয়। পাঠশালায় আধবেলা পড়ার পাট থাকত। সেটাও কতদিন ভুলে গেছি। আমাদের পড়াশোনা নিয়ে বড়োদের অত মাথাব্যথা ছিল না। যতটা সময় পাঠশালায়, ঠিক ততটুকুই আমাদের পড়াশোনা। তবে প্রত্যেক পাঠশালার মতো এই পাঠশালাতেও একজন পণ্ডিতমশায় ছিলেন, প্রত্যেক পণ্ডিমশায়ের মতো ইনিও ছিলেন বেশ কড়া ধাতের। তিনি যে বেশ কড়া ধাতের তা জানান দিত তাঁর হাতের বেতের ছড়ি। ওই পাঠশালায় শুধু আমরাই পড়তাম তা নয়, আমাদের প্রজাবর্গের ছেলেরাও পড়তে আসত। তাদের সঙ্গে আমাদের বেশ বন্ধুত্বই ছিল। পাঠশালার পাট চুকে গেলে আমরা গ্রামের নানা জায়গায়, কখনো পশ্চিমপার, কখনো দক্ষিণের বাড়ি ছুটে খেলে বেড়াতাম। দক্ষিণ বাড়ির দিকে লোকালয় কিছুটা কম। তবে সেখানে বিজনদারা (ভট্টাচার্য) থাকতেন, সম্ভবত। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই ছবি একটা নালা পার হলেই ফুলগাছে ভরা বিস্তীর্ণ এলাকা। মূলত ওখানে গিয়েই ভিড় জমাতাম। বাবা-মায়ের বাধা নেই। গ্রামের কোথাও কোনো বাউন্ডারি নেই। চারিদিক খোলা এক বিশাল এলাকায় আমরা চরে বেড়াতাম। একবার ফলসা গাছে উঠে কীভাবে যেন পড়ে গেলাম। বেশ কিছুক্ষণ অজ্ঞান অবস্থায় ওখানেই। তারপর যখন জ্ঞান ফিরল, কিছুই মনে হল না, উঠে খুব স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। এখনকার দিনে এরকম ঘটনা ঘটলে বাড়ি জুড়ে কী ত্রাহিরব উঠে যেত।
আমার বাবার প্রিয় নেশা ছিল মাছ ধরা। হুইলে করে মাছ ধরতেন। রুই-কাতলা-মৃগেল এইসব। এরা দিঘির মাছ। এদের সঙ্গে ঢাউস আকারের চিতলও থাকত। তবে চিতল মাছ স্বভাবে কিছুটা আঞ্চলিক। এরা যুথবদ্ধভাবে দিঘির একটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই থাকত, ভেসে উঠত। আমরা, ছোটোরা এইসব উচ্চবর্ণের মাছ যে ধরিনি তা নয়। বাবার প্রিয় নেশার ছোঁয়া আমার মনেও এসে লেগেছিল। দিঘি ছাড়া আরও কত কত পুকুর, নালা। নালার দু’দিক বন্ধ করে, কৌটো দিয়ে জল ছেঁচে ল্যাটা মাগুর ধরতাম। বাড়ির যে অঞ্চলে রান্নাঘর তার থেকে একশো ফিট দূরেই আর একটি পুকুর, পেছনের দিকে। আমরা গ্রামীণ কথায় এই পুকুরকে ডাকতাম ‘ব্যারের ঘাট’ বলে। ওই পুকুরে ভরে থাকত কচুরিপানা। ওখানে কেউ স্নান করত না। বাসনকোসন ধোয়া হতো। এই পুকুরেও প্রচুর পরিমাণে ল্যাটা শোল এসব মাছ দেখা যেত। শোল মাছদের সমাজ ব্যবস্থা বেশ অন্যরকম। শোল মাছ বাচ্চা পাড়লে দেখতাম বড়ো মাছটিকে ঘিরে বাচ্চারা ঘুর ঘুর করছে। ওই বড়ো মাছটি ছোটো মাছেদের মা। মা-ই ওদের পাহারা দেয়। আর ছিল গজাল মাছ। সেগুলো আমরা পেতাম না। শুনেছি ওই মাছ খেলে শরীর খারাপ হয়।
আমরা কিন্তু নিজেরাই বড়শি বানাতে পারতাম। তার বেঁকিয়ে মুখে কেঁচো লাগিয়ে দিতাম। টলটলে জলে বেশ বড়ো আকারের বেলে মাছগুলো ভেসে বেড়াত। ওদের মুখটাও বেশ বড়ো। অবলীলায় বড়শিতে গাঁথা কেঁচো খেয়ে নিত। টান দিতেই অত বড়ো বেলে মাছ ডাঙায় এসে আকারে ছোটো হয়ে যেত। জলে থাকা অবস্থায় বেলে মাছকে বড়ো দেখায়। বড়োদের মাছ ধরার মধ্যে একটি রীতি ছিল। যিনি মাছ ধরবেন তিনি অন্য বাড়িতেও সেই মাছ সমান ভাগে ভাগ করে দেবেন। তবে মাছের মাথাটির অধিকার তাঁরই।
দিঘি-পুকুর এত বেশি, সাঁতার আপনা থেকেই শিখে গিয়েছিলাম। ওখানে থাকলে যে কেউই তা শিখে যাবে। গোটা একটা দিনই হয়তো কেটে গেল দিঘি পারাপার করে। সে-সময় বড়দা দিদি ছোড়দা সকলেই কলকাতায়। বাড়িতে ছোটো বলতে আমি আর আমার ভাই। সারা দিন গাছপালা নদী নালার মধ্যেই আমাদের বেড়ে ওঠা। সেই ফরিদপুর মাঝে মাঝেই আমার ভেতর হানা দিয়ে যায়। ছবিগুলো জ্যান্ত হয়ে আছে। আসলে, ছোটোবেলা থেকেই যে-কোনো দৃশ্য আমার মাথার ভেতর বন্দি হয়ে যেত। আজও তা স্মৃতি থেকে ধুসর হতে পারেনি। এই যে কথাগুলো তোমাদের বলে যাচ্ছি, কী হচ্ছে জানো, আমার কেবলই মনে হচ্ছে, না, আমি মোটেও শান্তিনিকেতনে বসে নেই, আমি ফরিদপুরে চলে গেছি। আমার চারপাশ জুড়ে ফরিদপুর।

মনে পড়ছে, বাবার সঙ্গে যেতাম জ্যাঠামশায় চারুচন্দ্র চৌধুরীর বাড়ি। লম্বা মতো সেই বাড়িটিতে বড়োদের আড্ডা বসত। সকলকে চা দেওয়া হতো। আমি তখন নেহাতই ছোটো, তবু মাঝে মাঝে চায়ের আসরে আমিও যোগ দিতাম। চায়ের সেই সুবাস আজও ভুলতে পারিনি। দুঃখ এটাই, পরবর্তীকালে ওই সুবাস আর কোনো চা-তেই পেলাম না। কলকাতায় চলে আসার পর প্রথম প্রথম চা-য়ে সেরকম সুবাস পেয়েছিলাম। তারপর কোথায় যে হারাল। কলকাতার কত জায়গাতে সন্ধান করেছি, কত রকমের চা-পাতা কিনে দেখেছি, কিন্তু ওই সুঘ্রাণ কিছুতেই পেলাম না। জ্যাঠামশায়ের বাড়িতে যে আড্ডা বসত, সেই ছবিও স্মৃতিতে উজ্জ্বল। নস্যি নিতেন বড়োরা। তাস খেলা হতো। আমাদের বাড়িতে ছিল না, কিন্তু জ্যাঠামশায়ের বাড়িতে গ্রামাফোন ছিল। সে এক মস্ত ব্যাপার। ওই গ্রামাফোন শোনার জন্য আমি মাঝে মাঝে গিয়ে বসে থাকতাম, তাকিয়ে থাকতাম ওই যন্ত্রটার দিকে। তখনও ইলেকট্রিক আসেনি, লণ্ঠনই ছিল প্রধান ভরসা। আর বড়ো বড়ো অনুষ্ঠানে থাকত হ্যাজাকের ব্যবস্থা। আর, যাত্রা-থিয়েটারের সময় লাল-হলুদ আলো দেখতাম। অবাক হয়ে ভাবতাম, ওই আলোগুলো কোথা থেকে আসছে।
প্রশ্ন: ওই সময়ই মা আপনাকে মহাভারত-রামায়ণ পড়ে শোনাতেন, তাই না?
উত্তর: মা খুব বই পড়তেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন মনে পড়ে, রোজ ওই দুপুরবেলায় বই পড়তে পড়তে, চশমা খুলে, কখন যেন ঘুমিয়েও পড়তেন। মায়ের বাড়ির দিকে সকলেই পড়াশোনা করা লোক, বাবাকে অত বই পড়তে দেখিনি।
প্রশ্ন: কিন্তু আপনার বাবা তো ছবি আঁকতেন…
উত্তর: বাবা আঁকতে পারতেন। নিজের মনের খুশিতে আঁকতেন। ওই জমিদারির কাগজপত্তরের পেছনে কিছু কিছু ছবি তিনি করতেন। তার থেকে কয়েকটা ছবি আমাদের ঢাকুরিয়ার বাড়িতেও নিয়ে আসা হয়েছিল। আমরা বাবার আঁকা একটা ছবি বাঁধিয়েও রেখেছিলাম। কিন্তু তারপর যে ওই ছবিটা কোথায় গেল বা কীভাবে নষ্ট হল তা আর আমার মনে নেই। ছবিটাকে ভুলি নি। একটা মেয়ে বসে আছে। রঙিন পেনসিল দিয়ে আঁকা।
মায়ের কথায় ফিরে আসি। আগেকার দিনে মহাভারতের মোটা মোটা বই থাকত অনেক বাড়িতে। সেই বইয়ের বাড়তি প্রাপ্তি ছিল কাহিনির সঙ্গে মজাদার সব ইলাসট্রেশন। রাক্ষসের ছবি দেখে আমি খুবই আকৃষ্ট হতাম। এছাড়াও রাম-রাবণের যুদ্ধ, হনুমান, তার দলবল এসব নিয়েও আগ্রহ তৈরি হতো। ওই সব ছবি দেখে মা-কে প্রশ্ন করতাম আর তিনি গল্প করে করে বলে দিতেন। তাছাড়া ওই যাত্রাপালা নাটকের মধ্যে দিয়েও ‘খুব ছোটো বয়সেই পুরাণ সম্পর্কে আমাদের একরকম জানাশোনা তৈরি হয়ে পিয়েছিল।
প্রশ্ন। আর দেশের বাড়ির খাওয়া দাওয়া সে সব তো নাকি গল্পকথার মতো। কেমন ছিল আপনাদের বাড়ির খাওয়া-দাওয়া।
উত্তর: সকালে চিঁড়ে মুড়ি খই এসব থাকত, দুধ বা দই নিয়ে মিশিয়ে খাওয়া হতো। সঙ্গে গুড় থাকত। আর বাংলাদেশ মানে তো সারা বছরের জন্য নাড়ু – যখন তখন মুখ চলত। নারকেলের নাড়ু ছাড়াও তিলের নাড়ুও খুব হতো। বাড়িতে ছাঁচে ফেলে আমসত্ব তৈরি হতো।
দুপুরের পাতে প্রথমে তেতো দিয়ে শুরু হতো। উচ্ছে ভাজা বা নিমপাতা ভাজী। এরপর আসত বেগুন পোড়া। কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাখা। সঙ্গে ডাল। মুগ, মুসুরি বা ছোলার ডাল। একটা কথা বলার, মায়ের হাতের রান্না খুব ভালো ছিল। তরকারির কথা আর কী বলব। গ্রামে যা যা পাওয়া যেত শাকসবজি সব নিয়েই তরকারি হতো। তবে কাঁঠালের দানা (বিচি) দিয়ে যে তরকারি তা এখনও আমার মুখে লেগে আছে। আর চারিদিকে কত রকমের মাছ – তাই সারা বছর, প্রতিদিন ভাতের পাতে মাছ থাকতই। তবে, আমাদের বাড়িতে কোনোদিন মুরগি ঢোকে নি। মাংস বলতে আমরা বুঝতাম পাঁঠা। পাঁঠার নিরামিষ ঝোল। আমাদের বাড়িতে কোনোদিন পেঁয়াজ, রসুনও ঢোকেনি। সুস্বাদু ওই মাংস রান্না হতো এলাচ দারুচিনি লবঙ্গ গোলমরিচ দিয়ে। বাড়িতেই ছিল গোয়াল ঘর। দুধ-দই-পায়েসের কোনো অভাব ছিল না। সঙ্গে চাটনি তো থাকতই।
আর, ওই মাংসের কথা বললাম না, এখনও মাঝে মাঝে বাড়িতে আমি ওইভাবে নিজের হাতে মাংস রান্না করি। যাই হোক, এই খাওয়া দাওয়ার সূত্রেই বলে রাখি, আমাদের গ্রামবাংলায় পুজোর পর, বিজয়ার সময় ঘরে ঘরে ছাঁচে ফেলে নানারকম মিষ্টি পড়তেন মা-কাকিমারা। সেই সব মিষ্টির ফর্মগুলো আমাকে আকৃষ্ট করত। তারপর নিমকি হতো। চিনির রসে সেসব নিমকি ডোবানো হতো। এইরকম নিমকি অবশ্য কলকাতায় চলে আসার পরেও আমাদের বাড়িতে হয়েছে। পুজোর পরে কৌটো হাতে আমরা বিজয়া করতে বেরোতাম। বাড়িতে বাড়িতে বিজয়া করতে যাওয়া তখন আমাদের একটা রীতি ছিল। বাড়ি ফেরার পথে সেই কৌটো মিষ্টিতে ভরতি হয়ে যেত।
পুজো ঠিক যে-সমায় শেষ হতো, বর্ষা না থাকলেও নদীগুলো বর্ষার জলে টইটম্বুর হয়ে থাকত। টলটলে জলের উপর শাপলা ছাড়াও সাদা সাদা ফুল ভেসে থাকত। নৌকো করে ঘুরে বেড়াতাম। ছোটো ছোটো কত রকমের মাছ দেখা দিয়ে যেত। কালো জলে রামধনুর রং ছড়িয়ে যেত খোলসে মাছ।
পুরোনো বাংলাদেশের এসব চিত্র আমার কিছু কিছু কবিতায় এসে ধরা দিয়েছে।
প্রশ্ন: এইরকম এক নিশ্চিন্ত সুন্দর গ্রামীণ পরিবেশে ছ’সাত বছর কাটল। আর ঠিক এই সময়ই যদি গ্রামের বাইরে চোখ রাখি, দেখব পরিস্থিতি যথেষ্ট উত্তাল। যুদ্ধ, রায়ট, দেশভাগ…
উত্তর: শোনো, গ্রামে থাকতে রায়ট ব্যাপারটা আমরা একেবারেই বুঝিনি। ওসব ঢাকা, ফরিদপুর বড়ো বড়ো শহর অঞ্চলে হতো। গ্রামে সংবাদপত্রও আসত না। আমরা নিশ্চিন্ত এক দ্বীপে হিন্দু-মুসলমান সকলেই একসঙ্গে বাস করেছি। সকলের সঙ্গেই মধুর সম্পর্ক। শুধু উপর দিয়ে মাঝে মাঝে জাপানি যুদ্ধ বিমান উড়ে যেত। তাতে ভয়ের থেকে মজাই লাগত বেশি। পুজোর সময় কলকাতা থেকে আত্মীয়-কুটুম্বদের সঙ্গে আমার বয়সি ছেলে-মেয়েরাও আসত। কলকাতায় থাকার ফলে ওরা বেশ সাহেব-সুবো ছিল। স্মার্ট ছিল। আমরা পরতাম ইজের দেওয়া প্যান্ট। ওদের প্যান্ট বোতামওয়ালা। ওরা নানারকম খেলাধুলার সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে আসত। গুলি খেলা ওদের কাছ থেকেই শিখেছি। ওরা যখন আমাদের গ্রামে আসত, সঙ্গে চলে আসত কলকাতার পরিবেশও। ওদের মুখেই সেই ছড়া শুনেছিলাম – ‘জাপানি ফেলিবে বোমা কলিকাতা জুড়িয়া’। যুদ্ধ বলতে আমরা বুঝেছিলাম ওই ছড়াটুকুই যা। ওরা যখন চলে যেত, কলকাতার পরিবেশও আমাদের গ্রাম থেকে বিদায় নিত। তাতে আমার আক্ষেপ হতো না। গ্রাম বাংলাই আমার প্রিয় ছিল। বহুরূপীরা আসত। আমাদের বাড়ির পাশের মাঠে চড়কের মে’লা বসত। আমার একটা ছবি আছে, মেলার। সেখানে অবশ্য চড়কের সেইসব দৃশ্য আঁকিনি – ওই সেই লোকটা আমার ছবিতে ধরা পড়েনি, যার চামড়ার মধ্যে দিয়ে একটা হুক ঢুকে বের হয়ে যেত। কিংবা সেই লোকটিও আমার ছবিতে নেই যে মানত করে জিভে বঁড়শি গেঁথে নিত আর কিছুতেই কথা বলতে পারত না। ওরা আমাদের বাড়ির সামনে হাজির হতো চাল-ডাল ভিক্ষে করবে বলে। জিভে বঁড়শি গাঁথা অবস্থায় ওইসব ভিক্ষান্ন সে যে কীভাবে খেত – কে জানে। আমার আঁকা ওই ছবিতে এল হাটের মেজাজ। কত লোক সেখানে কলসি পুতুল এসব নিয়ে বসত। কত লোকের ভিড় সেসব কিনবে বলে।
আসলে আমি যেটা বলতে চাইছি ওই পুজো, ব্রত, মেলা এসবের মধ্যে দিয়ে গ্রামের সমাজটা জেগে উঠত। কম বয়সি মেয়েরাও শাড়ি পরে কী সুন্দর পাউডার দিয়ে আলপনা দিত। তার সঙ্গে ফুল সাজাত ব্রত পালনের সময়। এরা সকলেই প্রায় আমাদের আত্মীয়-কুটুম্ব। দেশভাগের পর আর এদের দেখা পেলাম না। সকলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল।
তবে একটা জরুরি কথা, জমিদারি ছিল বটে আমাদের। কিন্তু আমার বাবার মধ্যে জমিদারের কঠোর মেজাজ ছিল না। তাঁর প্রকৃতি ছিল নরম। অনেক সময়ই হয়েছে প্রজারা হয়তো খাজনার অর্থ দিতে পারল না, পরিবর্তে তাঁদের বাড়ির ফলন ওই নারকেল, লাউ, ওল এসব দিয়ে গেল। বাবা মেনে নিতেন। আবার যার পক্ষে সম্ভব সে অর্থের মাধ্যমেই খাজনা দিয়ে যেত।
প্রশ্ন: এই প্রকৃতি পরিবেশের মধ্যে প্রথম কবে আপনি ছবি আঁকা শুরু করলেন?
উত্তর: দেশের বাড়িতে আমি কখনো ছবি আঁকিনি। আমার অজান্তেই ভেতরে ভেতরে হয়তো একটা কিছু গড়ে উঠছিল। ধরো, বাড়ির সামনের উঠোনে হঠাৎই আপন মনে আমি বাগান করতে লাগলাম। খুব ছোটো জায়গা; তাতে ফুল গাছের ডালপালা এনে পুঁতে দিলাম। মাঝে একটা পুকুর কাটলাম। আমাদের ওখানে একরকম মাছ পাওয়া যেত, খুবই ছোটো ছোটো মাথাটা জলের ওপরে ভাসিয়ে রাখত, কী যেন নাম, এখন আর মনে পড়ছে না, সেই মাছ সহজেই ধরা যেত, ধরে এনে আমায় পুকুরে ছেড়ে দিতাম। ঘণ্টাখানেক পরে মরা মাছগুলো ভেসে উঠত। ফুল ডালপালা শুকিয়ে যেত পরের দিনই। কিন্তু ওই ছোট্ট জায়গাটাকে কীভাবে সাজিয়ে তুলব, সেই নিয়ে মজায় থাকতাম। ভেবে দেখো, এটা একধরনের ক্রিয়েটিভ ওয়ার্ক। পুজোর সময় মূর্তি গড়তে লোক আসত। খড় বাঁধা থেকে শেষ পর্যন্ত কী এক আচ্ছন্নতা পেয়ে বসত আমাকে। দেখা আর ফুরোত না। দেখা মানে তো. শেখা। ওদের রংগুলো দেখতাম – হরিতাল অর্থাৎ হলুদ রং তারপর নীল রঙের চাকা। ওরা চলে যেত, রঙের ভাঙা টুকরো পড়ে থাকত। ওই পড়ে থাকা রংগুলো আমার কাছে এক আশ্চর্য প্রাপ্তি হয়ে উঠত। ঠাকুর গড়া দেখতে দেখতে আমারও হাত মূর্তি গড়তে চায়। সরস্বতী, কার্তিকের মূর্তি তৈরি করেছি, কিন্তু মূর্তিগুলোকে কীভাবে দাঁড় করাব? আমার করা ওই মূর্তিগুলো শুয়েই থাকত। তবে একরকম রং আবিষ্কার করেছিলাম মনে আছে। বাড়ির চারিদিকে একধরনের গাছ লাগালে হতো আগে, বেড়া দেওয়ার জন্য, সেই গাছের রস চুনের সঙ্গে মেশালেই সাদা রং হলুদ হয়ে যেত। সেই রং লাগাতাম মূর্তিগুলোর পায়ে। দেশের বাড়ির চালচিত্র আমার জীবনে এ-কারণেই গুরুত্বপূর্ণ, ওখানে না থাকলে আমি কোনোভাবেই শিল্পকে সমাদর করতে শিখতাম না। ওই যে নানা রঙে নানা বেশভূষায় বহুরূপীরা আসছে, দোল পূর্ণিমার দিনে গোবিন্দদেবের মূর্তি সাজানো হচ্ছে, তাঁকে কাপড় পরানো হল, আবিরে লাল করে দেওয়া হয়েছে তাঁকে, এ সবের মধ্যে একরকম নাটক রয়েছে, যে নাটকীয়তা আমি থিয়েটার বা যাত্রার মধ্যেও খুঁজে পেয়েছি বারে বারে। বার বার আমি ওই নাটকীয়তায় আকৃষ্ট হয়েছি। আর প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা, ঘুরে বেড়ানোর ফলে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল অনেক নিবিড়। রান্নাঘরের চালের উপর লাউ ডগাটা উঠেছে, সে কীভাবে বেড়ে উঠছে, কিংবা বাতাবি লেবুর গাছটাই বা কীভাবে বেড়ে উঠেছে – এসব দেখতে খুব ভালো লাগত। প্রাকৃতিক শোভা আমাকে আকৃষ্ট করত। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি উৎসাহ আমি খুঁজে পেতাম প্রকৃতির উপাদানগুলোর মধ্যে। তোমরা দেখো, সেভাবে আমি কিন্তু ল্যান্ডস্কেপ আঁকিনি, অন্যরা যেমন এঁকেছেন, কিন্তু প্রকৃতির উপাদানগুলোর মধ্যে যে অর্গানিক কোয়ালিটি তা আমার ছবিতে এসেছে। পিঁপড়ে কীভাবে হেঁটে যাচ্ছে কিংবা পাছের পাতার উপর চকমকিয়ে গেল একটা রঙিন পোকা – আজও দেখি।
দেশভাল, কলকাতায় আগমন
প্রশ্ন: যে-কোনো মানুষের জীবনেই স্থানান্তর একটা বড়ো অভিজ্ঞতা। বেশভাগের পর আপনাকেও কলকাতা চলে আসতে হল, অত কম বয়সেই।
উত্তর: বড়দা গিয়ে আমাদের নিয়ে এসেছিলেন। মা, আমি, আমার ছোটোবোন নমিতা এবং আমার ছোটভাই। শুধু ঠাকুরমা আর বাবা ওদেশেই রয়ে গেলেন। আমার তখন ন’বছর বয়স। ট্রেনে করে চলে এলাম। সেবার ট্রেনের ওপর থেকে পড়ে নমিতা মাথায় ভয়ানক চোট পেল। কলকাতায় এসে অপারেশন করাতে হয়েছিল। তবে কলকাতায় এর আগেও একবার এসেছিলাম, চার-সাড়ে চার বছর বয়সে। তখন কাকাবাবু থাকতেন আশুতোষ মুখার্জি রোড ধরে এলগিন রোডের দিকে যেতে একটি বাড়ি পড়ে, যেখানেই। পরে, ওই বাড়িটিকে আমরা ভাই-বোনেরা শনাক্তও করেছিলাম। কাকা খুব দুরস্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। দেশ থেকে পালিয়ে এসে সরাসরি পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছিলেন। সেবারের কলকাতা সফরের দুটো স্মৃতি আমার এখনও মনে আছে। ওই বাড়ির একটা ঘর ছিল, যার দেওয়ালের নীচের দিকে জল যাওয়ার জন্য ছিদ্র করে রাখা হয়েছিল। কাকাবাবু সেই ছিদ্রপথ বন্ধ করে জল ছেড়ে দিতেন। জল আর ওই ঘরের থেকে বাইরে বেরোতে পারল না। সেদিন এভাবেই তিনি আমাদের স্নানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কাকাবাবুর পরিচারকের নাম ছিল কান্তি। সে আমাদের ময়দানে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল। থোকা থোকা গুলমোহর পেড়ে সে আমাদের হাতে দিল। আজও, হলুদ সেই গুলমোহরের রং দু’হাতে লেগে আছে যেন। যাই হোক, পার্টিশনের সময় দ্বিতীয় বারের জন্য কলকাতায় আসতে হল। তখন আমাদের এত কিছু বোঝার বয়স হয়নি। বুঝতে পারিনি এখন থেকে কলকাতাতেই থাকতে হবে। ফরিদপুর মুজিবরের দেশ, সেখানে তিনি জন্মেছিলেন। ঝঞ্ঝাটের কোনো আঁচ না পাওয়ায় আমরা ছোটরা বুঝেছিলাম বড়দা নিতে আসছেন, আমাদের কলকাতা যেতে হবে। বড়োদের মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল মনে মনে। কলকাতায় কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, সবই তখন আমাদের কাছে অস্পষ্ট। যেতে খারাপও লাগছে। প্রায় আধবেলা স্টিমারে কাটিয়ে সন্ধে নাগাদ নামলাম গোয়ালন্দ স্টেশনে। স্টিমারের ফ্লোরে কাতারে কাতারে মানুষ শুয়ে আছে। চারিদিকে ভিড়। তবু স্টিমার অভিযান খারাপ লাগছিল না। তারপর গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে ওঠা। অন্ধকার ওই ট্রেনটাও বেশ অদ্ভুত। ছোটো ছোটো ঘর। বাড়ির মতো মনে হচ্ছিল। তবে কোনো চেকার ছিল না। জানিয়ে রাখি, বর্ডার পার করার সময় শেষ চেকিং করা হল আমাদের। একটি দৃশ্য মর্মাহত করেছিল। আমাদের সঙ্গ নিয়েছিলেন এক মহিলা। তাঁর যথেষ্ট বয়স এবং বোধ করি তিনি ছিলেন বিধবা। চেকিংয়ের সময় তাঁকে আটকে দেওয়া হল। তিনি থেকে গেলেন ওপারেই। ওপারে তাঁর কেউ ছিল না। আর এপারেও তিনি যে কার কাছে যাচ্ছিলেন, তাও তাঁর অজানা ছিল।
দেশভাগের এই অবর্ণনীয় ব্যথা আমার বাবাকেও সারা জীবন তাড়া করে গেছে। তিনি ছিলেন ওই দেশের জমিদার। আর এইপারে যখন এলেন, সারাদিন চুপচাপ ঘরে বসে থাকতেন। এদেশে এসে তাঁর কিছু করার নেই। আয় নেই। ওই সময়টা আমাদের খুবই কষ্টের মধ্যে কেটেছে। বাবা এদেশে এসেছিলেন ১৯৫১ সালে। তারপর আবার ফিরে গিয়েছিলেন ফরিদপুর। জমিজমা কিছুই বিক্রি করা সম্ভব হল না। সামান্য কাঠকুটো ইত্যাদি যা বিক্রি করতে পেরেছিলেন সেসব বেচে যে অর্থ পেয়েছিলেন তিনি, তা তাঁর মায়ের অর্থাৎ আমাদের ঠাকুরমার শ্রাদ্ধে ব্যয় হয়ে গেল।
গোয়ালন্দ স্টেশন থেকে সেদিন ট্রেনে করে বালিগঞ্জ এলাম। ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেদিনের বালিগঞ্জ স্টেশন। প্রথমেই আকর্ষণ করেছিল পেট্রলের গন্ধ, এখন সেই গন্ধ আর পাই না। কী পরিষ্কার স্টেশন চত্বর বলে বোঝানো যাবে না। দোকান-পাট কত কম। এখনকার মতো বিক্রি কোলাহলময় নয় তার পরিবেশ। কিন্তু তখনও যে উন্নয়ন ছিল না, তা নায়, স্বস্তি ছিল। এখনকার মতো উন্নয়নের নেতিবাচক দিকগুলো সেদিনের
পরিবেশকে ঘিরে ফেলতে পারেনি। অনেক বেশি আন্তরিক ছিল সেই পরিবেশ। ঝাঁ-চকচকে দোকান ছিল না অত। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের উষ্ণতা ছিল। পাড়ায় পাড়ায় সেদিনেও অজস্র ক্লাব গড়ে উঠেছিল। ঘরে ঘরে আড্ডার প্রচলন ছিল। কিন্তু এই সমস্ত কিছুকে চাদরের মতো মুড়ে রাখত সংস্কৃতি। পরের দিকে আমরা যেখানে এসে থাকতে শুরু করলাম, ঢাকুরিয়ায়, সেখানে পাড়ায় পাড়ায় কত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান লেগে থাকত। এখন টিভিতে কোনো অনুষ্ঠান হলে আমরা দেখি আর তখন আরও কত ভালো অনুষ্ঠান আমাদের পাড়াগুলোতে নিয়মিত হতো। আমাদের পাড়াতেও একটি ক্লাব ছিল, কিশোর সংঘ। জনা তিরিশেক ছিলাম তার সদস্য। ফুটবল দল তৈরি হয়ে গেল।
সেদিন বালিগঞ্জ স্টেশনে নেমে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে আমরা গিয়ে পৌঁছোলাম পি ৯৫/বি মনোহর পুকুর রোড, আমার সেই কাকাবাবুর বাড়ি, যিনি জীবিকাসূত্রে পুলিশ। আর তিনি পুলিশ বলেই আমার বড়ো দাদা কিছুতেই সেখানে থাকবেন না। কেননা তিনি তখন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত এবং সে সময় ওই পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। খবর পেলাম কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য মারা গেলেন যাদবপুরের টি.বি হাসপাতালে। কাগজে বেশ বড়ো করে সুকান্তর ড্রয়িং অথবা ফোটোগ্রাফ বেরোল। আর কাকা ঠিক পুলিশও ছিলেন না, তিনি সিআইডি। সেজন্যে কাকিমাও বড়দাকে ওই বাড়িতে থাকার ক্ষেত্রে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। বড়দা থাকতেন মামার বাড়িতে। নতুন জায়গাতে এসে আমাদের পথ ভুল হতেই পারে, এই আশঙ্কায় বড়দাই বারেবারে ওই বাড়ির ঠিকানা অর্থাৎ পি ৯৫/বি মনোহরপুকুর রোড – আমাদের মাথায় গেঁথে দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন: সেই বাড়িতেও তো খুব বেশিদিন ছিলেন না আপনারা।
উত্তর: না, সে-সময় তিন বছরের মধ্যে আমরা চার বার বাসা বদল করেছি। কাকাবাবুর প্রমোশন হল। সেই সূত্রে সকলে মিলে উঠে এলাম দশ নম্বর গোখেল রোডে। কাকিমাদের তিন ছেলে-মেয়ে। সকলকে নিয়ে একটি ঘরে ওরা থাকতেন। পাশের ঘরে থাকতাম আমরা।
আর অমাদের এক মামা কালু মামা ও আরেক দাদা এঁরা দু’জনে শুতেন ওই বাড়ির সিটিং রুমে বেড লাগিয়ে। ওইরকম ভাবে থাকার মধ্যেও জীবনের অনেক অভিজ্ঞতা উপভোগ করেছি। ওখানে গিয়েই আমার প্রথম ব্রিটিশ দর্শন। ১৯৪৮-৪৯ সাল। গোখেল রোডের যে কোয়ার্টারে আমরা থাকতাম, সেখানে দুই ব্রিটিশ পরিবারও ছিল। প্রথম পরিবারের যিনি প্রধান তাঁর নীল ঘোলাটে চোখ দেখে আমরা খুব ভয় পেতাম। ওই সাহেবের দুটি ছেলে ছিল, আমাদের বয়সি। বড়ো ছেলে টমি আর ছোটো জন টাইগার। অচিরে ওরা আমাদের সঙ্গী হয়ে গেল। আরেক পাশে ছিল মিসেস পাওয়েলের বাড়ি। তাঁর দুটো ফ্ল্যাট এমনভাবে জোড়া লাগানো যে দুটো ফ্ল্যাটের মাঝখানে ওঁদের রান্নাঘর পড়ত। আমাদের বাড়িতে তখনও উনুনে রান্না হতো, যাকে বলা হতো ‘ধোঁয়া লাগানো’। সেই উনুন জ্বলামাত্র গলগল করে ধোঁয়া বের হতো, আর ধোঁয়ার সমমাত্রায় খেপে উঠতেন মিসেস পাওয়েল, দৃঢ় অভিযোগ, ধোঁয়া নাকি তাঁর চুল নষ্ট করে দিচ্ছে। ওদের বাড়িতে একটা মোটর বাইক ছিল যার সঙ্গে লাগানো ছিল আরও একখানা অতিরিক্ত সিট। মি. পাওয়েল সেই বাইকে স্টার্ট দিচ্ছেন আর মিসেস পাওয়েল গিয়ে বসছেন ওই অতিরিক্ত সিটে, এরকম দৃশ্যদর্শন ছিল আমাদের কাছে নৈমিত্তিক ব্যাপার।
গোখেল রোডের পরিবেশ ছিল অসামান্য। নির্জন, ছিমছাম, অত্যন্ত পরিষ্কার রাস্তাঘাট। সাম্প্রতিকের সঙ্গে সেদিনের গোখেল রোডকে কোনোভাবেই মেলানো যাবে না। কাকাবাবু তখন অফিসার র্যা ঙ্কে কাজ করছেন। তাঁর চাকরি জীবনের অন্যতম ঘটনা, স্বাধীনতার পূর্বের কথা, তিনি নাকি নেতাজির ব্যাপারেও গোয়েন্দাগিরি করেছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও বেশ কয়েক বছর গোখেল রোডে ব্রিটিশরা থাকায়, একটু আগেও বলেছি, তাঁদের বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে আমাদের ভাব হয়ে গিয়েছিল, একসঙ্গে খেলাধূলো করতাম। বেশিরভাগ সময়ই ক্রিকেট খেলেছি। একটা কথা বলে রাখি, খেলাধুলোর ব্যাপারে আমার কোনোদিনই সেভাবে উৎসাহ ও সামর্থ্য ছিল না। আমার ছোটোভাই ছিল বেশ তাগড়াই চেহারার, যা আমি নই। ফুটবল মাঠে তাই গোলকিপারের মতো দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকাতেই আমাকে দেখা যেত (হেসে)।
গোখেল রোডের বাড়িতেই কাকাবাবুর সৌজন্যে প্রথম রেডিয়ো দেখলাম। নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চ্যানেল পালটে সাউন্ড বাড়িয়ে কমিয়ে রেডিয়ো শোনার সেই ছোটোবেলাকার বিস্ময় আজও আমার মনে রয়ে গেছে। ততদিনে অবশ্য শিবরাম চক্রবর্তীর বই এসে গেছে আমাদের হাতে। এবং পুজো, আমাদের গ্রামের তুলনায় কলকাতার দুর্গাপুজো দেখার অভিজ্ঞতাও যে কত নতুন, তা বুঝতে পেরেছি। পুজো শেষে জলসার আয়োজন থাকত। সেই জলসায় প্রথম শুনলাম হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘কোনো এক গাঁয়ের বধূ’। তখন হেমন্ত বাবুর আর কতই বা বয়স। বড়োজোর পঁচিশ। চৌকির ওপর সাধারণ একটা হারমোনিয়াম রেখে অসাধারণ সব গান পরিবেশন করে গেলেন তিনি। ওই গোখেল রোডে থাকার সময়ই জীবনের প্রথম সিনেমা দেখা তানসেন – কে.এল. সায়গলের অভিনয় দেখে আমরা তখন মুগ্ধ হয়ে গেছি। এভাবেই শহরে পরিবেশের মধ্যে এসে পড়লাম আমি।
প্রশ্ন: এই সময় থেকেই কি আপনার ছবি আঁকার শুরু?
উত্তর: না, তখনও আমি আর্টিস্ট নই। কিন্তু মনের ভেতর বোধহয় একটা চর্চা শুরু হয়ে গেছে। কাগজে, পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হতো অবনীন্দ্রনাথের ছবি। তাঁর সেই ‘শাহাজাহানের মৃত্যু’ ছবিটি ওখানেই প্রথম দেখি। এছাড়াও ছাপা হয়েছিল পিকাসোর পায়রার ছবি। আমি কাগজের থেকে, পত্রিকার থেকে সেইসব পাতাগুলো কেটে কেটে একটা খাতায় সেঁটে রাখতাম। ওই খাতা আমার জীবনের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। সেই ‘৪৮ সালের কথা বলছি। এটা ২০১৮। সত্তর বছর হয়ে গেল। এখনও সে-খাতা আমার কাছে রাখা আছে। ওই প্রথম শিল্পের সঙ্গে আমার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। আমি তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বোধ করছি।
প্রশ্ন: কলকাতায় এসে আর পুতুল গড়েননি?
উত্তর: না, পুতুল আর গড়া হল না। কিন্তু বুঝতে পারলাম আমি আঁকতে পারি। ঢাকুরিয়ার বাড়ির দেওয়ালে লাল-নীল পেনসিল দিয়ে ময়ুর এঁকেছিলাম। সে-ই আমার জীবনের প্রথম ড্রয়িং। বাড়িটিতে রঙের প্রলেপ পড়েছে বহুবার। তবু মনে হয়, দেওয়াল ঘষে ঘষে প্রলেপ সরালে বুঝি ওই রং বেরিয়ে পড়বে। ঢাকুরিয়ার বাড়িতে আমরা এসেছিলাম ১৯৫১ সালে। আবার একটু পিছনে ফিরছি। গোখেল রোডে থাকার সময়ই আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হল। সঙ্গে ওই বছর নমিতা ছাড়া অন্য ভাইদেরও। কীভাবে ভরতি হলাম। হেডমাস্টার প্রশ্ন করলেন টাইগারের বানান কী হবে? উত্তরটা আমার কাছে ছিল অতি সহজ কেননা, আমার বন্ধুর নামই তো ‘টাইগার’। বলে দিলাম t-i-g-e-r. রামরিক হরলালকা স্কুলে ক্লাস ফোরে আমাকে নেওয়া হল। ক্লাস সিক্স অব্দি সেই স্কুলে পড়েছিলাম। আর ওই ক্লাস সিক্সের সময়ই প্রথম কোনো শিল্পকাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। স্কুলে হাতে লেখা একটা পত্রিকা হয়েছিল। তার সম্পূর্ণ অলংকরণ আমিই করেছিলাম। এই ঘটনা ময়ূর
আঁকারও আগের। যদিও সেই পত্রিকা আজ আর কোথাও সংরক্ষিত নেই। থাকলেও আমার অজানা। পরবর্তী সময়ে নিজের প্রথম স্কুলকে দেখতে গিয়েছি। তার চেহারা বদলে গিয়েছে এখন। আধুনিক একটা বিল্ডিং হয়েছে সেখানে।
প্রশ্ন: ‘৬১ সালে ঢাকুরিয়া আসার সঙ্গে সঙ্গে আপনার স্কুলেরও তো বোধহয় বদল হল।
উত্তর: জানো, পড়াশোনায় আমি মোটামুটি ভালোই ছিলাম। সে-কারণেই বোধ হয়, সিক্স পাশ করার পর ছোড়দা আমাকে একেবারে ক্লাস এইটে ভর্তি করে দিলেন। অবশ্য সে-সময় অত বাধা-নিষেধ ছিল না। ভর্তির সময় অত সার্টিফিকেট দেখাও হতো না। প্রথমে আদর্শ নগর স্কুলে চেষ্টা করা হল। সেখানে না-হওয়াতে ঢাকুরিয়ার একটি স্কুলে ভর্তি করানো হল। সে-ও এক মজার ব্যাপার। জলযোগ নামে একটি খাবারের দোকান আছে, তার মালিক তৈরি করেছিলেন সেই স্কুল। যদিও স্কুল তৈরি করবেন এরকম পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না। তাঁরা একটা সিনেমা হল তৈরি করতে চেয়েছিলেন। সেভাবেই কাঠামোটা গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু করপোরেশনের অনুমতি না মেলায় সিনেমা হল হয়ে গেল স্কুল। হলের কাঠামোয় পার্টিশন দিয়ে-দিয়ে স্কুলের চেহারা তৈরি করা হল। সেই স্কুলের প্রথম বছরের ছাত্র আমি। অঙ্ক আমার ভালো লাগত। কিন্তু সমস্যা হল, সেভেনে না-পড়ার ফলে অ্যালজেব্রায় সড়গড় হতে পারলাম না। কিন্তু পাটিগণিতে নিজের চিন্তাপদ্ধতি খাটিয়ে খাটিয়ে আমি সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারতাম। স্কুল ফাইনালে অঙ্কে আমি সত্তরের মতো পেয়েছিলাম। হাই সেকেন্ড ক্লাসে পাশ করলাম। ওহ, একটা কথা বলা দরকার। আমাদের স্কুলের হেডমাস্টারমশায় আমাকে সেসময় পাঁচ অথবা পনেরো টাকা, ঠিক কত তা আজ আর মনে করতে পারছি না, ব্যাক্তিগত স্কলারশিপ দিয়েছিলেন। আমার তখন চেহারা খুবই দুর্বল। দুধ খেতে বলেছিলেন। পড়াশোনায় ভালো, ফাইনালে যাতে আরও ভালো করতে পারি, সে-কারণেই উৎসাহ দিয়েছিলেন। স্কুলে টেস্ট পরীক্ষায় সেকেন্ড হয়ে আমি ‘বুড়ো আংলা’ উপহার পেলাম। ফার্স্ট ক্লাস পেতেই পারতাম। আসলে, আমার তো বই ছিল না। বাবার আর্থিক দুর্দশা তখন চরমে। বই তো দূরের কথা, খাবারই জুটত না ঠিক মতো। দিদির বাড়িতে গিয়ে বাবা ধার করে টাকা নিয়ে এসে চিঁড়ে কিনতেন। ধার বেড়েই যেত। দাদা দূরে থাকতেন। চাকরিসূত্রে। নিজের খরচ সামলে কিছু টাকা পাঠাতেন। আমাদের পরিবারে এই সংকট বেশ দীর্ঘদিন ধরে চলেছিল। সেসব আর না-বলাই ভালো।
প্রশ্ন: ঢাকুরিয়ার এই পর্বেই লেখালেখির প্রতিও আপনার আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে, তাই না?
উত্তর: বাংলা লেখার প্রতি আমার একটা ঝোঁক ছিল। তখন ঢাকুরিয়ায় আমরা সকলে মিলে দেওয়াল পত্রিকা করছি। আমি অজস্র ছড়া লিখেছি সে-সময়। সে-সব নিয়ে পরে বইও হয়েছে। আবার, ছড়া লিখতে লিখতে বুঝতেও পারিনি, কখন সেসব কবিতা হয়ে উঠেছে। ঢাকুরিয়ায় ‘সরোজদা’ ছিলেন, সরোজলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। সাহিত্য নিয়ে তাঁর গভীর চর্চা। আদর্শের দিক দিয়ে ছিলেন মার্কসিস্ট। এর সঙ্গে পরবর্তীকালে অরুণাচল বসুরও যোগাযোগ তৈরি হয়। সরোজদার নেতৃত্বে আমরা লেখালেখিতে ডুবে গেলাম। আমার ভাই, নমিতা, ওরাও লেখালেখি করত। তখন পাড়ায় রীতিমতো সাহিত্যসভা হতো। আমরা নিয়মিত যোগ দিতাম। নিজেদের লেখা পাঠ করতাম। এদিকে স্কুলের দিনও শেষ হয়ে আসছিল।
(অংশবিশেষ)
উৎস: শিলাদিত্য, কলকাতা, জুলাই ২০১৮


Leave feedback about this