গদ্য

রিলকে : গোলাপ-কাঁটায় নিহত হে কবি | দ্বিতীয় পর্ব | মাসুদ সিদ্দিকী | প্রবন্ধ

Basic RGB

একদিন কবির সাথে দেখা করতে একজন অতিথি আসেন। তিনি হলেন মিশরীয় সুন্দরী নারী নিমেত এলুই বে। তাঁকে স্বাগত জানাতে কবি তাঁর নিজের বাগান থেকে কিছু গোলাপ ফুল সংগ্রহ করেন। ফুল তোলার সময় তাঁর হাতে গোলাপকাঁটা বিদ্ধ হয়। কাঁটার দংশনে কবি তীব্র বেদনা অনুভব করেন। এই ক্ষুদ্র আঘাতের আর নিরাময় হয়নি। দ্রুত খারাপের দিকে যায়। তার দুই বাহুর গ্রন্থি ফুলে যায়। ক্রমশ কবি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। ১৯২৬ সালের ডিসেম্বর মাসের ২৯ তারিখ কবি সুইজারল্যান্ডের ভালমঁ স্যানেটোরিয়ামে ডাক্তারের হাতের ওপর চোখ খোলা অবস্থায় মারা যান। মৃত্যূর পূর্বে রিলকের রোগ নির্ণয় করে বলা হয় রোগটা ছিল লিউকেমিয়া। শ্বেত কণিকার আধিক্যজনিত রক্তাল্পতার কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯২৭ সালের ২ জানুয়ারি তাকে ভিসপের পশ্চিমে রারোঁ সমাধিতে সমাহিত করা হয়। রিলকে মৃত্যু আগেই তার একটি কবিতাকে তাঁর সমাধিলিপি হিসেবে নির্বাচন করে গিয়েছিলেন :
Rose , O pure contradiction, desire
to be no one’s sleep beneath so many Lids

রিলকের তিনটি সম্পূর্ণ কবিতাচক্রের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে The Book of Hours। ১৯০৫ সালে এই বইটি প্রকাশিত হয়। এর উপকরণ ও প্রকরণের মধ্যে দিয়ে তিনি খ্রিস্টান ধর্মের আলোকে ঈশ্বরের অনুসন্ধান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করেছেন। ধর্মীয় প্রার্থনারীতি, প্রকৃতি এবং বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে সন্ত ফ্রান্সিসের চিত্রকল্পকে গ্রহণ করেছেন। উদাহরণ তিনি বলেন :
I find you, Lord, in all Things and in all
my fellow creatures, pulsing with your life;
as a tiny seed you sleep in what is small
and in the vast you vastly yield yourself.
The wondrous game that power plays with Things
is to move in such submission through the world :
groping in roots and growing thick in trunks
and in treetops like a rising from the dead

উল্লিখিত কবিতার মূল সুর হচ্ছে স্রষ্টা চরাচরের সব কিছুতেই বিদ্যমান। পৃথিবীর সবকিছুতেই তিনি পরিব্যাপ্ত। বস্তুত স্রষ্টা সবকিছুতে আছেন এবং সবকিছুই ঈশ্বর এই সর্বেশ্বরবাদী বিশ্বাস কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় আছে। তাছাড়া ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মরমি মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবির “ওয়াহিদাতুল ওজুদ” তত্ত্বে (Unity of Being) এটি বহুল আলোচিত একটি বিষয়। যা হোক, রাশিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পর কবি যান জার্মানির শিল্পী কলোনিতে। সেখানে তার সাথে দুই মেধাবী চিত্রশিল্পীর পরিচয় ঘটে। সেকথা আগেই বলেছি। শিল্পীদের জীবন প্রণালীর পরিবেশ কবিকে মুগ্ধ করে। এখানে তিনি প্রবল উৎসাহের সাথে ক্যালিফোর্নিয়ার ওটস্ খেতেন। এটি ছিল তার প্রিয় খাবার। শিল্পী কলোনির পরিবেশ তাঁকে The Book of Pictures-এর কবিতাবলি রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। এই কবিতায় আমরা দেখি সার্বিকভাবে কবি ধর্মীয় আবাহন ও আবেগ থেকে বেরিয়ে এসে নিজেকে আবিষ্কার করছেন একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা ও রাজসিক বিষাদ, বিষণ্ণতার মধ্যে। এই বইয়ের সব কবিতাই সুখকর ও আনন্দদায়ক। কিন্তু আমার কাছে অবিস্মরণীয় লেগেছে Autumn Day কবিতাটির বিষণ্ণ সুর ও কবির চমৎকার সংগীত লয়। কবিতার অন্তিম পর্বের পঙক্তিতে আমরা কবির ভবিষ্যৎ দার্শনিক ভাবনার পরিণতির বীজ অঙ্কুরিত হতে দেখি ;

Whoever has no house now, will never have one,
Whoever is alone will stay alone,
will sit, read, write long letters through the evening,
and wander on the boulevard, up and down,
restlessly, while the dry leaves are blowing

মানব চৈতন্যের নিঃসঙ্গতা, একাকীত্বের এমন ভয়াবহ বেদনাময় প্রতিমাসদৃশ গীতধর্মী প্রকাশ শুধুমাত্র রিলকের পক্ষেই সম্ভব। এই চিত্রকল্প থেকে কবির মানসিক, অস্থির প্রকৃতি, স্বভাবের প্রতীকী নান্দনিক সূত্রাবলির পরিচয় পাওয়া যায়।র কবি এই কবিতা বইয়ের কাজ শেষ করেন ১৯০২-১৯০৬ সালের মধ্যে। প্যারি-পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো Neue Gedich (New poems, ১৯০৭), Der Neuen Gedichte Anderer Teil (Another part of the New Poems, ১৯০৮)। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, রিলকে প্যারিসে যান ১৯০২ সালে। ১৯০৩ সালের দিকে কবির মনে নতুন প্রকল্প জন্ম নেয়। তিনি এই প্রকল্পের অনুপ্রেরণা লাভ করেন রদাঁর কাজ দেখে। এই প্রথিতযশা ভাস্করের যে দিকটি তাঁকে মুগ্ধ করে সেটি হলো শিল্পের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা। রদাঁ ছিলেন কঠিন পরিশ্রমী শিল্পী। তিনি তাঁর শিল্পকর্মের চূড়ান্ত শুদ্ধতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত অত্যন্ত মনোযোগ ও কষ্ট সহকারে কাজ করতেন। শিল্পের উৎকর্ষের জন্য তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অনেক সময় না খেয়ে শ্রমসাধ্য কাজ করতেন। রিলকে ভাস্করের এই শারীরিক ও মানসিক আদর্শ গ্রহণ করে ভিন্ন ধরনের কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা লাভ করেন। তিনি উপলব্ধি করলেন যে, কবিতা রচনার বিষয়টি হলো একজন শ্রমজীবী মানুষের পাথর ভাঙার মতো শ্রমসাধ্য ক্লেশকর কাজ। তিনি এখন যে ধরনের কবিতা নির্মাণ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন কবির নিজের ভাষ্য মতে তা হলো : not about feelings, but about things he had felt” – এই ধরনের কবিতা। একে বলা হয় বস্তুনিষ্ঠ কবিতা। তিনি এই সব কবিতার উপজীব্য বিষয় করলেন জীব-জন্তু, মানুষ, ভাস্কর্য, চিত্রশিল্পকে। এ ধরনের কবিতায় গীতিধর্মী বক্তাকে ঝেড়ে ফেলে কবিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করা হলো স্বচক্ষে দেখা বস্তুকে। এই পরীক্ষা, গবেষণা থেকে সৃষ্টি হয়েছে New Poems। এই কবিতাগুলি রচিত হয় ১৯০৩ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে। নতুন এই কবিতাগুলো ছিল ভিন্ন সুর ও মাত্রার। রবার্ট হ্যাস এই ধরনের কবিতার বিশ্লেষণ করে বলেন : For all their objectivity, Neue Gedichte are profoundly inward poems। অর্থাৎ এই কবিতাগুলো হচ্ছে নিভৃত, অন্তরাত্মার কবিতা। রিলকে যখন বস্তুর দিকে দৃষ্টি দিলেন তখন তাঁর দৃষ্টিতে প্রথম যে বস্তুটি প্রতিভাত হলো তা হলো খাঁচার ভেতরে বন্দী একটি কালো চিতা বাঘ। তার The Panther কবিতাটি একটি অতি প্রসিদ্ধ কবিতা। একই সঙ্গে এটি একটি ভীষণ, আতঙ্কজনক কবিতা। এই কবিতার মধ্যে রিলকে নিজেকে এমন কিছু বলছেন যা আগে কখনো বলেননি। প্যারিসের চিড়িয়াখানার কঠিন গরাদের ভেতরে বন্দী বাঘটির হাঁটার বেগ দেখে কবি আবিস্কার করলেন, এই বিশ্ব তাঁর কাছে অসীম, নিরবধি প্রতীকের কোনো পরম্পরা, সম্পর্কযুক্ত ঘটনা নয়। পৃথিবী কবির কাছে একটি খাঁচা বা বন্দীশিবির বলে প্রতীয়মান হলো। এই আবিষ্কারের অভিঘাতের ফসল কবিতাটি। যার অর্ধেক হলো কবির নিজের আত্মপ্রতিকৃতি। আর বাকি অর্ধেক হলো জীবনের ভিন্নতা, পার্থক্য, ও শূন্যতার স্বীকৃতি। নীচে সম্পূর্ণ কবিতাটি উদ্ধৃত করা হলো এই কারণে যে বিজ্ঞ পাঠক কবিতাটির মধ্যে অনেক রহস্য আবিষ্কার করতে পারবেন :

His vision, from the constantly passing bars,
has grown so weary that it cannot hold
anything else. It seems to him there are
a thousand bars; and behind the bars, no world.
As he paces in cramped circles, over and over,
the movement of his powerful soft strides
is like a ritual dance around a center
In which a mighty will stands paralyzed .
Only at times, the curtain of the pupils
Lifts, quietly- . An image enters in,
rushes down through the tensed, arrested muscles,
plunges into the heart and is gone

কবিতাটির শিল্পরূপ শুদ্ধ, যথার্থ ও নির্ভুল। তারপরও কবিতাটির শেষাংশে এসে আমি এক ধরনের কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পড়ি। রিলকে পাঠককে একটি দুর্বোধ্য প্রশ্নের সম্মুখীন করেন। প্রথম প্রশ্ন imageটি কোথায় যায়? অথবা সহজভাবে বললে এই জন্তুটির হৃদয়ের ভেতরে কী আছে? এর উত্তর আমি খুঁজে পাইনা। তবে এটা বুঝতে পারি যে মানুষের জীবনের সামনে হাজার গরাদের বাধা আছে। আর তার পিছনে কোনো বিশ্ব নেই। ফলে কবি আমাদের নিক্ষেপ করেন এক অসীম শূন্যতা ও নাস্তির মধ্যে। বস্তুকে দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও অভিঘাত থেকে রিলকে পরে যে প্রভাবশালী কবিতাটি নির্মাণ করেন সেটি হলো Archaic Torso of Apollo। এখানেও কবি তার প্রথম দিককার গীতিময় অহং থেকে বেরিয়ে এসে চৈতন্যের গভীরতম প্রদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এই কবিতাটি রিলকের ব্যক্তিগত যন্ত্রণাময় সংবেদনশীলতার বহিঃপ্রকাশ ।

রিলকে গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর একটি হাত-পা-মাথাবিহীন মূর্তি দেখে বিস্ময়ে শিহরিত হন। তাঁর মধ্যে সৃজনশীলতা মঞ্জরিত হয়। তিনি হঠাৎ করেই উপলব্ধি করেন এই কবন্ধ মানব শরীরটি তাঁর চেয়েও অনেক বেশি বাস্তব, খাঁটি, অকৃত্রিম ও উজ্জ্বল। কবি অনুভব করলেন যৌনক্রিয়ার ক্ষেত্রেও তার সক্ষমতা কবির চেয়েও বেশি। এটি একটি জীবন্ত মূর্তি। প্রদীপের আলোর মতো তার ঔজ্জ্বল্য, প্রভা এবং নক্ষত্রের মতো সে উদ্ভিন্ন ও মুকুলিত। সম্পূর্ণ কবিতাটি নিচে উদ্ধৃত করা হলো :

We cannot know his legendary head
with eyes like ripening fruit. And yet his torso
is still suffused with brilliance from inside.
like a lamp, in which his gaze, now turned to low,
gleams in all its power. Otherwise
the curved breast could not dazzle you so, nor could
a smile run through the placid hips and thighs
to that dark center where procreation flared.
Otherwise this stone would seem defaced
beneath the translucent cascade of the shoulders
and would not glisten like a wild beast’s fur:
would not, from all the boarders of itself,
burst like a star; for here there is no place
that does not see you. You must change your life

এই কবিতায় রিলকের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিকৃক অস্পষ্ট মূর্তিটির বিষয়ে পাঠকের মনোযোগ আকৃষ্ট করা। এজন্য তিনি বিমূর্ত, ভাবমূলক কোনো প্রক্রিয়ার শরণাপন্ন হননি। অবশ্য তার যুগের কোনো কবি তাঁর মতো মানুষের অন্তরের গভীরে প্রদেশে এত আলো প্রজ্বলিত করতে পারেননি। বস্তুত অন্তর্জ্ঞানমূলক কবিতার অন্তঃসার হচ্ছে চিত্রকল্প। এই কবিতার চিত্রকল্পে ধরা পড়েছে মানুষের যন্ত্রণাময় অস্তিত্বের খণ্ডিত, অপরিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণতার বোধ। আর এই স্বজ্ঞা থেকেই দাবি ওঠে মানুষের চরিত্রের রূপান্তরের। মানুষ যদি প্রকৃত, প্রামাণিক, খাঁটি, যথার্থ মানুষ হতে চায়, তবে তার মধ্যে অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে। কবির এই ভাবীকথন তাৎক্ষণিকভাবে পাঠকের চৈতন্যে উত্তেজনা ও আলোড়ন সৃষ্টি করে। এখানে একটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে সামান্য আলোচনা করতে চাই। সেটি হলো মানুষের জীবনের নারী ও পুরুষের মানবিক সম্পর্ককে রিলকে কীভাবে দেখতেন?

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রিলকে তাঁর জীবনে অনেক গুণী নারীর সঙ্গ ও বন্ধুত্ব পেয়েছেন। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো তিনি কোনো সম্পর্ককেই স্থায়ী রূপ দিতে পারেননি। তার বোধের মধ্যে একধরনের অনীহা, নিঃস্পৃহতা, বিতৃষ্ণা, বৈরাগ্য কাজ করতো। এর কারণ বিশ্লেষণ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মান ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতিমান অধ্যাপক রল্ফ গোয়েবেল। তিনি বলেন, রিলকের ব্যক্তিচরিত্র ছিল নিরুত্তাপ ও হিমশীতল। কাফকা ও রিলকের ছবি মিলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, রিলকে যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কোনো প্রাণী। আর কাফকা অনেকটা শান্ত, সুশীল ও পাঠকের সঙ্গে জড়িত। রিলকের ছবিতে তাঁর ব্যক্তিচেতনার মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিনি মনে করতেন দেবদূতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ তাঁরা স্বয়ম্ভর। রিলকে ছেলেবেলা থেকেই এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিয়ে বড়ো হয়ে উঠেছিলেন। নারী ও পুরুষের সম্পর্কের বিষয়ে রিলকের একটি অসামান্য কবিতা হলো Requiem for a Friend। ১৯০৮ সালে তিনি এই দীর্ঘ কবিতা শেষ করেন। তিনি তাঁর শিল্পীবন্ধু পাউলা বেকারের মৃত্যুর পর এর রচনা কাজ শেষ করেন। বেকার ছিলেন তাঁর সময়ের জার্মানির অন্যতম সেরা চিত্রশিল্পী। তাঁর প্রথম দেখা হয়। তাঁরা দুজনে গভীর প্রেমে পড়েন। কিন্তু কবি বিয়ে করেন ক্লারাকে। আর বেকার বিয়ে করেন পরিচালক চিত্রশিল্পী অটো মডারশনকে। অটো ছিলেন বেকারের চেয়ে বেশি পরিচিত ও প্রভাবশালী শিল্পী। ফলে বেকারের জীবন গার্হস্থ্য কাজকর্মের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। ঘটনাক্রমে তিনি নিজেই এক বছরের ছুটি নিয়ে চিত্রশিল্পের উপর প্রশিক্ষণ নিতে প্যারিসে যান। সেখানে থাকার সময় তিনি তাঁর স্বামী ও মা-বাবার কাছ থেকে জার্মানিতে ফেরার জন্য ঘন ঘন চিঠি পেতেন। চিঠিতে স্বামী তাঁকে স্ত্রীর দায়িত্ব পালনের তাগিদ দিতেন। তিনি দেশে ফিরে আসলেন এবং অন্তঃসত্ত্বা হলেন। ১৯০৭ সালে তাঁর একটি সন্তান হয়। কিন্ত পরে সে মারা যায়। বেকার ছিলেন গতিশীল, কর্ম-উদ্যগী মৌলিক শিল্পী। রিলকে শিল্পভাবনা নিয়ে বেকারের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন। কিন্তু বেকার যতদিন বেঁচে ছিলেন কবি তার শিল্পকর্মের গভীরতা বুঝতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর এক গ্রীষ্মকালে প্যারিসে কবি শিল্পী সেজানের অতীত শিল্পকর্মকাণ্ডের উপর একটি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। সেজানের চিত্রকর্ম দেখে রিলকে অনুভব করেন কত বড় শিল্পী ছিলেন বেকার। তিনি তাঁর জন্য গভীর বেদনা অনুভব করেন। চিঠিতে এক বন্ধুকে লেখেন : It stood in front of me so huge and close that I could not shut my eyes। কবি বেকারের স্মৃতিচারণ করে অসাধারণ শোগাথা রচনা করেন। আমি সেই দীর্ঘ কবিতার শুধু প্রারম্ভিক পঙক্তিগুলো উল্লেখ করছি :

I have my dead, and I have let them go,
and was amazed to see them so contented,
so soon at home in being dead, so cheerful,
so unlike their reputation. Only you
return; brush past me, loiter, try to knock
against something, so that the sound reveals
your presence. Oh don’t take from me what I
am slowly learning. I’m sure you have gone astray
if you are moved to homesickness for anything
in this dimension. We transform these Things;
they aren’t real, they are only the reflections
upon the polished surface of our being

এই কবিতাটি পাঠ করার সময় কবিতার রূপালঙ্কার ও প্রতিমাপুন্জের গভীরতা পাঠককে মোহের ঘোরে আচ্ছন্ন করে রাখে। কবি এখানে নিজেকে শিল্পী পাউলার মৃত্যুর সাথে একাত্ম ও একীভূত হয়েছেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না, কবি শিল্পকে নিজের মৃত্যুর সাথে অভিন্ন হিসেবে শনাক্ত করছেন। চিত্রশিল্পীকে কবি তাঁর মনের গভীরে সযত্নে লালন করেছেন। কবি তাঁর মৃত্যুকে মেনে নিতে পারেননি। তাই বেদনার্ত চিত্তে কবি বলেন :

Let us lament together that someone pulled you
out of your mirror’s depths. Can you still cry?

কবির মতে পাউলার গর্ভধারণ ছিল ত্রুটিপূর্ণ। প্রতিটি নারীরই মাতৃত্বের অধিকার আছে। তাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাই রিলকে তাঁর কল্পনায় নারী-শরীরের ভেতর নিজেকে স্থাপন করে গর্ভধারণের বেদনাকে অনুভব করতে সচেষ্ট হয়েছেন। বলা বাহুল্য রিলকের জন্মের পর তার মা তাকে নারী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁকে ডাকতেন Miss বলে। দ্বিতীয় যে তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো, এই ঘটনার সাথে The Sonnets to Orpheus-এর তরুণী নৃত্যশিল্পী ভেরা নপের অকালমৃত্যুর সম্পর্ক আছে। কারণ দুটি কবিতাই কবির নিজের গভীরতর আত্মিক, মানসিক উপাদান ও উৎসের প্রতীক। আমার মনে প্রশ্ন জাগে, কবি কী তাঁর নিজের মৃত্যুকেও বেকার, ভেরা ও পুরাণের ইউরিডাইসের মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত করে যন্ত্রণাময় অস্তিত্ব থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন? তাঁর সমাধিলিপিতে গোলাপের প্রতীকে তাঁর ব্যক্তিপ্রকৃতির এই বেদনার্ত দ্বৈততা বা অসংগতির কথাই বিস্ময়কর শিল্পরূপ পেয়েছে।

রিলকের একমাত্র উপন্যাস The Notebook of Malte Laurids Brigge লেখা শেষ করেন ১৯১০ সালে। এখানে এক অপব্যয়ী পুত্রের গল্প অসাধারণ কাব্যিক ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। উপন্যাসটি আধা-জৈবনিক এবং এর রচনাশৈলিতে গ্রহণ করা হয়েছে অভিব্যক্তিবাদ রীতিকে। উল্লেখ্য, এখানে ক্ষমাহীন,নির্দয় পৃথিবীর একজন নিরীশ্বরবাদী নাস্তিকের নিয়তি ও অস্তিত্ববাদী বিষয়কে উপজীব্য করা হয়েছে। নিরাসক্তভাবে অঙ্কন করা হয়েছে মানুষের উদ্বেগ, ভয়, দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা বোধের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার ভয়াভহতাকে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ডুইনো এলিজিস (Duino Elegies)

পূর্বেই আমরা ডুইনো এলিজিসের রচনার পটভূমি বর্ণনা করেছি। এই রচনাটি তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম হিসেবে পরিচিত। ডুইনো ক্যাসেলে অবস্থানের সময় তাঁর মধ্যে সৃজনশীলতার জোয়ার আসে। তিনি তাঁর নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের কথা বর্ণনা করে বলেন : a savage creative storm। অন্যত্র বলেন : boundless storm, a hurricane of the spirit। সুইজারল্যান্ডে থাকা কালে ১৯২২ সালে শীত ঋতুতে তিনি এই কবিতার বই লেখা শেষ করেন। এর ৫৯টি এলিজির প্রতিটি এলিজিই পরিমাণগত ও গুণগত মানের দিক থেকে বিস্ময়কর, অদ্ভুত। পাঠককে তা সহসা সচকিত করে, চমৎকৃত করে এবং বিস্ময়ে বিহ্বল করে। এই কাব্যগ্রন্থে কবির শিল্পরূপের রূপান্তর আমরা প্রত্যক্ষ করি। কবি নিজেই শব্দ, বাক্যবিন্যাস ও চিত্রকল্পে এরই আগমনবার্তা ঘোষণা করেন বইয়ের প্রথম সনেটে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় সেটি হলো, এখানে দেবদূতের পরিবর্তে কবি অর্ফিয়ুসকে তাঁর চৈতন্যের বিকল্প প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিস্থাপন করেছেন।

A tree ascended there. Oh pure transcendence!
Oh Orpheus sings! Oh tall tree in the air!
And all things hushed . Yet even in the silence
a new beginning, beckoning, change appeared

১৯২৩ সালে এটি প্রকাশিত হবার পর সাহিত্যের একট গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতি লাভ করে। এর খ্যাতিকে অনেকেই টি. এস. এলিয়টের The Waste Land-এর দীপ্তিময় কাজের সঙ্গে অভিন্ন বিবেচনা করেন। বস্তুত ডুইনো এলিজিসের কবিতাগুলো গভীরভাবে ধার্মিক ও মরমি। এসব কবিতার আধার ও আধেয়তে বিধৃত হয়েছে মানুষের সৌন্দর্য, অস্তিত্বের পাপ ও পুণ্য, দুঃখ-বেদনা ও পরিত্রাণের উপায়। কবি একটি দার্শনিক হতাশা ও নৈরাজ্য থেকে মুক্তির আশায় প্রথম শোকগাঁথায় দেবদূতদের উদ্দেশ্যে বলছেন :

Who, if I cried out, would hear me
among the Angels orders? and even if one of
them pressed me
Suddenly to his heart: I’d be consumed
In his more potent being. For beauty is nothing
but the beginning of terror, which we can still barely
endure
and while we stand in wonder it coolly disdains
to destroy us. Every Angle is terrifying

এই পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব হচ্ছে ভঙ্গুর। অতি প্রগাঢ়, গীতধর্মী ভাষায় তিনি ঐশ্বরিক দেবদূতের কাছে মানুষের অস্তিত্বের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেছেন। মানুষ অসহায়, কারণ সে ঐশ্বরিক এবং প্রাকৃতিক এই উভয় বিশ্ব থেকেই বিচ্ছিন্ন। ঐশী গ্রন্থসমূহে দেবদূতদেরকে যেভাবে সহৃদয় ও সদয় হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, কবি সেই বিশ্বাসের অশংভাক নন। রিলকে বলছেন মানুষ ও দেবদূতের মধ্যে বৈপরীত্য রয়েছে। দেবদূতরা হচ্ছে একটি সর্বাধিক শক্তিশালী,উচ্চতর সম্পূর্ণ সত্তার প্রতিনিধি। তারা হচ্ছে উচ্চতর সত্তার ভয়াভহ দূত। তারা যদি আমাদের আলিঙ্গন করে তাহলে আমরা তার ভার বা শক্তি বহন বা ধারণ করতে পারবো না। আমরা নিঃশ্বাস নিতে পারবো না। মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে। কবির অভিমত হচ্ছে প্রতিটি দেবদূত ভয়াবহ। রিলকে এখানে কবি হিসেবে সকল রোমান্টিক ভাবনা ও ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। রোমান্টিকরা ভাবতেন সকল সৌন্দর্য হচ্ছে দয়ালু , পরোপকারী, কল্যাণকর এবং সত্যের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু রিলকে বলেন দেবদূতদের সৌন্দর্য হচ্ছে ভয়াবহ, ভীষণ, আতঙ্কজনক। দেবদূতদের দ্বৈততাকে রিলকে এই কবিতায় অসাধারণ ভঙ্গিতে রূপ দিয়েছেন। তারা একইসঙ্গে সীমাতিক্রমী, সর্বোৎকৃষ্ট (Transcendent) শক্তি। আবার তারা মানুষের কাছে প্রেরিত দূত হিসেবে সর্বব্যাপী। বস্তুত ডুইনো শোকগাঁথাগুলো হচ্ছে কবির অস্তিত্বের নিদারুণ যন্ত্রণার কাব্যিক রূপান্তর বা অনুবাদ। একইসঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের স্বরূপ অনুধাবনের অনতিক্রম্য স্বগতোক্তি। রিলকে এই কবিতাগুলির আত্মা ও শরীরে মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং অপর্যাপ্ততাকে শিল্পরূপ দিয়েছেন। তিনি বলেন, মানুষের সচেতনতা, সজ্ঞানতা হলো ভঙ্গুর। মানুষ নিঃসঙ্গ প্রাণী। জীবন, মৃত্যু, ভালোবাসা ও দেবদূতদের উৎকর্ষ সর্বোপরি কবিদের প্রকৃত কাজ ও দায়িত্ব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ আছে ডুইনো শোকগাথায়। লক্ষণীয়, শোকের বিলাপ প্রাধান্য পেলেও এই কাব্যের অনেক কবিতায় কবি অবারিত উৎসাহের সদর্থক জীবনচেতনার পরিচয়ও খুঁজে পেয়েছেন। রিলকে কবিতার মধ্য দিয়ে জীবনের গভীরতর অর্থ অনুসন্ধান করতে চেয়েছেন। ডুইনো এলিজিজ কাব্যে তিনি তাঁর বিপ্লবী কাব্যদর্শনকে অসাধারণ ভাষা দিয়েছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ কবিতার বইটির উপর আলোচনা করতে গিয়ে কনরাড একিন বলেন, No poet before him had been brave enough to accept the whole of (the dark side of the) world, as if it were unquestionably valid and potentially universal।

(শেষ পর্ব আসছে এরপর)

প্রথম পর্বের লিংক

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field