গদ্য

রেনেসাঁসের আলোয় ‘দীপনপুর’ | স্মৃতিচারণ | লিমা সায়ন্তী

বাইরে এখন দুপুর নেমেছে। আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা, আর চারদিকে ছড়িয়ে আছে বৃষ্টির পরশে ভেজা মাটির সেই চেনা সোঁদা গন্ধ। জানালার কাচ গলে ঘরের ভেতর যে আলোটা আসছে, তা কেমন যেন ম্লান, ধূসর আর অন্যরকম। আমার শরীরটা আজ আস্ত একটা পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে। বিছানা থেকে ওঠার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি যেন অবশিষ্ট নেই। ভেতরের তীব্র শীতের কাঁপুনি আর চোখের কোণে জমে থাকা জল বারবার শুকিয়ে আবার নতুন করে চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে।

গতকাল ঠিক এই সময়ে অফিসের ডেস্কে বসে কপালে হাত দিয়েছিলাম। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিল। অভ্যাসবশত প্রথম আলোর অনলাইনে চোখ রাখতেই বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল। স্ক্রিনের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা খবরটা তখন মাত্র ১৯ মিনিট আগে প্রকাশিত হয়েছে—আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার আর নেই। খবরটা দেখার পর থেকেই মাথার ভেতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে গেছে, চারপাশের সমস্ত চেনা কোলাহল এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

গতকাল রাত থেকে তীব্র জ্বর বয়ে বেড়াচ্ছি, আজ দুপুর দুটোয় এসে তা আরও পুরোদমে চেপে বসল। গায়ের তাপমাত্রা চড়চড় করে বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মনের ভেতরের অস্থিরতা। শরীর খারাপ হলে মানুষের মনের ওপর বোধহয় কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। চরম খিটমিটে মেজাজে ফোনটা হাতে নিয়ে রিং করলাম। ওপাশ থেকে রক্তের সম্পর্কের মানুষেরা যখনই জানতে চাইল কেমন আছি, আমি কোনো কারণ ছাড়াই সবাইকে খুব কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দিলাম, প্রচণ্ড বকে দিলাম। মনের ক্ষোভ আর বেদনা যখন কাছের মানুষদের ওপর উগরে দিয়েও শান্ত হলো না তখন ক্লান্ত হয়ে ফোনটা ছুড়ে ফেলে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

চোখ বন্ধ করতেই চোখের কোণ দিয়ে ঝরঝর করে উষ্ণ পানি পড়তে শুরু করল। বুকে এক অসীম অসহায়ত্ব। আমি শেষবার স্যারকে দেখতে যেতে পারলাম না। একজন সাংবাদিক হিসেবে প্রতিদিন কত মানুষের কত রকম শেষ বিদায়ের খবর করেছি, কত মৃত্যুর খবরের স্ক্রিপ্ট লিখেছি, ভয়েস দিয়েছি। অথচ আজ? আজ যখন আমার অন্যতম প্রিয় বাতিঘর চিরদিনের জন্য চলে গেলেন, তখন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাঁর শেষ বিদায়ের যে জনসমুদ্র, সেই ভিড়ে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো ন্যূনতম শারীরিক সামর্থ্যটুকুও আমার নেই।

তীব্র জ্বরের ঘোরে অবচেতন মনটা হঠাৎ এই চার দেয়ালের বন্দিত্ব ভেঙে চলে গেল আমাদের সেই ছোটবেলার ভাঙাচোরা নদীর পাড়ে। শৈশব থেকেই একটা অদ্ভুত স্বভাব আমার। জ্বর এলে বা শরীর খুব খারাপ হলে আমি বরাবর এই কাণ্ডটাই করি। বাস্তবতা থেকে পালিয়ে নদীর পাড়ের একটা ভাঙা জায়গা খুঁজে নিই, সেখানে একা একা পা ডুবিয়ে বসে থাকি। দূরের জঙ্গল থেকে ভেসে আসা পাখিদের ডাক শুনি আর নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে। আজ তীব্র জ্বরের ঘোরে মনটা সেখানেও বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারল না। নদীর স্রোত পার হয়ে আমি যেন নিমেষেই উড়ে চলে এলাম রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ‘দীপনপুর’-এ। এই বইয়ের দোকানে, এই চত্বরে স্যারের সঙ্গে আমার কত বিকেল, কত দুপুর নানা আলোচনায় কেটেছে!

দীপনপুরের বুক কর্নারের সেই চেনা পরিচিত আরামদায়ক চেয়ারটায় পা দুটো গুছিয়ে বসলাম। নিজেকে গুটিয়ে একদম একটা ফুটবল বানিয়ে নিলাম, ঠিক যেভাবে শীত লাগলে মানুষ নিজের শরীরকে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে। শরীর কাঁপিয়ে জ্বরটা সমানে পুড়িয়ে মারছে। জানালার বাইরে ঢাকার চিরচেনা রিকশার টুংটাং আর গাড়ির কর্কশ হর্ন। চোখ আবার ভিজে উঠল, কিন্তু এবার আর বুকভাঙা কান্নার জল নয়—এ যেন এক অদ্ভুত, অলৌকিক শান্তির জল। ঠিক তখনই অলক্ষ্যে একটা মায়া ছড়াল। টের পেলাম, চেয়ারটার ঠিক সামনে আমার মুখোমুখি খালি জায়গাটাতে এসে স্যার বসলেন। পরনে সেই চেনা পোশাক, মুখে সেই চিরকালের চেনা অমায়িক ও প্রশান্ত হাসি। বিকেলের ম্লান রোদ জানালার কাচ গলে এসে স্যারের চশমায় পড়েছে, সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে সূর্যাস্তের এক ঐশ্বরিক আভায় জ্বলজ্বল করছে চারদিক।

— “কী রে, জ্বর নিয়ে এখানে?” স্যার স্বভাবসুলভ মৃদু স্বরে হাসলেন।
আমি ঝাপসা চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে শান্ত স্বরে বললাম— “আপনি চলে গেলেন স্যার?! আমার তো প্রচণ্ড জ্বর এসেছে, শরীরটা এত খারাপ যে শহীদ মিনারে আপনাকে শেষ দেখা দেখতে যেতে পারিনি।”

স্যার পরম মমতায় হাসলেন। সেই হাসির ছোঁয়ায় পার্থিব শরীরের স্পর্শ নেই, আছে এক অদ্ভুত অভয়। বললেন, “শরীরটা ছাড়ো—শরীর তো প্রকৃতির একটা নিয়ম মাত্র। মনটা তো এখানে এসেছে। চলো, রেনেসাঁসের গল্প শোনো, যা আমরা দীপনপুরে বসে কতবার আলোচনা করেছি, মনে আছে?”

আমি চুপ করে রইলাম। জ্বরের ঘোরে সবকিছু কেমন যেন জটপাকিয়ে যাচ্ছে—বাস্তব আর কল্পনা, স্মৃতির নদী আর চোখের জল, দীপনপুরের এসি আর ভেতরের তীব্র দহন। স্যার বলতে শুরু করলেন। তাঁর গলায় সেই পুরোনো, চিরপরিচিত উৎসাহ, যা ক্লাসরুমে কিংবা আড্ডায় তরুণদের উদ্দীপ্ত করতে বাধ্য।

— “রেনেসাঁস মানে শুধু কিছু ছবি আঁকা আর ভাস্কর্য তৈরি করা নয় রে। রেনেসাঁস মানে মানুষের মধ্যে মানুষকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া। ইতালির ফ্লোরেন্সে যখন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আর মাইকেলেঞ্জেলো তাঁদের কালজয়ী কাজগুলো করছিলেন, তখন কিন্তু ওদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানও আমূল বদলে যাচ্ছিল। গ্যালেনের বহু বছরের পুরোনো ভুল ধারণাগুলো একে একে ভেঙে পড়ছিল। মানুষের শরীরকে আর ঈশ্বরের দেওয়া কোনো শাস্তি বা পাপের খাঁচা ভাবা হচ্ছিল না, বরং তাকে দেখা হচ্ছিল যুক্তির আলোয়, বিজ্ঞানের আলোয়। লিওনার্দো শুধু মোনালিসার রহস্যময় হাসিই আঁকেননি, তিনি রাতের পর রাত মানুষের মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করে অ্যানাটমি বুঝতে চেয়েছিলেন, শরীরের ভেতরের মেকানিজমটা ধরতে চেয়েছিলেন।”

আমি কাঁপানো গলায়, চাদরটা গায়ে আরও জড়িয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “তাহলে মানবতা কোথায় স্যার? আজকের এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজ, আমার এই ব্যক্তিগত দুঃখ, এই রোগ-শোক আর মৃত্যুর মাঝে রেনেসাঁস আমাদের কী শেখায়?”

স্যার চশমাটা আঙুল দিয়ে একটু ঠিক করে নিয়ে আবারও হাসলেন। “মানবতা হলো পারস্পরিক গভীর বোঝাপড়া, যাকে আমরা বলি হিউম্যানিজম। পের্ত্রার, এরাসমাস—তাঁরা সবাই জোর দিয়ে বলেছিলেন, মানুষের যে অসীম সম্ভাবনা আর শক্তি, তার মধ্যেই আসল মহিমা লুকিয়ে আছে। রেনেসাঁস আমাদের শেখায় জীবনকে ভালোবাসো, ইহকালকে উপভোগ করো, জ্ঞান অর্জন করো এবং সমাজকে উন্নত করো। আর উন্নত জীবনচর্যা মানে কিন্তু শুধু টাকা-পয়সায় ধনী হওয়া নয়—শরীর, মন আর সমাজ—সব মিলিয়ে নিজেকে ভেতর থেকে সুন্দর ও রুচিশীল করে তোলা। বিজ্ঞান আর ইতিহাস সবসময় একসাথে হাত ধরাধরি করে চলে। কোপার্নিকাস যখন গাণিতিক প্রমাণ দিয়ে বললেন পৃথিবী নয়, বরং সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্রে আছে এবং গ্যালিলিও যখন বললেন পৃথিবী তার চারদিকে ঘোরে, তখন সমাজ তাঁর ওপর ক্ষেপে গিয়েছিল। কিন্তু সেটাই তো রেনেসাঁস—পুরোনো অন্ধ বিশ্বাস আর প্রাতিষ্ঠানিক ভয়কে ভেঙে নতুন সত্যের সন্ধান করা। আজকে তোমার এই যে জ্বর এসেছে, এটাও তো প্রকৃতির সেই নিয়মকে চেনার এবং লড়াই করার একটা অংশ। শরীরকে বিজ্ঞান দিয়ে বোঝা আর মনকে দর্শন দিয়ে শান্ত করা—এটাই তো প্রকৃত শিক্ষা।”

আমি মুখ ভার করে, একবুক অভিমান নিয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো বলে ফেললাম, “আপনি চলে গেলেন! চারদিকে এত শূন্যতা, এত হাহাকার। মনে হচ্ছে আমাদের মুক্তবুদ্ধি চর্চার সবটুকুই বুঝি এবার শেষ হয়ে গেল।”

স্যারের গলায় তখন সেই চিরকালের অটুট, অদম্য আশাবাদ। তিনি বললেন, “কিছুই শেষ হয় না। রেনেসাঁস তো ইতিহাসে কেবল একবারই হয়নি। যখনই সমাজে অন্ধকার নেমে এসেছে, মানুষ যখনই সংকটের মুখে পড়েছে, তখনই নতুন কোনো রূপে এর জন্ম হয়েছে। এই রেনেসাঁস তোমার মধ্যেও হবে। জ্বরটা কমবে। কাল সকালে যখন তুমি ঘুম থেকে উঠবে, দেখবে নদীর স্রোতের মতো জীবন আবার নিজের গতিতে বয়ে চলেছে। জানালার বাইরে পাখিরা ডাকবে। তুমি আবার পড়বা, আবার কলম ধরবা, লিখবা এবং মানুষকে বোঝাবা। মনে রাখবে—মানবতা মানে এটাই, চলে যাওয়া মানুষের রেখে যাওয়া আলোর মশালটা নিজের বুকে ধারণ করে সামনের অন্ধকার তাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া।”

স্যারের দিকে আমি ঝাপসা চোখে তাকালাম। চোখের জলে আমাদের দুজনের ছায়া কেমন যেন একাকার হয়ে মিশে গেল। কান্না আর হাসি একসাথে দোলা দিয়ে গেল মনের গহীনে। আমি স্যারের কাছে আমার সাংবাদিকতার কাজ আর বর্তমানের টেলিভিশন মিডিয়া নিয়ে নিজের তীব্র হতাশা ও সংশয়ের কথা বললাম। এই চটুল বিনোদন, সস্তা টিআরপির দৌড় আর হিড়িকের যুগে একজন সাংবাদিক হিসেবে নিজের আদর্শের পথে চলা, সত্য প্রকাশ করা কতটা কঠিন ও দমবন্ধকর, তা নিয়ে আক্ষেপ করলাম স্যারের কাছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেই কিংবদন্তী অধ্যাপক, যিনি সারাজীবন ক্লাসজুড়ে শুদ্ধতম বাংলায় সাহিত্য, সংস্কৃতি আর মানবমুক্তির কথা বলে গেছেন, তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ গভীর মমতায় আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তুমি তো এখন পুরোদস্তুর সাংবাদিক। বর্তমানে তুমি যে মাধ্যমে কাজ করছ, সেই টেলিভিশন হলো গণমানুষের কাছে পৌঁছানোর সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যমাধ্যম। একে কখনো শুধু সস্তা বিনোদন আর টিআরপি বাড়ানোর চটুল হাতিয়ার বানিও না। রেনেসাঁসের বার্তা যেমন একসময় ছাপা বই আর ছবির মাধ্যমে ইউরোপে ছড়িয়েছিল, আজকের এই আধুনিক যুগে টেলিভিশন হতে পারে মুক্তবুদ্ধি, সংস্কৃতির প্রসার, সঠিক ও প্রমিত ভাষাচর্চা এবং সত্য প্রকাশের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। পর্দায় তুমি যা দেখাবে বা যা লিখবে তাতে যেন সাধারণ মানুষের চিন্তার খোরাক থাকে। একজন সৎ সাংবাদিক হিসেবে সমাজের অন্ধকার দিকগুলো, অন্যায়গুলো আলোয় নিয়ে আসাই তোমার আসল কাজ।”

শুধু কি পেশাগত কাজের কথা? আমার ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন, একাকীত্ব, চারপাশের সম্পর্কের ভাঙন আর গভীর বিষণ্ণতা নিয়ে পরম স্নেহে বাংলা সাহিত্যের নানা উপমা টেনে বললেন, “ব্যক্তিগত দুঃখকে সবসময় ভাঙিয়ে শিল্প তৈরি করতে হয়। তুমি কি রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে দেখনি? জীবনভর কত দুঃখ, কত শোক তাঁদের সইতে হয়েছে! সেই গভীর দুঃখ থেকেই তো তাঁদের মহৎ সৃষ্টিগুলো এসেছে। দুঃখ ছাড়া কি কখনো বড় কিছু তৈরি হয়? জীবন কখনো কোনো এক জায়গায়, কোনো একটা আঘাতে থেমে থাকে না। নিজের মনকে সবসময় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে ধরো। মনের জানালাগুলো খোলা রাখো, সব ব্যক্তিগত দুঃখকে শক্তিতে রূপান্তর করতে শেখো।”

বাস্তবে হয়তো আমি এখনো আমার আলো-আঁধারি ঘরটার বিছানায় শুয়ে আছি, তীব্র জ্বরে শরীর কাঁপছে, কপালে জলপটি দেওয়ার মতোও কেউ নেই। কিন্তু মনের অবচেতনে আমি তখনো দীপনপুরের সেই বুক-কর্নারে স্যারের মুখোমুখি বসে আছি। বাইরে মেঘলা আকাশ, কিন্তু আমার ভেতরে একটা রেনেসাঁস চলছে, নিঃশব্দে, নতুন এক রূপান্তরের ভেতর দিয়ে। ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরের সেই তীব্র দহন আর কাঁপুনিটা একটু কমে এলো। চোখের পাতা দুটো এক গভীর শান্তিতে বুঁজে এলো। কানের ভেতর আচমকা গ্রামীণ নিঝুম রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পেলাম। সেই চেনা ডাক শুনতে শুনতে আমি কখন যে এক গভীর, স্বপ্নহীন ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম, তা নিজেও টের পাইনি।

একটানা এক ঘুমে যখন চোখ মেললাম, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত আটটা বেজে গেছে। ঘরের ভেতর ল্যাম্পশেডের মৃদু, উষ্ণ আলো ছড়িয়ে আছে। জানালার বাইরে বৃষ্টির বেগ এখন আরও বেড়েছে, জানালার পাশের গাছের পাতায় বৃষ্টির একটানা রিনিঝিনি শব্দ। বিছানা থেকে কোনোমতে উঠে এসে টেবিলের ওপর তাকালাম। সেখানে রাখা স্যারের নিজের হাতে লেখা ও উপহার দেওয়া ‘নবযুগের প্রত্যাশা’ বইটি। কাঁপাকাঁপা হাতে পরম মমতায় বইটি হাতে তুলে নিলাম। ধুলো ঝেড়ে প্রথম পাতাটা ওল্টাতেই চোখের জল আর কোনো বাধা মানল না, বাঁধভাঙা বন্যার মতো গড়িয়ে পড়ল পাতার ওপর। বইয়ের সেই চেনা পাতায় আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে দেওয়া স্যারের সেই পরিচিত, চিরকালের যত্নশীল হাতের লেখা অটোগ্রাফটি জ্বলজ্বল করছে :

“লিমা সায়ন্তীকে স্নেহের সঙ্গে”—আবুল কাশেম ফজলুল হক। ০৪.০১.২০২০।

আজ স্যারের চিরতরে চলে যাওয়ার দিনে দাঁড়িয়ে আমি চার বছর আগের সেই দূরবর্তী তারিখটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইলাম। বাংলার সেই প্রিয় শিক্ষকের, সেই বাতিঘরের ঝকঝকে, সুন্দর হাতের লেখাটা আমি আমার ঝাপসা চোখে, কাঁপা কাঁপা আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে নতুন করে ছুঁয়ে দিচ্ছি। কাগজের বুক থেকে স্যারের হাতের সেই ওমে-ভরা স্পর্শ যেন এখনো পুরোপুরি জীবন্ত হয়ে আমার আঙুল বেয়ে সারা মনে মিশে যাচ্ছে।

স্যার এতক্ষণে পরবাসী, নিজের মাটির ঘরে গভীর ঘুমে মগ্ন মানুষের নিয়ম মেনে তাঁকে বিদায় নিতে হয়েছে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সেই কালজয়ী আদর্শ, মুক্তবুদ্ধির চেতনা আর এই ‘নবযুগের প্রত্যাশা’ তো বর্তমানে একজন সাংবাদিক হিসেবে আমার কলমে, আমার প্রতিদিনের কাজের জায়গায়, আমার শুদ্ধতম বাংলা ভাষাচর্চায় এবং আমার অস্তিত্বের গভীরে চিরদিনের জন্য রয়ে গেছে। বাইরে শ্রাবণের বৃষ্টির বেগ যতই বাড়ুক না কেন আমার ভেতরের এতক্ষণের ঝড়টা এখন অনেকটাই শান্ত, স্নিগ্ধ। স্যারের জ্বালিয়ে যাওয়া সেই রেনেসাঁসের আলোর মশাল হৃদয়ে ধারণ করে, বহুদূর, বহুদূর এগিয়ে যেতে হবে আমাকে।

আবুল কাসেম চৌধুরীর স্কেচ : নিয়াজ চৌধুরী তুলি

লিমা সায়ন্তী
লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাংবাদিক হিসেবে যুক্ত আছেন।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field