প্রথম পর্ব
সাল ১৯১২। ঘটনার স্থান ইতালির আড্রিয়াটিক সাগর তীরের একটি দুর্গবেষ্টিত রাজপ্রাসাদ বা ক্যাসেল। রাজপ্রাসাদের নাম ডুইনো ক্যাসেল। এক রাজকন্যা এই ক্যাসেলের মালিক। তার নাম একটু দীর্ঘ – মারিয়ে ভন থার্ন উন্ড তাক্সিস হোহেমলোহে। রাজকুমারী এসেছেন একজন কবিকে অভ্যর্থনা জানাতে। তিনি জানতে পেরেছেন তার কবিবন্ধু বিষাদাক্রান্ত। ফলে তাঁর সৃষ্টিশীলতায় নেমে এসেছে অনুর্বর বন্ধ্যাত্ব। রাজকন্যা উদ্বিগ্ন হলেন। নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি ও চালককে পাঠিয়ে দিলেন কবিকে নিতে। কবির বয়স তখন ৩৫ আর রাজকন্যার বয়স ৫৬।
যথাসময়ে কবি পা রাখলেন প্রাসাদে। রাজকন্যা তাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। কবির জন্য উৎসর্গ করা হলো বিশাল আরামদায়ক, উষ্ণ, অন্তরঙ্গ একটি কক্ষ। কবির জন্য অবারিত করে দেওয়া হলো রাজকীয় পানশালা ও পড়ার জন্য লাইব্রেরি। রাজকুমারীর রাজকীয় কর্মচারীদের নিয়োগ করা হলো কবির সেবায় ও আপ্যায়নে । কারুকার্যময় কক্ষের বিশাল জানালা দিয়ে সুনীল সাগর দেখা যায়। কবি এখানে পূর্ণ স্বাধীনতার মধ্যে নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্বের আনন্দ উপভোগ করছেন। একদিন কবি হাতে গ্রহণ করলেন ডাকবিভাগ থেকে আসা একটি চিঠি। এটি পড়ে তিনি বিচলিত হলেন। আইনজীবী তার স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদের বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছেন। সেখানে তাঁর একমাত্র কন্যার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। তিনি অস্থির ও উদ্বিগ্ন বোধ করলেন। ঠান্ডার কারণে তিনি গায়ে লম্বা কোট পরিধান করলেন। তার পর প্রাসাদের বাইরে এসে বসলেন অত্যন্ত খাড়া পাহাড়ের একটি শিলাখণ্ডে। কবির সামনে তখন ঝড়ো, উত্তাল, উন্মত্ত আড্রিয়াটিক সাগর।
সাগরের বাতাসের এই একটানা আর্তনাদ ও প্রলয় গর্জনের মধ্যেই কবি শুনতে পেলেন এক দেবদূতের কন্ঠস্বর, আহ্বান। কবি ক্ষিপ্র গতিতে কলম হাতে তুলে নিলেন। লিখলেন “Who, if I cried out would hear me among the angelic orders?” কবির শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন Duino Elegies-এর এটি হলো প্রথম পঙক্তি। দশ বছর পর যখন এই বই প্রকাশিত হয় তখন সেই কবিতার বইয়ের খ্যাতিকে সমালোচকরা তুলনা করলেন টি. এস. এলিয়টের The Waste Land-এর সাহিত্যিক প্রভাব ও অভিঘাতের সাথে। এই হলেন কবি রাইনার মারিয়া রিলকে।
সৌভাগ্যক্রমে তিনি অনেক অভিজাত, ধনী, সুন্দরী এবং উচুঁমানের সংস্কৃতিবান নারীর সঙ্গ ও বন্ধুত্ব লাভ করেছিলেন। তারা কবিকে তাদের রাজকীয় প্রাসাদ, বৃহৎ অট্টালিকা এবং বিলাসবহুল ভবনে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি হিসেবে আপ্যায়ন করতেন। সঙ্গ দিতেন। তিনি ছিলেন এমন এক কবি যিনি কবিতা রচনাকেই তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর কবিতা পাঠ করে অনেকেই কবিতা, সংগীত, দর্শন পাঠ করতে উদ্দীপ্ত ও উদ্বুদ্ধ হন। বস্তুত তিনি ছিলেন ধ্রুপদী জার্মান আধুনিকতাবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক, লেখক। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল অনেকের মতে প্রশ্নসাপেক্ষ। তাঁর প্রথম জীবনের কবিতা রচনা ছিল অহংবাদী, ভাবালুতাপূর্ণ ও অগভীর। কিন্তু জীবনের মধ্য ও শেষ দিকে এসে তিনি নিজেকে অলৌকিকভাবে রূপান্তর করেন। তার কাব্যিক কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে চমৎকার, আকর্ষণীয়, অগাধ ও সুগভীর। তাঁর কবিতার অন্তঃপ্রবাহী গুণ হলো মরমিবাদ। এর উপকরণ ও প্রকরণে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবনের অস্তিত্বের মনোলীন অভিজ্ঞতা, নিঃসঙ্গতা, ভালোবাসা, অবিশ্বাস ও মরনশীলতার অনুভব। মানুষের অস্তিত্বের মৌলিক উদ্দেশ্য, সমস্যা, ভঙ্গুরতা তাঁর অতুলনীয় শব্দ ও চিত্রকল্পে অসাধারণ শিল্পরূপ পেয়েছে। তাঁর কবিতা পাঠ করে বিখ্যাত রুশ কবি মারিনা ইসভেতায়েভা বলেছিলেন : You are the phenomenon of nature, which cannot be mine and which one does not so much love as undergo – or (still too little) the fifth element incarnate: poetry itself। এর অর্থ হচ্ছে, প্রাচীন কালের দার্শনিকরা ভূমণ্ডল সংগঠনের চারটি উপাদানের কথা বলেছিলেন। এগুলো হচ্ছে পৃথিবী বা মাটি, বায়ু, আগুন ও পানি। মানুষের দেহ গঠনেও এই চারটি উপাদান ক্রিয়াশীল। কবি রিলকে কবিতাকে বিবেচনা করতেন জীবনদানকারী বস্তু ও পদার্থ হিসেবে। তিনি কবিতাকে শুধুমাত্র একটি লেখার কাজ হিসেবে দেখেননি। তিনি জীবনধাত্রী মাটি, আগুন,বায়ু, পানির পাশাপাশি কবিতার মাধ্যমে জীবনের নগ্ন অস্তিত্বকে রূপান্তর করেছেন শুদ্ধ আত্মিক, সজ্ঞানতার অভিজ্ঞানে। তিনি বাস্তব জগৎ ও অদৃশ্য জগতের মধ্যকার ব্যবধান বা সীমানাকে কবিতার মাধ্যমে ভেঙে দিতে চেয়েছেন। এই দুই জগৎকে প্রবলভাবে ধরে রাখার জন্য কবিতাকেই একমাত্র শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যিক হেরমান হেসে রিলকের কবিতার বিবর্তন প্রক্রিয়াকে মূল্যায়ন করে বলেন, কবি তাঁর পরবর্তী রচনাগুলোতে অসাধারণ কাব্যিক রীতিনীতি গ্রহণ করেছেন। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত উদ্বেগ পাঠকদের অভিজ্ঞতা, যুক্তি, বিশ্বাস ও বর্ণনাশক্তির সীমারেখা ছাড়িয়ে গেছে । ফলে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে গভীর, ‘বিশ্বসংগীত’। ডব্লিউ এইচ অডেন রিলকের দূরদৃষ্টি ও কল্পনাশক্তির সমুন্নত, সমুজ্জ্বল গুণাবলির প্রশংসা করে বলেন, তিনি তাঁর নিজের সৃষ্টির ভেতরে যে বিশৃঙ্খলার ড্রাগনগুলো আছে তাকে মোকাবেলা করতে গিয়ে রিলকের কাজের শরণাপন্ন হতেন।
রিলকের জন্মের শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও তাঁর কবিতা এখনো বর্তমান প্রজন্মকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কবিতার সঙ্গে আমাদের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছেদ সত্ত্বেও রিলকের নাম ও কবিতার চরণ এখন বিশ্বের নামীদামী শিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক- গায়িকা উলকি বা ট্যাটু হিসেবে তাদের শরীরে ধারণ করে ও সযত্নে লালন করে। অনেকেই তাঁর কবিতা উচ্চারণ করেন ধর্মীয় স্তোত্রগীতের মতো।
কবিজীবন
রিলকে ১৯৮৫ সালের ৪ ডিসেম্বর বোহেমিয়ার রাজ্যের রাজধানী প্রাগে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মনাম হলো রেনে কার্ল ভিলহেম জোহান জোসেফ মারিয়া রিলকে। বোহেমিয়া তখন ছিল অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরীর অন্তর্গত। এখন চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। প্রাগ ছিল একটি বহুজাতিক সংস্কৃতির শহর। এখানে পূর্ব ইউরোপের বহু এলাকা থেকে মানুষ এসে বসবাস শুরু করেন। রিলকে একটি জার্মানভাষী সংখ্যালঘু ক্যাথলিক খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, এই শহরেই রিলকের জন্মের ৭ বছর পর একটি ইহুদি পরিবারে ১৮৮৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন ফ্রানৎস কাফকা। তবে প্রাগ নগর সম্পর্কে রিলকের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিলো না। পরে তিনি এই প্রাগ সম্পর্কে বলেন, ‘ভুলে গেলে ভাল হতো, আমার অস্তিত্বের অনুকূল ছিল না।’ রিলকের বাবা জোসেফ রিলকে সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি চাকরি হারান। পরে তিনি চাকরি নেন রেলওয়ে সার্ভিসে। এ চাকরি তার মনোমত ছিল না। সে জন্য হতাশায় ভোগেন। রিলকের মা ছিলেন একটি বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। তাঁর নাম ছিল সোফিয়া এন্তজ। ছিলেন ক্যাথলিক গোঁড়া ধার্মিক। শৈশবে তিনি সন্তানকে মা মেরির বেদিতে নিবেদন করেন। রিলকের মায়ের প্রথম সন্তান ছিল একটি কন্যা। জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যেই সে মারা যায়। ফলে রিলকের মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কন্যা হারানোর শোককে তিনি কখনো ভুলতে পারেননি। তিনি রিলকের জন্মের পর তার মাঝে কন্যার ছায়া দেখতে পান। তাই তাকে সর্বদা মেয়েদের কারুকার্যময় পোশাক পরিয়ে রাখতেন। রিলকের থাকার কক্ষের এক পাশে থাকত খেলার পুতুল আর অন্য পাশে মেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদ। মা ঘুম পাড়ানোর সময় সন্তানকে খ্রিস্টান সাধু-সন্ত ও দেবদূতের কাহিনি শোনাতেন। প্রভু যিশুর বাণী প্রচারে তাদের অতুলনীয় কষ্টের কাহিনি বলতেন। শৈশবের এই ধর্মীয় পরিবেশ তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের দার্শনিক রূপরেখা তৈরি করে দেয়। তাঁর জীবনের সবচেয়ে সীমানির্দেশক ঘটনা হলো নিঃসঙ্গতা। উপরন্তু তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল জটিল। শৈল্পিক ও কাব্যিকভাবে মেধাবী এই তরুণকে তাঁর মাতা-পিতা ১০ বছর বয়সে ১৯৮৬ সালে মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে ভর্তি করে দেন। কিন্তু দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে তাকে ১৮৯১ সালে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এই ঘটনা তাকে আজীবন পীড়িত করেছে। রিলকে প্রাগের চার্লস বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য,ইতিহাস, দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু তিনি ছিলেন পূর্ণকালীন কবি ও সাহিত্যিক। তাই ডিগ্রি না নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়য়ের পড়াশোনায় ইস্তাফা দেন। তারপর তিনি বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাকরি বিলাসের স্বপ্নকে চিরতরে পরিত্যাগ করেন। সুনির্দিষ্ট, নিয়মিত, নিশ্চিত কোনো কাজে যোগ না দিয়ে সামাজিক অর্থে নিস্ফল কবিতাকেই জীবনের অন্বিষ্ট হিসেবে বেছে নেন। আর শুধু কবি হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। তাঁর জীবন কালের ব্যাপ্তি ছিল মোট ৫১ বছর। তিনি একটি ছিন্নমূল, উন্মূল, দীর্ঘ ভ্রমণজীবন বেছে নেন। জীবনের এই ৫১ বছরই তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। তার কোনো স্থায়ী আবাস ছিল না। একবার তিনি প্রাগে নিজেকে জার্মান বলে পরিচয় দেন। প্রশ্নকর্তা বলেন, “আপনি অস্ট্রিয়ান?” তখন রিলকে বলেন, “একেবারেই না।“ এই ঘটনার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে স্টিফেন মিশেল বলেন, সারাজীবন ধরে তাঁর ছিল গৃহহীনতার বোধ। ইউরোপের প্যারিস, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, জার্মানি, স্পেন ও রাশিয়া ভ্রমণ করেন তিনি। ১৮৯৬ সালে যান জার্মানির মিউনিখে। সেখানে একটি অসামান্য ঘটনা ঘটে। এই অজ্ঞাত তরুণ কবির সাথে পরিচয় হয় এক বিবাহিত, প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ, লেখক ও বুদ্ধিজীবী নারীর। কবি তাঁর প্রেমে পড়েন। সেই নারীর নাম লুই আন্দ্রে সালোমে। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ছাত্রী। রিলকের বয়স তখন ২১ আর সলোমের ৩৬। কবির উপর সলোমের প্রভাব ছিল গভীর। তিনি কবিকে ‘রেনে’র পরিবর্তে ‘রাইনার’ বলে ডাকতেন। সালোমের জন্যই কবি তার নাম পরিবর্তন করেন। তিনি রেনে থেকে হলেন রাইনার। সালোমে বলতেন রাইনার নামটি অনেক পৌরুষদীপ্ত, তেজস্বী ও জার্মান। সালোমে মনঃসমীক্ষণের বিভিন্ন মাত্রা নিয়ে কবির সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় মগ্ন হতেন। ১৮৯৮ সালে সালোমে ও তাঁর স্বামী ফ্রেডরিখ কার্ল আন্দ্রেয়াসের সাথে রিলকে রাশিয়ার মস্কোতে যান। সেখানে সালোমে কবিকে ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর ১৯০০ সালের মে ও আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে সালোমে কবিকে নিয়ে দ্বিতীয়বার রাশিয়া ভ্রমণ করেন। এই ভ্রমণে কবির একমাত্র সঙ্গী ছিলেন তিনি। সালোমে কবিকে নিয়ে যান সেন্ট পিটার্সবার্গে। সেখানে কবির সাথে পরিচয় ঘটে বরিস পাস্তারনেকের (মতান্তরে বরিস পাস্তারনাকের বাবা) ও কৃষক কবি স্পিরিডিয়ান ড্রোজিহিনের। রিলকে পরে এই কৃষক কবি স্পিরিডানের কবিতা জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন। লেখক আনা তাভিগ বলেছেন, অস্ট্রিয়ার বোহেমিয়া এবং রাশিয়ান সংস্কৃতি রিলকের চৈতন্যে গভীর প্রভাব ফেলে। কবি রাশিয়ার নিসর্গ ও মানুষের জীবন দেখে মন্তব্য করে বলেছিল রাশিয়া হচ্ছে তাঁর ‘অধ্যাত্মবাদী পিতৃভূমি’। সালোমে ও রিলকের মধ্যেকার কূলছাড়া, আবেগঘন সম্পর্কের ইতি ঘটে ১৯০০ সালে। তাদের বিচ্ছেদের পরও সালোমে ছিলেন আজীবন রিলকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ও সাহিত্যিক বিশ্বস্ত বন্ধু। মূলত তাদের সম্পর্ক ছিল সমালোচকের মতে গভীর আবেগিক বৃদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক। রিলকে ১৮৯৯ সালে যিশুখ্রিস্টের বাৎসরিক জন্মদিনে উত্তর জার্মানির ওরপসেডেতে অবস্থিত চিত্রশিল্পীদের ঐতিহাসিক বসতি দেখতে যান। এই নির্জন, গ্রামীণ, সমতল, ধুলি- ধূসর ভূ-প্রকৃতি তাঁকে মুগ্ধ করে। ১৯০০ সালে গ্রীষ্মের দীর্ঘ ছুটি কাটানোর জন্য আবার তিনি শিল্পী পল্লীতে প্রত্যাবর্তন করেন। এখানে তার সাথে গুণী ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী ক্লারা ওয়েস্টওফের দেখা হয়। কবি তাঁর প্রেমে পড়েন এবং ১৯০০ সালে তাকে বিয়ে করেন। তাদের একমাত্র কন্যা রুথ ১৯০১ সালের ডিসেম্বরে জন্মগ্রহণ করে। তাছাড়া এখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় চিত্রশিল্পী পাউলা মডারশন-বেকারের। তিনি ১৯০৬ সালে রিলকের একটি প্রতিকৃতি আঁকেন। রিলকে স্থানীয় শিল্পীদের উপর একটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ, অনুপুঙ্খ প্রতিবেদন তৈরি করেন। ১৯০২ সালে কবি প্যারিসে যান। তাকে একজন জার্মান প্রকাশক প্রখ্যাত ভাস্কর রদাঁর উপর একটি নাতিদীর্ঘ বই লেখার জন্য নিয়োগ করেন। প্যারিসে তাঁর যাবার মূল কারণ ছিল এই বইটির কাজ শেষ করা। সেখানে তিনি একজন তীর্থযাত্রীর দীনতা নিয়ে ভাস্কর রদাঁর সঙ্গে দেখা করেন। তখন কবির বয়স ২৬। আর রদাঁর বয়স ছিল ৬২। উল্লেখ্য, রিলকের স্ত্রীর শিক্ষক ছিলেন রদাঁ। এই সুপ্রসিদ্ধ শিল্পীর কাজ সম্পর্কে কবিকে ধারণা দেন তাঁর স্ত্রী ক্লারা। রিলকে তাঁর আলোকিত কর্মশালায় গেলে শিল্পী তাঁর কাজ অসমাপ্ত রেখে তরুণ কবির সঙ্গে কথা বলেন। ১৯০৫ সালে কবি রদাঁর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রিলকে ভাস্কর গুরুর উপর একটি আবেগঘন, চমৎকার পাণ্ডিত্যপূর্ণ বই রচনা করেন। শিল্পী বইটি পড়ে প্রশংসা করে বলেন এটি হলো তাঁর কাজের সার্বিক মূল্যায়নধর্মী বই। রদাঁর সাথে কবির সাক্ষাৎ ছিল নিরতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রভাবে রিলকে তার কবিতার শৈলীতে রূপান্তর আনেন। রদাঁ তাঁকে শিল্প ও চিত্র নির্মাণে বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের অনিবার্যতা ও গুরুত্ব বিষয়ে শিক্ষাদান করেন। তাঁর প্রভাবে রিলকে নাটকীয়ভাবে তাঁর কবিতার শৈলিকে মনোগত. আত্মনিষ্ঠ, আত্মলীন অবস্থা থেকে উদ্ধার করে বাস্তবধর্মী শিল্পে রূপান্তর করেন। এরপর থেকে আমরা লক্ষ্য করি রিলকে তাঁর শিল্পের অভীষ্ট লক্ষ্য হিসেবে ইন্দ্রিয়গোচর বস্তু, পদার্থ বা সামগ্রীর উপর কঠোর,তীব্র মনোযোগ নিবদ্ধ করছেন। একে কবিতার নীতিমালা হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর এই কর্মকৌশল কবিতাকে রোমান্টিক অস্পষ্টতা থেকে মুক্ত করে বাস্তব, সুনির্দিষ্ট, স্পর্শগ্রাহ্য, অনুভবযোগ্য বাস্তবতার অভিমুখে পরিবর্তন ও পরিপূর্ণতা দান করে। এই পর্বের কবিতাকে পণ্ডিতেরা নাম দিয়েছেন ‘বস্তু কবিতা’ (Thing Poems)। এই সময় কবিতায় রিলকের নবযৌবনপ্রাপ্ত শৈল্পিক কল্পনাশক্তি ও অন্তরদৃষ্টি প্রকাশ পায়। তিনি হয়ে ওঠেন দ্রষ্টা ও স্বাপ্নিক। রিলকে ও ক্লারার সম্পর্ক আজীবন অক্ষুণ্ণ ছিল। তারা পরস্পরের সন্মতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ চেয়েছিলেন। কিন্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ রিলকে ছিলেন ক্যাথলিক খ্রিস্টান।
ডুইনো এলিজিজ ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে কবি ১৯১২ সালে ডুইনো রাজপ্রাসাদে বসে ডুইনো এলিজিস লেখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু এগুলি একদশকেও তিনি শেষ করতে পারেননি। এ সময়ে কবির মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সৃষ্টিশীলতার সংকট দেখা দিয়েছিল। ১৯১২-১৩ সালে তিনি এল গ্রেকোর শিল্পকর্ম দেখতে টলেডোতে যান। অনেকের মতে এল গ্রেকো যে রীতিতে দেবদূতদের চিত্রিত করেছিলেন তা-ই কবিকে প্রগাঢ়ভাবে অনুপ্রাণিত করে ডুইনোর দেবদূত বিষয়ে পরিকল্পনা ও চিত্রকল্প তৈরি করতে। কবি জার্মানিতে থাকার সময় ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এই ঘটনায় তিনি বিচলিত হন। তিনি প্যারিসে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। কিন্তু তাঁর এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৮১৪ সাল থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত চিত্রশিল্পী লোউ অ্যালবার্ট-ল্যাসার্ডের সাথে এক উদ্বেল, অশান্ত, হৃদয়ঘটিত সম্পর্কে তিনি জড়িয়ে পড়েন। যুদ্ধের সময় ১৯১৬ সালে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য ভিয়েনাতে যেতে বলা হয়। কবির প্রভাবশালী বন্ধুরা তার জন্য মধ্যস্ততা করেন। এ কারণে তাকে যুদ্ধের রেকর্ড অফিসে (মহাফেজখানা) বদলি করা হয়। পরে সামরিক দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তিনি মিউনিখে ফিরে আসেন। সামরিক দায়িত্বের গুরুভার ও পূর্ববর্তী মিলিটারি একাডেমির বিভীষিকাময় আতঙ্কবোধ কবি হিসেবে তাঁকে নীরব ও নিষ্ক্রিয় করে দেয়।)
সুইজারল্যান্ড ও মুজো (১৯১৯-১৯২৬)
১৯১৯ সালের ১১ জুন রিলকে মিউনিখ থেকে সুইজারল্যান্ডে যান। সেখানে তিনি পোলিশ- জার্মান চিত্রশিল্পী ব্যালাডাইন ক্লোসোস্কার সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে কবির সম্পর্ক ১৯২৬ সাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল। কবি জুরিখে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পান। তবে সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার প্রকৃত কারণ ছিলো ডুইনো এলিজিসের অসমাপ্ত কাজ শেষ করা। ১৯২১ সালের মধ্যভাগে তিনি একটি স্থায়ী আবাসন খুঁজে পান। সেটির নাম ছিল শ্যাতিউ দা মুজো। এই পর্ব ছিল কবির জীবনের প্রগাঢ়, তীব্র, প্রবল সৃষ্টিশীলতার কাল। রিলকে তাঁর ডুইনোর অসমাপ্ত কাজ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ করেন। সেই সময়টা ছিল ফেব্রুয়ারি ১৯২২ সাল। এই সৃষ্টিশীল পর্বের আগে বা পরে রিলকে খুব দ্রুত তার কবিতাচক্রের উভয় অংশ সনেট থেকে অর্ফিউস শেষ করেন। এতে ছিল মোট ৫৫টি সনেট। কবিকে মুজোর বাড়িটি কিনে দিয়েছিলেন তাঁর পৃষ্ঠপোষক ভারনার রেইহার্ট। উদ্দেশ্য ছিল কবি ভাড়া ছাড়াই এই শান্ত, নিরুদ্বেগ পরিবেশে বসে যাতে সাহিত্য রচনা করতে পারেন। এই সময় রেইনহার্ট কবির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তাঁর অনুগ্রহভাজন অস্ট্রেলিয়ান বেহালা বাদক আলমা মুডির। রিলকে তাঁর বাদন শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে প্রশংসাসূচক চিঠি লেখেন : What a sound what richness, what determination. That and the sonnets to orpheus, those were two strings of the same voice. And she plays mostly Bach! Muzot had received its musical christening…”।
কবির মৃত্যু ও সমাধিলিপি
১৯২৩ সালের পর থেকেই রিলকে অব্যাহতভাবে স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ে সংগ্রাম করতে থাকেন। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তাকে লেক জেনেভার মঁত্রিউর নিকটবর্তী টেরিলেটের স্যানিটোরিয়ামে কাটাতে হয়। অসুখ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় ১৯২৫ সালের জানুয়ারি এবং আগস্ট মাসের মধ্যে তিনি দীর্ঘ সময় প্যারিসে কাটান। ভঙ্গুর স্বাস্থ্য নিয়েই ১৯২৩-১৯২৬ সালের মধ্যে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিতা রচনা করেন। ফরাসি ভাষায় লেখা তাঁর কবিতার বই ভার্জার্স (Vergers) প্রকাশিত হয় ১৯২৬ সালে।
(চলবে)


Leave feedback about this