ছোটগল্প বিশেষ সংখ্যা

যে গল্পের শেষ নেই | তাসনীম তারনি | ছোটগল্প | উৎসব সংখ্যা ২০২৬

ভোরের কোমল সূর্য ঝলসে গিয়েছে আরও ঘণ্টাখানেক আগে। জানালার ভাঙা তক্তার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়েছে কুলসুমের গালে। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সেই ঝাঁঝালো তাপ সে অনুভব করে। গত রাতে এই গালেই সপাটে থাপ্পড় মেরেছে ওর বর আজগর। দুই বছর আগে যে বয়সে বছর ছয়েকের বড় আজগরের হাত ধরে পালিয়ে ঢাকা এসেছিল কুলসুম, এখন সকাল-বিকেল নিয়ম করে ওর হাতে লাথি-ঝাঁটা খায়। পালিয়ে আসার সময় কুলসুমের বয়স ছিল একুশ বছর, দেখতেও ছিল চলনসই, পেটানো গড়ন। এখন দায়িত্ব ও কলহের ভারে চেহারায় বয়স্ক ভাব এসেছে। নিজের প্রতি মায়া হলে মাঝেমধ্যে আয়না দেখার সাধ জাগে। তাই মাসের বেতন পেয়েই সবার আগে আয়না কেনার চিন্তা করে। কিন্তু গতরাতে কুলসুমের হাতে আয়না দেখে আজগরের মাথা গরম হয়ে গেছে।
“বেহুদা আয়না কেনার টাকা আছে আর আমি চাইলেই কস টাকা নাই, শালি…” বলেই কুলসুমের দিকে তেড়ে আসে আজগর। আর যাই হোক, আয়নাটা যেন অক্ষত থাকে সেই চেষ্টায় কুলসুম ব্যর্থ হয়ে অবশেষে তার ক্লান্ত উপবাসী শরীরটা নিয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ে।
এতক্ষণে সেই ঘুম ভাঙল ওর। হকচকিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। শরীরজুড়ে ব্যথা, রাতে আজগর ওর লৌহমুষ্ঠি দিয়ে কতবার কুলসুমের পেটে-পিঠে আঘাত করেছে তা আর মনে নেই। চৌকির পাশে ভাঙা আয়নার টুকরোগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রতিটা টুকরায় কুলসুম ওর আলাদা আলাদা প্রতিবিম্ব দেখতে পায়। তারপর কারখানায় যাওয়ার জন্য ঝটপট প্রস্তুত হয়ে রওনা হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পায়ে হাঁটার চেষ্টা করে কুলসুম বুঝতে পারে শরীর সাড়া দিচ্ছে না; বরং লুটিয়ে পড়ে থাকতে চায় কোনো আবডালে।

কারখানার পাশে মাজেদ ভাইয়ের চায়ের দোকানে রোজকার মতো আজও ইউসুফ এসে দাঁড়িয়ে আছে। দোকান-ঘেঁষা সরু রাস্তা ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যা নাগাদ কুলসুম বাড়ি ফেরে। সে যবে থেকে এই গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছে, সেই থেকে একই ক্লান্তিকর রুটিন। প্রবল বর্ষার পানিতে ডুবে যাওয়া একগুচ্ছ ঘাসের মতো জীবনটা ডুবে আছে জবুথবু। কোথাও কুলসুমের মুক্তি মেলে না। মুক্তিই তো চেয়েছিল কুলসুম, চরম যাতনা থেকে মুক্তি। তারপর কয়েক মাস আগে মাজেদ ভাইয়ের চায়ের দোকানে ইউসুফকে প্রথম দেখে সে, চোখাচোখি হয় তাদের। সেই চোখাচোখি গড়ায় বন্ধুত্ব, বিশ্বাস, প্রত্যাশা আর অভ্যাসে। এই প্রথম কুলসুমের মনে হয় যে আশা নিয়ে ঢাকায় এসেছিল, তা যতই গুড়ে বালি হোক, আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার কারণ সে এতদিনে পেয়ে গেছে। সারাজীবন সে শুধু চেয়েছিল দুদণ্ডের শান্তি, প্রেম। বিধাতা তাকে স্নেহ, মায়া, প্রেম থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে ভেবে কুলসুমের আক্ষেপ ছিল ঢের। সেসব আক্ষেপ পোড় খেয়ে একসময় পরিণত হয় কৃতজ্ঞতায়। এরপর গার্মেন্টস থেকে বেড়িয়ে ইউসুফের সাথে দেখা করা আর একঘেয়ে জীবনে কংক্রিটে জমে থাকা জলের মতো গল্পগুলো ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়ে ওঠে ওর নিত্যদিনের অভ্যাস। একসাথে সময় কাটানো আর বাড়ি ফেরার তাড়নার দ্বান্দ্বিক অনুভূতির ভেতর দিয়ে কুলসুম অন্য কোনো এক জীবনের সন্ধান পায়; যে জীবন কোনোদিন পায়নি সে। ছোটবেলায় বাপ মরে যাওয়ার পর মায়ের বিয়ে হয় অন্য গ্রামে। কুলসুম মায়ের আঁচল ছাড়েনি তখনও। বাধ্য হয়ে মা কয়েক বছর নতুন স্বামীর বাড়িতে রেখেছিল তাকে ঠিকই, কিন্তু সেখানে দুর্বিষহ জীবন আর সইতে না পেরে বাপের ভিটায় ফিরে আসে কুলসুম। কিন্তু সে জীবনও অতিষ্ঠ হয়ে গেল চাচাত ভাইদের অত্যাচারে। কুলসুম জলে ভেসে বেড়ানো হাবুডুবু খাওয়া বেড়াল ছানার মতো শুধু একটুকরো জীবন খুঁজেছে, চেয়েছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে। এজন্যই আজগরের সাথে প্রেমের সম্পর্কের অজুহাতে একটা সংসারের স্বপ্ন দেখেছিল। আজগর সেই সব স্বপ্ন ভেস্তে দিয়ে মদ আর জুয়ার নেশায় মত্ত হয়ে গেল। সেই ক্ষয়ে যাওয়া স্বপ্ন আর ছোট জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রায় কুলসুমের জীবনে দেখা মিলেছে ইউসুফের । ইউসুফ ভবঘুরে যুবক, দেখতে ছিমছাম, কিছু করে না তেমন, পরিবার আছে কী নেই তাও জানা নেই। ওর রহস্যময় জীবন নিয়ে কুলসুম তেমন মাথা ঘামায় না। প্রয়োজনও বোধ করে না। কেনই বা করবে, এতো নিখুঁত করে যে ভালোবাসতে জানে, অনুভূতির গুরুত্ব দিতে পারে, তাকে তো সর্বস্ব দিয়ে ভরসা করা যায়।
কুলসুমের মুখে আজগরের সব দুর্ব্যবহারের অভিযোগ শুনে ইউসুফের রাগ হয়, হাত শক্ত করে মুঠো পাকায়। কখনো বা সমবেদনায় বিগলিত হয়ে কুলসুমের চোখ মুছিয়ে দেয়, অভয় দিয়ে বলে আমি আছি। এইতো জীবন, যে-জীবনের আশায় কুলসুম ভেসে বেড়িয়েছে অনন্তকাল। কিয়ামতের দিন মুমিনদের জান্নাতে যাওয়ার জন্য যেমন পুলসিরাত পার হতে হয়, তেমনি আজগরের সংসার ছেড়ে কুলসুম চলে আসবে শিগগির। তারপর ইউসুফের সাথে সীমাহীন সুখের জীবন কাটাবে সে। তবে আর কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে, ইউসুফের একটা কাজ হোক আর কুলসুম কিছু টাকা পয়সা জমিয়ে নিক। তারপর গোছানো সংসার হবে ওদের। আজগর নেশা করে আর জুয়া খেলে টাকাপয়সা উড়িয়ে দেয়, সেই সাথে কুলসুমের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয় ঋণের বোঝা। তাই ইউসুফ সযত্নে কুলসুমের জমানো টাকা গচ্ছিত রাখার ভার নেয়। ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাসগুলো রূপ নেয় প্রতিশ্রুতিতে। এভাবে কেটে যায় মাসের পর মাস।

ইউসুফ সাভারের কারখানায় কাজ পেয়েছে। তাই আজকাল মাজেদ ভাইয়ের দোকানে আসে না সে। কুলসুমের সাথে ফোনালাপ হয় মাঝেমধ্যে। ফোনালাপেই বলেছে সেসব কথা। এদিকে আজগরের সংসারে কুলসুম যেন টিকতেই পারছে না। প্রায়ই এমনভাবে মারধর করে যে, প্রাণভয়ে চিৎকার করে বস্তির লোকেদের কাছে আশ্রয় চাইতে হয়। রাতগুলো কাটে আতংকে, কখনো বা প্রতিবেশীদের ঘরে। তবুও সে সকালে উঠে সময়মতো কারখানায় গিয়ে পৌঁছায়, আবার কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আসে। মাঝেমধ্যে ওই ঘুপচি অন্ধকার ঘরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না। ইউসুফকে কল দিয়ে পাওয়া যায় না সবসময়। ব্যস্ত থাকে নিশ্চয়ই। ব্যস্ততা কাটিয়ে উঠতে পারলেই কুলসুম ও ইউসুফের প্রত্যাশিত অমোঘ জীবন, ভাবে কুলসুম।
একসময় এসব ভেবে হাজার সান্ত্বনা দিয়েও নিজের মনকে দমাতে পারে না কুলসুম। একসময় পৌষের মেঘের মতো সব প্রতিশ্রুতি ফিকে হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত মোহভঙ্গ হয় কুলসুমের। যে ইউসুফকে সে নতুন জীবন দিচ্ছে বলে ভেবেছিল, তা হয়ে ওঠে নিজেরই সাজানো কল্পিত জীবন। সে নিজই সে জীবন যত্ন করে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছিল। ইউসুফ শুধুই এক অভিজ্ঞতা, আজগর, চাচাতো ভাইদের নির্যাতন, সৎ বাপের দেওয়া কষ্টের মতো আরেকটা যন্ত্রণা।
কিছুদিনের মধ্যে ইউসুফের সাথে সমস্ত যোগাযোগের বন্ধ হয়ে যায় কুলসুমের। ওর দেওয়া মোবাইল নম্বরে কল দিলে বন্ধ পায় কুলসুম। পরাজয়ের আগে যেমন শেষ চেষ্টায় প্রাণ উগড়ে দিতে ইচ্ছে হয়, তেমনই কুলসুম ইউসুফের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা অব্যহত রাখে। কিন্তু কার কাছে গিয়ে অনুগ্রহ চাইবে কুলসুম! এতো বড় শহরে ওর না আছে বন্ধু, না আছে আত্মীয়-স্বজন, না আছে শুভাকাঙ্ক্ষী।
চায়ের দোকানের মাজেদ ভাই টাকা গচ্ছিত রাখার কথা শুনে বলে, “ঐ হালায় বাটপার, ওর কাছে টেকা দিছো কুন দুঃখে। টেকার আশা ভুইল্যা যাও!” কুলসুম এর আগেও ধোঁকা খেয়েছে কতবার, কিন্তু প্রতিশোধ নিতে চায়নি। এবার ও পণ করে, ইউসুফকে এর মাশুল দিতে হবে।

ইউসুফের বাড়ির ঠিকানা কুলসুমের জানা নেই। ফোনে কল দিলে মাঝেমধ্যে খোলা পাওয়া যায়। কিন্তু কেউ কল ধরে না। বস্তির মোড়ের সিমকার্ডের দোকানে ইউসুফের যাতায়াত ছিল। একবার বলেছিল, সেই দোকানি না কি তার পূর্বপরিচিত, ছোটবেলার বন্ধু। কুলসুম তার সাথে যোগাযোগ করে ইউসুফের বাড়ির ঠিকানা বের করে ফেলে। দোকানি কুলসুমের উদ্বেগ দেখে ইউসুফের সংসার না ভাঙতে অনুরোধ জানায়। কারো সংসার ভাঙার উদ্দেশ্য কুলসুমের নেই। সে তো নিজের অস্তিত্ব নিয়েই সংকটে পড়েছে। কুলসুম দোকানির কথা শুনে ভেঙে পড়ে।
কুলসুম বুঝতে পারে, ইউসুফ তাকে মিথ্যে বলেছে। ওর আলাদা সংসার আছে। নিজেকে ভীষণ পরাজিত মনে হয় কুলসুমের। সমস্ত জীবনীশক্তি যেন ফুরিয়ে আসছে। তবুও আরেকবার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেয় কুলসুম। ইউসুফ নিখুঁতভাবে মিথ্যে বলেছে দিনের পর দিন! এত বড় বেঈমানি! যে জীবন সে
যাপন করতে চেয়েছে, ইউসুফও তা দেয়নি। প্রতারণা করেছে। লুটে নিয়েছে তার জমানো অর্থ। প্রতিশোধ সে নেবেই।

“ক্যান, তুমি এক বিওইত্যা মাইয়া আরেক বিওইত্যা পোলার লগে ফষ্টিনষ্টি করতে গেলা ক্যান? তুমার স্বামী আছে না?” আজ আজগরকে সঙ্গে নিয়ে কুলসুম ইউসুফের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে এসেছে।
চেয়ারে বসে থাকা মুরুব্বির এই মন্তব্যের পর কুলসুমের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আজগর চিৎকার করে বলে ওঠে, “আমরা কিচ্ছু বুঝি না, কুলসুমের টাকা ইউসুফ মাইরা খাইছে, সেইডা ফেরত চাই।” আজগর এ বেলা-ওবেলা কুলসুমের উপর নির্যাতন চালায়। কিন্তু আজ সে বউয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। কুলসুম বোঝে, টাকার গন্ধ পেয়ে আজগর তার হয়ে কথা বলছে। ইউসুফও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আজগরের কথার উত্তরে ইউসুফ বলে, “কুলসুম আমারে নিজে থেইক্যা ট্যাকা দিছে। আমি চাই নাই। ওই ঢেমনির লগে আমি ক্যান সম্পর্ক করুম!” ইউসুফের কথা শুনে কুলসুম অবাক হয়। তাচ্ছিল্যের চোখে একবার দেখে নেয় মানুষটাকে। আজগর এবার চিৎকার করে বলে ওঠে, “আমাগো ট্যাকা ফেরত চাই।” শেষপর্যন্ত মাতুব্বরের মাধ্যমে একটা দফারফা হয়। কীভাবে ইউসুফ টাকা ফেরত দেবে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন মাতব্বর মুরুব্বি। এর মাঝেই
কতশত মন্তব্য কুলসুম আর আজগরের দিকে ছুড়ে মারে। তাদের কোনো বাক্যই কুলসুমের নির্লিপ্ত অনুভুতিকে স্পর্শ করে না। সে তার অর্ধনমিত চোখের পাতার ফাঁক দিয়ে ওকে ঘিরে রাখা জটলা পাকানো মানুষগুলোকে দেখতে থাকে। কোনো রাগ বা দুঃখ হচ্ছে না তার, কেবল কটাক্ষ ও তাচ্ছিল্যভরে দেখতে থাকে চারপাশের মানুষগুলোকে।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field