ছোটগল্প বিশেষ সংখ্যা

বেবিসিটার | নাহিদা নাহিদ | ছোটগল্প | উৎসব সংখ্যা ২০২৬

এমন পরিস্থিতি সোহাগের জন্য নতুন নয়। রোখসানার মনের আবহাওয়া আচানক চমকে ওঠা ভূ-প্রকৃতির চেয়েও বিস্ময়কর; ভালো অথবা মন্দ—এই বাইনারির বাইরে তাকে বলা যায় রহস্যময়। প্রথম প্রথম রোখসানাকে সে বেশ চালাক-চতুর মেয়ে বলেই ভাবতো; মনে হতো সে সংসার বোঝে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও বেশ ওয়াকিবহাল। এখন ভাবনাটা উল্টো; ঘটনা এবং পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী রোখসানা বদলায়। সকাল- সন্ধ্যায় বদলায়, দুপুরে বদলায়, বদলায় মধ্যরাতেও। এই যে আজকে একটা ঘটনা ঘটালো তা কোনদিকে যাবে—এ নিয়ে তার কোনো হুঁশ থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। সামলাতে হবে কাকে? অবশ্যই সোহাগকে। এই সামলানোটা হচ্ছে সংসার করার কাফফারা। সোহাগের আর ভালো লাগে না। ক্রমান্বয়ে এই ভালো না লাগার বোধ চলে যাচ্ছে বিরক্তিতে এবং এমন বিরক্ত হতে হতেই তার অফিসে যাওয়ার সময় হয়। একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করে সোহাগ। এই অফিসটারও রোখসানার মতো মাথা খারাপ; যখন-তখন কল আসে। বেতনও হয় না নিয়মিত। সংসারের জন্য তবু করে। রোখসানা জানে সোহাগ কাজের জন্য বের হলেও অবশেষে তার গন্তব্য হবে লোকাল থানা। যাক। ওর হাতে পুরো সকাল আর দুপুর পড়ে আছে। অনেক সময়। গুনগুন করে পুরোনো দিনের একটা গানের সুর ভাজে। সুর ঠিক আছে কি না এ ব্যাপারে সন্দেহ হয়। মেয়ের দিকে তাকায়। একটু হাসে কারণ মেয়ে গভীর মনোযোগে চিরুনি দেখছে। এ্যানি; সামনের মাসেই ওর এক বছর পুরবে। রোখসানার হৃৎপিণ্ড ধুকধুক করে—মেয়ের প্রথম জন্মদিন। দাওয়াত দিবে কাকে? মেয়েকে দিবেই বা কী? সোহাগকে বললে কি একটা ভালো মানের কেক আনবে? মাথায় ভূত চাপে। জন্মদিনে মেয়েকে রাজকুমারী সাজানো দরকার। ট্রায়াল হিসেবে এখুনি সাজাতে বসে। আহ্, কী নরম তুলতুলে গাল মেয়ের! একটু ব্লাশ লাগায়; কী চমৎকার লাগছে! লিপস্টিক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট করবে জেনেও একটু ছোঁয়ায় ঠোঁটে। মেয়েকে বলে, “আইসক্রিম খাবা? কেক, ফ্রুটস?” মেয়ে কথা বলবে না জেনেই ফ্রিজ থেকে দুধ নিয়ে গরম করে। এ্যানির রাজকুমারী জামা কিনতে যেতে হবে মার্কেটে—গোপন সঞ্চয়ে হাত দেয়। রাস্তায় বের হতেই পাড়ার বখাটে ছেলেদের মতো এলাকার সব ক’টা কুকুর একসঙ্গে ঘেউ ঘেউ করে ওঠে; সেও পাল্টা বিবাদে জড়াবে কি না ভাবতে ভাবতেই তাদের মধ্যে সর্দার গোছের কুকুরটা সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে সরে যায়। কেনাকাটার আগে একটা রিকশা নিয়ে দুজন ঘুরবে—এই পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়। খানিকক্ষণ যেতেই রিকশাওয়ালা রোখসানাদের উৎফুল্ল মুখ দেখে আলাপ জমাতে চায়:
“মেয়ের নাম কী গো আম্মা?”
রোখসানা উত্তর দেয় না; এইসব গরিব ছোটলোকদের সঙ্গে কথা বললেই সমস্যা। শেষে আবার দশ টাকা বাড়তি দিতে হবে। তবু রিকশাওয়ালা কথা বাড়ায়—”মেয়েরে খাওন-দাওন কেমন দেন?”
“মামা, কথা বলবেন না, দ্রুত যান।”
“যাইতাছি তো। মেয়ে কি হাগা-মুতা বেশি করে?”
কেমন লাগে! রোখসানা আকস্মিক রিকশা থামিয়ে মোড়ের একটা ছোট দোকান দেখে নেমে যায়। তেমন ভিড় নেই, তবু দোকানি সমাদর করে না। মনে মনে রোখসানা ওর মাকে যৌন সঙ্গমের বীভৎস আচরণ প্রদর্শন করে কঠিন একটা গালি দেয়; মুখেও নিচুস্বরে বলে, “শালা কমজাত কুত্তার বাচ্চা।” গালি দিয়ে মন ভালো হয়। রোখসানার মেকি গালি ভালো লাগে না, ব্যাটাদের অকথ্য গালি দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ হয়। গালিপর্ব শেষ করে একটা ছোট চারকোণা হাফচেয়ারে মেয়েকে কোলে নিয়ে বসে। বলে, “ভাই, এগার মাস বয়সের বাচ্চার জন্য সুন্দর দোপাট্টাসহ পাকিস্তানি ঘাগড়া হবে?”
দোকানি প্রথমে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে; এ্যানির দিকে তাকিয়ে নাক-মুখ কুঁচকে বলে, “কার লাইগা?”
রোখসানা খুব উল্লসিত হয়ে বলে, “এই যে আমার মেয়ের জন্য।”
“এ পরবে ঘাগড়া?”
“হ্যাঁ, পরবে।”
“আপা, আপনের জামাই কি ঘুষ খায়?”
“কেন?”
“এমনি কইলাম আরকি।”
“না, আপনাকে বলতেই হবে কেন বললেন?”
“চেইতেন না, দেখেন আপনের মেয়ের হাফপ্যান্টের নিচে এখনও ত্যানা, গলার নিচে দিয়া রাখছেন লোল বান্ধুনি। লেহাঙ্গা, ঘাগড়া, পায়জামা হেরে কেমনে পিন্দান?”
রোখসানার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে; মেয়ে কোলে নিয়ে হনহন করে বের হয়ে আসে। মানুষ কেন এমন করে? কত সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে তার; গোলাপি ঠোঁট, রেশমের মতো চুল। মেয়ের মুখে হাত বুলায় রোখসানা। পৃথিবীর তাবৎ মানুষকে শাপ-শাপান্ত করে হাঁটতে থাকে। একটু পার্লারে যাওয়া দরকার। নার্গিস পার্লারে মাঝে মাঝে কাজ শিখতে যায়; মাসে সাত না আট দিতে হবে—এ নিয়ে দরকষাকষির পরও মহিলার সঙ্গে তার একটা সখ্য আছে; প্রতি মাসে নাইট ক্রিম ফ্রি দেয়। এমনকি এই টেম্পোরারি কাজটাও যোগাড় হয়েছে ওখান থেকে।
তিন-চারটা গলির পরে একটা বড় পানির ট্যাংকি, এরপর একটা বাসের যাত্রী ছাউনি; তারপরে একটা গলির চারতলা বিল্ডিংয়ের টপ ফ্লোরে পার্লারটা। এত ডিটেইলস বলার কারণ, ওই বাসার দোতলায়ই এ্যানিদের ঘর। রোখসানা ওর বেবিসিটার। নামেই বেবিসিটার; কাজটা হলো আয়া-বুয়ার। তবু সে নিয়েছিল কাজটা। সোহাগ অফিসে চলে গেলে ওর সময় কাটে না। মাথায় তখন নানান দুর্বুদ্ধি কাজ করে। একবার অনলাইনে এক নেশাখোরের পাল্লায় পড়ে চার হাজার টাকা গচ্ছা দিতেও হয়েছে। ও কেন যে এসব করে জানে না। এমন না মানুষজন ওর ভালো লাগে। আত্মীয়-পরিজন, শাশুড়ি-ননদ দুচোখের বিষ। একটা দেবরের বউ আছে ওরে দেখলেই রোখসানার গায়ে অটো সিলিন্ডার গ্যাস বার্স্ট করে। তবু চাকরিটা ওর পছন্দ হয়। এ্যানির মা একটা এনজিওতে চাকরি করা সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার। খুব স্মার্ট; বাসায় খোলামেলা পোশাক পরে। ফোনে কথা বলার সময় পটাশ পটাশ ইংরেজি গালি দেয়; এমন না ওসব বোঝে না রোখসানা। এসএসসি দিয়ে ইন্টার পড়ার সময় সোহাগের সঙ্গে প্রেম করে ভেগে না আসলে এতদিনে অনার্স পাসও হয়ে যেত। সবাই বলতো রোখসানার মাথা ভালো। পড়লে একদিন জজ-ব্যারিস্টার হবে। হইলো তো; এখন করে হাগা-মোতা পরিষ্কারের কাজ।
এ্যানিদের বাসায় রোখসানার রেগুলার হওয়ার আরও কয়েকটা কারণ আছে। প্রথম কয়েকদিনেই সে টের পেয়েছে ওদের বাসাটায় প্রচুর খাদ্য মজুদ থাকে; রোখসানার আবার একটু মুখ নাড়ানোর দোষ আছে। বিলাতি পানি-পুনি থাকলেও এগুলো সে খায় না; গন্ধ লাগে। আরেকটা বিষয়ও দেখছে। ঘরের ব্যাটা-বউ দুইজনই খাটাস; ওদের মধ্যে বিবাদ বাঁধলে কী যে বিচ্ছিরি কথাবার্তা, নাচন-কুদন হয়। ওসব শুনতে বেশ আমোদ। সবচেয়ে যেটা মজা লাগে সেটা হচ্ছে তাদের দুজনেরই আলাদা অ্যাফেয়ার বা প্রেম আছে। রোখসানার ভাষায় পিরিত। বেটিরটা টের পাওয়া যায়; তার অফিসের এক কলিগ। লোকটা আসলে ম্যাডামের ব্যবহার্য মিহিন সুতা। রোখসানাকে বলে, “অফিসের কাজ করছি, ডিস্টার্ব করবে না।” কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় হলে সামান্য একটু খুলে রাখা দরজার ফাঁক-ফোঁকড় দিয়ে রোখসানা দেখে অন্য ঘটনা। একবার দেখে ধামড়ি বেটি শুকনা ওই বেটার কোলে বসা। বেটির ওজনের ভারে বেটা চিৎ।
মন্দ না কাজটা; ওখান থেকে ফিরলেই রোখসানার কাছে তার চালচুলোহীন সংসারটাকে মনে হয় বেহেশত। বাইরের ভ্যাপসা গরমে এ্যানি গোঙানো শুরু করেছে। রোখসানার ঘরের ফ্যানটাও ভালো না। দুই দিনেই এ্যানির ঘামাচি উঠে গেছে। রাস্তার দুপাশে খুব মনোযোগ দিয়ে রোখসানা ওয়ালটনের শোরুম খোঁজে। সাহস করে কিস্তিতে একটা এসি নিয়ে নেবে কি না ভাবে। সোহাগ চেঁচাবে। চেঁচাক। মেয়ের মুখ দিয়ে লালা গড়াতে থাকলে রোখসানা মুছে দেয়। এত টিস্যু লাগে, সব তো আর কিনে নেওয়া যায় না। এ্যানির শরীরটাও একটু ভারী; কোলে নিয়ে হাঁটা বেশ কষ্টকর। তবু এই ভার রোখসানার এত ভালো লাগে। হাতে একটু পয়সা এলে মেয়েকে সে অনেক দামি দামি বেবিফুড দেবে। সেরেলাক, হরলিক্স। ওগুলো দেওয়ার কি সময় চলে গেছে? নাকি মেয়ের আর একটু বড় হওয়া লাগবে? এ্যানির কান্নায় রোখসানার সুখ স্বপ্ন আর এগোতে পারে না। ওকে সামলাতে একটু সান্ত্বনা দেয়—”আম্মুরে আম্মু, তুমি একটু শান্ত হও, কাইন্দো না। কলা খাইবা? জুস? থামো একটু।”
এ্যানি থামে না, রোখসানাও হাল ছাড়ে না। নিচু স্বরে বোঝাতে থাকে, “পাখি, আমরা একদিন শিশুপার্ক যাব। নিউমার্কেট যাব। একটা উড়োজাহাজ কিনব। আকাশে উইড়া যাব।” এ্যানির সঙ্গে এই সমস্ত সামূহিক আহ্লাদের মাঝে রোখসানার ব্যাগে পিনপিন করে বেজে ওঠে ফোন; সোহাগের কল।
“রোখসানা, মাইয়াডা কই? পুলিশ কইছে ওরে নিয়া আসতে।”
“ক্যান? পুলিশের সঙ্গে আমার মেয়ের কী?”
“আরে আজব! এই মেয়ে কি তোমারে ওরা পার্মানেন্টলি দিয়া দিছে?”
“না, দিক; আমি নিছি।”
“হ্যাঁ, তুমি নিছ কইলেই হইলো! দেশে তো আইন-আদালত নাই? আর এই ল্যাংড়া, কালা ভূতের মতো বাচ্চা দিয়া তুমি করবাটা কী?”
রোখসানা লাইন কেটে দেয়; সোহাগ রেগে আছে, এখন কথা বললেই ঝামেলা। সে এ্যানিকে আরও শক্ত করে বুকের কাছে চেপে ধরে। আহারে, আহারে। সোহাগের ওপর অভিমানে ওর দুচোখ ভরে ওঠে। বিয়ের পর পর সোহাগ কতবার একটা বাচ্চার কথা বলেছে। খেলনার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ফুটবলের আকার-আকৃতি মেপে রেখেছে—বলেছে, “নিজের ঘরে পোলা হইলে এই বল কিন্যা দিবো।” এই সেই মানুষ!
কার ওপর যেন ক্ষোভে রোখসানার আত্মা চিঁড়ে ওঠে। দুনিয়াটা বিতৃষ্ণ লাগে। মেয়েকে নিয়ে একটু থামে। ভাবে সমস্যা কার—দুনিয়ার, মানুষের না কি নিজের? একটা সময় ও নিজেই খাটাস ছিল রোখসানা জানে। চেহারা-সুরত ভালো না, চালচলনও ভালো না। মেয়েদের যে স্বভাবজাত সংসারপ্রীতি, সন্তানপ্রীতি; রোখসানার ভেতরে তাও নাই। কিন্তু তারপরও এমন হইলো ক্যান! সোহাগের ধারণা এইটা জ্বিনের কারবার। সময়-সময় রোখসানারও মনে হয় ঘটনা সত্য হইলেও হইতে পারে। সোহাগের ফোন আবার বাজে। কল ধরতেই বলে, “রোখসানা শোনো, লক্ষ্মী পাখি…”
“ধুর বাল!” বলে কল কেটে দেয় রোখসানা। সব কেমন তালগোল পাকায়া যাচ্ছে। যাবে না কেন, এটাই তো হওয়ার কথা। শুরু থেকে ভাবতে গেলে দেখা যায় এ্যানিদের বাসায় বেবিসিটারের কাজটা সে অনেকটা টাকার লোভে নিয়েছিল। মা হওয়ার খায়েশ দুঃস্বপ্নেও ছিল না। ভেবেছে কয়েকদিন করে ছেড়ে দেবে। কিন্তু প্রথম দেখাতেই এ্যানিকে দেখে হতভম্ব হয়ে যায় রোখসানা। কী এক বিশ্রী অবস্থা! ওর কল্পনার চেয়েও দোজখের ছিল এ্যানির জীবন। রান্নাঘরের পাশে একটা স্টোররুমের মতো জায়গায় পুঁটলি করে ফেলে রেখেছিল বাচ্চা মেয়েটাকে। অসহায়, রুগ্ন। ওদের যে পার্মানেন্ট কাজের বুয়া এ্যানিকে দেখতো; সে বাড়ির বিভিন্ন জিনিস চুরি করে পালানোর পর পুরো আড়াই দিন ধরে একভাবে পড়ে ছিল সে। মেয়েটার ক্ষুধা পেয়েছিল ওরা শোনেনি; লালা পড়ে গলার নিচে লাল হয়ে গিয়েছিল, ওরা দেখেনি। প্যাডও পাল্টায়নি কেউ। পায়খানা-প্রস্রাবের বোটকা গন্ধে ঘরটা যেন অসহনীয় হয়ে রোখসানার টুটি চেপে ধরতে এগিয়ে এসেছিল সেই প্রথম দিনই। এভাবে কোনো বাচ্চা টেকে? দেশে আইন-আদালত না থাকলে, একটা জান্তব চেহারার মানবশিশু জন্ম দেওয়ার হীনন্মন্যতায় তারা হয়তো মেয়েটারে গলা টিপে মেরেই ফেলতো। এ্যানির অপরাধ ওর পা দুটো অচল, অপুষ্ট; মুখ দিয়ে যা বের হয় তা কান্না নয়—গোঙানি। রোখসানা তাকে স্পর্শ করে, হাত আঁকড়ে ধরে। থর থর করে কেঁপে ওঠে এ্যানি। করুণ এক আকুতিতে বড় বড় চোখ করে রোখসানাকে এক মুহূর্ত দেখে নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ে কোলে।
পুরো একটা সপ্তাহ প্রাণান্তকর চেষ্টায় এ্যানিকে স্বাভাবিক করেছিল রোখসানা। আতঙ্ক ওর পেটের মধ্যে ঢুকে যায়। যখনি ঘরে ফেরার সময় হতো রোখসানার মনটা নড়ে উঠতো। মেয়েটাকে যদি ওরা মেরে ফেলে? কেমন অবলা একটা প্রাণ, কোরবানি দিতে আনা পশুর মতো অসহায়। ওর অন্তর থেকে উৎসারিত “বাঁচাও বাঁচাও” ধ্বনি রোখসানা স্পষ্ট শুনতে পেত যেন। এই শুনতে শুনতেই রোখসানা ঘোরগ্রস্ত হয়ে যায়, হয়ে পড়ে অস্বাভাবিক মমতা পোষণে অভ্যস্ত। ডিউটি শেষে বাড়ি ফিরেও সুখ নেই। সারারাত যতবার ঘুমায়, ততবার এ্যানির বাঁকাচোরা হাত-পা, অভিমানী ঠোঁট, ফোলা ফোলা মুখের কাতর গোঙানি তার ঘুম ভাঙায়, ছটফট লাগে। বুঝেই পায় না মেয়েটা কি ঠিক আছে নাকি নাই? আজন্ম স্বার্থপর রোখসানার ভেতরে কী যেন ঘটে, ঠিক বোঝেও না। কেবল মনে হয় দৌড়ে যাই মেয়েটার কাছে। ক্রমেই রোখসানার জগৎ-সংসার হয়ে ওঠে এ্যানিময়। ওকে যদি এখন কেউ বলে মৃত্যুর আগে তার শেষ ইচ্ছে কী? ও বলবে এ্যানির কপালে দীর্ঘ একটা চুমু খেয়ে মরে যাওয়া। মেয়েটার দিকে তাকালেই ওর হৃৎপিণ্ড ধুকধুক করে। জাদু, টোনা, বাণ মারার মতো কষ্ট। তার প্রথম প্রেমের অনুভূতিও এত প্রগাঢ় ছিল কি না; রোখসানা জানে না।
এ্যানিদের বাসায় রোখসানা ভোর সকালেই পৌঁছাত। দিনের শুরুতে এ্যানির বাবা-মায়ের পারস্পরিক দোষারোপ শুনতে শুনতে রোখসানা এ্যানির প্যাড পাল্টাত, পুতুল গোছাত। প্রাথমিক কাজ শেষ হলে ওকে সকালের হেলদি ডায়েট দিতে দিতে মনোযোগ দিত তাদের দাম্পত্য কলহে।
বাবা : “মেয়েটাকে অ্যাবোর্ট করলেই হতো। প্রতিবন্ধী হবে তা তো জানতেই। ফিগার নষ্ট হবে বলে করোনি।”
মা : “You talk like a nuisance. পাঁচ-ছয় মাসের বাচ্চা খালাস করে আমি ব্লিডিং করতে করতেই মরব?—এই চেয়েছিলে?”
বাবা : “এখন মনে হয় খুব সুখে বেঁচে আছো? জন্ম দিয়েছো তো একটা কোলাব্যাঙ। না পারি বাইরে নিতে, না পারি ঘরে রাখতে।”
মা : “What?”
বাবা : “Yes, you idiot! Stupidity runs in your blood! এই বাচ্চা বড় হলে কী হবে? হাঁটতে পারবে, না বলতে পারবে, না শুনবে কিছু? আবার হয়েছে মেয়ে। বাহ্। পৃথিবীতে নাকি এত রেয়ার রোগের বাচ্চা কম জন্মায়, আহা আমাদের কী ভাগ্য শেষে কি না এমন সন্তান আসতে হলো তোমার পেটেই।”
মা : “Is this baby my alone? Do you think I slept with those bastards on the street to have this baby, you stupid?”
এরপরই বেঁধে যায় ধুন্দুমার। রোখসানার ভালোই লাগে। ষাঁড়ের মতো দুজন লড়তে থাকে। লড়তেই থাকে। রক্তাক্ত না হওয়া পর্যন্ত থামাথামির বালাই নাই। বলা যায়, এ্যানিকে পেয়ে রোখসানা বরং বেঁচেই গিয়েছে। তার জীবন এখন ভীষণ অন্যরকম। তার শুধু বাঁচতে ইচ্ছে হয়। সে মাজারে-মাজারে ঘোরে। সুতা আনে; মসজিদের ইমাম থেকে আনে পানিপড়া। তার নিজের সংসার পড়ে রয় অযত্নে—এ্যানির বাসা হয়ে ওঠে তার একমাত্র আশ্রয়।
সোহাগ রোখসানার এইসব অর্থহীন কাজের কোনো মানে খুঁজে পায় না। কিন্তু এ নিয়ে কিছু বলতে গেলে ও নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেয়। ছোটবেলা থেকেই রোখসানা একটু ঘাড় ত্যাড়া। একবার বাপের সাথে রাগ করে গ্রামের চালতা গাছের সঙ্গে ফাঁস দিতে গিয়েছিল। সোহাগ ভেবে পায় না—রোখসানার ভেতরে কী চলে, এটা কি কোনো মনের রোগ? ওর এই সব ভাবনা যে টের পেত না রোখসানা, তা নয়। চোখ ভরে পানি আসত ওর; কেউ নেই তার পাশে। অথচ সবাই বলে সোহাগ বউ পাগল। তার মেয়েটার পাশেও কেউ থাকে না। রোখসানা কোনোদিন এ্যানিকে বিয়ে দিবে না। সব স্বামী ছোটলোক। বাবা-মায়েরাও ছোটলোক। পৃথিবীর সবাই ছোটলোক। রোখসানা এ্যানির মাথায় হাত বুলায়—জন্মের পর একটা দিনও ওর দিকে কেউ ভালো চোখে দেখেনি; রাস্তার কুকুর-বেড়ালেরও তার বাচ্চার জন্য যেটুকু দরদ থাকে এ্যানির বাবা-মায়ের তাও নেই। ওদের চোখে-মুখে শুধু বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম দেওয়ার লজ্জা।
এ্যানিকে কোলে নিয়ে রোখসানার হাঁটতে কষ্ট হয়; যাত্রী ছাউনিতে একটু বসে। কত মানুষ আসছে-যাচ্ছে; রোখসানা বেশ আগ্রহ করে দেখে। দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে কখন; চা দিয়ে পাউরুটি ভিজিয়ে খায় মা-মেয়ে। বাসায় ফিরবে কি ফিরবে না সংশয়ে ভোগে। ফিরলে যদি সোহাগ এ্যানিকে পুলিশে দেয়? রোখসানার মনে আছে একদিন সে এ্যানিকে তার বাসায় নিয়ে এসেছিল। ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় সোহাগকে বলেছিল বাচ্চাটাকে একটু দেখতে। সোহাগ ফিরেও দেখেনি। এমনিতেই অপরের বাচ্চা সোহাগের পছন্দ না, তার মধ্যে আবার এমন বদখত এ্যানি! রোখসানার একবার মনে হয় সে বাসের টিকিট কেটে বেনাপোল দিয়ে ইন্ডিয়া পালিয়ে যাবে। তার কাছে তার মায়ের এক জোড়া সোনার বালা আছে; দরকার হলে বিক্রি করে দেবে ওটা। ওখানে একটা ঘর নিবে। সে আর এ্যানি থাকবে ওখানে একা।
আবার ফোন বাজে—
“রোখসানা, বাসায় আসো; পাগলামি করো না।”
“মেয়েসহ ফিরব? পুলিশে দিবা না?”
“ওরাই দিবে।”
“কখনো না, এই মেয়ে ওদের দরকারই নাই।”
“তোমার দরকার?”
“হু, আমারই দরকার।”
“এইসব ফাও প্যাঁচাল বাদ দাও, তুমি ওর বেবিসিটার ছিলা, আয়া-বুয়া। এই মেয়ে পালার জন্য তোমাকে ওরা পয়সা দিছে, মা হওয়ার জন্য না।”
“তো, মা হয়ে গেলে কি তোমার পুলিশ আমাকে ফাঁসি দিবে?”
“প্লিজ বোঝো কথা।”
“কী বুঝব? ওরা দুইটা জানোয়ার সাতদিন মেয়েটাকে রেখে কোন না কি ফ্যামিলি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস ট্যুরে গেছে। এই বাচ্চা ওগো ফ্যামিলি না? শুয়োরের দল একটা বারও খোঁজ নেয় নাই মেয়ের। একলা বাসায় নিজের ঘরে এনে একলা একলা মেয়ে পালছি আমি। এখন ওরা ফিরছে, তো আমি মেয়ে নিয়া যাব সাধতে? যাব না। মেয়ের শোকে ওরা তো মরবে না, আমি মেয়ে দিবই না।”
“সব ঠিক আছে, তোমার দোষ নাই; এগুলা তুমি মাঝে মাঝে করো খুব ভালো কথা। এখন এই বারের মতো ফিরা আসো।”
“আসব না, তুমি পুলিশে দিবা।”
“পুলিশে কেন দিব? তোমারে আমি ভয় দেখাই…”
“ভয় দেখাও আর যাই করো, এইবার কিন্তু আমি ফিরব না।”
“তুমি অবশ্যই ফিরবা, মেয়ে ফেরত দিয়া আসবা, এরপর দেখবা কয়দিন পর আমাদের ঘরেই কেমন ফুটফুটে একটা সোনার মানিক হবে।”
এই বাক্যে রোখসানার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। গা শিরশির করে। আরও অস্থির লাগে ওর। ফোন কেটে দেয়। অদ্ভুতভাবে হাসে—”বাচ্চা! হাহাহা।” কত বোকা সোহাগ! রোখসানা তার ভ্যানিটি ব্যাগের মুখ খুলে একটা রিসিট বের করে। হসপিটালের বিল। সাত হাজার তিনশ টাকা। সরকারি হাসপাতালে গিয়ে রোখসানা চিরতরে তার বাচ্চা ধরার থলেটা ফেলে এসেছে। সোহাগ তো জানেই না কত সাকসেসফুল ইউটেরাস অপারেশন! সোহাগের ‘সোনার মানিক’ কথাটা মনে এলে আরও হাসির বেগ বাড়ে রোখসানার। দূর থেকে পথচারী বুঝে পায় না একটা পরিপাটি সুস্থ চেহারার মানুষ খামোখা কেন এমন উন্মাদের মতো হাসছে।
রোখসানা শ্বাস ফেলে। হা করে ফুসফুসে টেনে নেয় বাতাস। সন্ধে শেষ। ফ্যাকাসে অন্ধকার গাঢ় হতে হতে কালো হয়ে আসে। ঘরের দিকে ফিরবে কি না ভাবতে ভাবতেই এ্যানিকে বুকে করে এগিয়ে যায় একদিকে। এই অন্তহীন পথ ফুরাবে না জেনেও হাঁটে, গুনগুন করে কাটে ছড়া—

দাঁত দুটো তার মুলোর মতো,
পিঠখানা তার কুলোর মতো,
কান দুটো তার নোটা নোটা,
চোখ দুটো তার আগুন ভাঁটা!
কোমরে তার ফিতার দড়ি,
বেড়ায় কেবল বাড়ি বাড়ি
খাই না পাই না তাই না
কারো সাথে যাই না।

এমনও হতে পারে কাল সকালে পত্রিকার পাতায় রোখসানার একটা ছবি থাকবে। শিরোনাম হবে : ‘বেবিসিটার কর্তৃক বাচ্চা চুরির অভিযোগ’। রোখসানা গুনে দেখে অনেকগুলো পেপার কেনার টাকা তার আছে। এই সুখেই নিশ্চিন্তে রোখসানা দ্বিগুণ উৎসাহে পথ হাঁটে।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field