গদ্য

পচা সিঙারা ও বিভূতিভূষণের মৃত্যু | রুশতী সেন | গদ্য

‘খগোলে শ্রীবিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে শোকসভা’ এরকম একটি শিরোনাম ছিল ১৯৫০ সালের ১৮ নভেম্বর তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায়। শিরোনামের তলায় সংক্ষিপ্ত সংবাদটুকু হল ‘খগোল (পাটনা) স্থানীয় রেলকর্মীদের উদ্যোগে শ্রীকালীকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে বাঙ্গলার প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জগদ্বিখ্যাত মহামনীষী জর্জ বার্নার্ড শয়ের মৃত্যুতে এক শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। একটি শোকপ্রস্তাব গ্রহণ ও এক মিনিট নীরবতা পালনের পর সভা ভঙ্গ হয়।’ যেদিন বিভূতিভূষণের মৃত্যু-সংবাদ প্রথম কলকাতার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়, সেই ৩ নভেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় মূল শিরোনামে দেখি ‘পরলোকে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ নাট্যকার সমালোচক ও চিন্তানায়ক জর্জ বার্নার্ড শ’। কিন্তু খগোলের রেলকর্মীদের উদ্যোগে কি জর্জ বার্নার্ড শ জায়গা পেতেন, যদি তাঁর মৃত্যু না হত বাংলা-সাহিত্যের বিভূতিভূষণের অকালমৃত্যুর ঠিক একদিন পরে-২ নভেম্বর, ১৯৫০, ভোর ৪টা ৫১ মিনিট গ্রিনউইচ সময়ে?

সেই নভেম্বর মাসে বিভূতিভূষণের মৃত্যু দৈনিক পত্রিকার পাতায় ফিরে ফিরে এসেছে। ১৮ নভেম্বরের আনন্দবাজার পত্রিকায় ছিল ‘শ্রীবিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ/ঘাটশীলায় শোকসভা’। ১৩ নভেম্বরের কাগজে আছে চাইবাসায় শোকসভা আর পুরুলিয়ায় শোকসভার খবর। প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয় ৩ নভেম্বর, দ্বিতীয়টি ৬ নভেম্বর। ইতিমধ্যে নভেম্বরের ৭ তারিখে কলকাতার ওয়াই. এম. সি. এ হলে হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের সভাপতিত্বে সাহিত্যিকসমাজ শোক প্রকাশ করেছেন। বক্তা ছিলেন গজেন্দ্রকুমার মিত্র, মনোজ বহু, পরেশ ভট্টাচার্য, সুমথনাথ ঘোষ, সমীর ঘোষ, সতীশচন্দ্র নন্দী। ২৪ নভেম্বর আনন্দবাজার পত্রিকার সভা-সমিতির বিজ্ঞপ্তি কলামে বেরিয়েছে — বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় শোকসভা স্থান সেনেট হল তারিখ ২৬শে নভেম্বর সময় অপরাহ্র ৪ ঘটিকা — বিভূতিভূষণের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদনের জন্য এক বিরাট জনসভা হইবে। সর্বসাধারণের উপস্থিতি প্রার্থনীয়। বক্তাগণ: শ্রী মোহিতলাল মজুমদার, ডক্টর সুশীল দে, অতুল গুপ্ত, ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কবিশেখর কালিদাস রায়, ডা. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধকুমার সান্যাল, অমল হোম, উপেন গঙ্গোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, চপলাকান্ত ভট্টাচার্য, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী, মনোজ বসু, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, সুমথনাথ ঘোষ, জগদীশ ভট্টাচার্য, বাণী রায় প্রভৃতি। শ্রী সজনীকান্ত দাস আহ্বায়ক।’ ২৭ নভেম্বরের আনন্দবাজারে দেখি সেই অনুষ্ঠানের রিপোর্ট, যার শিরোনাম ছিল, ‘পরলোকগত কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় / কলিকাতার সিনেট হলে মহতী জনসভায় শ্রদ্ধাঞ্জলি’।

এই সভার প্রসঙ্গেই গোপাল হালদার লিখেছিলেন, ‘…সুস্থ ভাবুক সানন্দ-চিত্ত বিভূতিভূষণকে আমরা দেখেছি কখনও পরীক্ষার খাতা ফেরত দিতে গিয়ে একবার হেড-এক্সামিনার নামীয় এক ভাগ্যবানের গৃহে — যিনি অত্যন্ত রূঢ়ভাবেই সচেতন যে তিনি হেড-একজামিনার, আর তেমনই স্থূলভাবেই অচেতন — রাত জেগে যে লোক বনগাঁ থেকে খাতা ফেরত দিতে এসেছেন ক্লান্ত দেহ, চিন্তাভারাক্রান্ত মন, আর যাঁকে তিনি রূঢ়ভাবেই বসে থাকতে হুকুম করেছেন, সেই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সিনেট হলে বিভূতিভূষণের স্মৃতিসভা যখন হয়, তখন মনে পড়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বাংলার হেড-একজামিনারের কথা।’ এমন এক জনসভা, যেখানে ভাড়া করা হাজারটি চেয়ারকে যৎসামান্য প্রমাণ করে ভিড় উপচে পড়েছিল রাস্তায়, যেখানে সভাপতি অতুল গুপ্ত ‘ইছামতী’ উপন্যাসের রবীন্দ্রপুরস্কার প্রাপ্তির সম্ভাবনা ব্যক্ত করেছিলেন, সে সভা ছোটখাটো ঘাত-প্রতিঘাত, গ্লানি, মলিনতা থেকে একেবারে মুক্ত থাকে কেমন করে? তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সজনীকান্ত দাসের সঙ্গে মোহিতলাল মজুমদারের তখন যথেষ্ট অস্বস্তিকর সম্পর্ক। সে অস্বস্তির রেশ এসে পড়েছিল বিভূতিভূষণের স্মৃতিসভায় কোনো কোনো উপস্থিতি-অনুপস্থিতিতে, কোনো এক নিবন্ধের পাঠে অংশবিশেষের বর্জনে (যদিও নিবন্ধকার চেয়েছিলেন, নিবন্ধটির যেন একটি শব্দও বাদ না দিয়ে পড়া হয়)।

যাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে সেদিনের সভা, তিনি এসব মালিন্য গ্লানির আশেপাশে থেকেও, মানবিক প্রসাদেরই উপকরণ খুঁজতেন। ক্ষোভ তাঁর দিনলিপিকে ছু’য়ে গেছে মাঝেমধ্যেই। ১৯৩৩ সালের ২৬ জুন ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘ভাল লাগচে না। বঙ্গশ্রীর আড্ডা পুরনো হয়ে গেছে।’

সেই বছরই ১৩ জুলাই বিভূতিভূষণের মনে হয়েছিল, ‘আজ কাল জীবনের অনেক কথা বুঝতে পারচি। সাহিত্যক্ষেত্রে পরস্পর যে হিংসা, দ্বেষ, সংকীর্ণতা দেখতে পাই আজকাল, ওতে আমার মন আর সায় দিচ্চে না। এক্ষেত্রে ক্রমেই কলকাতাতেই অতি বিষময় শস্যের বীজ উপ্ত হচ্চে — আমি ভাবচি দেশে চলে যাবো। দেশ থেকে আমি দেশের যা সেবা করতে পারবো এমন আর কোথাও নয়। পরিশ্রম, সেবা সব দিক থেকে। এখানকার এ সৌখীন জীবনযাপন করে পরস্পরকে হিংসা দ্বেষ করে কি হবে?’ তিনটি সপ্তাহও পুরো কাটেনি তারপর, ১ অগস্টের দিনলিপিতে দেখছি, ‘আজকাল কলকাতায় অনেক আড্ডা জুটে গিয়েচে স্কুল, বঙ্গশ্রী আপিস, পশুপতিবাবুদের বাড়ী, টরুদের ওখানে, Imperial Library, কিরণ মাসীমার বাড়ী, নীরদবাবুদের flat, নীরদ চৌধুরীর বাসা, Mognaschi-র flat, মণীন্দ্র বসুর বাড়ী-নানাধরণের atmosphere, কোথায় কখন যাই! কিন্তু সবখানে গেলেই আনন্দ পাই এই শরতের রোদের মাঝে।’ এই তো বিভূতিভূষণ, যাঁর অস্থিরতা বুঝি তাঁর মানবিকতারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মরণোত্তর রবীন্দ্রপুরস্কার অথবা আড়াই দশকব্যাপী নিরলস সাহিত্যসৃষ্টির ব্যাপ্তি শুধু নয়, খুবই সম্ভব তার বেশি কিছু থাকে খগোলের রেলকর্মীদের সশ্রদ্ধ আয়োজনের মূলে। যার হদিস দিতে গিয়ে ৫ নভেম্বর ১৯৫০ তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকায় শ্রীকমলাকান্ত শর্মাবেশী প্রমথনাথ বিশী লিখেছিলেন, ‘অনেকের হৃদয়ে সদর দরজা, খিড়কি দরজা দুটি দ্বার থাকে। বিভূতিভূষণের হৃদয়ে সদর খিড়কির ভেদ ছিল না। সকলের জন্যই একটি দ্বার উন্মুক্ত ছিল। তাই তাঁহার বন্ধুর সংখ্যাও যেমন ছিল অনেক, বৈচিত্র্যও ছিল অদ্ভুত। বিভূতিভূষণের হৃদয় ছিল বন্ধুত্বের আমদরবার, সেখানে উচ্চ-নীচ ভেদে আসন ছিল না, সকলের জন্যই এক প্রশস্ত ফরাস পাতা ছিল, তিনি নিজেও সেই ফরাসের একান্তে উপবিষ্ট থাকিতেন। তাঁহার হৃদয়ে প্রবেশ করা যেমন সহজ ছিল বাহির হইয়া আসা ছিল তেমনি কঠিন। বিভূতিভূষণের সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন হইয়াছে, এমন একটিও দৃষ্টান্ত মিলিবে না।’ কমলাকান্ত শর্মার এই বক্তব্যে যেন ধুয়ো গেয়ে যায় চাইবাসা থেকে, পুরুলিয়া, মানভূম থেকে, ঘাটশিলা থেকে, খগোল থেকে বিভিন্ন শোকসভার সংবাদ।

তবু কত কিছু না-জানা থাকে। আসলে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের এমনি বিন্যাস যে, এ জীবনের অনুষঙ্গে যত তথ্যই গবেষকের সঞ্চয়ে জমা পড়ুক, তত যেন অজানার ভারও বাড়তে থাকে। তাঁর জীবিতকালে প্রকাশিত এতগুলি দিনলিপি, মৃত্যুর পরে প্রকাশিত আরো দুটি, গবেষকের অতৃপ্তিই কেবল বাড়িয়ে চলে। কারণ বিভূতিভূষণ তো এমনি দিনলিপিকার, যাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিকথায় অনিবার্য এসে পড়ে সেই বৃদ্ধা; যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল পাটশিমলে থেকে ফিরবার পথে, গোবরাপুরের মোড় বেঁকে কুঁদীপুরের বাঁওড়ের ওপারে রাণীনগর চাষা-গাঁয়ে। পথ শুধোতে, যে বুড়ি বিভূতিভূষণের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তোমার নাম বিভূতি? সাতবেড়েতে একবার গিয়েছিলে না?’ নতুন অরণ্য দেখবার রোমাঞ্চে বিভূতিভূষণ মিলিয়ে নিতে পারতেন বরমকোচায় দেখা সাঁওতালি মেয়ের ভাঙা-ভাঙা বাংলা, ‘ভাল ভাল জায়গা দেখে তুমি বেড়াচ্চ বুঝি?’ সেই প্রায়-অজানা মেয়েটির কথা তাঁর শ্রবণস্মৃতিতে ফিরে আসে, যখন তিনি বসে আছেন গহন বনে লিপুকোচা তাঁবুতে, অন্ধকারে যখন হাতির ভয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে তাঁবুর সামনে। হেঁদেকুলীর গভীর অরণ্যে দাঁড়িয়ে ভ্রমণসঙ্গী যোগেন্দ্রনাথ সিন্হাকে এই বিভূতিভূষণই বলতে পারেন, ‘হাতী আমাকে আর আপনাকে মেরে ফেলুক। বাঘ আর হাতী মিলে সারা দুনিয়াকে জনশূন্য করুক। যতক্ষণ এ সংসারে একজনও “দুম্বী হো” বেঁচে থাকবে মনুষ্য জাতি অমর।’ আজীবন ভ্রমণপাগল মানুষটির স্মৃতিতে অমলিন থাকে মংডু ব্রহ্মদেশের মৌংপে পরিবারটির কথা। নিবিড় অরণ্যময় আরাকান ইয়োমার উন্নতকায় শাখাপ্রশাখার অদৃষ্টপূর্ব সৌন্দর্যের মহিমাকে তিনি উপভোগ করতে পারেন না, সিংজুর বাসিন্দা সেই সামান্য ইংরেজি জানা, রুক্ষ কর্কশ চেহারার ডাকপেয়াদা কাচিনের প্রেমকাহিনী ছাড়া; সিংজুতে চুরুটের কারখানায় দু’টাকা-হপ্তায় কাজ করা সেই প্রেমিকা কাচিনের, যার কাহিনী শুনতে শুনতে তবেই নাকি আরাকান ইয়োমার অবারিত মুক্তিকে আরো আপন করে পাওয়া যায়। আশ্চর্য কী যে, এই বিভূতিভূষণ বহু ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে নিয়ে, আরো ভ্রমণের পিপাসা অন্তরে নিয়ে দিনলিপিতে লিখবেন, ‘দেশ বেড়িয়ে যদি মানুষ না দেখলুম, তবে কি দেখতে বেরিয়েচি?’

জীবনভর যেসব মানুষের সঙ্গে বিনিময়কে বিভূতিভূষণ এক পথের পাঁচালী থেকে নানান্ পথের নানান্ ছোটোবড়ো আখ্যানে পাথেয় মেনেছেন, তাঁদের অনেকেই বাংলার বিশিষ্ট কথাশিল্পীর মৃত্যুর পরবর্তী শোকসভা, শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্যোগ-আয়োজন পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন না। অথচ সংস্কৃতির পীঠস্থান থেকে তেমন সুদূর এক বিন্দুতেই তো একদিন পথের পাঁচালীকারের পথ-চলা শুরু হয়েছিল। তাঁর দিনলিপি জুড়ে, তাঁর খ্যাতির সংলগ্ন বিভিন্ন আখ্যান স্মৃতিকথা ব্যেপে বিভূতিজীবনের অনেকখানি আজ পাঠকের আয়ত্তে এসে গেছে, এরকম হয়তো ভাবাই চলে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে, ভোলা যায় না যে, এই বিরাট সাহিত্যিকের মৃত্যুর পরে কোনো মৃত্যুসংবাদে, কোনো স্মৃতিকথায় মানুষটার জন্মের সঠিক সন-তারিখ ছাপা যায়নি। বিভিন্ন ভ্রম-সংশোধনের ভিতর দিয়ে ‘শনিবারের চিঠি’ যখন সঠিক তারিখটি প্রকাশ করল, তখন ১৩৫৭ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাস পড়ে গেছে। এটা কি ভাবা যায় যে মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই খাতা, যেখানে ‘জন্ম পত্রিকা’ শিরোনামে মহানন্দের জ্যেষ্ঠ পুত্র বিভূতিভূষণের জন্মতারিখ স্পষ্টই ১৩০১ বঙ্গাব্দের ২৮ ভাদ্র, অর্থাৎ ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর নথিভুক্ত আছে, তা কখনোই বিভূতিভূষণ দেখেননি?

গোপাল হালদারের কথায়, ‘রঙ্গ কৌতুকের বিষয়ের অভাব ছিল না। যেমন বিভূতিভূষণের বয়স। এ যেন কোন দিনই তিনিও ঠিক বলবেন না, আমরাও তাঁকে ঠিক বলতে দেব না।’ পরিমল গোস্বামীর লেখায় আছে ‘বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠির তারিখ ৩রা আশ্বিন ১৩৪৭ (১৯৪০)। লিখছেন “ধূমকেতু দেখার সুযোগ ঘটেনি! ছেলেবেলায় হ্যালির ধূমকেতু উঠেছিল শুনেছি, সে আজ ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন খুব ছেলেমানুষ, পাড়াগাঁয়ে থাকি, কেউ দেখায় নি।”… ১১১০-এ ওঠা হ্যালির ধূমকেতু এমন বিরাট এবং এমন স্মরণীয় ঘটনা এবং এমন দীর্ঘদিনব্যাপী “ইভেন্ট” যে তা পনেরো ষোল বছরের বালকের দৃষ্টি এড়িয়ে যাবার কথা নয়। তবু তিনি এরকম লিখলেন কেন, এটি আমার কাছে একটি রহস্য রয়ে গেল। তাঁর জীবিতকালে হ্যালির ধূমকেতু নিয়ে কখনো তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছি মনে পড়ে না। সে সময় এ কথা জানলে এর একটা মীমাংসা তখনই হয়ে যেত, আজ তো আর কোনো উপায়ই নেই।’ আসলে হয়তো এ রহস্যের সমাধান হওয়ার নয়; কারণ বিভূতিভূষণের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ সুহৃদ পরিমল গোস্বামী পনেরো-ষোল বছরের বাল্য-কৈশোর বলতে যা ভাবতে পারেন, খুবই সম্ভব বিভূতি-জীবনের পঞ্চদশ কি ষোড়শ বছরটি তার থেকে অনেকখানি আলাদা ছিল। বাল্য থেকেই যে বিভূতি একান্ত স্বপ্নদর্শী, জ্ঞানপিপাসু, তার ষোল বছরের কৈশোর হ্যালির ধূমকেতুর নাগাল হয়তো বহু চেষ্টাতেও পেত না। এমনকী, এরকম কোনো চেষ্টার যে প্রয়োজন আছে, সে কথাও হয়তো বিভূতিভূষণের কৈশোরে এসে পৌঁছয়নি।

কে বলতে পারে, এই যে মিথ্যারসিক বিভূতিভূষণ নিজের বয়স নিয়ে নানান গল্প বানিয়ে যেতেন নানান আসরে, তা কোনো সংকোচকে আড়াল করতেই নয়? বারাকপুর গ্রামের দরিদ্র কথকব্রাহ্মণের জ্যেষ্ঠ সন্তানকে জীবনের কুড়িটা বছর তো কাটিয়ে দিতে হয়েছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষা পেরনোর জন্য। নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে, নিজের পিপাসাকে তৃপ্তি দিতে, লড়তে হয়েছিল কঠিন আর্থ-সামাজিক লড়াই। জীবনে বারবার বিভূতিভূষণ নিজের সাংস্কৃতিক, আর্থিক অর্জন নিয়ে বিস্মিত হয়েছেন। এমনকি জীবনের একেবারে শেষ পর্বে, ১৯৫০ সালের ৪ জুলাই মণীন্দ্রলাল বসু বিভূতিভূষণের পুত্রকে বই উপহার দিলে, বাবলুর বাবার মনে হয়, ‘যখন জাঙ্গিপাড়ায় মণীন্দ্রলাল বসুর গল্প প্রথম পড়ি, তখন কি জানি আমার ছেলেকে সে বই দেবে?’ আজও জানা যায় না কলকাতার ছাত্রজীবনে কী ছিল বিভূতিভূষণের প্রাত্যহিক লড়াইয়ের স্বরূপ। কোন কোন বিষয় নিয়ে ইনটারমিডিয়েট পড়েছিলেন তিনি? ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিতে কীভাবে, কবে শুরু হয়েছিল তাঁর যাতায়াত? প্রথম কোন বইটি তিনি পড়েছিলেন সেই গ্রন্থাগারে? এমনকী পরিমল গোস্বামীকে যে তিনি নিজমুখে বলেছিলেন রিপন কলেজে তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন কলেজের এক বিতর্কসভায় ‘নূতনের আহ্বান’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ বিভূতিভূষণ নাকি পাঠ করেছিলেন, কে জানে এই বলার মধ্যেও বিভূতিভূষণ-সুলভ মিথ্যারসিকতা অনেকখানি মিশে আছে কি না। ‘অপরাজিত’ উপন্যাসে অপূর্বকুমার কলেজে এরকম একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিল আর সেই সূত্রে পেয়েছিল অনিলের মতো বন্ধু। কিন্তু বিভূতিভূষণের লেখা ‘নূতনের আহ্বান’ কি কোনো গবেষক স্বচক্ষে দেখেছেন? তাছাড়া অপুর ভিতরে নিজেকে আর নিজের মধ্যে অপুকে মিলিয়ে মিশিয়ে বিভূতিভূষণের খেলা তো অন্তহীন! সে ক্রীড়ার কৌশল কি নিকটজনেরাও সর্বদা নির্ভুল ধরতে পারতেন?

সময় যত এগিয়েছে, বিভূতিভূষণ যতই লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক হয়েছেন, ততই হয়তো কমেছে বিভূতিজীবন বিষয়ে তথ্যের অপ্রতুলতা। কিন্তু আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ আজও গবেষকের নেই। তাই তো মাত্র ছাপ্পান্ন বছরের ভ্রমণপাগল জীবনকে, এক পেশা থেকে অন্য পেশায়, এক চাকরি থেকে অন্য চাকরিতে ফেরা জীবনকে, অপু-অপূর্বকুমারের নির্মাণ থেকে ভবানীচরণের সৃষ্টি পর্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত এক শিল্পীর জীবনকে কখনোই বড়ো একটা নিশ্চিন্ত নাগালে পাওয়া যায় না। আর বিস্মিত হয়ে দেখি, বিভূতিজীবনের শেষ কয়েকটি দিন, শেষ অসুস্থতা নিয়ে প্রচলিত কাহিনীতেও আজ দ্বিমত দেখা দিয়েছে। আজ যদি ফিরে দেখতে হয় বিভূতিজীবনকে, সব থেকে সংগত কি তবে ১৯৫০-এর ১ নভেম্বর দিয়েই সে দেখা শুরু করা? যেদিন সন্ধ্যা ৮টা ১৫ মিনিটে ঘটেছিল সেই মৃত্যু, যার প্রসঙ্গে চারদিন পরে ৫ নভেম্বরের আনন্দবাজার পত্রিকায় শ্রীকমলাকান্ত শর্মা লিখেছিলেন ‘আকস্মিকতা কদাচিৎ এমন অকস্মাৎ বেশে দেখা দিয়া থাকে?’

তখন বিভূতিভূষণ থাকেন বারাকপুর গ্রামে সেই বাড়িতে, যে বাড়ি ১৯৩৮ সালের অক্টোবর মাসে সইমার কাছ থেকে কিনেছিলেন। সুপ্রভা দত্তকে লেখা ১২ অক্টোবর ১৯৩৮-এর চিঠিতে আছে, ‘আমি সইমার সেই বাড়ীটা কিনেচি, কাল প্রথম সেই বাড়ীতে রাত্রি কাটালুম মালিক হিসেবে। খুব বড় একটা শিউলি গাছ আছে উঠোনে।’ ওই ১৯৫০-এর ৬ সেপ্টেম্বর চিঠি পেয়েছেন যে বনগাঁ কলেজ বিভূতিভূষণকে বাংলা বিভাগে শিক্ষক নিযুক্ত করেছে, পুজোর ছুটির পরে ১৬ নভেম্বর সে কাজে যোগদান করার কথা। বাসে চেপে গিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষের কাছে, কথাবার্তা হয়ে গেছে। সেবারের পুজোর ছুটিটা বিভূতিভূষণ কাটাচ্ছিলেন ঘাটশিলায়। ঘাটশিলার ‘গৌরীকুঞ্জে’র স্থায়ী বাসিন্দা তখন বিভূতিভূষণের সর্বকনিষ্ঠ এবং একমাত্র জীবিত সহোদর ডাক্তার মুটুবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর স্ত্রী যমুনা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমা স্ত্রীর নামে যে বাড়ির নাম বিভূতিভূষণ রেখেছিলেন ‘গৌরীকুঞ্জ’, সেই বাড়িটি সম্ভবত কেনা হয়েছিল ১৯৩৯ সালে। সুপ্রভা দত্তকে লেখা ১৯৩৯-এর ১৪ অক্টোবরের চিঠিতে আছে, ‘ঘাটশীলায় একখানা বাড়ি কিনেচি — আমার ছোটভাই সেখানে যাচ্চে সস্ত্রীক পূজোর আগেই।’

ঘাটশিলায় বিভূতিভূষণের বাড়ি কেনা নিয়ে ‘শনিবারের চিঠি’র ১৩৪৬ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় “সংবাদ সাহিত্য” বিভাগে লেখা হল’ — “পথের পাঁচালী’র গায়ক, চিরভ্রাম্যমাণ এবং বিপত্নীক বিভূতিভূষণ ঘাটশিলায় সম্প্রতি একটি বাড়ি খরিদ করিয়াছেন, সুতরাং আমরা আরও কিছু সংবাদ অচিরাৎ প্রত্যাশা করিতে পারি।’ মাঘ সংখ্যার “সংবাদ-সাহিত্যে” ‘শনিবারের চিঠি’ লিখেছিল, ‘পূর্ব্বে আমরা সংবাদ দিয়াছিলাম যে, প্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বহু ঘাট ফিরিয়া অবশেষে ঘাটশিলায় একটি বাড়ি কিনিয়াছেন এবারকার সংবাদ, বিভূতিবাবু গৃহপ্রবেশ করিয়াছেন কিন্তু তাঁহার চাদরের খুঁটি খোলাই ছিল। তবে ঘরে প্রবেশ করিলেও বাহির হইতে হয়, কারণ বিভূতিবাবুর মন বহির্মুখী, সুতরাং পুনরায় ঘুরিয়া ফিরিয়া যখন আবার গৃহপ্রবেশ করিবেন, তখন চাদরের খুঁট কেমন থাকিবে কে জানে!’ ঘাটশিলায় এই বাড়িটি কিনবার পিছনে গল্প একটা আছে।

মুকুল চক্রবর্তীর ঝুলি থেকে সে কাহিনী বিস্তারিত পাওয়া যায়, ‘বাড়িটা আগে ছিল শ্রীঅশোক গুপ্তের। গুপ্ত সাহেব ছিলেন একজন অতি উচ্চ শিক্ষিত আদর্শবাদী শিক্ষাবিদ। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই বিলেতে থাকতেন। অবসরপ্রাপ্ত জীবনে বিকলাঙ্গ ও মানসিক অপরিণত শিশুদের শিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এক পরিকল্পনা খাড়া করলেন। ইংরাজ সরকার কর্ণপাত করলেন না। অশোক গুপ্তের স্ত্রীও ছিলেন তাঁর উপযুক্ত সহধর্মিণী। ওঁরা স্বামী-স্ত্রী মিলে স্থির করলেন ক্ষুদ্রতর পরিবেশে ঐ বিষয় নিয়েই গবেষণা করে যাবেন। দু-দশটি বিকলাঙ্গ ও অপরিণতবুদ্ধি শিশুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। এইজন্য চাই গ্রাম্য নির্জন পরিবেশে একটা আস্তানা। অনেক স্থান ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঘাটশিলার ঐ জনহীন স্থানটিই পছন্দ হল দুজনের। বাড়িটি তাঁরাই তৈরী করেন। সীমিত ক্ষমতার ভিতর যতটুকু সম্ভব পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। ঐ সময়েই বিভূতিভূষণের সঙ্গে অশোক গুপ্তের পরিচয় হয়। ওঁর সাধনার কথা শুনে বিভূতিভূষণ তাঁকে খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন। তাঁর আর্থিক দুরবস্থার কথা শুনে বিভূতিভূষণ গুপ্ত সাহেবকে তখন পাঁচশত টাকা কর্জ দেন। তারপর ক্রমে ক্রমে গুপ্ত সাহেব নানাভাবে জড়িয়ে পড়েন। তিল তিল করে ওঁর প্রতিষ্ঠান নিঃশেষ হয়ে গেল। গুপ্ত সাহেবের স্বাস্থ্যও ভেঙ্গে পড়ল। বিভূতিবাবু ইচ্ছাসত্ত্বেও গুপ্ত সাহেবের খোঁজ খবর নিতে পারতেন না, পাছে গুপ্ত সাহেব ভাবেন টাকাটা ফেরত পাওয়ার জন্যই বিভূতিবাবু খোঁজ করছেন।

‘একদিন কলেজ স্ট্রীটে বইয়ের দোকান থেকে বের হয়েই বিভূতিবাবু দেখতে পেলেন ‘বিপরীত ফুটপাত দিয়ে অশোক গুপ্ত এই দিকেই আসছেন। বিভূতিভূষণ তৎক্ষণাৎ হাতের ছাতাটি খুলে
মুখটা আড়াল করে পাশ কাটাতে চাইলেন, কিন্তু তার পূর্বেই গুপ্ত সাহেব তাঁকে দেখে ফেলেছেন।
“বিভূতি না?”
‘অপ্রস্তুত বিভূতিভূষণের তখন “ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা”। গুপ্ত সাহেব এগিয়ে এসে বিভূতিভূষণের হাতটি ধরে বললেন “আমার একটা উপকার করতে হবে বিভূতি, না বললে শুনব না।”
‘বিভূতিবাবু তো কৃত কৃতার্থ। অশোক গুপ্তকে তিনি দাদা ডাকতেন। ঐ আদর্শবাদী সর্বত্যাগী শিক্ষাবিদের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ছিল তাঁর। বললেন, “নিশ্চয় রাখব। বলুন দাদা।”
“আমাকে ঋণমুক্ত করতে হবে। আমার ছেলেখেলা শেষ হয়েছে ভাই। দুনিয়াদারীর হাটে যা কিছু ঋণ ছিল সব একে একে মিটিয়ে দিয়েছি। বেশ বুঝতে পারছি ডাক এসেছে। তোমার ঐ পাঁচশ টাকা…।”
‘বিভূতিভূষণ আমতা আমতা করে বললেন, “তা সুযোগ সুবিধা মতো একসময় দিয়ে দিলেই চলবে।”
“না না বিভূতি। তুমি যখন আমায় দাদা বলেছ তখন আমাকে ঋণমুক্ত করে দেবার দায় তো তোমার। ঋণ নিয়ে মরেও আমি শান্তি পাব না। শোন, ঘাটশিলায় যে আমার বাড়ীটা তৈরী করেছি, ওটাই তোমার নামে লিখে দেবো। ঐ টাকার পরিবর্তে তুমি বাড়ীখানা নিয়ে আমায় ঋণমুক্ত কর।”

‘বিভূতিভূষণ প্রচণ্ড আপত্তি জানালেন, “তা কেমন করে হবে। একখানা বাড়ীর দাম ৫০০ টাকার অনেক বেশী। তা হলে আর কত টাকা আপনাকে দিতে হবে বলুন।”
“না, আর কিছুই তোমাকে দিতে হবে না। গুপ্ত সাহেব রেজিষ্ট্রি করে বাড়ীটা ওঁকে দিয়ে গেলেন। চমৎকার বাড়ী। খোলা চাল, সিমেন্টের মেঝে, তিনখানা ঘর, সামনে বারান্দা, রান্নার জায়গা, ভাঁড়ার ঘর এবং সামনে একটি প্রশস্ত উঠান। গুপ্ত সাহেব যতই আদর্শবাদী হন, তিনি বিলাত-ফেরৎ মানুষ। বাড়ীটি তাই ঝকঝকে তকতকে করেছেন। মাল মশলাও ভাল ছিল। ভাল এবং মজবুৎ। শক্ত বাঁধুনি। সামনের বারান্দায় দাঁড়ালে সুবর্ণরেখা এবং তার ওপারে অনতিদূরে পাহাড়ের দৃশ্যে অভিভূত হতে হয়। বিভূতিভূষণ বাড়ীর নাম দিলেন “গৌরীকুঞ্জ”।’ এই হল ঘাটশিলার গৌরীকুঞ্জের ইতিহাস। যে বাড়িতে ১৯৫০-এর পুজোর ছুটি কাটাচ্ছিলেন বিভূতিভূষণ। যে বাড়িতে ১৯৫০-এর ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় আকস্মিকতা সেই অকস্মাৎ বেশে এসেছিল।

গোপালনগরে হরিপদ ইনস্টিটিউশনের চাকরি, কলকাতার সংস্কৃতি জগতের নানান ব্যস্ততা, এসবের অবকাশে যখনি পারতেন, ঘাটশিলায় আসতেন বিভূতিভূষণ। বড়ো প্রিয় জায়গা তাঁর, ফুলডুংরি, সুবর্ণরেখা নদী, আরো দূরে ধারাগিরি। যখন বিভূতিভূষণ ঘাটশিলায় আসতে পারেন না, তখন চিঠি যায় এখানকার নিকটজনদের কারো কাছ থেকে, ‘আপনি না থাকলে ঘাটশিলা is a desert… শীগগির আসুন।’ সেই ১৯৫০-এর পুজোর ছুটিতেও বিভূতিভূষণের কাজের অন্ত নেই। সেবছর সেপ্টেম্বর মাসে বিভূতিভূষণের জন্মদিন অনুষ্ঠান হয়েছিল কলকাতায়, সুইনহো স্ট্রিটে, বিভূতিভূষণের দ্বিতীয় স্ত্রী রমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামার বাসাবাড়িতে। এই অনুষ্ঠানে গজেন্দ্রকুমার মিত্র এবং সুমথনাথ ঘোষ বিভূতিভূষণকে একটি কালো কভারে ঢাকা বাঁধানো খাতা উপহার দেন, যার উপরে ইংরেজিতে, সোনালি অক্ষরে লেখা ‘কাজল’। ‘কাজল’ লিখতে হবে, লিখতে হবে ‘ইছামতী’র দ্বিতীয় খণ্ড, যার প্রস্তুতি চলেছে ছোটো ডায়েরিতে, ‘পিতৃভক্তি দেখাও ইছামতী-এ। পিতৃভক্তি বড় জিনিস। পিতাদের অনাদরের মধ্যে টাটানগরের সেই বৃদ্ধটির কথা দিতে পারো।’ জন্মদিনের ওই অনুষ্ঠানের পরে দিনলিপিতে লিখেছেন, ‘বাবার দশ টাকা দেওয়া মনে পড়লো। কতদিনের কথা — সেই খড়ের ঘরে জল পড়চে।’ তাছাড়া ‘অথৈ জল’ উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড লেখারও ইচ্ছে আছে।

সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় সুইনহো স্ট্রিটে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যেমন উপস্থিত ছিলেন সজনীকান্ত দাস, কালিদাস রায়, বাণী রায়, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, নলিনাক্ষ সান্যাল, বেগম জাহানারা এবং তাঁর স্বামী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, সুমথনাথ ঘোষ, ঘাটশিলাবাসী লরি বাংলোর ভক্তবাবু সস্ত্রীক, তারক গঙ্গোপাধ্যায়, প্রমোদ চট্টোপাধ্যায়, ২৫ অক্টোবর ঘাটশিলায় স্থানীয় ডাক্তার সুবোধ বসুর বাড়িতে বিভূতি-সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও জনসমাগম কম হয়নি।

ঘাটশিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোকুল পাইন, শিক্ষক যতীশবাবু আর শিবসত্য চক্রবর্তী, লরি বাংলোর ভক্তবাবু, বিভূতিভূষণের মামাশ্বশুর নিরঞ্জন চক্রবর্তী (যাঁর সুইনহো স্ট্রিটের বাড়িতে জন্মদিন অনুষ্ঠান হয়েছিল), ধলভূমগড় রাজ এস্টেটের ম্যানেজার বঙ্কিম চক্রবর্তী তো ছিলেনই, কলকাতা থেকে গিয়েছিলেন প্রবোধ সান্যাল, সুমথনাথ ঘোষ, প্রমথনাথ বিশী, কুলেশ কর, প্রতুলচন্দ্র রক্ষিত, আরো অনেকে। সেদিন ছিল কোজাগরী পূর্ণিমা। প্রবোধ সান্যাল কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। সংবর্ধনার উত্তরে বিভূতিভূষণ বলেছিলেন, ‘এতো যে সংবর্ধনার আয়োজন, আমার যা দেবার সব কি শেষ হয়ে গেল নাকি। ভবিষ্যতে কি আর কিছু করব না?’

তখনো রোজ লিখতে বসেন বিভূতিভূষণ। লেখা হচ্ছে ‘অনশ্বর’ উপন্যাস, শেষ হয়েছে সেই কাহিনী, যা “শেষ লেখা” নামে পরে ‘কুশল পাহাড়ী’ সংকলনে বেরিয়েছিল। নামকরণের অবশ্য বিভূতিভূষণ অবকাশ পাননি। লেখা হয়ে গেছে “কাশী কবিরাজের গল্প”, “আমার ডাক্তারি” কিংবা “ছোটনাগপুরের জঙ্গলে’র মতো গল্প, যা প্রকাশিত হয়েছিল বিভূতিভূষণের মৃত্যুর পরে। প্রথম দুটি যথাক্রমে ‘অভিষেক’ পত্রিকার আশ্বিন ১৩৫৮ সংখ্যায় এবং ওই বছরের শারদীয় ‘কথাসাহিত্যে’। তৃতীয়টি বেরিয়েছিল ‘বসুধারা’ পত্রিকার ১৩৬০ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যায়। “কবিরাজের বিপদ” বেরিয়েছিল ১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ‘উদয়ন’ পূজাবার্ষিকীতে। কিন্তু যেদিন সন্ধ্যায় ধলভূমগড়ের রাজ এস্টেট থেকে অসুস্থ শরীরে ফিরেছিলেন, সেই ২৯ অক্টোবরও ভোরে সূর্যের আলো ফুটবার আগে স্ত্রীকে ডেকে তুলেছেন ঘুম থেকে, ‘ওঠো ওঠো। গেট খুলে দাও। “কাজলের” ছক তৈরী করব না আজ? মনে নেই?… উপাসনা সেরে নেব না আমার সেই শিলাসনে! তারপরে লেখা।’ ফুলডুংরির পিছনে বনের মধ্যে এক বিরাট পাথরের উপরে বিভূতিভূষণের লেখা আর উপাসনার জায়গা। বাড়ি ফিরতে সেদিন হয়ে গেল সাড়ে দশটা-এগারোটা। যেটুকু খাবার তাঁর জন্য তৈরি ছিল, তাতে খিদে মিটল না। আরো কিছু খেতে চাইলেন। নারকেল-চি’ড়ে অতি প্রিয় আবার বিভূতিভূষণের, কল্যাণী তাই খানিক এনে দিলেন।

খেতে খেতে অস্বস্তি, বুকে যেন চিড়ে আটকে গেছে! সাতাশ বছরের কল্যাণী বলেছিলেন, ‘শুকনো চিঁড়ে খেলে এমনিই হয়। ভিজিয়ে খেতে চাও না আম কলা না থাকলে। কত ঘুরে এসেছ, গলা শুকিয়ে আছে না?’ সারাজীবনে খুব কমই ওষুধ খেয়েছেন যে মানুষ, তিনি কোরামিন চাইলেন। বিচলিত হলেন কল্যাণী, যমুনা। কিন্তু দশ ফোঁটা কোরামিন খেয়ে বিভূতিভূষণ সামলে নিলেন। তবে পুকুরে স্নান করতে গেলেন সেদিন একা, রোজকার মতো তিনবছরের বাবলুকে সঙ্গে নিলেন না। উদ্বিগ্ন কল্যাণী বারবার বলেছিলেন, ঘরেই স্নান করতে, অভয় দিয়ে গেলেন, ‘কিছু হবে না। যাব আর আসব।’ দুপুরে খেতে বসেছেন, ধলভূমগড় রাজ এস্টেট থেকে বঙ্কিম চক্রবর্তী’র চায়ের নিমন্ত্রণ নিয়ে এল এক পত্রবাহক। আর এইখান থেকেই শুরু হল জীবনীকারের বিপদ।

সুনীলকুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় আছে, ‘ঘাটশিলায় উপস্থিত সাহিত্যিক ও সাহিত্যরসিক দলটিকে ধলভূমের রাজা ২৯শে অক্টোবর এক বৈকালিক চায়ের সভায় নিমন্ত্রণ করেন।’ কিশলয় ঠাকুর লিখেছেন, ‘প্রমথনাথ বিশী, সুমথ ঘোষ, অধ্যক্ষ ডঃ অরুণ সেন, বিশ্বপতি চৌধুরী প্রমুখ অনেক লোক উপস্থিত বঙ্কিমবাবুর ওখানে। বঙ্কিমবাবু অভ্যাগতদের তাঁর নতুন তৈরি কারখানাটা ঘুরিয়ে দেখালেন। বিভূতিভূষণ উঠলেন না। শরীরটা আবার খারাপ লাগছে। না এলেই বুঝি ভালো হোত। বসলেন বটে সবার সঙ্গে, খেতে পারলেন না কিছু।… একটা জিনিস খেয়েছিলেন, যা না খেলেই ভাল হত। সেটা শিঙাড়া। সুনথবাবুর কথা, “শিঙাড়াটা একদম সবুজ হয়ে গিয়েছিল। আমরা আর কেউ ছুইনি পর্যন্ত”।’ কিশলয় ঠাকুর আরো জানিয়েছেন, ফিরবার পথে গাড়িতে যখন বিভূতিভূষণ দুবার বমি করেন, তখন গাড়িতে ছিলেন প্রমথনাথ বিশী এবং সুমথনাথ ঘোষ। পথে প্রমথ বিশী নেমে গিয়েছিলেন তাঁর বাড়িতে, বিভূতিভূষণকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নাকি ছিল সুমথ ঘোষের।

১৯৯২ সালে রসায়নের বিশিষ্ট অধ্যাপক প্রতুলচন্দ্র রক্ষিতের ‘পেরিয়ে এলাম’ শীর্ষক গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। এ বইয়ের “ঘাটশিলা” অধ্যায়ে আছে, ‘সেই সন্ধ্যায় প্রমথবাবু এবং আমি ছাড়া বঙ্কিমবাবুর ওখানে বিভূতিবাবুর সঙ্গে আর কেউ যান নি।’

বিভূতিভূষণের ভ্রাতৃবধূ যমুনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে অবশ্য দেখি, সেই ২৯ অক্টোবর রাত্রি আটটা নাগাদ বিভূতিভূষণ গৌরীকুঞ্জের সামনে অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় গাড়ি থেকে নেমেছিলেন সুমথনাথ ঘোষের কাঁধে ভর দিয়ে। সুমথনাথ ঘোষ নাকি বলেছিলেন, ‘বড়দা ওখানে কবিতা আবৃত্তি করেছেন, ঘুরে ঘুরে কি যেন দেখেছেন, তারপর বললেন, আমার শরীর খারাপ লাগছে। তখুনি গাড়ি করে বাড়ি ফিরেছি, গাড়িতেই একবার বমি করেছেন।’

প্রতুলচন্দ্র রক্ষিত লিখেছেন, ‘বঙ্কিমবাবু আমাদের তিনজনকে সাদর অভ্যর্থনা করে নিয়ে তাঁর প্রকাণ্ড ড্রইংরুমে বসালেন। তাঁর গৃহিণী এবং দুই কন্যার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বিভূতিবাবুকে নিজেদের বাড়িতে পেয়ে ওঁরা সবাই আনন্দে উচ্ছ্বসিত। বঙ্কিমবাবুর মেয়েরা দু’তিনটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনাল, বড় মেয়েটি সেতার বাজিয়েও শোনাল। বঙ্কিম-গৃহিণী আমাদের জন্য প্রচুর খাবার এনে উপস্থিত করলেন। বিভূতিবাবু খেতে ভালবাসতেন, সবাই জানে। কিন্তু সেদিন তিনি প্রায় কিছুই খেলেন না। বললেন, “শরীরটা ভাল লাগছে না।” …একটিমাত্র মিষ্টি তুলে নিলেন। আর বললেন; “বাকীটা ছাঁদা বেঁধে দাও, বাবলুর জন্য নিয়ে যাব।”… গ্রন্থকার বিভূতিবাবুর জীবন-আলেখ্য লিখতে গিয়ে বলেছেন যে তিনি সেখানে সিঙাড়া খেয়েছিলেন এবং সেটা খারাপ ছিল সেজন্য তাঁর অসুখ করে। এটা অলীক কল্পনামাত্র। আমি সেখানে ছিলাম, তিনি একটি মিষ্টি ছাড়া আর কিছুই খান নি। গ্রন্থকার বলেছেন, ওখানে গিয়ে বিভূতিবাবু বঙ্কিমবাবুর কারখানা ঘুরে ঘুরে দেখেছিলেন — বিভূতিবাবুর সঙ্গে প্রমথবাবু বিশ্বপতিবাবু প্রভৃতি সবাই গিয়ে নতুন কারখানা দেখেছিলেন। আদৌ সত্য নয়। আমি সর্বক্ষণ তাঁর সঙ্গে ছিলাম, তিনি মোটেই ফ্যাক্টরীতে ঢোকেন নি। …সেই সন্ধ্যায় প্রমথবাবু এবং আমি ছাড়া বঙ্কিমবাবুর ওখানে বিভূতিবাবুর সঙ্গে আর কেউ যান নি।’

তবে কি যমুনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতির বিভ্রমে প্রমথনাথ বিশী হয়ে গেছেন সুমথনাথ ঘোষ? নাকি বিভূতিভূষণকে অতখানি অসুস্থ দেখে প্রমথ বিশী, প্রতুলচন্দ্র রক্ষিত গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার পরে, সুমথ ঘোষকে ডেকেছিলেন? ২৫ অক্টোবরের সংবর্ধনা উপলক্ষে সুমথনাথ ঘোষ ঘাটশিলায় এসেছিলেন, এ তো সত্যি। হয়তো তিনি তখনো ছিলেন ঘাটশিলায়। প্রতুলচন্দ্র রক্ষিতের লেখায় আছে, ধলভূমগড় রাজবাড়ি থেকে ফিরবার পথে মাইলখানেক এসে পদ্মপুকুরের হাটের কাছে বিভূতিভূষণ গাড়ি থামাতে বলেন, সেই স্টেশন ওয়াগন, যা নাকি প্রমথনাথ বিশী, প্রতুলচন্দ্র রক্ষিত আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিকেলবেলায় নিয়ে গিয়েছিল রাজবাড়িতে। গাড়ি থামিয়ে, গাড়ি থেকে নেমে, সামান্য একটু বমি করলেন বিভূতিভূষণ, বললেন, ‘বড় অস্বস্তি হচ্ছে’। সেদিন বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিল, তখনো রাতের আকাশে ছিল ঘন কালো মেঘ, পথ ছিল জনমানবশূন্য। পোশাক-পরিচ্ছদে চিরকাল উদাসীন, কখনো বা বিসদৃশ যে বিভূতিভূষণ, তাঁর সাজগোজ সেদিন ছিল রাজবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষার উপযুক্ত। কল্যাণীর একান্ত ইচ্ছায় সাজতে হয়েছিল। প্রতুলবাবুর বাড়ি পড়ে সবার আগে। তিনি অনুরোধ করেছিলেন, বিভূতিভূষণ যদি নেমে, মুখ ধুয়ে, একটু বিশ্রাম নিয়ে যান। কিন্তু বিভূতিভূষণ তাড়াতাড়ি গৌরীকুঞ্জে পৌঁছতে চাইছিলেন, প্রমথনাথ বিশী তাঁকে পৌঁছতে গিয়েছিলেন।

তারপর তিন দিনও কাটেনি। হুটুবিহারীর মতো ডাক্তার তো ঘরেই আছেন, এসেছেন ঘাটশিলার স্থানীয় ডাক্তার সুবোধ বসু। টাটানগর থেকে প্রখ্যাত চিকিৎসক ব্রহ্মপদ মুখোপাধ্যায়কে আনানোর ব্যবস্থাও হয়েছিল। কিন্তু তখন বিভূতিভূষণের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে, অক্সিজেন চলছে। টাটানগর থেকে এই সময় ব্রহ্মপদ মুখোপাধ্যায় এলেও, তাঁর আসা যে নিরর্থক হবে, তা বোঝা যাচ্ছিল। তাই ট্রাঙ্ককলেই তাঁকে আসতে বারণ করা হয়। এই তিনদিনের যা কিছু বিন্যাস আজ পর্যন্ত পাঠকের কাছে পৌঁছেছে, তার থেকে মনে হয়, বিভূতিভূষণ যেন নিজের অবসানকে প্রত্যক্ষ করতে পারছিলেন। হয়তো তাই, দুই দশকের অনিকেত জীবনের শেষে পাওয়া তাঁর গৃহকোণকে মাত্র দশবছরের নাবালক অবস্থায় ফেলে যেতে, সাতাশ বছরের তরুণী পত্নীকে, তিন বছরের শিশুপুত্রকে ছেড়ে যেতে, বারবার সরবে-নীরবে ভাবতে চাইছিলেন যে, ‘দেবযান’ সত্যি।

জীবনের শেষের দিকে বিভূতিভূষণের পছন্দসই পড়ার ভিতরে ছিল স্বামী অভেদানন্দের ‘লাইফ বিয়ন্ড ডেথ’-এর মতো বই, কর্নিলরের ‘দ্য সারভাইভাল অভ, সোল অ্যান্ড ইট্স্ এভোলিউশন আফটর ডেথ’, কিংবা ‘উদ্বোধন’ পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় প্রকাশিত স্বামীজি অখণ্ডানন্দের বাণীসমূহ। অকালে পিতৃহীন বিভূতিভূষণ কৈশোর থেকে যে দায়দায়িত্বে আকীর্ণ জীবন বহন করেছিলেন, তার রেশ জীবনের শেষ মুহূর্তেও তাঁকে ছেড়ে যায়নি। ওভারসিয়ার বাবুকে, বঙ্কিম চক্রবর্তীকে, সুবোধ বসুকে বারবার বলেছেন, মুটুকে যেন তারা দেখে। যমুনার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছেন, বউমা যেন সুখী হয়। কল্যাণীর সব আকুলতা অগ্রাহ্য করে দিয়েছেন কিছু শেষ নির্দেশ। আর ১ নভেম্বর, ১৯৫০, রাত্রি ৮টা ১৫ মিনিটে অবসানের ঠিক আগের মুহূর্তে বিভূতিভূষণ বললেন, ‘বাবলু কই’? শেষ মুহূর্তটিতে তাঁর চোখ ছিল বাবলুর মুখের দিকে, মুখে ছিল হাসি।

এখানে মিলিয়ে নেওয়া যায় বিভূতিভূষণের ‘দেবযান’, বিভূতিভূষণের পরলোকচিন্তা, ঈশ্বরচিন্তা, আর জীবনের শেষ তিনটি বছরে বারে বারে সেই ঈশ্বরচিন্তায় বাবলুর ভাবনা মিশে যাওয়াকে। ১৯৫০-এর ৮ ফেব্রুয়ারি দিনলিপিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাবলুর সঙ্গ অতি নিষ্পাপ ও মনোরম।’।

এই সাধ, এই সুধা, এই টান, এই পিয়াস যে মানুষের জীবনের আর সাহিত্যের মূলমন্ত্র, তাঁকেই তো ভাবতে হয় যে, তিনি দেবযানের আরোহী; তেমন আরোহণের সুবাদে মরণের পরেও তিনি বারবার দেখে যেতে পারবেন, তাঁর বাবলুকে, তাঁর কল্যাণীকে, তাঁর সংসারকে, তাঁর পৃথিবীকে!

রোগ আর তার চিকিৎসাকে আজ আমরা সাধারণ বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতায় নির্ভর করে যেটুকু বুঝি, তাতে মনে হয়, ওই অসুস্থতা আর আকস্মিক মৃত্যু খুবই সম্ভব হৃদরোগের অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ আর তার পরিণাম। ওই যে বুকের কাছে চাপ লাগা, অস্বস্তি, বমি, এসবই তার ইঙ্গিত দেয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগে নাকি বিভূতিভূষণ একটি শবদেহকে নিজের শবদেহ বলে চিনতে পেরেছিলেন, ঘাটশিলায় সাঁওতালদের অন্ত্যেষ্টির জন্য নির্দিষ্ট এঁদেলবেড়ার জঙ্গলে; রহস্য তো আরো আছে। বিভূতিভূষণের মৃত্যুর কয়েকদিনের মধ্যে অচেনা অজানা এক বৈদ্যনাথ চট্টোপাধ্যায়ের চিঠি এসেছিল পাকুড় থেকে ঘাটশিলার গৌরীকুঞ্জে — আরো বিপদ আসছে, অবিলম্বে স্থানত্যাগ করুন।

বিভূতিভূষণের মৃত্যুর ঠিক ‘সাতদিনের ব্যবধানে ৮ নভেম্বর ১৯৫০ নুটুবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গেলেন; আর সে মৃত্যুকে খুব স্বাভাবিক মৃত্যু বলা চলে না। নুটুবিহারীর মৃত্যুর পরে যখন সেই একই বৈদ্যনাথ একই পাকুড় থেকে আবারও লিখলেন, এখনো সরে পড়ুন, আরও বিপদ আসছে, যমুনা আর কল্যাণী তখন শিশু বাবলুকে নিয়ে ঘাটশিলা ছাড়লেন। যমুনা গেলেন তাঁর বাপের বাড়ি ভাটপাড়ায়, আর কল্যাণী এলেন নৈহাটি ব্যারাকপুরে। সেখানেই তখন কল্যাণীর পিতা ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের কর্মস্থান এবং নিবাস। এরকম চিঠি যে সত্যিই এসেছিল, আর ষোড়শীকান্ত সে চিঠি ছিড়ে ফেলেছিলেন, একথা তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও সাবালক হয়ে শুনেছেন। অবশ্যই সে চিঠি তিনি কখনও চোখে দেখেননি। তবে বহুদিন পর্যন্ত, তারাদাসের ঘাটশিলায় যাওয়ার ব্যাপারে রমা বন্দ্যোপাধ্যায় অস্থির উদ্বেগে আকুল হতেন, ছেলেকে কিছুতেই একা ঘাটশিলায় যেতে দিতেন না, একথা তারাদাসই বলেছেন। রমা বন্দ্যোপাধ্যায় সুস্থ থাকলে, এ প্রসঙ্গে আরও খোঁজ হয়তো পাওয়া যেত। তবে এটুকু মানতেই হয়, বিভূতি-জীবন নিয়ে, এমনকী মরণ নিয়েও রহস্যের বুঝি শেষ নেই।

সবুজ রঙের পচা সিঙাড়ার গল্প কি ওই ভোজনরসিক, মিথ্যারসিক, রহস্যপ্রিয় বিভূতিভূষণে বড়ো বেশি খাপ খেয়ে যায়? হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘বিভূতিভূষণ ভোজনবিলাসী ছিলেন, কিন্তু কলিকাতা শহরে দুই-একবার একসঙ্গে নিমন্ত্রণে গিয়া দেখিয়াছি, তিনি বচনে যেরূপ আড়ম্বরের সৃষ্টি করিতেন, উদর তাঁহার ততখানি সমর্থন করিত না।’ গজেন্দ্রকুমার মিত্রের অভিজ্ঞতায় আছে, ‘বিভূতিবাবু বড় খেতে ভালবাসতেন, একথা সবাই জানে। সেই তথাকথিত পেটুকটির সবচেয়ে লজ্জা ছিল খাওয়াতেই।’ সারাদিন না খেয়ে বলা, গলা পর্যন্ত নিমন্ত্রণ খেয়েছেন, ধরা পড়ে বলা, ‘ইন ফ্যাক্ট, খাওয়া হয়নি’, এই সবই তো কোনো না কোনো রসিকতারই স্মৃতি বয়ে চলে।

হয়তো হৃদরোগ চিকিৎসার সেই একান্তই অনুন্নত পরিস্থিতিতে, নিকট-জনদেরও কোনো একটা কার্যকারণ প্রয়োজন ছিল বিভূতিভূষণের আকস্মিক মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার প্রস্তুতিতে। নাকি, বিভূতিভূষণের একান্ত দীনহীন গ্রাম্য শৈশব থেকে লব্ধপ্রতিষ্ঠ বঙ্গসাহিত্যিকের যাত্রাপথকে, রাজবাড়িতে সাদর নিমন্ত্রণের সাফল্য আর সৌভাগ্যকে একটা বাঁধাধরা ছকে গাঁথতে গেলে, এরকম একটা ধারণা বেশ জুতসই ঠেকে, যে, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে সেই মানুষটা ছিলেন নিতান্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন, অবিবেচক? সত্যি-মিথ্যের ভেদরেখাকে বিভূতিভূষণ এতই স্বতঃস্ফূর্ত ভেঙে দিতে চাইতেন যে, তাঁর জীবনে সত্যি ঘটনা থেকে মিথ্যে গল্পকে আলাদা করে নেওয়া বড়ো সহজ নয়। এমন স্বতঃস্ফূর্তিও হয়তো বিভূতিভূষণের অনুরূপ কোনো যাত্রাপথই কেবল বানাতে পারে।

মৃত্যু যখন ঘটেই যায়, তখন তো আর সে মৃত্যুর কোনো পরোক্ষ এমনকী প্রত্যক্ষ হেতুও সেই মৃত্যুর থেকে বড়ো হয়ে ওঠে না। বিশেষত এমন এক শিল্পীর মৃত্যু, যিনি জীবনের শেষদিন সকালে আচ্ছন্নতার মধ্যে বলেন, ‘আজ আর লেখা হলো না’। যে মৃত্যুতে সমসময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলমে এসে পড়ে সেই অমোঘ পঙক্তি, ‘বাংলা সাহিত্যের নাটমণ্ডপে পথের পাঁচালীর আসর ভাঙ্গিয়া গেল।’ যিনি অসুস্থ শরীরে অস্বস্তি সত্ত্বেও “কর্ণ-কুন্তী সংবাদ” আবৃত্তি করে শ্রোতাদের মুগ্ধতা নিয়ে শেষবারের মতো গৌরীকুঞ্জে ফিরে এসেছিলেন সেই ২৯ অক্টোবর, ১৯৫০-এর রাত্রে, তাঁর জীবন তো সাধারণ আর অসাধারণের টানাপোড়েনে, কোনো সহজ সিদ্ধান্তের স্বস্তি থেকে আমাদের বঞ্চিত করে বারবার।

অসম্পূর্ণ পড়ে থাকে ‘অনশ্বর’ উপন্যাস, ‘কাজল’ অথবা ‘ইছামতী’র দ্বিতীয় খণ্ডের পরিকল্পনা তো সম্পূর্ণই না-লেখা রইল। দেওয়া হল না শেষ সম্পূর্ণ গল্পটির নাম। আর এত অসম্পূর্ণ কিন্তু সতেরোটি উপন্যাস, সাত-সাতটি দিনলিপি-ভ্রমণকাহিনী, দুশোর কিছু বেশি ছোটোগল্প সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরে। এই সাহিত্যকীর্তির জন্য বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়েছিলেন তিন দশকেরও কিছু কম সময়। দেবযানের এই আরোহীটির কাছে যদি পৌঁছত, বাড়ির বাইরে তাঁর জীবনের শেষ বিনিময়ের সন্ধ্যাটি নিয়ে এই মতভেদ বা স্মৃতিভেদের বিন্যাস, সম্ভবত তিনি পেতেন আরো সাহিত্যের রসদ, অসম্পূর্ণের তালিকাটি দীর্ঘতর হত। রহস্য করে বলতেও পারতেন, ইন ফ্যাক্ট দুটোই মিথ্যে। অথবা হয়তো তিনি উড়িয়ে দিতেন, চ্যান করুক গে যাক বাদ দাও দিকি…
(সংক্ষেপিত ও বানান অপরিবর্তিত)

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field