তীরন্দাজ নববর্ষ সংখ্যা
আকাশ যখন রোদ্দুরের শাসানিতে নতপ্রায়, মাঝে মাঝে জোর বাতাস দিয়ে জানান দিত বোশেখ আসছে। আমরা তখনো জানতাম না বাংলায় কোন মাস চলে, কোন মাস আসছে। আমাদের উঠোনজুড়ে আমের বোল, কাঁঠালের মুচির দিন পেরিয়ে সবুজ ছোট মুকুলগুলো ক্রমেই আম হয়ে উঠছে। আমরা পাহারা দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠি প্রায়। মা বলতেন, খবরদার বি-পরবের আগে আম মুখে নিবি না। মানুষ পাগল হয়ে যায়! মরার ভয় তাও সহনীয় কিন্তু পাগল হবার ভয়ে আমরা কাঁচা আম মুখে নিই না। তারপর ঝড় আসে, টিনের চাল ভেঙে আম পড়ে, আমরা কুড়িয়ে কোচড় ভরি, মা আচার বানায়, আমসত্ত্ব বানিয়ে বোয়াম ভরে রাখে। তারপর একদিন বি-পরব আসে। আমরা দ্বিধাবোধ ছাড়াই কচকচ করে কাঁচা আম খাই। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বি-পরব মানে চৈত্র সংক্রান্তি আর পহেলা বৈশাখ। ফুল বি আর মূল বি। চাকমারা খুব কাছাকাছি বাস করে বলেই হয়তো ধর্ম-বর্ণ ছাপিয়ে আমাদের সংস্কৃতি মিলেমিশে গেছে। বি মানে আমাদের মা-খালা, পিতামহী হলফ করে তেমন কিছুই আমাদের শেখায়নি। ধারণা করি বিজু থেকেই বি-পরব এসেছে।
আমার ছোটবেলাজুড়ে কোন বৈশাখীমেলা ছিল না, যা ছিল বইয়ের ভিতর। চৈত্র সংক্রান্তিকে মা বলত চৈত্ মাস’র শেষ। গাছের কাঁচা কাঁঠাল, লতাপাতা সবজি-ফল নিয়ে পাঁচন রান্না হতো। আমরা পাতপেড়ে সে পাঁচন খেতাম। পাড়ার প্রায় সবার ঘরে ঘরেই এটা রান্না হতো। পরদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দাওয়ায় দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে দেখতাম মা সারা ভিটে ঝাড়ু দিয়ে সমস্ত আবর্জনা স্তূপ করেছে উঠোনের একপ্রান্তে। আর আগুন দিয়ে সে আবর্জনা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নতুন বছরে পুরনো আবর্জনা ধ্বংস করে সুন্দরের দিকেই যেন হয় আগামীর যাত্রা।
মুড়িমুড়কি হ’তো, দরজায় নিমের ডাল-পাতাসমেত ঝুলিয়ে দিতো মা। এতে রোগবালাই দূর হয়। অমঙ্গল ঝেটিয়ে বিদেয় করে, মঙ্গলের আহ্বান জানায়। বৎসরের আবর্জনা ভস্ম হয় আমাদের চোখের সামনে। কেউ বলত না এটা হিন্দুয়ানী ব্যাপারস্যাপার। কোন মোল্লা এসে ফতোয়া দিয়ে যায়নি। তারপর অনেক অনেক বছর মা ছিল না, কিন্তু ফিবছর এই সংস্কৃতির চর্চা পাড়াতে, বাড়িতে ছিল। আমাদের মামাবাড়িতেও এসব কালচার বজায় ছিল।
কিন্তু ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির এই সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈশাখ এখন আর কোথায়! ক্রমেই সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে ঢেকে যাচ্ছে আমাদের হার্দিক সহাবস্থান। একটা মৌলবাদী চক্র বাংলাদেশে ঐতিহ্যের ওপর ধর্মের প্রলেপ দিতে শুরু করে দিয়েছে। এখন পহেলা বৈশাখের উৎসবে মৌলবাদের কালো থাবা এসে পড়েছে। বাঙালি নারীর শাড়ির ওপর হিজাব এসে ভর করেছে। সন্ধ্যার আলো নেভার আগেই ঝেঁটিয়ে উৎসবমুখর মানুষগুলোকে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়ার জন্য ক্ষমতার ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। তাও, মন্দের ভালো, আমরা সয়ে নিয়েছি। স্বল্প পরিসরের আনন্দের ভেতর নিজেদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা জিইয়ে ছিল।
দোকানে বাকির খাতায় জমাপড়া হিসেব দেখে ধার শোধের তাড়না দেয়া হতো। এখনো হয়, বিশেষ করে স্বর্ণের দোকানে। নতুন খাতায় ফের নতুন হিসাব। হালখাতা হল পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পালিত একটি উৎসব যাতে গত বছরের সমস্ত হিসাব-নিকাশ শেষ হয় এবং একটি নতুন খাতা খোলা হয়। এটি বাঙালি ব্যবসায়ী, দোকানদার এবং ব্যবসায়ীদের দ্বারা পালন করা হয়। পহেলা বৈশাখে কেউ দোকানে গেলে তাকে মিষ্টিমুখ করানো হতো। সে ঐতিহ্য চলমান।
বৈশাখের যত আড়ম্বর সব শহরে। আমরা গ্রামে কেবল ওটুকুই দেখেছি। তারপর শহুরে জীবনে আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রা, জব্বরের বলিখেলা, বলিখেলার মেলা, মাটির হাড়িপাতিল, হাতপাখা, ঝাড়ু এইসব কেনাকাটার আনুষ্ঠানিকতায় অভ্যস্ত হই। ভালো লাগে। বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। জীবনের সর্বাংশকে উদযাপন করতে পছন্দ করে। সে উৎসবের গায়েও এখন সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সিলছাপ্পর মারতে শুরু করেছে সুবিধাবাদীরা। দুর্বৃত্তায়ন চলছে। কিন্তু কতদিন? মানুষ জাগবে ফের…
প্রত্যাশার বাতায়ন খুলে গাইবে- “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’,… তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে উড়ায়ে দিয়ে, মানুষ পোড়াবে বৎসরের আবর্জনা। মানুষেরই তো জয় হবে। আমাদের জীবন থেকে সব আনন্দ, রঙ যারা যে কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধীরে, আড়ম্বরে, তাদেরই দিনশেষে হারতে হবে ! মানুষের গন্তব্য এই বাংলার বাউল, জারি-সারি, বাঁশির সুর বেয়ে ক্রমেই লালমাটির দিকে। আমরা চাষার বংশধর। কে না জানে, আশায় বাঁচে চাষা…


Leave feedback about this