কিউবার ছোটগল্প
ঘণ্টাখানেক আমরা মালিকোন এলাকায় ঘোরাফেরা করলাম। তার চেয়ে বেশি সময় কাটালাম একসঙ্গে বসে থেকে। তার চেয়েও বেশি ভালোবাসলাম একে অপরকে। খানিকটা ঠাট্টা তামাশাও করলাম।
রাত একটার দিকে মনে হলো আমরা একে অপরকে চিনে ফেলেছি। কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলাম। নির্মম হতে লাগলাম তার দিকে তাকিয়ে। তাকে চুমু খেলাম বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে। সেও খেলো আমাকে। খুব জোরে চেপে ধরল। বললাম, “এখন কী করব আমরা?”
সে বলল, আমার ওখানে চলো। ছেলেটাকে কোলে তুলে নিল। ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমরা উঠে পড়লাম।
২৬৪ নম্বর ট্রেকাডেরোর কাছে একটা দালানে থাকে মিরিয়াম। ভীষণ স্যাঁতসেঁতে আর অন্ধকার তার ঘরটা। দুর্গন্ধ আসছে। ঢোকার রাস্তায় অনেক লোক। তার ঘরটা ১০ বাই ১৩ ফুট মাপের। পিছনে ছোট একটা জায়গায় কেরোসিনের চুলো রাখা। কুঁজো হয়ে থাকতে হলো আমাকে, কারণ একটা কাঠের প্ল্যাটফর্ম ঘরটাকে দুভাগে বিভক্ত করেছে। বিছানাটা ওপরে। ছেলেটাকে এক কোনায় শুইয়ে দিল মিরিয়াম। বাকি জায়গাটা রইলো আমাদের দখলে।
আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সঙ্গম করলাম। সে চাইছিল আমি ওকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করি। শেষে বলল, কোনো পুরুষ এরকমভাবে তার সঙ্গে আগে কখনো সঙ্গম করেনি। “অধিকাংশ পুরুষ আমার উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে না, এসেই তাদের মতো করে উপগত হয়।”
আমাদের খেলার মাঝপথে ঝড়ের বেগে ওপর থেকে পাথর আর বালি পরতে লাগল। বললাম, “মাথার ওপর ধসে পড়বে নাকি?”
“ভয় পেয়ো না, কিচ্ছু হবে না।”
কাজ শেষ করে মালিকোনে ফিরে এলাম। একটা লোকের কাছ থেকে এক বোতল আগুয়ারদিয়েন্তে মদ কিনলাম। সামান্য একটু গলাধঃকরণ করতেই লোকটা আবার এলো।
“এই, গাঁজা লাগবে নাকি আপনার? কাছেই পাওয়া যায়, লাগলে এখনই এনে দিতে পারি।”
“ ভাইরে, জানি টাকার জন্য এসব বিক্রি কর। এগুলো আসলে বিষ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
“আরে না না, কী বলছেন এসব, আমার জিনিস খুব ভালো। সত্যিকারের গাঁজা, গ্যারান্টি দিতে পারি। একটা টান দিয়ে দেখুন ভালো না হলে নেবেন না।”
“ঠিক আছে ভায়া, দেখাও দেখি।”
মদ ও গাঁজার প্রভাবে ভোর চারটার মধ্যে আকাশে ভাসতে লাগলাম আমি।
কিন্তু মদ-গাঁজার বিক্রেতা আমার পিছু ছাড়ছিল না, আমাকে সর্বস্বান্ত না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে। অনবরত কথা বলে যাচ্ছিল। শেষে বললাম, “নরকে যাও বাপু, আমি এবার উঠব।”
আবার ২৬৪ ট্রেকোডেরোতে ফিরে এলাম। আগুয়ারদিয়েন্তে তখনও একটুখানি পড়ে আছে বোতলের তলায়, আর সামান্য একটুখানি গাঁজা। মিরিয়ামকে ঘুম থেকে ডেকে ওঠালাম। সে-ও আমার সঙ্গে খানিকটা মদ-গাঁজা খেলো। আমরা আরও খানিকটা সঙ্গম করলাম।
মিরিয়াম সংকর জাতের নারী। খুব বেশি লম্বা নয়। ঠিকমতো খেতেটেতে পায় না, তবে সে সুন্দরী। সুগঠিত শরীরের অধিকারী। হাড্ডিসার মেয়ে পছন্দ নয় আমার। পছন্দ করি না মোটাদেরও। মিরিয়াম অবশ্য অনায়াসেই তার ওজন পাঁচ-ছ পাউন্ড বাড়াতে পারে। এখন সে ৩১। তার ছেলের বয়স ২ বছর। ওর স্বামী তার ভাষায় ‘কাকের মত কালো’। এখন জেলে আছে, ১০ বছরের সাজা খাটছে। এক পুলিশকে খুনের চেষ্টা করার দায়ে দু’বছর আগে জেলে গেছে সে। ওই লোকটাই মনে হয় তার ছেলের বাবা, কারণ, ওর গায়ের রঙও খুব কালো। তার মায়ের চেয়েও বেশি। মিরিয়ামের চরিত্রের সবচেয়ে ভালো দিক ওর নির্লজ্জতা। অন্য যেসব পুরুষের সঙ্গে সে ছিল তাদের বিষয়ে বিস্তারিত বলেছে আমাকে।
কিছুদিন সে মালিকোন ও সেন্ট্রাল হাভানা এলাকার হোটেলগুলোতে টুরিস্টদের দেহদানে লিপ্ত ছিল। একদিন আমাকে বলেছিল, “সে সময় যদি আমাকে দেখতে? কী সুন্দরীই না ছিলাম আমি। আমার নিতম্বটা ছিল দারুণ! তবে কালোদের সঙ্গে মাঝে মাঝে অন্যদের গুলিয়ে ফেলতাম। কালোদের আসলে খুব পছন্দ করতাম, একেবারে পাগল ছিলাম ওদের জন্যে। জেলে আছে যে লোকটা, সে-ই আমার ছেলের বাবা। রাগ কোরো না আমার কথায়; তার ছিল আমার কাঙ্ক্ষিত পৌরুষদীপ্ত ব্যক্তিত্ব। তুমিও অবশ্য খুব মিষ্টি; কিন্তু তার ভেতরে কী যেন একটা ছিল, ঠিক বোঝাতে পারব না তোমাকে।”
বাচ্চা জন্মদানের পর তার দেখভাল করার মতো কেউ ছিল না বলে পতিতাবৃত্তি ছেড়ে দিতে হয় তাকে। ফলে আবার দারিদ্র্যের ভেতর দিয়ে জীবন চলতে থাকে তার।
নির্লজ্জতা তাকে অশ্লীলতার ভেতর নিয়ে যায়, আর এটা আমার ভালো লাগত।
নিজেকে আমি তার কাছে আরও অমার্জিত ও অসভ্য করে রাখতাম। সে কালোদের পছন্দ করত – তা সে যতই কালো হোক না কেন। সে অবশ্য নিজেকে তাদের চেয়ে উন্নত ভাবত।
আমাকে একদিন বলেছিল, “তারা শুকর ছানার মতো, আমি তাদের ব্ল্যাকম্যান বলে ডাকি। বলি, হেই নিচে নেমে এসো। সব সময়ই আমি তোদের ওপরে থাকি। আমার গায়ের রং দারুচিনির মতো চকচকে।”
সত্যি কথা বলতে কী দারুচিনির চেয়েও বেশি উজ্জ্বল ছিল তার গায়ের রং। আর ওভাবেই অন্যদের বিচার করত সে। আমি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছি ব্যাপারটা – তুমি যত বেশি নিম্নমানের, যত বেশি উজ্জ্বল, তত বেশি উন্নত। কিন্তু সে তার মত বদলায়নি। আমার কাছে সবই ছিল এক। নিজের ইচ্ছে মতো বিশ্বাস-অবিশ্বাস করার অধিকার তার আছে।
আমি জীবন কাটিয়েছি একজন সাংবাদিক হিসেবে, যাকে বলে ‘ফাকিং জার্নালিস্ট’। প্রথম দিকে ভেবেছি সত্যের প্রতিভূ হবো আমি; এমন কেউ যে কি না লোকের মত বদলে দিতে পারে; কিন্তু এখন আর ওভাবে ভাবতে পারি না।
কুড়ি বছরের সাংবাদিক জীবনে পাঠকের প্রতি যৎকিঞ্চিত ভক্তিও দেখাতে দেওয়া হয়নি আমাকে। এমনকি দেখাতে দেওয়া হয়নি তাদের বুদ্ধিমত্তার প্রতি সামান্য শ্রদ্ধা। সব সময় আমাকে এমনভাবে লিখতে হয়েছে যেন ওগুলো নির্বোধ সব লোকেরা পড়বে। আর পড়বে সেই জনগণ যাদের মাথায় জোরপূর্বক কিছু ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া দরকার।
এর সবই আমি প্রত্যাখ্যান করে আসছি। চমৎকার সব গদ্য রচনার নিন্দে করেছি, নৈতিক ও সামাজিকভাবে যা কিছু ক্ষতিকর হতে পারে, সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে গেছি। যথার্থতাকে ওপরে স্থান দিতে পারিনি, যথাযথ আচরণ করতে পারিনি। কেবল হেসেছি, চমৎকার সব পোশাক-আশাক পরেছি, সুন্দর করে সেভ করে মেখেছি সুগন্ধি। দামি ঘড়ি হাতে দিয়েছি – যেটা ঠিকমত সময় দিয়ে গেছে। বিশ্বাস করেছি এসব অনিবার্য ছিল, বিশ্বাস করেছি সবই টিকে যাবে চিরদিনের জন্যে; কিন্তু না, শিখেছিলাম কোনো কিছুই চিরদিনের জন্য টিকে যায় না।
পুতিগন্ধময় ওই দালানে নিজের ঘরের আমেজ অনুভব করলাম। এখানকার বাসিন্দাদের কারো কোনো শিক্ষাদীক্ষা নেই, নেই কোনো জ্ঞানগম্যি। মেধা নেই তাদের। কোনো বিষয়ে তারা কিছু জানে না। কে সব সমস্যার সমাধান করছে? আগের চেয়েও সবকিছু খারাপ হয়েছে – চিৎকার – চেঁচামেচি, অপমান দাঙ্গাহাঙ্গামা, ঘুসোঘুসি, মারামারি আরও কত কী চলছে। একটা নরক গুলজার করা অবস্থা। নরকের সব কিছুই এখানে আছে!
অল্প কিছু সময়ের জন্য ছিলাম ওখানে। ট্রেকাডেরো আমার প্রিয় জায়গা। এখান থেকে একটু সামনে ১৬২ নম্বরে থাকতেন লিজামা লিমা। ১৯৭৬ সালে মারা গেছেন। দরজার পাশেই একটা নাম ফলক আছে। তবে এখানকার কিছু পুরনো বাসিন্দায় কেবল ১৯৯৪ সালের লিমাকে মনে করতে পারেন। “ও, মোটাসোটা মানুষটা? সত্যিকারের একজন ভদ্রলোক ছিলেন। সব সময় স্যুট পরে থাকতেন, তার বউটা ছিলেন পাগলা কিসিমের। তিনি তো সমকামী ছিলেন, তাই না?”
এখান থেকে কাছে একটা পিৎজার দোকানে খেতে যেতেন। দোকানটার নাম ছিল বেলা নেপোলেস। এখন তাদের রান্না করবার মতো জ্বালানিও জোটে না! দোকানের সামনে খালি জায়গায় পুরনো আমলের একটা কাঠের চুলাও বসিয়েছিল। ওখানে তারা যতটা সম্ভব মাছের স্যুপ আর ভাত রান্না করত।
ভোরের শুরুতেই মিরিয়াম ওখানে গিয়ে লাইনে দাঁড়াত, আর দুপুর নাগাদ কিছু খাবার কিনতে পারত, ওভাবেই আমরা জীবন ধারণ করতাম।
সেপটিক ট্যাংক উপচে পড়লে আমার ঘরটা ভীষণ অরুচিকর হয়ে উঠত। করিডোর চুঁইয়ে আসত কালো রঙের দুর্গন্ধময় পানি।
মিরিয়ামের ছেলেটা হাঁপানিতে আক্রান্ত হয়েছিল। সে জানিয়েছিল ট্যাংকের পানির গন্ধে ছেলেটার এলার্জি হয়। ওকে সান্তারিয়াতে (সাধুদের উপসনালয়) নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমি কখনওই জিজ্ঞেস করিনি তারা তাকে কী বলেছিল, আর ওর আরোগ্য লাভের বিষয়ে কী পরামর্শ দিয়েছিল। ছেলেটা এখনও আধা ন্যাংটা হয়ে খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়। এখনও ট্যাংকের সামনে পড়ে যায়, আর রাতে হাঁপানির কবলে পড়ে।
প্রবল বৃষ্টি হলে সবাই ভয়ে কাঁপতে থাকে, কারণ দালানটা অনেক পুরনো – ইট, বালু, আর চুন দিয়ে তৈরি, কোনো সিমেন্ট নেই। বন্যার কথা তো বাইবেলেও আছে। প্রচণ্ড ঝড়ের সঙ্গে প্রবল বর্ষণ দিনের পর দিন ধরে চলে। দেওয়ালে আরও বেশি ফাটল সৃষ্টি হয়। দেওয়াল অনেক সময় ধসেও পড়ে। ভয়ে কেউ ঘুমাতে পারেনা। বয়স্ক মহিলারা নীরবে প্রার্থনা করে।
মিরিয়ামের সঙ্গেও থেকেছি আমি যাবার কোনো জায়গা ছিল না বলে। ভালো-মন্দ কোনো জায়গায় না। সেক্স ভোগ করা ভালোই চলত। হাতের কাছে যা পাওয়া যেত তা-ই বিক্রি করে কিছু অর্থকড়ি জোগাড় করে কিছু সময়ের জন্য প্রাণ ধারণের চেষ্টা চালাত মিরিয়াম। নিজের মতো করে কিছু কাজ করত মেয়েটা, আর বাস করত আমার ছত্রছায়ায়। কিছু আদিম ব্যাপার ছিল তার মধ্যে। শুধু ছেলে আর আমার জন্য বাঁচত সে। প্রাচীন কিছু বিশ্বাসও প্রোথিত ছিল তার অন্তরে। মনে করত, পুরুষ গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবে আর নারীরা হবে ভারবাহী পশু।
আমি যখন ঘেমেটেমে নোংরা হয়ে বাসায় ফিরতাম, তার ভেতর যৌন উত্তেজনা জেগে উঠত। আমাকে সে বন্য পুরুষ হিসেবে গণ্য করত, সারাক্ষণ যার লিঙ্গ উত্থিত অবস্থায় থাকবে। নিজেকে সে একান্ত আমার নারী হিসেবে কল্পনা করে কামাতুর হতো। মনে করত সে আমার এমন নারী, যাকে আমি অন্য পুরুষের লালসা থেকে রক্ষা করব। উত্তেজনা জাগাতে এমন সব পোশাক পরত যাতে তার স্তন জোড়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে, খুলে রাখত পেটের দিকের বোতাম। লোকজন যখন তার অশ্লীল বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলত, তখন সে এই কাজগুলো করত, যেগুলো সে আবার যৌনসঙ্গমের সময় আমার কানে কানে বলত। তাতে আমার নিজের উত্তেজনাও বেড়ে যেত। তখন তাকে আঘাত করার হুকুম জারি হতো আমার উপর। প্রহৃত হতে ভালোবাসতে সে। গালে দু’চারটে চড়থাপ্পড় পড়লেই রাগ মোচন ঘটত তার।
সব সময়ই টাকা-পয়সা কিংবা খাবার জোগাড় করতে পারত সে। “একটুখানি রাম খেতে ইচ্ছে করছে”, মুখ থেকে একথা বের করার সঙ্গে সঙ্গে সে একবোতল রাম আর এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসত।
তার সঙ্গে কখনও খারাপ ব্যবহার করতাম না আমি। এটাকে সে ভালোবাসা বলে ভুল করত। আমাকে বলত, জীবনে সে এমন ভালোবাসা আর কারও কাছ থেকেই পায়নি। আমিই প্রথম তাকে দলাই-মলাই করেছি। তার কাছে খুব ভালো ছিলাম আমি। তাকে অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথাও বলেছি।
আমি আসলে পুনর্বার প্রেমে পড়তে চাইনি। এমনিতেই আমার জীবনে প্রেম-ভালোবাসার অভাব ছিল না। ভালোবাসা আনুগত্য আর সমর্পণের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আর কারও কাছে অনুগত বা সমর্পিত হওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে।
শেষ পর্যন্ত একটা রেডিও স্টেশনে চাকরি পেয়ে যাই; কিন্তু আমার পছন্দের কাজ ঘোষক হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেবে না তারা। আমাকে জনকল্যাণমূলক ঘোষণা লিখতে হবে, যেগুলো নিয়মিত অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে প্রচার করা হবে – যেমন ধূমপান বর্জন, মাতাল হয়ে গাড়ি না চালান, ঘরবাড়িতে বাচ্চাদের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করার মতো অদ্ভুত সব আবেদন।
এছাড়াও ছিল শিক্ষা ও উদ্দীপনামূলক বুলেটিন। এসব লিখতে গিয়ে পাগলের দশা হতো আমার। পরিষ্কার করে বলতে গেলে বলতেই হয়, কেউ ওসব আবেদনে কর্ণপাত করে না – মানুষ এখনও ধূমপান করে, মাতাল হয়, আর তাদের আহত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে দৌঁড়ায়।
রেডিও স্টেশনের পরিচালক বর্ণসংকর নারী। তিনি নারীদের রানি। দুষ্টু কন্যা। জার্মান ভাষায় কথা বলেন। মার্জিত আর পরিশুদ্ধ নারী হওয়ার ভান করেন। আমাকে বলেন, বুলেটিন হতে হবে নির্ভরযোগ্য ও বাস্তব। তার ওসব কথা শুনতে ভালো লাগে না আমার। সহ্যও হয় না।
শুরু থেকেই নির্ভরযোগ্য ও বাস্তব ওই শব্দগুলোর প্রতি ঘৃণা আছে আমার। আসলে গোঁড়া আর বানোয়াট সত্যকে আড়াল করার জন্যে ব্যবহৃত হয় এসব। সবকিছুই অনির্ভরযোগ্য আর মিথ্যে। তাবৎ ইতিহাস, গোটা জীবন, প্রতিটি যুগই অনির্ভরযোগ্য ও বাস্তবতা বিবর্জিত। আমরা নিজেরাও সবাই স্বভাবগতভাবে অগভীর ও অবাস্তব। আমরা আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি লুকিয়ে রাখি, আর নিরীহ ভেড়াদের মতো খোঁয়াড়ে ফিরে যাই। লাগাম আর নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেই।
দীর্ঘদিন ধরে আমি একটা দ্বৈত জীবন যাপন করছি। এক : রেডিও স্টেশনের নিরাপদ ও বাস্তব জীবন। দুই : মিরিয়ামের বাসায় দুর্দশাপূর্ণ অবাস্তব জীবন। এখনও মুক্ত জীবনের স্বাদ পাইনি, তবে অবস্থার উন্নতি ঘটছে। সত্যি কথা হচ্ছে, কোনো ধরনের সহজ সরল পথ ও সংকীর্ণ জীবনের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। আগ্রহ নেই সেই জীবনের প্রতি যা অবাধে একবিন্দু থেকে আর এক বিন্দুতে পৌঁছে, সন্ধান করে এমন এক পথ যা এক স্থান থেকে শুরু হয়ে অন্য কোথাও চলে যায়।
না, নির্ভরযোগ্য ও বাস্তব হওয়ার চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই, কিংবা লাভ নেই লাভ নেই পরিকল্পিত জীবনযাপনের চেষ্টা করেও। জীবন হচ্ছে সুযোগের খেলা।…
পেদ্রো হুয়ান গুইতিরেস

কিউবা তথা লাতিন আমেরিকার খ্যাতনামা লেখক। তিনি বেশি পরিচিত তাঁর ‘ডার্টি হাভানা ট্রিলোজি’ উপন্যাসের জন্য। বইটি প্রবল যৌন উত্তেজনাময় কতগুলো গল্পের সমষ্টি।
১৯৯০ সালের প্রথম দিকে কিউবার রাজধানী হাভানা এক নারকীয় শহরে পরিণত হয়, কারণ সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবা সরকারকে যে সাহায্য দিত, তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।
আত্মজীবনীমূলক ওই উপন্যাসে গুতিয়েররেস সেই সময়কার হাভানা শহরের শোচনীয় ও করুণ পরিস্থিতির চমকপদ বর্ণনা হাজির করেছেন।
নিজের বিয়ে বিচ্ছেদ আর দেশের অর্থনৈতিক সংকটের মুখে কী করে পাগল হয়ে যাওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেছিলেন তারই মর্মস্পর্শী বয়ান ডার্টি হাভানা ট্রিলোজি।
প্রকাশের পরপরই অশ্লীলতার অভিযোগে খোদ কিউবায় বইটি নিষিদ্ধ হয়। তবে অনূদিত হয়ে বিশ্বের কুড়িটি দেশে প্রকাশিত হয়েছে, বিক্রি হয়েছে লক্ষ লক্ষ কপি।
হাভানার পটভূমিতে লেখা তাঁর অন্য উপন্যাস ‘ট্রপিক্যাল অ্যানিম্যাল’, ‘ইনসাটিয়েবল স্পাইডারম্যান’, ‘দ্য কিং অব হাভানা’ আর ‘ডগ মিট’ ছাড়াও তাঁর সাতটি ফিকশন ও আটটি কবিতার বই বেরিয়েছে।
জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন সময় বিচিত্র সব পেশা বেছে নিয়েছিলেন গুইতিরেস। প্রথম জীবনে তিনি আইসক্রিম ও খবরের কাগজ বিক্রি করেছেন। কাজ করেছেন শিক্ষক, কৃষি-শ্রমিক, রেডিওর কথিকা পাঠক ও সৈনিক হিসেবে। সাংবাদিকতা করেছেন দীর্ঘদিন।
গুইতিরেসের জন্ম ১৯৫০ সালে মাতানজাসে। এখন থাকেন হাভানায়। ওখানে বসেই লেখালেখি করেন।
তাঁকে ‘ডার্টি রিয়েলিজমের’ লাতিন আমেরিকান গুরু বলে অভিহিত করা হয়।


Leave feedback about this