অনিলার কথা মনে আছে?
কোন অনিলা?
ওই যে গল্পগুচ্ছের ‘পয়লা নম্বর’ গল্পটা। পড়া হয়নি বুঝি?
ও হ্যাঁ, পড়েছিলামতো। তা কী হয়েছিল অনিলার?
অনিলা কেন হারিয়ে গেল বলতে পার?
আর কী করার ছিল তার?
কেন, সিতাংশুর বাঁধনে বাঁধা পড়তে পারত।
তাহলে তুমি অনিলাকে নিয়ে এভাবে ভাবতে? কই বিনোদিনীকে নিয়ে তো এভাবে ভাবছ না? সে তার প্রার্থিত পুরুষের কাছে উপযাচক হয়ে নিজেকে সমর্পন করতে চেয়েছিল বলে?
সিতাংশু ভলোবসেছিল অনিলাকে।
ওই কথাটা খেয়াল করেছ, ‘সংসারে যে মেয়েকে বেদনার নিত্য পৃথিবী বহন করতে হয়, তার সে পৃথিবী মুহূর্তে মুহূর্তে নূতন নূতন আঘাতে তৈরি হয়ে উঠছে। সেই চলতি ব্যথার ভার বুকে নিয়ে যাকে ঘরকন্নার খুঁটিনাটির মধ্য দিয়ে প্রতিদিন চলতে হয়, তার অন্তরের কথা অন্তর্যামী ছাড়া কে সম্পূর্ণ বুঝবে!’
সিতাংশু কিন্তু বুঝেছিল। অনিলাকে তার ব্যর্থ জীবন থেকে উদ্ধার করে সিতাংশু তার পুরুষ জীবন সার্থক করতে চেয়েছিল।
দ্যাখো, অনিলা তার সব গয়না রেখে গেলেও হাতের শাঁখা-নোয়া কিন্তু খুলে রেখে যায়নি। তোমরা নারীরা চারদেয়ালের ভেতর একটা নিরাপদ স্বস্তিময় জীবন চাও। একই সাথে একজন পুরুষের সারা জীবনের আরাধ্য হয়েও থাকতে চাও। বুঝতে চাও না যে, এই দু’টো বিষয় একইসাথে সাধারণের মাঝে থাকে না। সংসারের নিত্য উদ্বেগ-অপমান, অন্তর্গূঢ় ব্যকুলতায় অনিলার অন্তর্বেদীতে যে বৃহৎ প্রেমের শিখা জ্বলে উঠেছিল তার কাছে এই নর-নারীর প্রেম নিতান্তই তুচ্ছ। নয় কি?
আছে কেউ? ছিল কখনো? সামিয়া মনে করার চেষ্টা করে। একটা মুখ, যাকে আনমনে ভেবে একটা নির্জন প্রহর পার করে দেওয়া যায়। একটা নিঃসঙ্গ বেলা যার ছায়ায় অনায়াসে ডুবে থাকা যায়।
এ কথার প্রতিউত্তর খুঁজে পায় না সামিয়া। আয়নার ভেতরে নিজেকে দ্যাখে মনোযোগ দিয়ে। বেশ শীর্ণ দেখাচ্ছে আয়নার ভেতরের নারীটিকে। ইদানীং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারে না সামিয়া। সারাদিন অফিস-সংসারধর্মে ব্যস্ত সামিয়া যা বলে, যা করে, সেই মানুষটি, আর একান্তে আয়নার সামনে দাঁড়ানো এই মানুষটি যেন এক নয়। তারা সম্পূর্ণ আলাদা। সত্তায়, রুচিতে, জীবনবোধে, আকাঙ্ক্ষায়। একবার মনে হয়, এই সংসার, নিত্যযাপিত জীবন, পুরোটাই একটা মিথ্যে নাটক। শুধুই নিরাপদ একটা ঠিকানার জন্য জীবনভর একটা চরিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছে সে। আর সবার আড়ালে ইদানীং যে সামিয়াটা বেরিয়ে আসে সেই আসল। যে এতদিনের লালিত সব সংস্কারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সংসার থেকে পালাতে চায়। কোন সামিয়াটা যে আসল এটা নিয়ে সত্যিই মাঝে মাঝে বিভ্রান্তিতে পড়ে যায় সে।
আয়নায় ডুব দিয়ে কী খুঁজছ? অনিলাকে?
নাহ। তার মতো একা হারিয়ে যাওয়ার সাহস নেই। আর কে বলো বৃথাই বইবে মোর অবেলার এই জীর্ণ তরী।
কেউ নেই?
আছে কেউ? ছিল কখনো? সামিয়া মনে করার চেষ্টা করে। একটা মুখ, যাকে আনমনে ভেবে একটা নির্জন প্রহর পার করে দেওয়া যায়। একটা নিঃসঙ্গ বেলা যার ছায়ায় অনায়াসে ডুবে থাকা যায়। মনের পর্দাটা হাতড়ায় সামিয়া। একটা আবছা ছায়া হেঁটে বেড়ায় সেখানে। এই ছায়াকে সঙ্গী করেই, তার সাথে কথা কয়েই তার কৈশোর, তারুণ্য, যৌবনের দিনগুলো কেটে গেল। এত এত মানুষের ভিড়ে সেই ছায়াটা কায়া পেল কই!
তোমাকে বেশ লাগছে শাড়িটাতে।
সামিয়া আয়নায় ভেতরে দাঁড়ানো নারীটির ওপর দৃষ্টি স্থির করে। তার পরনে মেরুন পাড়ের পীতরঙা তাঁত। বছর দু’য়েক আগে হস্তশিল্প মেলা থেকে সাড়ে ছ’ শ টাকায় কেনা হয়েছিল শাড়িটা। কেনার পরপর পরা হয়েছিল একদিন। অফিসে বের হওয়ার পথে সায়েম বলল, ‘কী সব সস্তার হাবিজাবি পরে অফিসে যাও! মানুষের ইমেজের সঙ্গে পোশাকের একটা প্রত্যক্ষ সংযোগ আছে। বোঝ তো? ‘
এই সহজ ব্যাপারটা সামিয়া বোঝে। কিন্তু তার সাথে দামের কী সম্পর্ক, বোঝে না। আসলে সায়েমের অল্প দামের জিনিস পছন্দ নয়। শাড়িটা খুব পছন্দের হলেও সেদিনের পর শাড়িটা আর পরা হয়নি। আলমারিতে অন্যসব শাড়ির তলে চাপা পড়ায় শাড়িটার কথা ভুলে গেছিল সামিয়া। আজ আলমারি গোছাতে গিয়ে চোখে পড়ল।
পাতলা হয়ে আসা লম্বা চুলগুলো চিরুনি দিয়ে পিঠে ফেলে আই পেনসিলটা তুলে নেয় সামিয়া। চোখে কাজল পরতে পরতে গুনগুন সুর ভাঁজে – আমার ভাঙা পথের রাঙা ধুলায় পড়েছে কার পায়ের চিহ্ন…
তোমার মন আজ বেশ ফুরফুরে দেখছি!
হ্যাঁ। সাজগোজ করলে মেয়েদের মন ভাল হয়।
আয়নার ভেতর থেকে গভীর দু’টো চোখ চেয়ে থাকে সামিয়ার চোখে। অন্তর্ভেদী চোখ দু’টো যেন তার সব বাহ্যিক আবরণ ভেদ করে মনের ভেতরটা অনায়াসে পড়ে ফেলে। শান্ত দিঘীর জলের ওপর পড়া সূর্যরশ্মির মতো মুগ্ধতার আলো খেলা করে সে চোখে । যদিও সামিয়া জানে, মুগ্ধ হওয়ার মতো সুন্দরী সে নয়। আর চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুরুষদের এ ধরনের ফাঁপা প্রশংসায় সামিয়া খুব স্বস্তিবোধও করে না। তবুও সামান্য প্রশংসাটুকু আজ তার ভালো লাগে। আয়নার ওপারে দাঁড়ানো সাধারণ সুতির শাড়ি পরিহিত নারীটি তার চোখে অপার সৌন্দর্য নিয়ে ধরা দেয়। নিজের এই সৌন্দর্য কবে, কার চোখের আয়নায় দেখেছিল সামিয়া? ছায়া ছায়া একটি মুখ স্মিত হেসে ওঠে আয়নার ওপাড়ে।
সামিয়া বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। প্রায় ফাঁকা রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে উদাস চোখে। নির্জন নিঝুম পড়ন্ত দুপুর। চনমনে রোদে পিচঢালা রাস্তাটা কেঁপে কেঁপে ওঠে। স্বচ্ছ নীল আকাশ সূর্যের আলোয় আবরণহীন, ঝকঝকে সুন্দর। দৃষ্টি ধরে রাখা যায় না। চোখ নামিয়ে নেয় সামিয়া। কালো মেঘে ভরা বর্ষার আকাশ তাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। অবসর মিললে আকাশ দেখার নেশা পেয়ে বসে তাকে। সারাদিন ধরে দেখার পরও মনে হয় কী যেন দেখা হল না। সেই চোখ দুটোর মতো। ছায়া ছায়া, মায়া মায়া।
হঠাৎ কলবেল বেজে ওঠে। চমকে যায় সামিয়া। এই অসময়ে কে এল? এমন সময়ে সাধারণত তারা দুজনেই অফিসে থাকে। তাই সচরাচর এ সময় বাসায় কেউ আসে না। অলস পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় সামিয়া। পিপহোলে চোখ রাখে। সায়েম!
দরজা খোলে, কী ব্যাপার? এ সময়ে অফিস ফেলে তুমি?
সামিয়াকে আপাদমস্তক দেখে একটু অবাক হয় সায়েম, অফিসের কাজে কোর্টে এসেছিলাম। আগেভাগে কাজ শেষ হয়ে গেল। অফিসে ফেরত না গিয়ে বাসায় চলে এলাম। সকালে তোমাকে দেখে অসুস্থ মনে হলো। এখন দেখছি, বেশ শাড়িটাড়ি পরে বসে আছ? কোথাও গিয়েছিলে?
না। এমনি। অনেকদিন শাড়ি পরা হয় না। হঠাৎ ইচ্ছে হল।
সায়েম বিছানায় বসে মোজা খুলতে খুলতে বলে, শরীর খারাপ বলে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সেজেগুজে ঘরে বসে আছ! বেশ ইন্ট্রারেস্টিং।
সায়েমের কৌতুকে অসহায় বোধ করে সামিয়া। অনেকদিন ধরেই সে অসুস্থ বলা চলে। বুকের ভেতর বিরামহীন প্যালপিটিসন। অনিদ্রা। খাওয়া-দাওয়ায় অরুচি। শরীর ভেঙে পড়ছে দিনকে দিন। মেডিসিনের ডাক্তার দেখানো হলো। তিনি কিছু ভিটামিন আর গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ প্রেসক্রাইব করলেন। প্রতিদিন কিছু সময় খোলা আলো-বাতাস আর রোদে কাটাতে অ্যাডভাইস দিলেন। এসব নিয়েই নটা-ছটা অফিস করে অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকল। প্রতিদিন সকালে উঠে তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে অফিসে দৌড়ানো। আবার সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে খেয়েদেয়ে ঘুমানো। বাইরের রোদ-বৃষ্টি আলো-বাতাসের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। সামিয়ার মনে হচ্ছিল, ক্লান্তিকর একটা চক্রে বিরামহীন দৌড়ে বেড়াচ্ছে সে। কোনো কাজে মনোযোগ স্থির রাখতে পারছিল না। একজন সাইকোলোজিস্ট দেখানো হলো। হিস্ট্রি শুনে তিনি দুবেলা ট্রাঙ্কুলাইজার ও অ্যান্টিডিপ্রেশনের ওষুধ লিখলেন। সেই সাথে যথাসম্ভব মানসিক চাপমুক্ত থাকতে বললেন। তার পরামর্শেই অফিস থেকে দু-সপ্তাহের ছুটি চলছে সামিয়ার।
শহরটা ছোট। যে কোনো দিকে কিছুদূর এগুলেই ছোট ছোট নদী পার হয়ে ছায়া ছায়া কত পথ চলে গেছে। একদিন বেরিয়ে পড়লেই হয়। হয়ে ওঠে না।
সায়েম শার্ট খুলে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখে বলে, ফ্যানটা বাড়িয়ে দিও তো।
ফ্যান বাড়িয়ে দিয়ে ঠান্ডা একগ্লাস পানি নিয়ে আসে সামিয়া। গ্লাসটা বেডসাইড টেবিলের ওপর ঢাকা দিয়ে রেখে খাটের কোণে বসে আলগোছে। ছুটির দিন ছাড়া তারা দুজনই অফিসে লাঞ্চ করে। তাই সায়েমের দুপুরের খাবার নিয়ে ভাবনা নেই। এখন বিকেল প্রায় পাঁচটা। সামিয়া বলে, অফিস থেকে লাঞ্চ করে বেরিয়েছিলে?
হ্যাঁ। তুমি?
এখনো হয়নি। রান্না করতে ইচ্ছে হলো না।
কিছু নেই ফ্রিজে? খেয়ে নাও।
সামিয়া বসে থাকে। শাড়ির কুচির ভাঁজ মেলায় অনর্থক। তার ইচ্ছে করে সায়েম তাকে বলুক, ‘চলো, বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে নিই। তারপর কোথাও ঘুরে আসি।’ কিন্তু সায়েম তার মোবাইল ফোনে দেশের সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
সামিয়া বলে, ঘরে দমবন্ধ হয়ে আসছে। কাছাকাছি কোথাও ঘুরে আসি চল।
গরমে ঘেমে নেয়ে এলাম। একটিু জিরিয়ে নিই। রোদটা পড়ুক। তারপর দেখা যাবে।
সামিয়া জানালার ওপাড়ে চোখ রাখে। রোদ ঝকঝকে আকাশে কালো মেঘের ছায়া পড়েছে। এক্ষুণি নেমে পড়বে হয়ত। আবার নাও পারে। কালো মেঘগুলো দূরের কোনো আকাশে ভেসে যেতে পারে। কিছুই বলা যায় না। এই মৌসুমে আকাশের মন বোঝা ভার।
সামিয়া আলতো পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। গ্রিলের বাইরে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির জল স্পর্শ করে সামিয়া। তার হাতের তালুতে ক’ফোঁটা জল জমা হয়। ভেজা হাত দুটো দু-গালে আলতো চেপে ধরে। খুব ইচ্ছে করে বাইরে গিয়ে ভিজতে। ইচ্ছে করে, কোনো নিরিবিলি ছায়াঘেরা পথে রিক্সার হুড ফেলে ঘুরে আসতে। বুক ভরে বাতাস নিয়ে দমবন্ধ ভাবটা ঝেড়ে ফেলতে। এসব তুচ্ছ ইচ্ছে পূরণ করতে বেশি কিছু করতে হয় না। শহরটা ছোট। যে কোনো দিকে কিছুদূর এগুলেই ছোট ছোট নদী পার হয়ে ছায়া ছায়া কত পথ চলে গেছে। একদিন বেরিয়ে পড়লেই হয়। হয়ে ওঠে না।
আরেকটা আষাঢ়-শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্র চলে যাচ্ছে। এ সময়ে আকাশের মতো সামিয়ার মনটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। মনে হয়, কাছেই ভরা নদী ফেলে খটখটে একটা মরুভূমির মধ্যে বসে আছে সে। মনে হয়, এই সাজানো ঘরদোর, এই আসবাবপত্রের মতোই প্রাণহীন বেঁচে থাকা। দীর্ঘশ্বাস জমে জমে ভার হয়ে থাকে বুকের ভেতর। অসুখটা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কাউকে বোঝানো যায় না এই হাহাকার।
গ্লাসটা টেনে দেবে? বৃষ্টির ছাঁটে বিছানা ভিজে যাচ্ছে।
সায়েমের কথায় সামিয়া বারান্দা থেকে ঘরে আসে। দরোজার গ্লাস টেনে দেয়। খোলা হাওয়া বাঁধা পেয়ে কাঁচের গায়ে আছড়ে পড়ে। অদ্ভুত এক ছন্দে গোঙাতে শুরু করে। বিষণ্ণ এক সুরের লয় ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরজুড়ে। সামিয়ার কানে কানে কে যেন আওড়ে যায়, উতল হাওয়া ডানা ঝাপটায়, বন্ধ দুয়ারের গায়।
চা-টা কিছু হবে, সামি?
চায়ের পাতা শেষ। কফি হবে।
ফোনে একবার বললেইতো নিয়ে আসতাম।
খেয়াল ছিল না।
সামিয়া বরাবরই বেখেয়ালি। ইদানীং তার মাত্রাটা আরও বেড়েছে। সায়েম জানে সে খবর।
সারাদিন পরে রান্নাঘরে ঢোকে সামিয়া। চুলায় পানি বসিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আগুনের আঁচ এসে লাগে গায়ে। বুকের ভেতরে জমে থাকা মেঘ দুফোঁটা জল হয়ে নেমে আসে নিঃশব্দে। কেন? কার জন্য? কে জানে! রান্নাঘর লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে বসে। আরেকটা দিন খসে পড়ছে পৃথিবীর আয়ুষ্কাল থেকে। তার বিদায়ে রক্তিম হয়ে উঠেছে আকাশ। আঁধারের পাতলা চাদরে ঢাকা পড়ে যায় কর্মব্যস্ত দিনের বাস্তবতা। পৃথিবী কেমন মায়াময় হয়ে ওঠে। এই আলো আঁধারীতে মনে হয়, সারাদিনের সব হিসেবনিকেষ অর্থহীন। সামিয়ার ইচ্ছে করে, নরম কোমল আঁধারের চাদর গায়ে জড়িয়ে হেঁটে যায় অনেক দূর। ইচ্ছে করে, কেউ এসে তার হাতটা ধরুক এ সময়। হঠাৎ পাশে বসা ছায়াটা ফিসফিস করে বলে ওঠে,
জানি না তো কোন্ কালো এই ছায়া,
আপন ব’লে ভুলায় যখন ঘনায় বিষম মায়া।
স্বপ্নভারে জমল বোঝা, চিরজীবন শূন্য খোঁজা,
যে মোর আলো লুকিয়ে আছে রাতের পারে
তোমার মাঝে আমার আপনারে দেখতে দাও…
দেখতে দেখতে দু’সপ্তাহের ছুটি ফুরিয়ে এল। এ কদিন ঘরে বসে থেকে সামিয়া টের পেল, সে আসলে একা। একদম একা। সায়েম ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পার হয়ে যায়। ঘরে ফেরার পর সেই একই কথা। একই ভূমিকায় পুনরাবৃত্তি। সামিয়ার একাকিত্বের ভার আরও প্রকট হয়ে ওঠে তখন। ঘড়ির টিকটিক শব্দও মাথায় এসে বাজে।
ইদানীং একা থাকলে যতখানি একাকিত্ব ঘিরে ধরে, মানুষের কোলাহলের মাঝে আরও বেশি। গত সপ্তাহান্তে এক বন্ধুর অ্যানিভার্সারির নিমন্ত্রণে গিয়েছিল সামিয়া। ভেবেছিল, বন্ধুদের সাথে সময় কাটালে মনটা উৎফুল্ল হবে। ভালো লাগবে। কিন্তু যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় ফেরার জন্য তার ভেতর সে কী তাড়া। শূন্য ঘরে কার কাছে ফেরার ব্যাকুলতায় সামিয়া অস্থির হয়ে ওঠে, কে জানে! সেখানে নৈঃশব্দ্যের এক অনন্ত ভুবন অপেক্ষা করে থাকে তার জন্যে।
ইদানীং ওষুধের প্রভাবে সকালে ওঠা হয় না। সেদিন বেশ কদিন পর ফজরের নামাজ পড়ে ছাদে গিয়েছিল সামিয়া। তার প্রিয় জুঁইফুলের গাছটি শুকিয়ে টলে গেছে। ফুলগুলো ঝরে পড়েছে, তারই মতো। গাছে পানি দিয়ে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়াতেই মনে হলো, দেখতে দেখতে জীবনটা ফুরিয়ে যাচ্ছে। হুট করেই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল সামিয়া।
সকালেই বাসের টিকেট কনফার্ম করে ফেলল। সায়েমকে জানালে কিছুতেই সম্ভব না। তাই তাকে কিছু না জানিয়েই সন্ধ্যার বাসে উঠে বসল। রাত নটার দিকে ফোন এল সায়েমের, কী ব্যাপার? কোথায়?
বাসে।
সায়েমের বিস্মিত কণ্ঠ, বাসে? কোথায় যাচ্ছ?
ঘরে আর ভালো লাগছিল না। কক্সবাজার যাচ্ছি।
কই কিছুতো বলনি। কার সাথে?
কে আর? নিজের সাথেই।
মুহূর্তকাল শব্দহীন থেকে ফোনটা কেটে যায়। সায়েম এমনই। শান্তিপ্রিয় শান্ত স্থির মানুষ। সামিয়ার এই আকুলতা সায়েমের কাছে নিতান্তই অহেতুক মনে হয়। সে কিছুতেই সায়েমকে বোঝাতে পারে না তার ভেতরের এই ব্যাকুলতা। শূন্যতা।
না কি সামিয়াই বুঝতে পারে না সায়েমকে? তার কঠিন খোলস ভেঙে পৌঁছতে পারে না তার হৃদয়ের দ্বারে? সামিয়ার জন্য সে দ্বার কি কখনো খুলে দিয়েছিল সায়েম?
একা একা বেশ লাগছিল, মুক্ত পাখির মতো। যদিও দেশের পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। কোথাও নিরাপত্তা নেই। স্বস্তি নেই। সবকিছুর মাঝেই অদৃশ্য এক কাঁটা ফুটে থাকে। তাকে ভুলে থাকার বৃথা চেষ্টা করে সে।
এই প্রথম সমুদ্রের সামনে একা সামিয়া। সন্ধ্যায় আনমনে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখছিল তন্ময় হয়ে। সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে তার গর্জন শুনছিল। এ যেন নিজের ভেতর নিজেকে জোর করে বেঁধে রাখার এক বিষম ভীষণ যন্ত্রণার আর্তনাদ। তার সাথে মিশে যায় সামিয়ার গুমড়ে ওঠা কান্না। এই বিশালতার সামনে একলা বসে ক্ষুদ্র তুচ্ছ মনে হয় নিজেকে!
ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে ভিজিয়ে দেয় সামিয়াকে। উঠে দাঁড়ায় সে। পিছিয়ে না গিয়ে ঘোরগ্রস্তের মতো হাঁটতে থাকে সামনে। মনে হয়, এ বুঝি হারিয়ে যাওয়ার সব থেকে সহজ সুন্দর পথ। অনেকদিন ধরে এই সময়ের অপেক্ষায় ছিল সামিয়া। এই প্রাণময় বিশালতার বুকে যে মৃত্যু, তা প্রাণহীন জীবনের থেকেও সুন্দর। বিশাল এক ফেনিল ঢেউ এসে বুকে তুলে নেয় তাকে। সমুদ্রের বুকে নিজেকে সমর্পন করে সামিয়া।
ঠিক তখন, তার পাশে পাশে থাকা অদৃশ্য ছায়াটা হাত বাড়িয়ে দেয়। তার হাত ধরে সামিয়া। ফিরে আসে জীবনের বেলাভূমিতে। ক্লান্ত হয়ে বসে থাকে বেশ রাত অবধি।
তারপর দুটো দিন বেশ কেটে যায়। খোলা আকাশের নীচে বসে থেকে। রোদে পুড়ে। এলোমেলো ঘুরেফিরে। বিশাল সমুদ্রের সামনে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সামিয়ার মনের তন্ত্রীতে রবিঠাকুরের ওই কবিতাটা বেজে উঠছিল ক্ষণে ক্ষণে :
তবু ভেবে দেখতে গেলে
এমনি কিসের টানাটানি
তেমন করে হাত বাড়ালে,
সুখ পাওয়া যায় অনেকখানি।
দুদিন পর সায়েমের সাথে কথা হলো। এর মাঝে সায়েম আর ফোন করেনি। রাতের গাড়িতে ফিরবে, জানাতে সামিয়া নিজে থেকেই ফোন করল।
সায়েম বলল, এত তাড়াতাড়ি রাকিব তোমার কঠিন অসুখ সারিয়ে দিল? তোমার কী ধারণা আমার কোনো অনুভূতি নেই? কিছু বুঝি না? অনেকদিন ধরে খেয়াল করছি। সংসারে মন নেই তোমার। কিছু বলিনি। কারণ আমি অমন লো স্ট্যান্ডার্ডের মানুষ নই যে কাউকে জোর করে আটকাব। মনে রেখ, পথেঘাটে যে সুখ খুঁজে বেড়ায়, ঘরের সুখ তার কাছে সারাজীবন অধরা থেকে যায়।
বরাবর, সায়েমের পছন্দের বৃত্তের মধ্যেই চলার চেষ্টা করেছে সামিয়া। সেই বৃত্তের বাইরে একবার উঁকি দেওয়াতেই সায়েমের পলকা খোলস ভেঙে পড়ল কী অবলীলায়।
সায়েমের বরফ শীতল নগ্ন কথায় সামিয়া স্তব্ধ। একটা শব্দও বের হয় না তার জমে যাওয়া ঠোঁটের ফাঁক গলে। সে পথেঘাটে সুখ খুঁজে বেড়ায়! না কি নিজেকে খোঁজে? এই জৈবিক জীবনের অর্থ খুঁজে মরে! ঘরে-বাইরে। সময় সময় খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া এই জীবনের মহিমা খুঁজে ফেরে?
সায়েমের কথায় চমকে ওঠে সামিয়া। সত্যিই একই ঘরের ভেতর, একই বিছানায় থেকেও তারা কেউ কাউকে চিনতে পারেনি। ছুঁতে পারেনি এতগুলো বছরেও। দিনের পর দিন এই জৈবিক জীবনের ভার সামিয়াকে তিলে তিলে ডুবিয়ে দিয়েছে অস্থিরতার অন্ধকারে।
হ্যাঁ, রাকিবও কক্সবাজার এসেছে গতকাল। একই হোটেলে উঠেছে সে-ও। এর আগে অফিসের সেমিনারে এসে এখানেই থাকার ব্যবস্থা ছিল তাদের। গতরাতে হঠাৎই হোটেলের লবিতে রাকিবের সঙ্গে দেখা। সঙ্গে অফিসে নতুন জয়েন করা মেয়েটি। অফিসে কিছুদিন ধরেই ফিসফাস চলছিল রাকিব আর তৃষাকে নিয়ে। শুক্রবার নাকি অনেকটা হুট করেই রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে তাদের। নিরিবিলি সময় কাটাতে শনিবার রাতের ফ্লাইটে এখানে এসেছে তারা।
সামিয়া বয়সে রাকিবের চার-পাঁচ বছরের সিনিয়র। সহকর্মী হিসেবে ছেলেটি বেশ। পজিটিভ, হেল্পফুল। সামিয়ার বাসায়ও এসেছে কয়েকবার। চা খেয়েছে, আড্ডা দিয়েছে সায়েমের সঙ্গে। একদিন রাতের খাবারও খেয়েছে তাদের সঙ্গে। রাকিব বেশ পছন্দ করে সায়েমকে। এসব নিয়ে সায়েমের কোনো আপত্তিকর আচরণ কখনো চোখে পড়েনি সামিয়ার।
বিয়ের পর থেকে সায়েমকে খোলামেলা মনের মানুষই মনে হয়েছে। বরাবর, সায়েমের পছন্দের বৃত্তের মধ্যেই চলার চেষ্টা করেছে সামিয়া। সেই বৃত্তের বাইরে একবার উঁকি দেওয়াতেই সায়েমের পলকা খোলস ভেঙে পড়ল কী অবলীলায়। বিশ্বাস করতে পারছিল না সামিয়া।
রাতের হাইওয়েতে গাড়ি ছুটে চলেছে ঊর্ধ্বশ্বাসে। জানালা দিয়ে আসা হু হু বাতাস সামিয়ার ভেতরটা এলামেলো করে দিয়ে যায়। বিধাতা মানবশরীরে যে হৃদয় দেন, সে হৃদয়ে ভরা প্রেমও তো দেন। সেই কিশোরবেলা থেকে এই শরীরের সাথে সে হৃদয়টা অতি যত্নে তুলে রেখেছিল। সমর্পনের অপেক্ষায়। সায়েম সে হৃদয়ে কান পাতেনি কখনো। সামিয়ার হৃদয়ের এতকালের সঞ্চয় জমতে জমতে আজ উছলে পড়ে। সে ব্যথার ভারে গুমড়ে মরে প্রতিদিন।
ফোন বেজে চলেছে। সায়েমের ছবি ভাসছে স্ক্রিনে। ফোন সাইলেন্ট করে বাইরের অন্ধকারে চোখ রাখে সামিয়া। রাস্তার ওপাশে আঁধার, প্রান্তর ছুটে যাচ্ছে পেছনে। জীবনটা যদি এমন পিছিয়ে নেয়া যেত! কী করত সামিয়া? অন্যরকম কিছু হতো? না কি একইরকম কোনো চক্রে ঘুরপাক খেত এই মিথ্যে জীবনের চাকা?
এ পথের শেষে কী আছে জানে না সামিয়া। কারো সাথে একলা থাকার চেয়ে জীবনের বাকি পথটুকু সত্যিকারের একলা হাঁটলে মন্দ কি? জীবনভর একটা ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে করতে সে কি নিজের কাছে নিজেই মিথ্যে হয়ে উঠছে না?
নাকি নতুন কোনো জীবনের পথে হাঁটবে সে? সামিয়া জানে না।
সে চায়, এই পথটা খুব দীর্ঘ হোক। যে পথ রাত্রিশেষে তাকে পৌঁছে দেবে প্রকৃত সমর্পণের পথে।
সামিয়া চোখ বুঁজে অনুভব করে তার ভেতরের সেই কায়াহীন ছায়াটিকে।
সে গুনগুন করে গেয়ে ওঠে–চিরসখা হে, ছেড়ো না, ছেড়োনা মোরে…


Leave feedback about this