অনুবাদ কবিতা বিশ্বসাহিত্য

মঈনুস সুলতান অনূদিত তানজানিয়ার কবি ইউফ্রাসে কেঝিলাহাবির কবিতা | তীরন্দাজ অনুবাদ

তানজানিয়ার প্রখ্যাত কবি ইউফ্রাসে কেঝিলাহাবি (১৯৪৪-২০২০)-র অনবদ্য পদাবলী যেমন সমাজবাস্তবতা ও রূপকের সমন্বয়ে সমুজ্জ্বল, তেমনি তিনি উপন্যাস রচনায়ও কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। সোয়াহিলি ভাষার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এই কবি, ফ্রিভার্স বা প্রবাহমান মুক্তক ছন্দ প্রবর্তনের মাধ্যমে আফ্রিকান কাব্যকলায় উত্তর-আধুনিক ভাবনাকেও পরিচিত করে তোলেন। জীবনের অনেকটা সময় কবি কেঝিলাহাবি কাটিয়েছেন ইউনিভারসিটি অব বৎসোয়ানায় অধ্যাপনা করে। বৌদ্ধিক সমাজ তাঁকে বিবেচনা করেন হরেক রকমের তত্ত্ব বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ একজন পণ্ডিত হিসেবে। ভাষান্তরে উপস্থাপিত দুটি কবিতা এবং কবি পরিচিতির উৎস ইন্টারনেট।

ইউফ্রাসে কেঝিলাহাবির দুটি কবিতা

যে ভূখণ্ডে সৃজিত হয়েছিল সভ্যতা
সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত পানীয়জলের কূপটির দরোজা খোলা ছিলো সবার জন্য।
ব্যাঙের ঘ্যাংর ঘ্যাং শব্দ আমাদের টেনে নিয়ে যায় সন্নিকটে,
কোরাসে উত্যক্ত হয়ে ফিরে তাকায় দৈত্যটি
লম্বা লম্বা পা ফেলে ফের দ্রুত এগিয়ে আসছে সে আমাদের দিকে।

তামার একটি ধারালো খঞ্জর বিদ্ধ করে তার নাভিকুণ্ড।
দুহাতে তীর-ধনুক জাপটে ধরে সে কূপের পাশে হাঁটু গেড়ে নতজানু হয়,
তার দিকে ধেয়ে আসা কাউকে প্রতি-আক্রমণের প্রস্তুতি নেয় দৈত্য:
তষ্কর পরিবৃত হয়ে কখনও মৃত্যু হয় না বীরেন্দ্রকেশরীর,
একজন বীর লড়াকুর মৃত্যু হয় আহত সিংহের মতো – মূলত একাকী।

কূপ থেকে জল উত্তলন করার মৌরসি আধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত হই।
মনে হয়, শুকিয়ে গেছে আমাদের কলমের কালি।
এখন থেকে যে-কাগজে কলমটি ঠেসে ধরে চেষ্টা করবে লেখাজোখার
পরিচিত হবে সে প্রতারণার বীরপুঙ্গব হিসেবে।
ভীত-সন্ত্রস্ত্র হয়েও যে প্রতিরোধের প্রেষণায় শক্ত হাতে উঠে দাঁড়াবে,
পাওয়া যাবে না খুঁজে তাকে সমর্থন করার মতো কেউ,
তবে বুদ্ধিবৃত্তি ও অনুধাবনের ভেতরকার বিপরীত দরোজাটি খুলে ধরবে যে:
প্রথম প্রজন্মে সে খুঁজে পাবে পর্যবেক্ষণের বিরল ক্ষমতা।

যে শব্দপুঞ্জ সৃজন করেছি আমি –
চাইলেও তা গিলে লোপাট করে দিতে পারি না:
বলছি সোজাসাপটা – সত্যের অনুসন্ধানী আমি অনুসরণ করি সঠিক পথরেখা।
সবজিখেতের মধ্যিখানে রোপন করা হয়েছে –
এরকম একটি লাউ এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে আমাকে।
লতানো লাউ-ডগাটির মতো আমি ছড়িয়ে পড়েছি মৃত্তিকাময় পরিসরের সর্বত্র
বৃদ্ধিবৃত্তির বৃক্ষটি পেঁচিয়ে ধরে উঠে যাওয়ার জন্য বিস্তৃত হই চতুর্দিকে,
সর্পিল সঞ্চারণে আমি মাড়িয়ে যাই আগাছার অনভিপ্রেত জঞ্জাল।

না, সমৃদ্ধ কোন ঐতিহ্য নেই আমার
তথাপি নিঃশঙ্ক চিত্তে রুখে দাঁড়াই,
নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে ছড়াই আমি প্রতিরোধের কর্মসূচি।
আমারও আসবে একদিন সুসময় – যখন আমি ভরে উঠবো ফুলে-ফলে
লতানো পত্রালির ফাঁকে দৃশ্যমান হবে ছোট বড় ভালোমন্দ – সব রকমের ফল।

এমন সময়ও আসবে –
ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টারা নিড়ানি দিয়ে আঁচড়ে উপরে ফেলবে আমাকে সমূলে,
না, আমার আশেপাশে জন্মানো সবজি পড়শিরা রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে না।
নির্দিষ্ট সময়ে লাউয়ের লতানো গাছটি কেটে-ছেঁটে উপড়ানো হবে
আমার ফসল – নিটোল কিছু লাউ – এমন কী আধ-পঁচা দাগ-ধরা
লাউগুলো ধুয়ে পাকলে চড়ানো হবে হান্ডিতে ।

রান্নার অযোগ্য লাউগুলো নিয়ে খেলবে শিশুরা
তারা যখন সজোরে ছুঁড়ে ফেলবে আমাকে বিশুষ্ক খটখটে মৃত্তিকায়
ফেটে যাব আমি –
তারপরও আমার অভ্যন্তরে প্রোথিত বীজের ভেতর আমি বেঁচেবর্তে থাকবো
নওল জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে।
আমি যে বিপদজ্জনক কেউ নই – এ বিষয়ে আমি সচেতন
শহর কিংবা গ্রামে সঠিক পাঠক ধুয়ে-পাকলে আমাকে ফের করে তুলবে পরিচ্ছন্ন।

এমন একটা সময়ও আসবে যখন সরিয়ে রাখা হবে আমাকে একপাশে
বিকল্প হিসাবে ব্যবহৃত হবে সোনার পানপাত্র,
যখন আমাকে ক্রোধে ছুঁড়ে ফেলা হবে –
সময়ের পশ্চাৎদেশে – অন্ধকার এক কোণে;
বিস্মৃত হবে তারা যে –
এক যুগে তাদের পূর্বপুরুষরা ব্যবহার করতো লাউ বাদ্যযন্ত্র হিসেবে,
তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি মৌলিক উপাদানকে
তারা অসাবধানতায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
বিষয়টা যেন স্মরণে থাকে – থাকে স্মরণে।

[সোয়াহিলি ভাষা থেকে কবিতা দুটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন কাতরিনা রেনে]

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field