অনুবাদ কবিতা বিশ্বসাহিত্য

রথো রাফি অনূদিত মুহাম্মদ আল-মাঘৌতের কবিতাগুচ্ছ | তীরন্দাজ অনুবাদ

মুহাম্মদ আল-মাঘৌত সিরিয়ার হামা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। যৌবনে তিনি সিরীয় সোশ্যাল ন্যাশনালিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে শীর্ষস্থানীয় এক জেনারেলের হত্যাকাণ্ডের পর দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তিনিও কারারুদ্ধ হন। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে আল-মাঘৌত লেবাননে পালিয়ে যান। সেখানে তিনি সিরিয়ার কবি অ্যাডোনিসের ‘শি’ দলে যোগ দেন। একজন প্রথাবিরোধী কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করা আল-মাঘৌত ১৯৫৯ সালে তাঁর প্রথম কাব্যসংগ্রহ ‘চাঁদের আলোয় দুঃখ’ শিরোনামের বইটি শি’র জার্নাল প্রেস থেকে প্রকাশ করেন। এরপর থেকে তিনি আরবি গদ্য কবিতার জনক হিসেবে পরিচিতি পান। আল মাঘৌতের মাধ্যমে আরবি কবিতাকে প্রচলিত রূপ থেকে মুক্ত করেন তিনি এবং কবিতার কাঠামোতে বিপ্লব ঘটান।

তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্যে রয়েছে ছয়টি কবিতার সংগ্রহ, গদ্য, নাটক এবং চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। এর প্রতিটিতেই তিনি তাঁর নিজস্ব শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে নৃশংস স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থেকে মর্যাদা ও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখার অনিশ্চয়তাকে তুলে ধরেন। ১৯৫০-এর দশকে কারাগারে থাকাকালে, আল মাঘৌত তার কারাবাসের অভিজ্ঞতার ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা হিসেবে সিগারেটের কাগজে তাঁর প্রথম কবিতাগুলো লেখেন, যা পরে বিপ্লবী কবিতা হিসেবে আবিষ্কৃত হয়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তার ভবিষ্যতের কাজগুলো প্রখর কল্পনা, শব্দের ওপর সহজাত দক্ষতা এবং স্বজ্ঞাকে কাজে লাগিয়েছে।

আল মাঘৌতের কাজে ব্যঙ্গের সঙ্গে সামাজিক দুর্দশা ও অসুস্থতার বর্ণনা এবং এই অঞ্চলের শাসকদের মধ্যে নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে ওঠে। তার রচনা অবিচার এবং স্বৈরাচারী সরকারের সমস্যা নিয়ে লেখা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম তার সমস্ত কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। তার প্রথম নাট্য-প্রযোজনা – ‘দ্য হাঞ্চব্যাক বার্ড’ মূলত একটি দীর্ঘ কবিতা যা তিনি ছোট, নিচু ছাদের ঘরে লুকিয়ে থাকার সময় লিখেছিলেন। এরপর আসে আরেকটি নাটক – ‘দ্য ক্লাউন, যে নাটকে অভিনয় করেন লেবাননের প্রখ্যাত অভিনেতা আন্তোইন কেরবাজ। আল-মাঘৌত সিরীয় অভিনেতা দুরেইদ লাহাম এবং নিহাদ কালির সঙ্গে মিলে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং প্রশংসিত কিছু নাট্যকর্ম নির্মাণ করেন, যেমন কাসাক ইয়া ওয়াতান (স্বদেশের প্রতি টোস্ট), ঘোরবেহ (বিচ্ছিন্নতা), এবং দায়াত তিশরিন (অক্টোবরের গ্রাম)। আল-মাঘৌত তাঁর ‘আমি আমার স্বদেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব’ বইটির জন্যও পরিচিত, যা স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে লেখা কলাম-গদ্যের একটি সংকলন আল-মাঘৌত ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০০৬ সালের এপ্রিলে ৭২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

শব্দরা যখন পুড়ছে

কবিতা, এই অমর কঙ্কাল, আমাকে ক্লান্ত করে।
জ্বলছে লেবানন – আহত ঘোড়ার মতো লাফায় মরুপ্রান্তে
আর আমি এক মুটকি মেয়ের সন্ধান করে বেড়াই
ভ্যানের উপর তার সঙ্গে শরীর ঘষাঘষি করতে,
বেদুইন চেহারার মানুষটাকে আমি মুছে ফেলতে চাই।
অচল হয়ে পড়ার মুখে আমার দেশ
এক নগ্ন সিংহীর মতো কাঁপছে
আর আমি খুঁজে বেড়াই ওই সবুজ দুটি চোখ
আর সাগর পাড়ের সেই ক্যাফেটিরিয়াটি
প্রতারণা করতে খুঁজে বেড়াই সেই বেপরোয়া মেয়েটিকে।
কোনো অচেনা মেয়ে, কোনো মূক মাতৃভূমি
যে কি না সবার সঙ্গেই খায়-শোয়
তার জন্য আমি যখন কবিতা গেয়ে চলি
মনে হয় কবিতার ঈশ্বরী সেসময়
ছুরির মতো আমার হৃদয় বিদ্ধ করে চলে।
আমার ওষ্ঠ থেকে যতক্ষণ রক্ত ফিনিক দেয় আমি হাসতে পারি।
আমি সেই বিষপুষ্প,
সেই নিঠুর ঈগল যে ঝাপিয়ে পড়ে শিকারের ঘাড়ে।
আর আরব ভূখণ্ডতো
আবেগ অনুরাগের বিকশমান পাহাড়
অন্ধ বুলেটের মাঠ – তুমি কি ফিলিস্তিন নিয়ে
রক্তপাত নিয়ে এবং
দেশ দখল নিয়ে কবিতা চাও।
আমি এক অচিন মানুষ, বৃষ্টিতে গড়া যার বুক
আর আমার উদাস চোখে
চার আহত দেশ তাদের নিহতদের খুঁজে বেড়ায়।
আমি নিজের বিছানায় একা আর ক্ষুধার্ত, একটি রেশম কীটের মতো তড়পাচ্ছি,
বিষাদের গান শুনছি,
তখনই প্রথম গুলিটার শব্দ শোনা গেল।
মরুভূমি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে!
এই রক্তিম হাত কার হাত,
আর কে সেতুর নিচে এতো সাবধানে ফুলগুলোর যত্ন নেয়?
এসব কাদের কবর, নক্ষত্রের নিচে এমন আনত হয়ে আছে?
পাতলা ঠোঁটের এক বীরপুরুষ ফিরে এলো গতকাল
এসব কর্কশ বুকের মাঝে,
এই বালির টিলায় যা ডেকে আনে
বাতাস আর যতো ভাঙা কামান
আর এভাবে আমাদের কারাগার কিংবা কবিতা
উপহার দেয় প্রতিটি বছর,
তার দীর্ঘ বর্শা দেখো খোলা ছুরির মতো চকচক করে।
তাকে একটা বুড়ো লোক, না হয় কোনো দেহজীবীকে উপহার দাও;
নক্ষত্র দাও তাকে, আর ইহুদিদের সমস্ত মরুভূমি
যেখানকার পাহাড়ে বসে আমরা কাঁদি
হাই তুলি গোসলখানায়,
যেখান থেকে আমার অবিশ্বাসী চোখ সাগরের দিকে তাকায়।
এখানে
আমার এই কপালের মাঝখানে, যেখানে শত শব্দ মারা যাচ্ছে
বুলেটটাকেই আমি শেষ আমন্ত্রণ জানাই।
ভাই আমার,
আমি তোমার চোহারা ভুলে গেছি।
(ওইসব মাদকতাময় চোখ)
আমার বুকে ভীড় করে চার আহত মহাদেশ।
আমার কাব্যিক দৃষ্টি আর আমার সবুজ চোখ দিয়ে
একদিন বিশ্বজয়ের আশা করতাম আমি।
লেবানন… জলের নীচে এক শুভ্র নারী;
বুক আর নখের পাহাড়।
চীৎকার করো, হে নিস্তব্ধ দেশ!
তোমার হাত উঁচু করো যেনো কাঁধ ফেড়ে যায়
আর অনুসরণ করো, হে ফাঁকা জাহাজ,
ঘণ্টাধ্বনির পেছনে পেছনে ছুটছে মরিয়া বাতাস।
মা আর প্রিয় নারীর মুখ
কবিতা আর ছন্দের শীতল ছাইয়ের ওপর
আমি এবার মধুর ঝর্ণা ছুটাবো,
লিখব গাছ কিংবা জুতা, গোলাপ কিংবা ছেলেদের নিয়ে।
দুঃখকে বিদায় নিতে বলবো
সুন্দর কুজোঁ বালকটিকে বলবো
আমার আঙুল সুইয়ের মতোই দীর্ঘ,
আহত দুই বীরপুরুষ আমার চোখ,
আর এ হলো কবিতার অন্তিম সময়।
লেবানন যেদিন ভেঙে পড়বে আর ফুরিয়ে যাবে কবিতার ধীর বহমান রাত
নিজের কণ্ঠকেই বরং বুলেটবিদ্ধ করবো আমি।

এতিম

আহা! স্বপ্ন! স্বপ্নরে আমার!
সোনায় মোড়া তেজী মালগাড়িটা আমার
ভেঙে পড়েছে
চাকাগুলো ছড়িয়েছিটিয়ে গেছে বেদুইনদের মতো
সবখানে।
একরাতে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম বসন্তের
আর জেগে দেখলাম
আমার বালিশ ঢাকা পড়ে গেছে ফুলে ফুলে।
একদিন আমি সমুদ্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম
আর সকালে দেখলাম
বিছানা ভরে গেছে শামুক-ঝিনুকের খোল আর মাছের পাখনায়।
কিন্তু আমি যখন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখলাম
সকালের আলোর মতো বল্লম আর বর্শা
আমার গলা ঘিরে ধরেছিল।
এখন থেকে তুমি আর আমাকে খুঁজে পাবে না
বন্দর বা ট্রেনের ভিড়ে
তবে পাবে সেইখানে… পাবলিক লাইব্রেরিতে
বিশ্বের মানচিত্রের ওপর ঘুমিয়ে আছি
(ফুটপাতের ওপর এতিমরা যেমন ঘুমিয়ে থাকে)
সেখানে আমার ঠোঁট দুটি স্পর্শ করে আছে একাধিক নদী
আর আমার চোখের পানি বইছে
এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে।

নিন্দা

যোদ্ধা হিসেবে আমার তলোয়ার কেড়ে নিয়েছে তারা
কবি হিসেবে আমার কলম
চিত্রকর হিসেবে কেড়ে নিয়েছে আমার তুলি
আর বেদুইন হিসেবে গিটারখানা
আর কবরে যাওয়ার পথে
যা কিছু আমার ফিরিয়ে দিয়েছে তারা
বলুন তো, একটা বেহালা তুফানকে যা বলতে পারে
তার বেশি কী-বা বলতে পারি আমি

কবি আর বোকা

প্রথমজন তার পদ্যকে তুমুল নাচায়
দ্বিতীয়জন তার বিশ্বকে বাধ্য করে আর্তনাদে
কিন্তু মূর্খতা আর কবিতাতেও আছে প্রজ্ঞা
নাগাল মেলে না যার এই দুনিয়ায়
দুইয়ের অর্থই দৃশ্যত আলাদা
কিন্তু দুজনেরই বসবাস একই আলোয়
কবিতো নির্ভর করে তার স্বরসতির ওপর
আর বোকা তার পাগলা-নীতির পথেই শুধু ছুটে
ধাঁধার জট খুলতে মরিয়া দুজনেই
একজন তার বোকামিতে
তবে অন্যজন তার তর্কময় আপ্তবিশ্বাসে।

পাহাড়

ভাগ্য আমার, আমাকে আর থাবড়িও না,
এরই মধ্যে মুখ ছেয়ে গেছে সজোর থাপ্পড়ের কার্পেটে।
এই এখানে যখন পড়ে আছি আমি
বই, অভিধান ও শুড়িঁখানা থেকে বেরিয়ে বাতাস
ধাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে খোলা রাস্তার ওপর,
ঠিক যেভাবে সেনারা সুড়ঙ্গ থেকে তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসে।
ওরে হারামি শতাব্দী, তুই পোকার মতোই ছোটোলোক,
ঝড় নয়, কেবল পাখার হাওয়ায়,
আগ্নেয়গিরির উদগীরণ নয়, আমারে শুধু দেশলাইয়ের
আগুনে উস্কে দিয়েছিস তুই।
কখনও ক্ষমা করবো না তোরে।
আমার গ্রামে ফিরে যাবো আমি, দরকার হলে পায়ে হেঁটেই যাবো
সেখানে তোকে নিয়ে গুজব রটিয়ে দেবো আমি।
আর যুদ্ধ-ক্লান্ত বীরের মতো
ঘাসের উপর আর নালার পাশে শুয়ে থাকবো আমি।

আগুনের রিং পার হওয়া প্রশিক্ষিত কুকুরের মতো
আমিও পার হবো একের পর এক তোরণ আর দরজা-জানালা,
আর কোনো কুমারীর লজ্জার আকাশে
আর শ্রমিকের দুর্ভোগের জগতে
বাজপাখির মতোই উড়ে বেড়াবে
জামার এইসব হাতা আর কলার,
আর সন্ধ্যায় চুড়ুইপাখির মতোই আমার ডানা দুইটি ছড়িয়ে দেবো
এক কুমারী ভূখণ্ডের খোঁজে, যে-ভুমি কুঁড়ে, বা প্রাসাদ,
আমির বা ফকিরের সামান্যতম স্পর্শ পেলেই
মাটি থেকে বন্য ঘোড়ার মতো লাফিয়ে ওঠে বাতাসে।
সেই ভূখণ্ডের কোনো অস্তিত্বই নেই, আমার নোটবই ছাড়া
অন্য কোথাও আর অস্তিত্ব পাবে না, কখনও না।

ঠিক আছে রে শতাব্দী, তুই আমারে সত্যিই হারিয়ে দিয়েছিস,
কিন্তু আমিওতো গোটা প্রাচ্যের কোথাও
এমন কোনো চূড়া খুঁজে পাবো না যেখানে
আমার পতাকাটি নির্দ্বিধায় সমর্পণ করে দিতে পারি।

দ্বারদেশ থেকে স্বর্গের আকাশ

এখন,
আমার দুঃখের মুখ প্লাবিত করা
দুঃখেরই বৃষ্টিধারার মাঝে,
স্বপ্ন দেখি আমি
কুঁজোদের কাছ থেকে
ও হাঁটু অবধি ঝুলে থাকা হাতগুলো থেকে
পাওয়া এক ধুলোর মইয়ের,
স্বর্গের আকাশের শেষচূড়ায় তা ঠেকাতে চাই
দেখতে চাই
কী ফল হয় আমাদের সব প্রার্থনা আর দীর্ঘশ্বাসের।
হে আমার প্রিয়তমা,
সমস্ত প্রার্থনা আর দীর্ঘশ্বাস,
সমস্ত আহাজারি আর সাহায্যের ক্রন্দন
হাজার হাজার বছর ধরে
লাখ লাখ ওষ্ঠ ও হৃদয় থেকে
উৎসারিত হয়ে
নিশ্চয় আকাশের কোথাও জড়ো হওয়ার কথা,
মেঘের মতো।
আর হয়তোবা
আমার সেইসব কথাও এখন
যিশুর কথাগুলোরই কাছাকাছি চলে গেছে।
চলো স্বর্গের আকাশ থেকে
অশ্রু ঝরে পড়ার অপেক্ষাই করি,
প্রিয়তমা আমার।

উল্কি

বিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় প্রহরে
পিচ ছাড়া কিছুই যখন
পথচারীর জুতা থেকে
আলাদা করতে পারে না লাশগুলোকে
আমি বেদুইন শেখের মতো
এবার
শুয়ে থাকবো মাঝরাস্তায়
আর উঠে দাঁড়াবো না
যতক্ষণ না সমস্ত জেলের শিক আর বিশ্বের সন্দেহভাজনদের ফাইল
জড়ো করে আমার সামনে আনা হয়
যেন খোলা রাস্তার ওপর একটি উটের মতো
চিবিয়ে গিলে ফেলতে পারি এসব
শুয়ে থাকবো আমি যতক্ষণ না পুলিশের হাত থেকে
সমস্ত লাঠি আর বিক্ষোভকারী পালাতে পারছে
এবং কুঁড়িভরা শাখাগুলো (আবারও)
ফিরে যেতে পারছে তাদের অরণ্যে
অন্ধকারে আমি হাসি
কাঁদি
লিখি
কলম আর আঙুলে তফাৎ করতে পারি না আমি আর
যখনই কেউ কড়া নাড়ে বা পর্দা দুলে ওঠে
পুলিশ রেইডের সময়
আমিও কাগজগুলো লুকিয়ে ফেলি
কার কাছ থেকে
আতঙ্কিত পাহাড়ি চিতার মতো এই ভয়
আর এই রক্তের
উত্তরাধিকার পেয়েছি আমি?
চৌকাঠে কোনো সরকারি নোটিশ পড়ে থাকতে
কিংবা দরজা দিয়ে হ্যাটপরা কাউকে ঢুকতে দেখলেই
আমার হাড়হাড্ডি আর চোখের পানি কাঁপতে থাকে
সবদিকে ছুটে পালাতে চায় আমার রক্তস্রোত
যেনো শিরা-শিরায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে
বংশানুক্রমিক পুলিশের আবহমান টহল
প্রিয়তমা আমার
নিজের সাহস আর শক্তি ফিরে পেতে কেবল ব্যর্থ চেষ্টাই সার
চাবুক, থানা, কিংবা পুলিশের সাইরেন
এসবে আসলে কোনো ট্র্যাজেডি নেই
ট্র্যাজেডি আসলে
দোলনায়…
মায়ের গর্ভে
আমি নিশ্চিত মায়ের গর্ভের সঙ্গে নাড়ির বাঁধন ছিল না আমার
ছিল আসলে জল্লাদের ফাঁসির দড়ির সঙ্গে

ধর্মঘট

আকাশের দিকে দীর্ঘকাল তাকিয়ে থেকে
আমার চোখের পানি নীল হয়ে গেছে
আর সোনালি গমের স্বপ্ন দেখে দেখে দীর্ঘদিন
হলুদ হয়ে গেছে দুচোখ
জেনারেলরা যুদ্ধে চলে যাক
প্রেমিকযুগল চলে যাক বনে
গবেষণাগারে ব্যস্ত থাকুক বিজ্ঞানীরা
আমি বরং –
তজবিহমালা আর ধুলিভরা চেয়ারটাই
খুঁজে বেড়াবো
পুরোনো সেই কাজটাই চালিয়ে যাবো আমি:
দুঃখের গেটের এক দারোয়ান
যতো দিন সমস্ত কিতাব, সংবিধান
আর ধর্ম নিশ্চিত না করে,
আমি বরং ক্ষুধায় কিংবা জেলে পচে
মরে যাবো

ছায়া ও দুপুরের রোদ

বিশ্বের সমস্ত জমিজমা
ছোট্ট দুই ঠোঁটের সঙ্গে বড়ো বেমানান
ইতিহাসের সমস্ত পথঘাটও
বেমানান নগ্ন দুই পায়ের সঙ্গে।
প্রিয় আমার,
তারা ঘুরে বেড়ায়, আর আমরা থাকি অপেক্ষায়
তাদের আছে ফাঁসিকাঠ
আর আমাদের গর্দান
তাদের আছে যতো মনিমুক্তা
আর আমাদের আছে শুধু আঁচিল আর ছুঁলি
তারা রাতের, ভোরের, সন্ধ্যা সূর্যের আর দিনের মালিক
আর আমরা শুধু অস্থিচর্মের।
আমরা দুপুর সূর্যের তলে বপন করি
আর তারা চালার ছায়ায় বসে খায়
তাদের দাঁত ভাতের মতো ধবধবে সাদা
আর দগ্ধ অরণ্যের মতো কালো আমাদের দাঁত
তাদের বুক রেশমের মতো কোমল
আর আমাদের বুক ফাঁসিকাষ্ঠের মতোই ধুলিমগ্ন
তবু আমরা পৃথিবীর রাজা:
তাদের বাড়িঘর তলিয়ে গেছে যত বিল আর হিসেবপত্রের কাগজে
আর আমাদের বাড়িঘর ছেয়ে গেছে হেমন্তের পাতায়
তাদের পকেটে তারা বয়ে বেড়ায়
চোরডাকাত আর বিশ্বাসঘাতকদের ঠিকানা
আমাদের পকেটে আমরা বয়ে বেড়াই
নদীনালা আর বজ্রপাতের ঠিকানাগুলো
তাদের আছে জানালা
আর আমাদের আছে বাতাস
তাদের আছে জাহাজ
আমাদের আছে যতো তরঙ্গ
তাদের আছে মেডেল
আর আমাদের আছে প্যাক-কাঁদা
তাদের আছে দেয়াল-ব্যালকনি
আমাদের আছে ছুরি-দড়িদড়া।
আর এখন প্রিয় আমার
চলো ঘুমিয়ে পড়ি এই ফুটপাতে।

নক্ষত্র ও বৃষ্টি

আমার মুখে আরেকটা মুখ
আমার দাঁতের মাঝে অন্যরকম দাঁত।
হে আমার বাবা মা… হে আমার মানুষ!
তোমরা যারা আমাকে বুলেটের মতো পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলে,
ক্ষুধা, ভ্রুণের আকারে, ধরফর করে অন্তর আমার।
আমি ভিতর থেকে আমার গাল খিঁচাই।
সকালে যা লিখি
সন্ধ্যায় আমাকে তা তাড়িয়ে দেয়।
রাত নয়টার দিকে সালাম জানাই যাকে
রাত দশটায় তাকেই খুন করতে চাই।
আমি পছন্দ করবো আমার মুখের মতো বড় একটি ফুল
এবং আমার কাঁধের মাঝখানে প্রশস্ত এক গর্ত
আমার সব স্মৃতি যেন ঝরনার মতো এক সঙ্গে ছিটকে বেরিয়ে আসে।
**
আমার আঙুলগুলো একে অপরকে বিরক্ত করে
এবং আমার ভ্রু দুটি লড়াইয়ে মুখোমুখি দুই শত্রু।
আমি আমার শরীরকে তারের মতো ঝাঁকুনি দিতে চাই
খুবই নির্জন কোনো কবরস্থানে,
রাক্ষসখোক্ষস, মায়েরা আর ব্রেসলেটে ভরপুর
অতল এক কূপে ছিটকে পড়বো।

**
ভুলে গেছি তো চামচের চেহারা
আর লবণের স্বাদ।
ভুলে গেছি আমি চাঁদের আলো
আর শিশুদের গন্ধও
ঠান্ডা কফি আর অন্ধ জলে
ভরে গেছে আমার এই পাকস্থলী
কাগজের টুকরো আর বরফের টুকরোয়
আমার গলা ভরে আছে
আর তুমি, বাসি পানি,
বিশুদ্ধ পানি…
জানো না তো
তোমাকে কতটা ভালোবাসি।
চিবুক পর্যন্ত শক্ত কলার লাগিয়ে,
আর আঠালো ঠোঁট,
আর শক্তভাবে বোতাম লাগানো কব্জি দিয়ে,
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাই আমরা
খুব দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকি
কবিতা আর রুমাল দিয়ে আঘাত করি
মাছিকে আমরা
পাশ দিয়ে যাওয়া কোনো গাছ বা পাখি দেখতে
নির্দয় ছোট পা দিয়ে আমরা মাটিতে হেলান দিয়ে থাকি
আর গ্রামের পাঁজর পেরিয়ে
রাস্তা থেকে রাস্তায় আমরা।

**

বেয়ে উঠতাম সর্পিল সিঁড়ি
তুলোর মতো পরিষ্কার
আর মার্টল পাতার মতো উজ্জ্বল।
খ্যাতির জুতা আর ঘৃণার জুতা দিয়ে
আমি খুনীর ছোরার মতো উপর-নিচ করি
দেয়ালে পেরেক দিয়ে ঝুলিয়ে রেখে আমার দুঃখ,
দূরের বারান্দা আর বন্দিদশা থেকে ফিরে আসা নদীগুলোকে গভীরভাবে ভেদকারী আমার চোখ।
আমি তাদের সবাইকে হলুদ আকাশের নীচে দেখতে পেতাম।
ধনী, শান্তিবাদী,
দরিদ্র এবং রাক্ষুসে।
লক্ষ লক্ষ দাঁত কিরমির করতে দেখতে পেতাম রাস্তায়,
দেখতে পেতাম বজ্রের নিচে চোখ নামানো
লাখ লাখ ঝাপসা মুখ।
আমি তাড়াহুড়া করে কবর দেওয়া দেখতে পেতাম,
আর রাস্তায় জ্বলতে দেখতাম বর্বর ঘোড়াগুলোর লাগাম
আর ওপর তলা থেকে পড়ে শ্রমিকরা
বিষণ্ণ বৃষ্টিতে সতর্ক সমাহিত,
তাদের তামাক, তাদের পোশাক,
আর তাদের মেসের টিনসহ।
কিন্তু মরুভূমিতে কিছুই নড়ছে না।
রক্তে শিস দেয় শুধু বাতাস
আর ছোট ছোট সমাধি শিশিরের মতো টুপ করে পড়ে
টুপি এবং কোটের ওপর।

**

আমি টিনজাত হাওয়া দেখেছিলাম
দেখেছিলাম সংবাদপত্রকে
বৃষ্টির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে
নোংরা পানি পান করেছিলাম
আর সেই ফেনা চেটে নিয়েছিলাম যেখানে নারীবক্ষের রক্ত ছড়িয়ে ছিল।
আর এই ভূমিকে আমি কখনো সন্দেহ করিনি
যে ঘুমায় শিশুর মতো,
এই কুঁজো জমি, কসাইয়ের মতো ঢিবি।
আমার মুখে একটি মৃত্যু আঘাতের জন্য
জানালা দিয়ে আমি তাকিয়ে ছিলাম
আর হাজার হাজার তারা, লাশ
আর গোলাগুলির হাতুড়ি পেটা
আর জুতা হিসাবে ব্যবহারে একটি ছোট সমুদ্র খুঁজছিলাম
এবং খুঁজছিলাম অহংকারী এক খাবার
যা আমি স্কার্ফের মতো আমার হাতের নিচে ভাঁজ করে রাখতে পারতাম।
সুদীর্ঘ সিঁড়ি আর বিজয়-কক্ষ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আমি।
ভুট্টা ভাজা করতে চাইতাম আমি
আর পাথর আর নুড়ি খেতে সূর্যাস্তের সময়ে।

**

আমি দূরের কিছু আলিঙ্গন করতে চাই
হোক তা বুনো ফুল
অথবা ঈগলের মতো দীর্ঘ একজোড়া কর্দমাক্ত জুতা।
আমি খেতে চাই, পান করতে চাই, মরতে চাই
এবং এক মুহূর্তে ঘুমাতে।
আমি তাড়াহুড়া করছি, তাড়াহুড়ো করছি
কোদালে মেঘের মতো,
সাগরে তাড়া খাওয়া নিঃসঙ্গ কোনো ঢেউয়ের মতো।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field