তোমার কি মারুফাকে মনে পড়ে?
মারুফা? কোন মারুফা?
সেই যে, তোমাকে একবার মারুফার গল্প শুনিয়েছিলাম? মনে নেই?
না তো! একদম মনে পড়ছে না!
কী হলো, তুমি অমন চুপ করে গেলে যে হঠাৎ?
না এমনিই। মারুফা মারা গেছে, আজই শুনলাম। মারুফার মৃত্যুর খবরটা ভীষণ এলোমেলো করে দিয়েছে আমাকে। তাই তোমার কাছে এলাম। কিন্তু তুমিও তো মনে রাখনি তাকে। পৃথিবীতে কে আর কাকে মনে রাখে বলো! সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।
আহা! ওভাবে বোলো না, আমার তো সেই অর্থে ব্যস্ততা নেই তেমন, চারপাশের সব মনে রাখাটাই আমার কাজ, তবু কেন মারুফাকে ভুলে গেলাম বলো তো! কী আশ্চর্য! কিন্তু তুমি শান্ত হও, মারুফার কী হয়েছিল? কীভাবে সে মারা গেল?
মারুফা আত্মহত্যা করেছে! আহা! মাথার দু পাশে বেণী দোলানো সেই ছটফটে কিশোরী মেয়েটা! তার ছোট্ট শরীরটা বাতাসে দুলছে, ফ্যানের সঙ্গে ওড়না বেঁধে গলায় ফাঁস লাগিয়ে ঝুলছে মারুফা, দৃশ্যটা মাথা থেকে সরাতে পারছি না কিছুতেই। মেয়েটার মুখ, তার কথা বলার ভঙ্গি, হাসি, ছুটোছুটি সব চোখের সামনে ভাসছে। কী দারুণ প্রাণবন্ত ছিল সে, কী উচ্ছল আর হাসিখুশি ছিল!
আত্মহত্যা! বলো কী!
কথাগুলো বলেই হতাশায় মাথা নাড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় শিউলি। নৈঃশব্দ্য ভীষণরকম জাপটে ধরে চারপাশ। বিপাশা অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে তার পাশে। একটু জল দেয় শিউলির পায়ে। আচমকা জলস্পর্শে চমকে ওঠে শিউলি। ফিসফিসিয়ে বলে, ধন্যবাদ। আমার বড্ড তেষ্টা পেয়েছিল…
দুঃখিত। এত কাজের চাপ, এত ব্যস্ততা আমার, তোমার দিকে নজর দিতে পারি না একদম। ক্ষমা কর আমায়…
আহা! ওভাবে বোলো না! আমি জানি তোমার অনেক ব্যস্ততা, অনেক কাজ। তবু যে তুমি এত রাতে আসো আমার পাশে, দু দণ্ড বসো, কথা কও, আমার পরিচর্যা করো, এতেই তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
কী যে বলো তুমি! বন্ধুত্বে কৃতজ্ঞতা শব্দটা সবচে বেমানান। আর কখনো বোলো না অমন। পৃথিবীতে তুমিই একমাত্র বন্ধু, যার সঙ্গে কেবলই নিঃস্বার্থ প্রেম আমার, যার সঙ্গে নেই বৈষয়িক কোনো লেনদেন। তোমার কাছে এসে আমি মুক্তি খুঁজি। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা আর ক্লান্তিকর সব আনুষ্ঠানিকতায় হাঁপিয়ে উঠি খুব। তাই সব কিছু থেকে ছুটি নিয়ে রাতের এই নীরব প্রহরে তোমার কাছে আসি। নিজেকে তখন বড় আপনার, বড় চেনা মনে হয় আমার। সারাদিন মুখে জড়িয়ে রাখা মিথ্যে খোলস সরিয়ে তোমার পাশে বসে নিজেকেই যেন ফিরে পাই আমি নতুন করে।
আমিও অপেক্ষায় থাকি সারাদিন। শরীরে অজস্র জাফরানি-শাদা শিউলি ফুটিয়ে উদগ্রীব পথ চেয়ে থাকি তোমার। দেখ, আমার ডালের ছোট্ট বাসাটা খালি পড়ে আছে। কতদিন হলো চড়ুই পাখি দুটো তাদের ছানাপোনা নিয়ে চলে গেছে, অপেক্ষায় থেকে থেকে এখন আর অপেক্ষা করি না তাদের। হয়তো আমাকে ভুলে গেছে তারা, নতুন কোনো ডালে সংসার পেতেছে। শুধু আমারই কোথাও যাওয়ার নেই, আমিই শুধু স্থাণু দাঁড়িয়ে থাকি, অপেক্ষায় থাকি নতুন কিছুর…
বাতাসে মৃদু গুঞ্জন ওঠে হঠাৎ। শিউলির বলা কথাগুলো যেন কান্না হয়ে ফিসফিসিয়ে ওঠে হাওয়ায়। বিপাশার মনটা মুষড়ে পড়ে আরো। শিউলির ছায়ার নিচে স্ট্রিটলাইটের হালকা আভাস। তার নিচে জড়ো হওয়া একরাশ জাফরানি-শাদা শিউলি হাসছে। নাকি শিউলির কান্নাই ফুল হয়ে ঝরেছে তারই ছায়াতলে? শিউলির ভেতরেও তাহলে জমে আছে এত অজস্র কান্নাজল, অনন্ত হাহাকার? প্রশ্নটা বিপাশার মনে হঠাৎই উঁকি দেয়। নীরবতা ভেঙে সে বলে,
তোমার কি কষ্ট হচ্ছে চড়ুই দম্পতি আর তাদের সন্তানদের জন্য?
এটা তো কোনো প্রশ্ন নয়! যেমন প্রশ্ন নয় মারুফার মৃত্যুতে তুমি কষ্ট পাচ্ছ কি না!
মনে মনে ভীষণ চমকায় বিপাশা। শিউলির উত্তরটা তাক লাগিয়ে দেয় তাকে। চমকে উঠে সে ভাবে, তবে কি নিজের আয়নায় এতকাল শুধু নিজেকেই দেখেছে সে? অগ্রাহ্য করেছে অন্যের অনুভব! জড় এই শিউলির ভেতরেও তবে ঢেউ তোলে বিরহ, উথলে ওঠে বিষাদের নোনা সুর! শিউলিকে কিছু বুঝতে না দিয়ে বিপাশা নাকে টেনে নেয় তার দারুণ মিষ্টি গন্ধটা। এই রাত, এই অনন্ত আকাশ আর অথৈ নীরবতা ভীষণ উপভোগ্য লাগে তার।
কী ভাবছ? ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করে শিউলি, নীরবতা খানিকটা থমকে দাঁড়ায় তাতে।
ভাবছি তোমারও তবে কষ্ট আছে, আছে হারানোর যন্ত্রণা!
আছে বৈকি! এই যে তুমি প্রতিরাতে নিয়ম করে এসে আমার পাশে বসো, আমার পরিচর্যা করো, জল দাও, এ আমার দারুণতম সুখ। সারাদিন আমি অপেক্ষা করি তোমার, সে-ও এক অন্যরকম সুখ। কিন্তু এসব ছাড়াও কত যে অনাচার দেখি প্রতিদিন, হজম করি নীরবে কত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও দৃশ্য, কতজন কত অকারণ যন্ত্রণা দেয় আমাকে ফেলে যাওয়া ওই চড়ুই দম্পতির মতো, সেসব অসুখ, সেসব কষ্ট তো বহন করতে হয় আমাকেই, আমি না চাইলেও!
অথচ আমি এতদিন তোমাকে কত সুখিই-না ভেবেছি!
হাহাহা। সুখ শব্দটা আসলে ভীষণ ঠুনকো আর আপেক্ষিক, তাই না?
হয়তো। তোমাকে আরেকটা একটা প্রশ্ন করি?
করো।
তুমি কি নিঃসঙ্গতা বোঝ? তোমার কি একা লাগে কখনো?
এই প্রশ্নের উত্তরটা তোমাকে পরে দেই। তার আগে তুমি বলো, শেষ কবে তুমি তোমার মায়ের কাছে গেছিলে?
প্রশ্নটায় দারুণ চমকে ওঠে বিপাশা। মা! কতদিন যে যাওয়া হয় না তার কাছে! কতদিন যে দেখা হয় না মায়ের মুখটা! মনটা ভারী হয়ে ওঠে আরও। দূরের রাজপথ কাঁপিয়ে হঠাৎ মিছিলের শব্দ কানে তালা লাগিয়ে দেয় তার। রাতের নীরবতা খান খান করে দিয়ে যায় সে মিছিলের হিংস্র হুংকার। শকুনেরা হামলে পড়ছে, হৃৎপিণ্ড চিরে ফেলবে বুঝি দেশটার, খুবলে খাবে সব জনপদ! কী এক অক্ষমতার চোরা ছুরি তীব্রভাবে গেঁথে যেতে চায় বিপাশার বুকের ভেতর। মায়ের মুখটা করুণ। বুকের ভেতর গভীর, গোপন ক্ষত, অবিকল দেশটার মতো। তীব্রতর কষ্টে নীল।
কী হলো? উত্তর দিলে না যে?
শিউলির প্রশ্নে ঘোর কাটিয়ে বাস্তবে ফেরে বিপাশা। বলে, অনেকদিন আগে। প্রায় বছরখানেক তো হবেই। কেন বলো তো?
প্রতিদিন কথা বলো মায়ের সঙ্গে?
না। প্রতিদিন সময় পাই না। আর নানান সব ঝামেলায় মাথাটা এত ভার হয়ে থাকে যে, ইচ্ছেও করে না প্রতিদিন মার সঙ্গে কথা বলতে।
অথচ মা কিন্তু প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ তোমাকে মনে করে কষ্ট পান, কাঙালের মতো অপেক্ষায় থাকেন তোমার ফোনের, তোমাকে দেখার… কখনো কি তার কষ্টটা অনুভবের চেষ্টা করেছ? চেষ্টা করেছ তার নিঃসঙ্গতা মাপার?
না তো! এমন করে তো ভাবিনি কখনো!
কেন ভাবোনি বলো তো? মায়ের কষ্ট না বুঝলে পৃথিবীতে আর কার কষ্ট বুঝবে, কাকে আর ভালোবাসবে তুমি!
আসলে এত বেশি ব্যস্ত থাকি সারাদিন, এত বেশি জনারণ্যে থাকি যে, নিঃসঙ্গতা আমার কাছে আশীর্বাদ মনে হয়, একাকীত্ব ভীষণ আরাধ্য ঠেকে আমার!
তোমাদের সীমাবদ্ধতা এখানেই। নিজের আয়নায় জগৎ দেখ শুধু। এবার তোমার প্রশ্নের উত্তর দেই, কেমন?
হু। দাও।
আমার জগতটাও তোমার অশিতিপর মায়ের মতোই। স্থাণু আর অপেক্ষাকাতর। নিঃসঙ্গতা আর একাকীত্বই আমার একান্ত আপনার। প্রকৃতির জল-হাওয়া, আর পথভোলা পশু-পাখির নিঃস্বার্থ সঙ্গই আমার জীবন। তবু দেখ, কত চড়ুই দম্পতিই আমাকে ছেড়ে এমন হারিয়ে যায় হুট করে। আর কখনো ফেরে না তারা। আমি তবু অপেক্ষায় থাকি…
চিন্তা কোরো না, নিশ্চয়ই আবার আসবে তারা।
হয়তো। কিংবা আমিই হারিয়ে যাব তাদের মতো।
কী যে বলো! এই ছাদ ছেড়ে তুমি আর কোথায় যাবে!
হাহাহা। ভালো বলেছ। অনেক রাত হলো, ঘরে যাও, ঘুমাও এবার।
আজ ঘুম আসবে না আর। মারুফা আজ আমাকে ঘুমাতে দেবে না। আর…
কী আর?
আরেকজন আছে, সেই যে, তোমাকে বলেছিলাম যার কথা…
তোমরা মানুষেরা বড় অদ্ভুত! বুকের মধ্যে কী যে অসহ্য সব কষ্ট পুষে রাখ অকারণে!
অকারণে?
নয়তো কী! তোমার জীবনের সবচে দুঃসহ, দুর্বহ সময়ে যে একটা সামান্য সান্ত্বনাবাক্য নিয়েও পাশে দাঁড়ায়নি, তাকে কেন বুকের মধ্যে পোষো? কেন তাকে ছুঁড়ে ফেলো না ডাস্টবিনে!
কী বলছ!
ঠিকই বলছি। সর্বস্ব দিয়ে যাকে গড়েছ, তার দেওয়া অপমান হজম করতে কষ্ট হয় না? কেন তবে তাকেই পোষো বুকের ভেতর!
কষ্ট হয় বলেই তো ঘুম উবে যায়! তাকে তো পুষি না বুকে আর! শুধু কষ্ট পুষি। কী করে এড়াব বলো তো। আর মারুফা! আহা, কী কষ্ট ছিল ওই একরত্তি মেয়েটার! কেন সে মরে গেল অমন করে?
কী আর করবে সে! বাবার মৃত্যুর পর নিত্যদিন মায়ের লাথি-ঝাঁটা, সৎ-বাপের অসৎ থাবা, মনিবের নগ্ন নখর আর সব শেষে বোবা স্বামীর নির্যাতন। বেঁচে থেকে আর কীই-বা করত সে?
শিউলি!
বলো!
তুমি কি জানো আমি প্রতি রাতে কেন তোমার কাছে আসি?
জানি।
কেন আসি, বলো তো?
তুমি একাকীত্ব উপভোগ করতে আসো, নিঃসঙ্গতার স্বাদ পেতে আসো, তাই না?
হু।
এবার বলো তো আমি কেন অপেক্ষায় থাকি তোমার?
বলেছ তো আগেই।
বলেছি? আচ্ছা। এবার যাও তবে, ঘুমিয়ে পড়ো গিয়ে।
যাব। কাল মার কাছে যাব। তোমার কান্নাগুলো সঙ্গে নিয়ে যাব। শিউলি মা-ও খুব ভালোবাসে।
বিপাশা উঠে পড়ে। সিঁড়িঘরের মৃদু আলোয় তার অবয়বটা ঝাপসা হয়ে আসে। তার কাছে যা আশীর্বাদ মা আর শিউলির কাছে তা-ই অভিশাপ তবে! ভাবনাটা তাকে পুড়িয়ে দিতে থাকে নিভৃতে। জীবনে জড়ো হওয়া বিষও তবে স্থান-কাল-পাত্রভেদে রূপ পাল্টায়, মধু হয়ে ওঠে! পরম বিস্ময়ে এই সত্য আবিষ্কার করে সে, চোখের ওপর থেকে সহসা একটা কালো পর্দা যেন হঠাৎই সরে যায় তার। বুকের ভেতর প্রচণ্ড এক ধাক্কা টের পায়। বহুদূরে অপেক্ষাকাতর স্নেহময় মায়ের মুখটা ভেবে ঝাপসা হয়ে আসে চোখ। কী এক শক্তি তাকে অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে টানে। সকাল হলেই মায়ের কাছে যাবে সে আজ, প্রতিজ্ঞা করে।
হাওয়ায় শরীর দুলিয়ে জাফরানি-শাদায় নিজেকে সাজাতে থাকে শিউলি। তার বুকের ভেতর জমা কান্না টুপটাপ ঝরে পড়ে নিচে। অন্ধকার ঘন হয়ে আসে। দূরের পৃথিবীর অন্ধকার ধীরে ধীরে চেপে আসে শিউলির কাছেও, যার আঁচে ঢের আগে থেকেই পুড়ছে বিপাশা…


Leave feedback about this