ছোটগল্প বিশেষ সংখ্যা

ছাতিমতলা | হামীম ফারুক | ছোটগল্প

নৈঃসঙ্গ্যের অনুভূতিমালা

পাকের্র এই কোণটুকু আবিদ সাহেবের বেশ পছন্দ। পছন্দের কারণ ছাতিম গাছ। অন্যান্য গাছের পাশাপাশি বেঞ্চের দুপাশে বেশ কয়েকটি ছাতিম গাছ রয়েছে। রোদের সময় বেশ ছায়া হয়। বর্ষায়, গাছে যখন ফুল আসে, সুন্দর একটা গন্ধও হয়। তার সৌরভ তখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
ছাতিম ফুলের বুনোগন্ধ বেশ ভাল লাগে আবিদ সাহেবের। তাই পুরো পার্কে চক্কর দিয়ে একবার হলেও এখানে এসে বসবেন তিনি। বসে সামনে লেকের পানির দিকে তাকিয়ে গভীরভাবে বারকয়েক শ্বাস টেনে নেবেন, ছাড়বেন।
পার্কে ঘুরতে আসা লোকজন এদিকটায় কম আসে। যদিও নিরিবিলি, তা সত্ত্বেও কোনো নির্জনতাপ্রত্যাশী যুগলকেও এদিকটায় তেমন আসতে দেখা যায় না। এটি ঠিক কী কারণে, আবিদ সাহেব জানেন না, অথবা জানতেও চান না। শুধু জানেন, এই নিরিবিলিটা তার দরকার। শহরের কোলাহল, মানুষের কথাবার্তা, পরিচিত মুখের ভিড়–সবকিছু থেকে দূরে থাকার একমাত্র আশ্রয় যেন এই ছাতিমতলা।
আবিদ সাহেব আজও বেঞ্চে বসে থাকেন অনেকক্ষণ। সামনে লেকের পানি স্থির। মাঝেমাঝে যখন পাতা পড়ে, তখন পানি কেঁপে ওঠে, আবার থেমে যায়। ঠিক যেন তার ভেতরটা। একসময় তাঁর জীবনেও ঢেউ ছিল–হাসি, তর্ক, অপেক্ষা, অভিমান। এখন সবই থেমে আছে। শুধু স্মৃতিগুলো মাঝেমধ্যে ঝরাপাতার মতো জলে এসে পড়ে। কোথাও একটু কাঁপিয়ে দিয়ে আবার চুপচাপ হয়ে যায়।
তার মনে পড়ে যায় সন্ধ্যাবেলাগুলো–যেদিন তার অফিস থেকে ফিরতে দেরি হতো, ঘরে কেউ একজন অপেক্ষা করত। দরজা খুললেই প্রশ্ন আসত, ‘কী আজও দেরি হলো?’ অনুযোগের সুরে আর কেউ এখন এই প্রশ্ন করে না। করবার মতো কেউই বাসায় নেই। তাতে কষ্ট হয়তো হয়। আবার হয়তো এই নৈঃশব্দ্যই তাকে বাঁচিয়ে রাখছে, কে জানে।
আবিদ সাহেবের পাশ দিয়ে কয়েকজন হেঁটে যায়। কেউ তাকে দেখে না, দেখার দরকারও নেই। আবিদ সাহেব ধীরে ধীরে শ্বাস নেন, ছাড়েন। মনে হয়, এই পার্কের কোণাটুকুও তাঁর মতোই–সবার চোখের আড়ালে, তবু নিজের মতো করে বেঁচে আছে।
আবিদ সাহেব হঠাৎ টের পান, বেঞ্চের ওপাশে কেউ এসে বসেছেন। তাকিয়ে দেখেন, একজন মধ্যবয়স্কা, পায়ে কেডস। হাতে ছোট একটা কাপড়ের ব্যাগ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। আজকাল ছানি হলেই লোকজন ফ্যাকো করে ফেলে। ভারি লেন্স ব্যবহার করতে হয় না। আবিদ সাহেব তাকালেন সেদিকে। একটু অস্বস্তিও হতে থাকে। এতদিন এই পার্কে, এই বেঞ্চে এসে বসেছেন, কখনো কেউ পাশে এসে বসেনি।
চোখে চোখ পড়তে মধ্যবয়স্কা নারীটি হালকা, মৃদু হাসলেন। গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, এই ছাতিম ফুলগুলোর গন্ধ আজ খুব তীব্র, না?
আবিদ সাহেব একটু চমকালেন। ছোট্ট করে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ।’ তারপর কী মনে করে বললেন, এই গন্ধটাই এখানে টেনে নিয়ে আসে আমাকে।’
উত্তর দিলেন বটে কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি উত্তর খুঁজছেন অন্যকিছুর। নারীটি বলছিলেন, গন্ধটি আজ খুব তীব্র। তার মানে কী তিনিও এখানে এসে বসেন মাঝেসাঝে? কিন্তু তাকে তো কখনো আবিদ সাহেব দেখেননি। স্মৃতি হাতড়াতে থাকেন তিনি।
‘এই গন্ধটা আমাকেও বেশ টানে’, মধ্যবয়স্কা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘সাহেদ, মানে আমার উনি বর্ষাকালে ছাতিম ফুল কুড়োতেন এখান থেকে। আমারতো পার্কে আসা হতো না। তবে ফুল পছন্দ করতাম, তাই আমাকে এনে দিতেন বাসায়। এখন আর সে আসে না। আমিই আসি। তবে ফুল না, শুধু গন্ধটাই নিই।’
এতগুলো কথা একসাথে বলে মধ্যবয়স্কা চুপ করে গেলেন। আবিদ সাহেব কিছু বলতে চাইলেন। যদিও অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন বা আগ্রহ তার স্বভাবে নেই। তবুও পরমুহূর্তে মনে হলো প্রশ্নটা করা উচিত।
‘আপনার হাজব্যান্ড এখন আসেন না, কেন?’ খুব নরম, অনুচ্চ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
মধ্যবয়স্কা তাকালেন আবিদ সাহেবের দিকে। একটু কৌতুক জড়ানো গলায় বললেন, ‘সে আসবে কী! ওতো নেই, মারা গেছে। এই বছরখানেক হলো!’ যেন বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, এমন ভঙ্গিতেই উত্তর দিলেন তিনি। যদিও তার মুখাবয়বে একটু বিষণ্ণতা কী খেলে গেল?
এমন কিছু একটা আঁচ করেছিলেন আবিদ সাহেব। বিষয়টি জেনে আর কথা বাড়ালেন না বা দুঃখ প্রকাশ করে কিছু বললেন না। তাকিয়ে রইলেন লেকের পানির দিকে। এই চুপচাপ বসে থাকাটাও যেন একটা কথা। নিঃশব্দে শোক জানানো।
কিছুক্ষণ পর উঠে গেলেন মধ্যবয়স্কা। হাতে রাখা কাপড়ের ব্যাগে একটা পানির বোতল ছিল। বোতলটি বের করে কয়েকচুমুক পানি খেলেন। বললেন, এখানে একা বসতে ভালো লাগে, কিন্তু একলা থাকলে মাঝে মাঝে কথা শুনতেও ইচ্ছে করে। কী অদ্ভূত তাইনা!’
আবিদ সাহেব মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
কাকে যেন খুঁজছেন, এদিক ওদিক তেমনভাবে তাকিয়ে চলে গেলেন তিনি।
কিছুক্ষণ পরে, ছাতিমতলার কাছে এসে দাঁড়াল এক কিশোর–হাতে ফুটবল। বলটা লেকের ধারে গড়িয়ে এসেছে। অনেকটা আবিদ সাহেবের পায়ের কাছে।
‘আংকেল, বলটা দিবেন?’ কিশোরটি এগোতে এগোতে বলল।

আবিদ সাহেব বলটা প্রথমে পায়ে মেরে দিতে চাইলেন। কিন্তু বলটি দিকভ্রষ্ট হতে পারে ভেবে হাতে তুলে নিলেন। সেটি ছুঁড়ে দিতে ‍দিতে জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, তোমার বন্ধুরা কোথায়? একাই খেলছ যে?
ছেলেটা হাসল. ‘হ্যাঁ। সবাই বাসায়, আংকেল। গেম খেলছে।’
আবিদ সাহেবের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি। বলল, এজন্য তুমি একাই খেলতে চলে এসেছ বাইরে?
বলটা নিতে নিতে ছেলেটা হাসল। তারপর দৌড়ে চলে গেল। তার হাসির শব্দটা কিছুক্ষণ বাতাসে লেগে থাকল।
আবিদ সাহেব আবার বেঞ্চে বসে পড়লেন। আজ পার্কটি আগের মতোই নিরিবিলি, তবু তার ভেতরে কিছু একটা কাজ করছে। যেন কেউ বলতে চাইছে, নিঃসঙ্গতা মানে একেবারে সবকিছুর অনুপস্থিতি নয়–কখনো কখনো টুকরো কিছু কথা বা সময় নিঃসঙ্গতাকে আরও ঋদ্ধ, উপভোগ্যও করে তুলতে পারে।
বেঞ্চে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন তিনি। এই নির্জন কোণায় এখন শুধু তার একাকিত্ব নেই–কিছু না-বলা গল্পও যেন তাকে সঙ্গ দেয়।
সূর্য একটু হেলে পড়ে। ছায়া লম্বা হয়। তিনি উঠে দাঁড়ান। ছাতিম গাছটার দিকে একবার তাকান। গাছ কিছু বলে না, তিনিও না। তবু দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত বোঝাপড়া রয়ে যায়।
এসময় হঠাৎ নারীকণ্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকার। আবিদ সাহেব চমকে এদিক-ওদিক তাকান। চট করে বুঝতে পারেন না কিছু। পানির ঝপাৎ শব্দে চোখ গেল লেকের দিকে। কেউ একজন লেকের পাড় থেকে পড়ে গেছে পানিতে। পানি থেকে উঠে আসবার চেষ্টা করছে। পাড়ের খুব কাছাকাছি এখনও রয়েছে যদিও।
আশেপাশে কেউ নেই সেদিকটায়। দ্রুত এগিয়ে গেলেন আবিদ সাহেব। কাছে যেতেই বুঝতে পারলেন মধ্যবয়স্কা সেই নারী। আবিদ সাহেব দ্রুত পাড়ের কাছে গিয়ে যতটুকু সম্ভব হাত বাড়িয়ে দিলেন। এর মধ্যে সেই কিশোরটিও কোথা থেকে এসে উপস্থিত হলো। চিৎকার করে ডেকে উঠল, আম্মু, আম্মু।
মধ্যবয়স্কা কোনমতে ঝাপটাতে ঝাপটাতে আবিদ সাহেবের হাত অবশেষে ধরতে পারলেন। তারপর উঠে আসেন পাড়ে। হইচই শুনে অবশেষে দুএকজন দূর থেকে এসে উপস্থিত হয়েছে।
ততক্ষণে মধ্যবয়স্কা মাটিতে বসে পড়েছেন। উপুড় হয়ে বমি করলেন। গলগল করে পানি বেরিয়ে এলো। হাঁপাচ্ছেন তিনি। চোখ থেকে চশমা উধাও হয়েছে। হয়তো পানিতে পড়ে গেছে। কোথা থেকে কেউ একজন একটি তোয়ালে নিয়ে এসেছে। ছেলেটি তোয়ালে দিয়ে মায়ের মাথা, মুখ মুছে দিতে থাকে দ্রুত। ঘটনার আকস্মিকতায় যেন কারো মুখ দিয়ে কোনো কথা সরছে না।
পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে ছেলের কাঁধে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ান মধ্যবয়স্কা। আবিদ সাহেবের কাছে আসেন। তার চোখেমুখে এখনো ভয়। বললেন, ভাই, কী যে হতো আজ। আপনি এসে না পড়লে হয়তো বাঁচতাম না। আমিতো সাঁতারও জানি না। আমার ছেলেও জানে না। মা-ছেলে দুজনেই একসঙ্গে ডুবে যেতাম লেকে।’
আবিদ সাহেব ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছেন। বললেন, আমিতো ভেবেছিলাম আপনি চলে গেছেন!
‘না, যেতে পারিনি। ছেলে বলল মা আরেকটু খেলি। তাই রয়ে গিয়েছিলাম। পরে কী মনে হলো, লেকের পানিতে নামলাম। একটু পা ধুবো বলে। তারপর কিভাবে পিছলে গেলাম, বুঝতে পারিনি। কীযে হতো আজ!’
আবিদ সাহেব নিজেও সাঁতার কাটেন না বহু বছর। সেই ছোটোবেলায় গ্রামের পুকুরে সাঁতার কেটেছেন। এরপর আর কখনো সুযোগ হয়নি। পাড়ের কাছাকা্ছি বলে হয়তো ওনাকে ধরতে পেরেছেন। পানিতে তেমন নামতে হয়নি। তবে লেকের আরো ভেতরে চলে গেলে কী পারতেন?
মধ্যবয়স্কার শরীর ততক্ষণে কিছুটা নেতিয়ে এসেছে। পার্কের গেট পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দেন আবিদ সাহেব। একটা রিক্সায় মা ও ছেলেকে তুলে দেন। তারপর নিজেও পা বাড়ান বাসার দিকে।
লক্ষ করেন, ফেরার সময় আজ তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেছে। যেন একটু আলাদা। এতদূর থেকেও, ছাতিম ফুলের গন্ধ আরও তীব্র হয়ে তার নাকে এসে ঠেকছে, বারবার।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field