ছোটগল্প বিশেষ সংখ্যা

অসুখ | জাহীদ ইকবাল | ছোটগল্প

মধ্যরাতে পিতা আমাকে লেপের ভেতর থেকে টেনে বের করে বসালেন। ঘুমে আমি অন্ধ।
তিনি বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস উড়িয়ে আমার পিঠে হাত রাখলেন, ‘চলে যাচ্ছি রতন।’
‘চলে যাচ্ছি মানে কী! কোথায় যাচ্ছ?’
‘জানি না। তবে যেখানেই যাই আমার ফিরতে দেরি হবে। এমনও হতে পারে তোর সঙ্গে আমার আর দেখা না-ও হতে পারে।’
‘কেন বাবা?’
‘আমার কোনোকিছু ভাল্লাগছে না।’
‘কোহিনূর খালাকে ডাকব?’
‘না, তাকে ডেকে আর কোনো ফায়দা হবে না।’
‘কেন?’
‘আমার নতুন একটা অসুখ করেছে। এই অসুখের দাওয়াই তার কাছে নেই।’
‘আমি তো জানি তোমার সব অসুখের দাওয়াই ওই কোহিনূর খালা। সে তোমার কাছে এলে তুমি ঠিক ঠিক সেরে উঠবে।’
‘রতন, আমার তা মনে হয় না। কারণ আমার অসুখের ধরন বদলেছে। বয়েসও। এই অসুখের দাওয়াই তার কাছে নাই।’
‘বাবা, আমি যেটা আঁচ করতে পারছি তা হলো তুমি কোহিনূর খালাকে ভুলে থাকতে চাও। নিজেকে একটু চেঞ্জ, একটু ঝালাইও করতে চাচ্ছ। আর সে কারণে তুমি দূরে কোথাও গা-ঢাকা দিতে চাইছ। ঠিক বলেছি কি না বলো?’
পিতা সন্তানের কাছে কিছুটা ধরা খাওয়া গলায় কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে আমার খাটে নড়েচড়ে বসলেন। তাঁর চোখ দুটো ভেজা। বোধহয় রাতভর কেঁদেছেন। আমি দেখলাম তাঁর চোখের ভিতর একটা দগদগে যন্ত্রণাময় দীঘি। যন্ত্রণায় খা খা করছে। এই লোক পালিয়ে কোথাও বেশিদিন থাকতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।
‘রতন তুই যেটা ভাবছিস বিষয়টা এমন না। তুই আমাকে ভুল বুঝছিস। আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। আমি নতুন একটা প্ল্যান করেছি। আর সেই প্ল্যানমাফিক আগাতে চাচ্ছি।’
‘ঠিক আছে আগাও। তা কবে ছাড়ছ খুলনা?’
‘এখনি।’
‘তোমার মাথা কি ঠিক আছে বাবা! রাত এখন কটা বাজে জান? শুধু শুধু আমার ঘুমটাই নষ্ট করলে! ফজরের আজান হোক তারপর যাবে। এখন তোমাকে আমি যেতে দিচ্ছি না!’
‘কিন্তু এখন না গেলে সকালে আমার আর যাওয়া হবে না। ঘুম ভেঙে দেখব দরজায় কোহিনূর দাঁড়িয়ে আছে!’
‘এটা তোমার ভুল ধারণা। একবার এসেছিল বলে যে সে বারবার আসবে তা নয়। ওটা ছিল নিছক একটি কাকতালীয় ঘটনা।’
‘কিন্তু আমার বিশ্বাস বলে একটা ব্যাপার আছে না?’
‘এইসব অন্ধবিশ্বাস মগজ থেকে সরিয়ে কাঁথা মুড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়। এই শীতের মধ্যে তোমাকে আমি কোথাও যেতে দেব না!’
পিতা দমে যাবার পাত্র নন। তবুও তিনি দমে যাওয়ার ভঙ্গি করলেন। কথা বাড়ালেন না। বাধ্য শিশুর মতো চুপচাপ রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। তাঁর ঘুম নিশ্চিত করে আমি আমার খাটে এসে ঘুমিয়ে পড়ি।
ভোরে কোহিনুর খালার চিল্লাচিল্লি শুনে আমার ঘুম ভাঙে। কোহিনূর খালা থাকে রূপসার সেই ওপারে। অথচ তিনি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন।
‘তোর বাবা কোথায়?’
‘কেন?’
‘সে তো চলে গেছে!’
‘আরে না। এই শীতের মধ্যে যাবে কোথায়! তবে যেতে চেয়েছিল। আমিই তাঁকে যেতে দিইনি। বাবা তাঁর রুমে ঘুমাচ্ছে।’
‘আমার তা মনে হচ্ছে না। আমি রাতে স্বপ্নে দেখেছি সে চলে গেছে।’
‘আজব! তুমি শুধু শুধু চিল্লাচিল্লি করে গলা না ফাটিয়ে ভিতরে এসে দেখ। আমি টয়লেটে যাচ্ছি। আমার খুব…।’
পিতা চলে গেছেন দেখে কোহিনূর খালার সে কী মায়াকান্না! মানুষ মরে গেলেও কেউ এত কাঁদে না। তিনি তিনদিন পিতার জন্য অপেক্ষা করে রূপসা চলে গেলেন।
নানী অসুস্থ না থাকলে খালা হয়ত আরও কিছুদিন থেকে যেতেন। মা যতদিন বেঁচেছিলেন কোহিনূর খালা একদিনের জন্যও আসেননি। খালাকে মা অনেক সন্দেহ করতেন। তবে শুধু শুধু সন্দেহ করতেন না। সন্দেহের অনেকগুলো কারণ ছিল। সমস্ত কারণ একত্রিত করলে পিতা গুরুতরভাবে ফেঁসে যেতেন। কারণগুলো সে কারণেই একত্রিত করা হয়নি। তাছাড়া পিতার অপমান হবে ভেবে মা বিষয়গুলো মনের মধ্যে চেপে রাখতেন এবং ভীষণ কষ্ট পেতেন।
আমার বয়স যখন সাড়ে চার বছর তখনই তিনি মেঘের ওপারে চলে গেলেন। তাঁর টাইফয়েড হয়েছিল। কোহিনূর খালাও আর বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন না। সারাক্ষণ আমাকে নিয়ে পড়ে থাকতেন। আমার এত সেবাযত্ন, দেখভাল মা করেছে কি না মনে পড়ে না। আমার শুধু মায়ের মুখটা মনে পড়ে। আমি পড়ে থাকতাম নানাবাড়ি।
পিতা থাকতেন শহরে।
নিজেই রান্নাবান্না করে খেতেন। মাঝেমধ্যে আমাকে রূপসায় গিয়ে দেখে আসতেন। খালাও আমাকে নিয়ে কখনোসখনো চলে আসতেন। তিনি থাকতেনও। তবে পিতার সঙ্গে খালাকে আমি কখনো কোনো অন্তরঙ্গ মুহূর্তে পাইনি। চোখেও পড়েনি কোনোদিন। নানা-নানী তাদের দুজনকে বিয়ে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। পারেননি। পিতার পূর্ণসম্মতি থাকলেও কোহিনুর খালাকে তাঁরা কোনোক্রমেই বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে পারেননি।
কোহিনূর খালার প্রতি পিতার দুর্বলতা ছিল লাগামহীন।
ছিল কী! এখনো আছে। কিন্তু আগুনসুন্দরী খালা সেদিকে গা ভাসালেন না। দুলাভাইকে যেন নাকে দড়ি দিয়ে এক অদৃশ্য সুতার টানে বেঁধে রাখলেন। আমার পিতাও আর বিয়ের কথা ভাবলেন না। ছ্যাকাখাওয়া মজনুর মতো ঘুরতে লাগলেন খালার পিছুপিছু। খালাকে পেলে পিতা যেন একদম শিশু ব’নে যান। দেখামাত্র মনের জমিয়ে রাখা সমস্ত কথা গড়গড় করে বলে যান। কোহিনূর খালাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো পিতার সমস্ত কথা শোনেন। তাদের বেবাক কথা আমিও শুনতাম। কিন্তু কোনো রোমান্টিকতা খুঁজে পেতাম না।
পিতার কারোর অধীনে চাকরি করা পছন্দ ছিল না।
গ্রামে তাঁর ভালোই জমিজমা ছিল। ছিল কয়েকটি সুপারি বাগান। তিনি শখ করে সুপারির বাণিজ্য বেছে নিয়েছিলেন। গ্রাম থেকে পাইকারি সুপারি কিনে সেগুলো বিভিন্ন জেলাশহরে সেল দিতেন। তবে এই বাণিজ্যে তিনি বেশিদিন থিতু হতে পারেননি। বড়ধরনের লস খেয়ে হাতপা ধুয়ে ঘরে উঠেছিলেন।
লেখাপড়ায় বেশিদূর না এগোলেও তিনি দেশ-বিদেশের ভ্রমণ কাহিনি বলতে ও পড়তে পছন্দ করেন। কত যে দেশ-বিদেশের গল্প শুনেছি তাঁর মুখে, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। এমন বইপোকা মানুষ জীবনে খুব কম দেখেছি। তাঁর বুকশেলফে আমি কোনো রোমান্টিক গ্রন্থ খুঁজে পাইনি। অথচ বাস্তব জীবনে এই বইপাগল মানুষটা ছিলেন চরম রোমান্টিক।

পিতা নিখোঁজের চতুর্থতম দিনে কোহিনূর খালাও নিখোঁজ হলেন।
আমি ভেবেছিলাম তিনি রূপসা গেছেন। কিন্তু না। ছোটমামা তাঁকে খুঁজতে না এলে জানাই হতো না, তাঁর লাপাত্তা হয়ে যাবার খবর।
পিতা বেশিদিন গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে পারেননি।
আমি ভেবেছিলাম তিনি দু’চার বছরেও ফিরবেন না। বাচ্চাকাচ্চা উৎপাদন করে একটু বড় করে একদিন তারা আমাকে চমকে দিয়ে বলবেন,_’রতন, এটা তোর ছোটবোন রত্না! একটা বোনের জন্য তোর অনেক কষ্ট ছিল।’
কিন্তু না, তিনি শূন্য হাতে ফিরে এলেন। সঙ্গে আমার কোহিনূর খালাও নাই।
পিতা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্নাজুড়ে দিলেন, ‘তোদের ছেড়ে আমি থাকতে পারলাম না!
‘তোদের মানে কী?’
‘কেন কোহিনূর আর তুই!’
‘সে তো তুমি চলে যাওয়ার চতুর্থদিনে নিখোঁজ হয়েছে! আমরা ভেবেছি কোহিনূর খালা তোমার কাছে গেছে!’
‘না। আমি কোথায় যাব বা কোথায় থাকব, এটা তো কোহিনূর জানে না! জানার কথাও না। তাছাড়া আমি তো ফোনই ব্যবহার করি না!’
‘তাহলে কোহিনূর খালা কোথায় যেতে পারে?’
‘রুস্তমের কাছে।’
‘রুস্তম কে, বাবা?’
‘ওরা দু’জন দু’জনকে খুব ভালোবাসে।’
‘আর তুমি?’
‘আমিও ভালোবাসি।’
‘তো বিষয়টি কী দাঁড়াল?’
‘কোহিনূর আমাকে বলেছিল, আমি যেন কোনোদিন তাকে না জানিয়ে কোথাও চলে না যাই! গেলে সে আমার জন্য স্রেফ তিনদিন অপেক্ষা করবে। এই তিনদিনও যদি আমি ফিরে না আসি তাহলে সে চতুর্থদিন রুস্তমের কাছে চলে যাবে। গেছেও।’
পিতার কথা শুনে আমার জবানে যেন তালা পড়ে যায়। এটাও সম্ভব! তা-ও এই মধ্যবয়সে?
পিতা কাঁদছেন।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field