Site icon তীরন্দাজ

মোবাশ্বেরা খানম বুশরা অনূদিত জোহানেস ভি জেনসেন-এর ছোটগল্প । তীরন্দাজ অনুবাদ

জোহানেস ভি জেনসেনের জন্ম ১৮৭৩ সালে ডেনমার্কের ফরসোর এক কৃষক পরিবারে। তিনি কোপেনহেগেনে গিয়েছিলেন চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশোনা করতে। কিন্তু ঘুরে বেড়ানোর তাড়নায় থিতু হয়ে পড়াশোনা করা হয়নি। যদিও প্রথম দিকের কবিতা ও উপন্যাসে বিদেশের পটভূমিতে ঘটনা ও আবেগকে সাজিয়েছেন, কিন্তু পরে তিন খণ্ডে প্রকাশিত তাঁর গল্পসমাহার প্রমাণ করে যে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের দেশ ও দেশের লোকেদের কাছেই ফিরে এসেছেন। যে ছয় খণ্ডের মহাকাব্যধর্মী কাজের জন্য ১৯৪৪ সালে নোবেল পুরষ্কার পান, সেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে মানুষ আদিতে বর্বর বন্য মানবজাতি-সদৃশ একটি সত্তা ছিল, সেখান থেকে ধীরে ধীরে সে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। এভাবেই সে হয়ে উঠেছে নির্মাতা, আবিষ্কারক ও উদ্ভাবক। ১৯৫০ সালে জোহানেস ভি জেনসেনের মৃত্যু হয়।

জমি চাষ করত যে লোকটা তার নাম ছিল কোরা। সে যখন কিছু টাকা জমাতে পারল, তখন শহরে গেল একটি দাস কিনতে।
দালাল তাকে বেশ কটা দাস দেখাল, কিন্তু কোরার পছন্দ হলো না।
‘আমার তো মনে হচ্ছে তুমি চাও যে আমি সব কটাকে টেনেহিঁচড়ে এখানে নিয়ে আসি।’ গজগজ করতে করতে দালালটা বলল। তখন দুপুর হয়ে এসেছে, দাসেরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
‘আমি তো অন্য জায়গায় যেতেই পারি, সব সময়,’ তীক্ষ্মস্বরে কোরা বলে উঠল।
‘আচ্ছা আচ্ছা,’ দালালটা শেকলে টান দিল, দাসরা ঘুমোতে ঘুমোতে পেছন পেছন এল। কোরা ভাল করে তাকিয়ে ওদের সবাইকে দেখল, খুব গভীরভাবে প্রত্যেককে পরীক্ষা করল।
‘ওকে হাত দিয়ে ধরে দেখ, চমৎকার বলবান লোক,’ একজন দাসকে সামনে ঠেলে দিয়ে দালালটা বলল, ‘কেমন মনে হয় ওকে? কী শক্ত একটা বুক আছে ওর, তাই না? এখানে থাবড়া মেরে দেখ। আর এই যে এদিকে ওর হাতের কব্জিটা দেখ। মাংসের পেশীগুলো যেন বেহালার তারের মত। এই, তোমার মুখটা হাঁ কর তো?’
দালালটা ওর একটি আঙুল দাসটির মুখের ভেতর ঢুকিয়ে ওকে আলোর দিকে ঘুরিয়ে দিল। ‘এখন তুমি ওর দাঁত কটাও দেখতে পাবে,’ গর্বের সুরে বলল সে। দাসটির দাঁতের মধ্যে একটা ছুরির পেছনদিকটা আড়াআড়িভাবে ঢুকিয়ে দিল। ‘দেখ দেখ! দাঁতগুলো যেন ইষ্পাতের মতো। এটা দিয়ে নখও চিবিয়ে ফেলতে পারবে।’
কোরা তবুও কিছুক্ষণ নিজে নিজে ভাবল। দাসটির শরীরে হাত বুলিয়ে ও বুঝে নিল, মসৃণ পেশীগুলোতে আঙুলের ডগা দিয়ে টিপে টিপে দেখল সেগুলো শক্ত কি না। শেষ পর্যন্ত মন ঠিক করে ফেলল, ওকেই কিনবে। একটু ভুরু কুঁচকে দামটা দিয়ে দিল, দাসটির শেকল ছাড়িয়ে ওকে নিয়ে বাড়ি গেল।
বেশী দিন গেল না দাসটি কেমন অসুস্থ হয়ে পড়তে লাগল, মন খারাপ করে থাকত। এখন যেহেতু ও আর বাজারে নেই, শেষ অব্দি থিতু হয়েছে স্থায়ীভাবে, যে বনাঞ্চল থেকে ও এসেছে তার জন্য মন উতলা হয়ে উঠল। এটা খুব দারুণ একটা চিহ্ন। এই লক্ষণগুলো কোরা চেনে। একদিন ও দাসটির পাশে এসে বসল, যে কি না জীবন সম্পর্কে সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। সটান চিৎ হয়ে শুয়েছিল সে। কোরা তার সাথে চিন্তান্বিত সুরে কথা বলতে শুরু করল।
‘ভয় পেও না, তুমি তোমার বনে ফিরে যাবে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি। আমার কথায় ভরসা রাখো। তুমি জানো তুমি এখনো তরুণ…। যদি আর পাঁচটা বছর তুমি পরিশ্রম করে, মনোযোগ দিয়ে কাজ করে আমার জমি চাষ করে দাও, আমি তোমাকে মুক্তি দেব, যদিও তোমাকে আমি দাম দিয়েই কিনেছি। পাঁচ বছর, ঠিক আছে তো দরটা?’
এরপর দাসটি আবার কাজ করতে লাগল। একটা দৈত্যের মতো সে কাজটাকে ধরে রইল। কোরার জন্যে খুবই আনন্দের ব্যাপার ছিল, যখন দরজার সামনে বসে বসে দেখত ওর ওই পেশীগুলো বাদামি চামড়ার নীচে কুঁচকে গিঠ বেঁধে কেঁপে কেঁপে উঠছে। কোরা দিনে কয়েক ঘণ্টা ধরে এটা দেখত, কারণ ওর আর কিছুই করার ছিল না। ও বুঝতে শুরু করল যে শরীর একটা খুবই সুন্দর জিনিস, এটা চোখের জন্যেও আনন্দের।
পাঁচ বছর, দাসটি গুণেছিল – ওর যতগুলো আঙুল আছে, ততগুলো অয়নকাল। দশবার সূর্যটাকে ঘুরে আসতে হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ও সূর্যটাকে অস্ত যেতে দেখত। সময়ের এই হিসাবটা ও ছোট ছোট ঢিবি আর পাথরের চিহ্ন দিয়ে রাখত। আরেকটা অয়নান্তের পর মনে হতো যেন অনন্তকালের জন্য তর্জনী ছাড়া পেল। এ দুটো আঙুলকে সে অন্যগুলোর চেয়ে বেশি ভালবাসত, যে আঙুলগুলো তখনও তার দাসত্বের কালকে নির্দেশ করছে।
এভাবে দিন গোণা আর সময়ের যাত্রাকে চিহ্ন দিয়ে রাখাই দাসটির ধর্ম হয়ে উঠল, তার অন্তর্গত সম্পদই তার আধ্যত্মিক বৈভব, যা কেউই ওর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না বা সেটা নিয়ে বিবাদ করতে পারবে না।
যতই দিন যেতে লাগল ওর হিসেব ছড়িয়ে যেতে লাগল, আরো প্রশস্ত আরো গভীর। বছরগুলো গড়িয়ে যেতে লাগল সীমাহীন বিমূর্ততার মতো, যা সে বুঝে উঠতে পারত না, তবে প্রতিটি নতুন সূর্যোদয়ের আভায় দাসটি তার প্রত্যাশাকে নতুন করে সৃষ্টি করত আর বিশ্বাসকে নতুন করে উৎসর্গ করত। যে-সময় বর্তমানের ভেতর বিলীন হয়ে যেত, তাকে মনে হতো যেন অন্তহীন, তা অতীতে কখনও ছিল আর ভবিষ্যত বুঝি অনির্দিষ্ট দূরত্বে।
এমন অভিজ্ঞতায় দাসটির চেতনা গভীরতর হলো। তার আকাক্সক্ষা যেমন অসীমকে সময়ের ভেতরে নিয়ে এল, তেমনি তার জগতও হয়ে উঠল অনন্ত আর ভাবনাগুলো সীমাহীন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় দাসটি চিন্তামগ্ন দৃষ্টিতে দূর পশ্চিমে চেয়ে থাকত, প্রতিটি সূর্যাস্ত ওর আত্মাকে গভীর থেকে গভীরতায় নিয়ে যেত।
শেষ পর্যন্ত যখন পাঁচ বছর ফুরিয়ে এল – কথাটা বলা কত সহজ – দাস তার প্রভুর কাছে এল, নিজের মুক্তি চাইল। সে বনের ভেতর তার বাড়িতে যেতে চায়।
‘তুমি খুব বিশ্বাসী কর্মী ছিলে,’ কোরা চিন্তামগ্ন হয়ে স্বীকার করল। ‘আচ্ছা বল তো তোমার বাড়িটা কোথায়? সেটা কি পশ্চিমে? আমি প্রায়ই তোমাকে ওই দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি।’
হ্যাঁ, ওর বাড়িটা পশ্চিমেই।
‘তাহলে তো অনেক দূরে,’ কোরা বলল। দাস মাথা নাড়ল – অনেক দূরে।
‘আর তোমার তো টাকা পয়সা নেই? আছে তোমার?’
দাসটি অস্বস্তিতে চুপ করে গেল। না, তা তো ঠিকই, তার তো টাকাপয়সা নেই।
‘আর দেখ, টাকা ছাড়া তুমি কোথাও যেতে পারবে না। যদি তুমি আমার জন্যে আরো তিন বছর কাজ কর – না, বরং দুই বছর করা যাক, তখন আমি তোমাকে যাবার জন্যে যথেষ্ট টাকা দেব।
দাস তার মাথা নত করল, আবার জোয়াল তুলে নিল। মে খুব ভালভাবে কাজ করতে থাকল। কিন্তু সে আর আগের মতো চলে যাওয়া দিনের হিসেব রাখত না। বরং অন্য দিকে দিবাস্বপ্নে মগ্ন হয়ে থাকত। কোরা শুনতে পেত ঘুমের মধ্যে তার বিলাপ আর বিড়বিড় বকুনি। কিছুদিন পর সে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ল।
তখন কোরা তার পাশে বসল। আন্তরিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে তার সাথে কথা বলল। কথাগুলো খুবই জ্ঞান ও দূরদর্শীতায় ভরা, যেন সৎ অভিজ্ঞতার ওপরে ভিত্তি করে বলা।
‘আমি তো একটা বুড়ো মানুষ,’ কোরা বলল। ‘আমার যৌবনে আমিও পশ্চিমে যেতে চাইতাম। সেই বিশাল বন আমায় হাতছানি দিত। কিন্তু আমার কখনোই সেই দিকে যাত্রা করার মতো টাকা ছিল না। এখন তো আর ওদিকে যাবই না, যদি না আমি মরে গেলে আমার আত্মা সেখানে যায়। তুমি তরুণ, সমর্থ, আর তুমি পরিশ্রমও কর খুব বেশি। কিন্তু তবু তুমি কি আমি যৌবনে যতটা শক্তপোক্ত ও সমর্থ ছিলাম, ততটা শক্ত? এই সব কিছু খুব ভালভাবে ভেবে দেখ আর একজন বুড়ো মানুষের উপদেশ শোনো। সুস্থ হয়ে উঠে এসব বুঝে দেখো।’
দাসটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু যখন আবার সে কাজে হাত লাগাল, আগের সেই উদ্দীপনা আর থাকল না। এখন সে সহজেই হার মানে। তার সেই উচ্চাশা হারিয়ে গেছে। কাজের ফাঁকে এখন সে শুয়ে থাকতে আর ঘুমোতে পছন্দ করে। সেরকম এক সময় কোরা ওকে চাবুক দিয়ে মারল। এতে তার ভালই হল। সে কাঁদল।
এভাবে দু’বছর কেটে গেল।
তখন কোরা সত্যিই দাসটিকে মুক্তি দিল। সে পশ্চিমে গেল; কিন্তু একমাস পরে চরম বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে এল। সে যে তার বনটাকে খুঁজে পায় নি।
‘ দেখলে তো?’ কোরা বলল। ‘আমি তোমাকে বলেছিলাম না? তবু কিন্তু কেউই বলবে না যে আমি তোমার ভাল চেয়েছি। আবার চেষ্টা কর, এবার পূবদিকে যাও। হতে পারে তোমার সেই বনভূমি হয়তো ওদিকেই আছে।’
আরো একবার দাসটি রওনা দিল। এবারে সে উদীয়মান সূর্যের দিকে মুখ রেখে চলল। শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ এক যাত্রার পর সে তার নিজের বনাঞ্চলে এসে পৌছাল। কিন্তু এদেরকে তো সে চেনে না! ক্লান্ত, পরাজিত; সে আবার পশ্চিমদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ফিরে এল তার প্রভুর কাছে। তাকে বলল, যদিও সে তার নিজের বনভূমি ফিরে পেয়েছে, বড় বড় আর ছোট ছোট বনগুলোর কোনোটাই আর তার নয়।
‘হুমম,’ কোরা কেশে উঠল।
‘আমার সাথেই থেকে যাও,’ উষ্ণ স্বরে বলল কোরা। ‘যতদিন আমি বেঁচে আছি ততদিন এই দুনিয়ায় তোমার ঘরের অভাব হবে না। যখন আমি আমার বাপদাদার কাছে চলে যাব, আমার ছেলেরা তোমার দেখাশোনা করবে।’
অতএব দাসটি রয়ে গেল।
কোরার বয়স হয়েছে কিন্তু তার দাসটি তখনো তার যৌবনে। কোরা তাকে ভালভাবে খেতে দিত যাতে সে দীর্ঘদিন বাঁচে। তার শরীর যাতে ভাল থাকে তাই তাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখত। আবার যৌক্তিক সময়ের ব্যবধানে চাবুকও মারত, যাতে সে বশ্যতা ও সম্ভ্রমপূর্ণ থাকে। বিশ্রামের ব্যাপারেও কমতি ছিল না। প্রত্যেক রবিবার দাসটি ছুটি পেত, যখন সে একটি উঁচু ঢিবির ওপরে বসে পশ্চিম দিকে তাকিয়ে থাকত।
কোরার খামারে অঢেল ফসল ফলত। সে বন কিনত, সেগুলো পরিষ্কার করত, সেগুলো লাঙলের নীচে রাখত যাতে তার দাসের হাতে কাজ থাকে। আর দাসটি গাছগুলোকে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ভূপাতিত করত। কোরা এখন ধনী হয়ে গেছে, একদিন সে একটি দাসী নিয়ে এল বাড়িতে।
বছর কেটে গেল। কোরার বাড়িতে ছ’টি পেশীবহুল দাসছেলে বেড়ে উঠেছে। ওদের বাবার মতো ওরাও প্রচণ্ড পরিশ্রম করে। ওদের বাবা ওদেরকে বলেছিল, যখন কেউ কাজ কওে তখন সময় কেটে যায়। আর যখন সময় বয়ে যায় ক্লান্ত আমরা চিরস্থায়ী বনের দিকে যেতে থাকি। প্রতিটা ছুটির দিনে দাসটি তার ছেলেদের নিয়ে ছোট টিলাটার ওপরে যেত, যেখান থেকে ওরা অস্তগামী সূর্যটাকে দেখতে পেত। সে ছেলেদেরকে কামনা-বাসনা শেখাত।
কোরা বুড়ো হয়ে অচল হয়ে গেছে। সে তো সব সময় বুড়োই ছিল, তবে এখন বয়স ছাড়া আর কিছুই তার মধ্যে নেই। তার ছেলে কখনোই শক্তপোক্ত ছিল না। কিন্তু কারো কাছ থেকে তাদের ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না। কারণ, যে কোনো দাস একটি লোককে মুগুরের এক আঘাতে ফেলে দিতে পারত। তারা দারুণ ছিল। তাদের লোহার মতো কঠিন পেশীতে মাংস শক্ত হয়ে বসেছিল। তাদের দাঁতগুলো ছিল বাঘের দাঁতের মতো। কিন্তু সময় এখন খুবই নিরাপদ। দাসেরা তাদের কুড়োল ঘোরাতো আর গাছ ফেলে দিত।

Exit mobile version