ওই মাতারি, তোর ভাতার কই?
ভাত-কাপড়ের কষ্ট। দেশি পয়সায় এখন আর কুলোয় না। সংসারের অভাব ঘুচাতে ধার-দেনা করে মানচিত্রের কান্দা পাড়ি দিয়ে ঘামমূল্যের দেশে ছুটছে হাজার হাজার লোক। নকশির স্বামীও গ্রাম ছাড়া বহুদিন, একার সংসার। চালতা গাছের পাশে ডোবা, বাড়ির কান্দা পার হলেই পুরানবাড়ির পুকুর, মানুষের আনাগোনা কম। জলে কারো পা পড়ে না; জলের রং মিশকালো, সবাই কয় কালাপুকুর। নকশি পা টিপে টিপে যায় পুকুরের দিকে। ভাতারের কথা মনে পড়ে, খলখল হেসে ওঠে। বন-বাদাড় কমে গেছে, পাখিদের প্রজনন কম, দুয়েক জাতের পাখি ঝোঁপের কিনারে লুকিয়ে থাকে। মানুষের ডরে গলা হাঁকায় না। ঠোঁটে জ্বর। খড়ের বাসা হারানোর ভয়ে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে দিনদিন। কিন্তু নকশির হাসির শব্দে আশপাশের পাখির ডাকও কানে লাগে না পথচারির। সন্ধ্যা নামার আগে এই পথের বাঁকে তেমন কেউ ছোটে না; মাঠের মানুষই বেলা ফুরানোর পূর্বে এদিকে হাঁটে। বিল ছোট হওয়ায় তেমন কাউকে চোখে লাগে না। নকশি পথের রাজসাক্ষী হয়ে ওঠে। তার মেজাজটা আজ ফুরফুরে, খাটুনি সত্ত্বেও খোলা হাওয়ায় বেণী ছেড়ে জলের তিন সিঁড়ি ওপরে বসে। এসময় নিঃসন্তান আজমেরী হেঁটে যায়। নকশির চেহারা দেখে চালতা গাছের শেকড়ের ওপর পা ঠেকায় সে। আধভেজা কাপড়ে ঢাকা বুকের ভেতর ঘনঘন মোচড় দেয়। ইচ্ছেমতো বকতে থাকে নকশিকে। টুঁ শব্দও করে না নকশি। শ্যাওলাভরা ঘাটকুলে বহুদিন পর পা ঠেকেছে তার।
আধো আধো অন্ধকার। সূর্যের ছুটি হয়েছে ঠিক মিনিট দশেক পূর্বে। ডোবাসূর্যের দিকে চোখ রেখেই একদৌড়ে ঘাটে আসে নকশি। হাত-পা ও শরীর এবং গোপন জায়গাগুলো ঘনঘন কচলাতে থাকে। হঠাৎ শরীর শিরশির করে কেঁপে ওঠে। চকমক চোখে চারপাশটা দেখে। সাঁঝবেলা কার মাতাল চোখ বেঁধে আধখোলা দেহের ওপর। ধবধবে পিঠে ভেতোপশমের ফাঁকে কার আঙুল চিরুনির মতো আঁচড় কাটতে শুরু করে। ওহ! কার পাঁচ আঙুলের চাপ, মোটা দাগের পাঁচ-পাঁচটা কামুক আঙুল ছুড়ে দেয় জলপীঠের ওপর। কেমন কেমন লাগে; মাথা নেড়ে মন শক্ত করে বারবার। নাহ! তেমন কাউকে দেখা যায় না। বুকে থু মারে, ঘনঘন নিঃশ্বাস টেনে ধরে এবং বারবার ছাড়ে। হাত লাগায় পিঠের ওপর। পিঠের ওপর ঝরাপাতা, কদমপাতা! মিছেমিছি ভয়। এবার ভারি নিঃশ্বাস ছেড়ে স্বস্তি পায় মনের ভেতর।
দিনভর ঘর-দুয়ারের কাজ ছাপিয়ে বাথরুমে গিয়ে দেখে ট্যাপে জল পড়ে না। মেজাজটা তখন গরম হয়ে ওঠে। তার মানে ট্যাংকি ফাঁকা। কী করবে! গোসল ছাড়া শরীর স্যাঁতস্যাঁতে লাগে। কারো সঙ্গে দেখা হওয়ার ভয়ে চুপিচুপি এসেছিল নকশি। কিন্তু বাড়ির নাইওরি আজমেরীর চোখ ফাঁকি দেওয়া অত সহজ না। তার নজরে পড়া মানে, কাম সারছে। খবরটা গাঁওব্যাপী চাউর হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। বাতাসের আগে খবর পৌঁছে যাবে। আজ একটু পরে প্রচার হলেও তার কাছে যখন পৌঁছেছে তখন আর চাপা থাকবে না, প্রচার করবেই। কান্দার সবাই তাকে একনামে চেনে, তাকে বিবিসি বলে। লোকের কাছে বিবিসি নামে তার খুব নামডাক আছে। কোনো খবরই তার ভেতরে চাপা থাকে না, স্মরণশক্তি ষোলোআনা। কোনো কথাই আগলে রাখে না, রাখার মানুষও আজমেরী নয়। মুহূর্তের মধ্যে চালান দেয়। কথা চালান করা তার আজন্ম-স্বভাব। এতটুকু বিরতি নেই। কখনো বিরক্তও হয় না। বরং এক কথা, দু কথা, তিন কথা, বহু কথা এভাবে কথার পিঠে কথা লাগিয়ে বাজখাঁই গলা বাজাতে থাকে। পড়শিরা কয় সাউন্ড সিস্টেম লাগানো গলা, কান ঠেকিয়ে শোনা লাগে না, তরতরে ধ্বনি আধ মাইল দূরেও শোনা যায়। কান থেকে কানে এভাবে পৌঁছে যায় বহুজনের কাছে।
ঘরে ঘরে গাজী ট্যাংক, ট্যাপ ছাড়লেই কাজ চুকে যায়। আগের মতো কেউ ভরপুকুরে ভিড় করে না। কদাচিৎ দুয়েকজনকে দেখা যায়। কেউ ঠেকে আসে, ঠেকাকাজে জলঘাটে ভিড় করে। কিন্তু জলের রং মরচে, মদা গন্ধ, নাক ছোয়ানো যায় না। এদিকে কারো খেয়াল নেই। সময় কোথায় মানুষের? এমন মানুষই-বা কোথায়, গাঁও-গেরামে পুরুষ নেই। পনেরো-ষোলো-সতেরো হলেই কাগজে-কলমে আঠারো বানিয়ে আরব দেশে পাড়ি দেয় বহুলোক। বছর বছর বাড়ি ফেরে। টাকা-পয়সার গরমে জেদ নরম হয় না, বরং ঘনঘন তেতে ওঠে এবং পুকুরগুলো ভরাট করে দালান ওঠায়। দু চারটে পুকুর বাদে সবই বালিভর্তি হয়ে গেছে। গাঁয়ে নজর দেওয়া যায় না। আদি রূপ নেই, সৌন্দর্য নেই। ইট-সুরকির স্তূপে সয়লাব নয়ানগরের হাট, গাঁওগেরাম আর নগরের অলিগলি। দীঘিনালা কিংবা বড় পুকুরে কাঁসা, পিতল ও কলসভরা দেওদানবের ঘুমপাড়ানি গল্পকথা কার না মনে আছে। মানুষের এখন ঘর দরকার, বাড়ি দরকার। কেবল নিজের একলা ঘর, নিজের নামে বাড়ি। দেয়ালে সাঁটানো থাকে শেখসাহেবি নাম। কয়েক পুরুষ একসঙ্গে থাকার দিনগুলো ছুটি নিয়েছে বহুদিন পূর্বে, দিনকাল শেষ। একলা ঘরে একলা মানুষ থাকার দিন এখন। খেয়ে থাকা না থাকা কিংবা ইচ্ছে মাফিক; যা করে সবই নিজের মর্জি ও আপন আপন ব্যাপার। মুখে এককথা, চোখ নাই চোখের দরদও নাই। দেশে ভাতার নাই ভাতারের দরদও নেই।
অসময়ে স্নানঘাটে নকশি। আজমেরীর মনের ভেতর কৌতূহল জাগে। নকশি ঘাটে ক্যান? ভাতার বুঝি দ্যাশে আইছে?
পরের ভাতারের দিকে চোখ ঠাউরে দেখা আজমেরীর কাজ। কান্দায় কে ফিরছে সবার আগে তার কানে খবর পৌঁছে যায়। গ্রাম চড়ে বেড়ানো তার অভ্যাস। আধভেজা চুল নিয়ে দুসিঁড়ি ওপরে ওঠে নকশি। আজমেরী ঘাটকুলে ইটের ওপর পাছা চ্যাপড়া করে বলে, কথা জিগাই, কথা কস না ক্যান? সন্দেহ হয় রে নকশি!
ভেজাচুলের জল ঝরাতে ঝরাতে এবার মুখ খোলে নকশি। ভেতরে ভেতরে জেদও চাপে, কিন্তু আজমেরীর মুখের কথা মনে পড়ামাত্রই জেদ হজম করে বলে, বুজান, তুমি ঠিক সময় আইছ। নইলে এতক্ষণ মূর্ছা যাইতাম। গোসল করলে কী শান্তি লাগে। কতদিন পর আরাম কইরা চুল ভিজাইলাম।
আজমেরী ভ্রু বাঁকিয়ে বলে, হ লাগে, লাগে তো। কপালে সুখ থাকলে পেটের ভেতরও সুখ নড়েচড়ে। ছ মাসে তো লাত্থি উস্টা দেয়। তোমার কী সাহস, এই সাঁইঞ্জাবেলা এধারে পা উঠাইছ। কও, কোনো খবর আছে নি?
না রে বুজান, কোনো খবর নাই। নতুন খবর হইলে তুমি জানতা না!
তা ঠিক। তোর ভাতার কবে আইব, না আইছে? তোগো তো আবার তেরো ভাতারির শখ।
জ্বিভ কাটে নকশি। কী কইলা বুজান?
না দুধে ধোয়া তুলসীপাতা! কিচ্ছু বুজে না বেটি! তো কও কবে আইব?
তা জানি না, তবে বড় হজ্বের পর বাড়ি ফিরব। বড় হজ্বের নিয়ত করছে তোমাগো মাশরুর।
বড় হজ্বে অধিক সওয়াব। নামের আগে আলহাজ্বও সাঁটানো যায়। ময়মুরুব্বিগণ মান্য করে। পরকালেও মুক্তি আছে। মানুষ বাঁচে কতকাল, মরলে তিনদিন তারপর সব শেষ, ভুলে যায়। সামর্থ্য থাকতে যা কামানো যায়। তাতে ইহকালে শান্তি পরকালে মুক্তির খুশি।
নকশির স্বামী মাশরুর। বছর পাঁচেক প্রবাসে। বাড়ি এল সেদিন, ঘরে নয়া বউ রেখে বিয়ের পরের মাসে গেছে সে। নকশির পেটে তখন মেয়ে স্মৃতি কেবল জমাট হয়েছে। খাবার-দাবারে মন বসছিল না; ঘনঘন কেবল নিচটা মোচড়ায়। মাশরুর বেশ খুশি হয়ে গেল। তার রক্তের প্রবাহ নকশির দেহে বাসা বেঁধেছে, তাতে সে মহাখুশি। যাক এবার যাওয়া যায়। নকশিকে নিয়ে বাড়িতে টেনশন থাকবে না; এবার গেলে নিশ্চিন্তে বছর চারেক পর ফিরবে মাশরুর।
নকশির ওপর দিয়ে বহু ঝড় ছুটেছে। একহাতে সামাল দিয়েছে সে। বড় ঝড় স্মৃতির জন্মতিথি। বাপছাড়া কত মানুষের মুখ দেখে হাঁটতে শেখে মেয়েটা। বাপকে চিনতে পারে না, এখন বাপ ডাকতে পারে। দুচারটে আবদারও করতে পারে, কিন্তু বাপের দেখা না পেয়ে কান্নাভেজা চোখ টলমল করে। মাশরুরের ফিরতে দেরি, মেয়ে দম বন্ধ করে হজম করে মনের রাগ।
দেশে ফেরে মাশরুর। সারপ্রাইজ দিতেই তার বাড়ি ফেরা, না ফেরারই কথা। স্মৃতির বয়স তখন চারের ওপর। নতুন অবস্থায় বাপের কাছে ঘেঁষতে চায় না মেয়েটা। ধীরে ধীরে মাশরুর তাকে বশ মানাতে থাকে। বাবা-মেয়ের সাক্ষাৎ ঘটে প্রতিদিন। মাস তিনেক বাবার আদর পেয়ে হাসিখুশি হয়ে ওঠে স্মৃতি। এখন আর বাবা ছাড়া একমুহূর্তও থাকে না। কোনো দিকে পা বাড়াতে পারে না মাশরুর। মেয়ের বায়না বেশি, নকশিও মাশরুরকে আগলে রাখতে সোহাগ দেখাতে থাকে। মা-মেয়ের আবদারে কোনো দিকে যায় না। ঘরকুনো ব্যাঙের মতো চার দেয়ালের ভেতর পায়চারি করতে থাকে মাশরুর। মানুষের মন একটা, একদিকে আগলে রাখলে অন্যদিকে আলতো হতে থাকে। এটা বাঙালি মা-বোনরা বোঝে কম। বহুসংসারে আগুন লাগে এবং ভেঙে খানখান হয়ে যায় সোনার সংসার। মাশরুরের সঙ্গে মা-বাবা ও ভাই-বোনের সম্পর্কে চিড় ধরতে থাকে। একদিন বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয় মাশরুর। কারণ, নকশি বহুদিন ধরে কানভারি করেছে মাশরুরের। ব্যাটা মানুষের মন কচু পাতার মতো টলমল করে, অধিক ওজন সয় না।
মাইল দশেক পরে থানা শহর। সেখানে বড় টাওয়ার দেখে বাসা ভাড়া করে একদিন। দোতলায় বসবাস, ঘরে জানালা নেই। বাবা-মা গাঁয়ে থাকে। ছেলের সুখে আনন্দ তাদের, কথা বাড়ায় না আর বাবা-মা। খুব সরল প্রকৃতির মানুষ। চিটিংবাজের দুনিয়া, ভালো মানুষের অভাব। গাঁয়ের নীড়ে সুখ, বিছানার পাশে খোলা জানালা, ভেসে আসে মিহি হাওয়া, কুচকানো শরীরের ভাঁজে ভাঁজে আয়েশ লাগে।
গাঁয়ে থাকে মাশরুরের বাবা-মা। মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসে বউয়ের বাসায়। ছেলে এখন বউয়ের কথায় ওঠবস করে। ক্যামনে বদলে যায়, মায়ের মন বোঝে না। মা কেবল আল্লাহ আল্লাহ ডাকেন এবং ভারী নিঃশ্বাস ছাড়েন। বুক ধড়ফড় করে, মরে মরে অবস্থা। মাস তিনেকে মাশরুর বদলে গেল। বোনেরাও দাঁতমুখ খিঁচতে থাকে। কিন্তু কোনোদিন ভাইয়ের বাসায় হাত কচলাতেও আসে না। এসবে কেয়ার নেই নকশির। নিজের ভাই-বোন আসে যায়। নিজের বাসা হওয়ায় নিজের মতো করে সাজায়, বিয়ে বাড়ির মতো আমোদ-ফূর্তি করে। কদিন পরপর বিশেষ দিনক্ষণে পার্টি দেয়, বার্থ ডে, চকলেট ডে, ভ্যালেন্টাইনস ডে, কোনো দিবসই বাদ যায় না। মাশরুর এসে পেয়েছিল ম্যারেজ ডে, বেশ আনন্দে কাটে দুজনের। ছুটি শেষ দেখতে দেখতেই। মাস তিনেকের ছুটি ছিল, ফুরিয়ে গেলে মাশরুর ফের চলে গেল।
নকশি একা থাকে। রাত-বিরেতে বাইরে যেতে বাধা নেই। না গিয়েও উপায় কি। ঘরে ব্যাটামানুষ নেই। বাইরেটা সামলাবে কে? ব্যাংক, বীমা, দলিল, দস্তখত সবই এখন নকশির নিজের হাতে সামলাতে হয়। কত পুরুষের সঙ্গে কথা বলা লাগে, গা ঘেঁষা লাগে। সে হিসেব কজন রাখে। কেবল দোষ ধরে আপনজন। ওসবে কান দেয় না নকশি। ফাঁকা বাসা। মন টেকে না। রাতভর নেটের সবুজবাতি অন রাখে, চ্যাটিং করে, বেরসিক সময় কাটে না।
শুক্রবার হাটের আগের দিন। নিশিরাতে কল আসে নকশির। নাম্বারটা চেনে না। দুবার কেটেও দেয়। কিন্তু ওধার থেকে বারবার চাপতে থাকে। এত চাপে ব্যথা হয় না লোকটার, মাগো হাতে কত জোর! অবশ্য পুরুষ মানুষের জোর বেশি। কয়েকবার বেজে ওঠার পর জেদের বসে কলটা ধরে। ছেলে মানুষের গলা। একেবারে মুক্তকণ্ঠ। মনে হয় চাঁদের দেশের মানুষ। চাঁদের গায়েবি বন্দনা দেয়, মিনিট কয়েক কোনো নিঃশ্বাস নেয় না নকশি। কদিন আগেই ইলেক্ট্রিক কিছু মাল এনেছিল সে। দোকানের ছেলেটি সেদিনই নাম্বার চেয়ে কেবল মালটা পেয়েছি কি না, এ খবরটা জানতে চেয়েছিল। কিন্তু কী দুষ্টু! নাম্বারটা টুকে রেখেছে। কোনো দরকার ছাড়া এত রাতে কল দিয়ে সে জানতে চায় ভেতরের খবর। মনে হয় তারই ঘরের মানুষ। কিন্তু তাকে পরও মনে হয়নি নকশির। মনে হয় যষ্ঠিমধু, ধীরে ধীরে স্বাদ বাড়ে যার।
মিহি স্বর। চেপে চেপে কথা কয়। কোনো কাঁটাছেড়া নেই। কবিতার মতো বেশ ঢং। কথা নয় কবিতা কিংবা গীতের ভাষা। মনের ভেতরে নিমেষে গেঁথে যায়। মাশরুর একটা বেরসিক মানুষ। শরীর ছাড়া আর কিছু দাবি করেনি কোনোদিন। দুচারটে মধুর কথাও বলেনি। মনটা বোঝেনি। কেবল ফর্সা শরীরটা খাবলে খাওয়ার ধান্দায় মাতাল ছিল সে। এখন বহুদূরে, কিন্তু ত্যাজি ঘোড়ার মতো রেগে থাকে সারাক্ষণ। কথা ছোঁয়ানো যায় না। তার চেয়ে দোকানের মাশেক ছেলেটা বয়সে ছোট, আচরণে খুব বিনয়ী, কণ্ঠেও যাদুকাটা। কী বলদার ঘর করছি। মনের জানালা বোঝে নাই, তাতে দুঃখ নেই, কিন্তু খোদা কি কইরা আমার লগে তারে বাঁধাইছে। মনে ছিল কম খামু, কম পড়মু, তারে পাশে পামু, এভাবে জীবন পার কইরা পরকালটা স্বর্গে কাটামু। সে দুরে থাকবো ক্যান! দুঃখ, কপালপোড়া আমার!
ভাবতে ভাবতে কদিনের মধ্যেই মনের ভেতর থেকে মাশরুরের ছবি বিলুপ্ত হয়ে যায় নকশির। দেয়ালে সাঁটানো ছবিটা ঘন-ঘন কেঁপে ওঠে। নকশির ভ্রু নদী ভাঙনের মতো আকাঁবাঁকা হয়ে ওঠে। ছবিটি পড়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যাহ্! যারে মনে ধরে না তার ছায়া মাড়িয়ে কী লাভ! নতুন ছবি, মাশেকের চেহারা জায়গা করতে থাকে নকশির আগুনমাখা শরীরের ভেতর। ধীরে ধীরে অনুভব করতে থাকে নকশি।
দিনদিন মাশরুরের সঙ্গে আলাপ কমে যায় নকশির। রিপ্লেস হয় মাশেক। সূর্যের পর চাঁদ যেমন আসে, চাঁদ দেখায় আনন্দ লাগে। চুপে-চুপে রাতে মিটি মিটি হাসে চাঁদ, চাঁদই বুকের পর্দা ওঠায়। গৃহস্বামী না থাকলে জায়গা কখনো খালি থাকে না। মাশরুরের মনের মাঠ দখল হয়ে গেছে। মাশরুরের মনে ধাঁধা লাগে, উছলাতে থাকে মন। আন্দাজ করতে সময় লাগলেও চারদিকের ঘটনা শুনে সন্দেহ বিঁধতে থাকে মনের দেরাজে। সিদ্ধান্ত নেয়, দেশে ফিরবে। তবে কাউকে জানাবে না। সারপ্রাইজ দেবে ভেবে একদিন না কয়ে চলে আসে মাশরুর। মাশেকের র্স্পশ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পদ্মের মতো নকশি তখন মাতাল হাওয়ায় দুলছে।
নকশির বাসায় অচেনা কেউ আসে না। এলেও খবর পায়। আজ উচ্চশব্দে কলবেলের শব্দ শোনা যায়। ভোর তখন ছটা। বাইরে কা কা শোনা যায়, কাকসভা। পরদিন কাকেদের অবরোধ, কোথাও ভাগাড় নেই, মানুষের শহরে কাকেদের ভিড়, ভাগাড়ের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে কাকের দল। স্বস্তির ঘুমটা ভেঙে চোখ কচলাতে কচলাতে দরজার ফাঁকে আসে নকশি। টিকটিকি লাফিয়ে পড়ে তার মুখের ওপর। চিৎকার দিয়ে ওঠে সে, বিপদের ইঙ্গিত। মাশেক তখন নকশির বাঁ পাশে দাঁড়ানো। হৃৎপিণ্ডে তুমুল ঝড়, মনের ভেতরটা লণ্ডভণ্ড হতে থাকে। মাশেক ধরার চেষ্টা করে, কিন্তু নকশি থরথর করে কাঁপে। কার পা পড়েছে বাসার সম্মুখে, কে এল এই ভোরে। তার মনে এইসব ভয়ানক প্রশ্ন এখন। মাশরুর ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে একটু বিরক্ত গলায় বলল, এখনো এরা ঘুমাচ্ছে!
মাশরুর গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, দরজা খোল।
এবার টনক নড়ে, গলাটা বেশ চেনা নকশির, মাশুরুরের কণ্ঠ। নকশির চোখ রাক্ষসী হয়ে ওঠে। জ্যান্ত রাক্ষসী, উসকোখুসকো চুল, মনে হয় শরতের মেঘে ধেয়ে যায় কালো মেঘের মিছিল। রাক্ষসী দৌড়াতে থাকে। পেছন থেকে হাত বাড়ায় মাশেক। মুখোমুখি দুজন। বিষ চোখে দরজা খোলে নকশি।
ঠোঁট কাঁপে মাশেকের। বিষধর সাপের মতো ঘন ঘন ফুঁসতে থাকে। কালসাপের ওপর মাশরুর ঝাঁপিয়ে পড়ে…

