চার্লস বুকাউস্কি | জন্ম ১৬ আগস্ট ১৯২০, মৃত্যু ৯ মার্চ ১৯৯৪
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়ার পর ‘লস্ট জেনারেশন’-এর লেখকেরা যেমন একধরনের মোহভঙ্গ ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগেছিলেন, চার্লস বুকাউস্কিকে তেমনি মার্কিন ‘বিট’ লেখকদের মতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারা আক্রান্ত ও প্রভাবিত কবি মনে করা হয়। তৎকালীন সমাজব্যবস্থার চিন্তাধারা ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এই লেখকেরা প্রকাশের নতুন পথ ও দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজছিলেন। তাদের কাছে মনে হয়েছিল—সমগ্র সমাজটাই একধরনের মানসিক ব্যাধিতে ভুগছে, যার প্রকাশ পরবর্তী স্নায়যুদ্ধের (কোল্ড ওয়ার) মাধ্যমে ঘটে।
বুকাউস্কির বেশিরভাগ লেখাই তাঁর জীবনভিত্তিক। তাই চেরকোভস্কি তাঁকে এমন এক “বিজ্ঞ অভিজ্ঞ বৃদ্ধ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি পোস্ট-ওয়ার বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমেরিকার অবক্ষয় শুরু হওয়ার আগেই তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। একইভাবে গবেষক ব্রুয়ারের মতে, বুকোভস্কি তাঁর লেখার সত্যতা ও বোধগম্যতা অর্জন করেছেন কোনো কৃত্রিম বা ধার করা চিন্তার আশ্রয় ছাড়া, বরং তিনি সরাসরি জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভীষণ সততার সঙ্গে মুখোমুখি হয়েছেন। আমেরিকার শ্রমজীবী মানুষদের ওপর অবিচলভাবে আলোকপাত করে বুকাউস্কির ৭০ ও ৮০-র দশকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা “ডার্টি রিয়েলিজম” (বা নির্মম বাস্তবতা) ধারার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন এবং এটিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন—যা পরবর্তীকালে রেমন্ড কার্ভারের মতো লেখকদের সাহিত্যেও দেখা যায়।
জ্যাক কেরুয়াকের দ্য টাউন অ্যান্ড দ্য সিটি (১৯৫০) কিংবা উইলিয়াম বারোজের জাংকি (১৯৫৩)-তে যেমন পারমাণবিক যুগের পর এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া আমেরিকার ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে, বুকাউস্কির লেখাতেও তেমনি মদ্যপান, হতাশা ও আত্মবিধ্বংসী মানসিকতার এক তীব্র বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তার ও পারমাণবিক ধ্বংসের ভয়াবহ আতঙ্ক, অন্যদিকে শিল্পায়নের অন্ধ দৌড়ে নৈতিকতাহীন এক সমাজ—যেখানে গণউৎপাদন, স্বল্প মজুরি ও অতিরিক্ত শোষণের মাঝে মানবজীবনের মূল্য একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বুকাউস্কির প্রথম উপন্যাস পোস্ট অফিস (১৯৭১)-এ ৫০ ও ৬০-এর দশকের আমলাতান্ত্রিক এবং যান্ত্রিক কর্মজীবনের এক রূঢ় বাস্তবতা। এতে দেখানো হয়েছে এমন এক আমেরিকা, যেখানে সফলতার একমাত্র মাপকাঠি টাকা। এর মাধ্যমে বুকাউস্কি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করেছেন—উচ্চবিত্তরা যখন আরাম-আয়াসে দিন কাটাচ্ছে, তখন খেটে খাওয়া নিম্নবিত্তরা অনিশ্চিত ও অর্থহীন এক জীবনের চক্রে বন্দি।
তাঁর ফ্যাকটোটাম (১৯৭৫) উপন্যাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তার পরবর্তী তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক জোয়ারের’ দিনগুলোতে খেটে খাওয়া আমেরিকানদের জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে—যেখানে দেখা যায় কীভাবে বারবার একই ধরনের অদক্ষ কাজ মানুষের ভেতরকার প্রাণশক্তিকে একদম মেরে ফেলে। অন্যদিকে, হাম অন রাই অন (১৯৮২) উপন্যাসে বুকাউস্কি তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠার গল্প বলেছেন। এখানে তিনি প্রচলিত পারিবারিক কাঠামো ও তার মধ্যকার সুবিধাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, এবং “কঠোর পরিশ্রম করলেই জীবনে উন্নতি করা যায়”—এই বহুল প্রচলিত রূপকথা বা মিথকে একদম উড়িয়ে দিয়েছেন।
৫০-এর দশকের শেষ দিকে এক নতুন প্রজন্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে। গড়ে ওঠে ভোগবাদ ও একঘেয়ে আনুগত্যের নতুন সংস্কৃতি, যার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল বৈচিত্র্যহীনতা ও একঘেয়েমির সমালোচনা। ‘বিট’ ঘরানার লেখকেরা এই উদাসীন ও সন্তুষ্ট সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল—আত্মিক মূল্যবোধের অভাব এবং মানবিক আদর্শের এই অবক্ষয় শেষপর্যন্ত মানুষের ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্যবোধকেই ধ্বংস করে দেবে। মূলধারার এই মানসিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে বুকাউস্কির লেখাগুলো মূলত নগর সভ্যতার এক তীব্র সমালোচনা হয়ে ওঠে এবং একই সঙ্গে মানুষের হারিয়ে যাওয়া আসল অস্তিত্বকে নতুন করে খুঁজে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। কর্মজীবনের যান্ত্রিকতার ওপর আঘাত হেনে এবং তার নিয়ম মেনে নিতে সরাসরি অস্বীকার করে তিনি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীন চেতনার জয়গান গেয়েছেন।
বিজ্ঞানসম্মত কর্মব্যবস্থাপনা (Scientific Management) এবং প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয়তা আমেরিকার শিল্পক্ষেত্রে সাফল্য এনে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আধুনিক শিল্পের জন্য উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও, সমাজবিজ্ঞানী ব্র্যাভারম্যান দেখিয়েছেন, কীভাবে শ্রমিকশ্রেণিকে পঙ্গু করে দেওয়া ‘আংশিক-দক্ষ’ (semi-skilled) শ্রমে ভাগ করে ফেলা হয়েছে। এই ধরনের তুচ্ছ ও একই কাজের পুনরাবৃত্তি শ্রমিকদের কাজের আগ্রহ পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়। অন্যদিকে এইচআর বা মানবসম্পদ বিভাগগুলোর মাধ্যমে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ ও শান্ত রাখা হতো, আর কনসাল্টিং ফার্মগুলো নজর দিত খরচ কমানো, দক্ষতা বৃদ্ধি ও উৎপাদন বাড়ানোর দিকে। এর ফলস্বরূপ, শ্রমিকরা মূল উৎপাদন প্রক্রিয়া ও সম্পদের সৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং অবমূল্যায়িত হয়ে পড়ে।
প্রতিসংস্কৃতির (counter-culture) আদর্শকে ধারণ করে বুকাউস্কির এই সাধারণ জীবনের পাগলামির গল্পগুলো বহু সাধারণ মানুষকে নিজেদের সাধারণ জীবনের ভেতরেই একধরনের বীরত্ব খুঁজে পেতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
বুকাউস্কির জন্মদিনে (১৬ আগস্ট ১৯২০) তীরন্দাজের অন্য দুটি পোস্টে পড়ুন তাঁর চারটি কবিতা। অনুবাদ করেছেন মাসুদুজ্জামা ও রথো রাফি।
ক্ষয়িষ্ণু মার্কিন সংস্কৃতির ভাষ্যকার চার্লস বুকোভস্কি | মাসুদুজ্জামান | গদ্য

