Site icon তীরন্দাজ

কণিষ্ক ভট্টাচার্য অনূদিত কার্ট ভনেগাট জুনিয়রের ছোটগল্প | তীরন্দাজ অনুবাদ

কার্ট ভনেগাট জুনিয়র (১৯২২-২০০৭) আমেরিকান কথাসাহিত্যিক। অর্ধশতাব্দীর সাহিত্যিক জীবনে ১২টি উপন্যাস, ৩টি ছোটোগল্পের সংকলন, ৫টি নাটক এবং ৫টি নন ফিকশন গ্রন্থের রচয়িতা ভনেগাট। ডার্ক স্যাটায়ারের জন্য তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
2BR02B শীর্ষক গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালের জানুয়ারিতে ‘ওয়ার্ল্ড অফ সায়েন্স ফিকশন’ পত্রিকায়। পরে গল্পটি তার ‘বোগাম্বো স্নাফ বক্স’ (১৯৯৯) বইতে সংকলিত হয়। গল্পের নাম ‘টু বি অর নট টু বি’ শব্দবন্ধ উইলিয়াম শেক্সপিয়রের হ্যামলেট, প্রিন্স অফ ডেনমার্ক নাটক থেকে গৃহীত।

কোনও সমস্যা? জাস্ট একটা ফোন করুন।
এ-ই সব সমাধান করবে – আর সব একইভাবে।

সবকিছুই এক্কেবারে ঠিকঠাক বৃদ্ধি পেয়েছিল।
সেখানে কোনও জেলখানা ছিল না, কোনও বস্তি ছিল না, কোনও পাগলাগারদ নয়, কোনও পঙ্গু নয়, কোনও দারিদ্র নয়, যুদ্ধও না।
সমস্ত রোগকে জয় করা হয়ে গেছে, বার্ধক্যকেও।
মৃত্যু, কেবল কোনও দুর্ঘটনা ছাড়া, ছিল স্বেচ্ছাসেবকদের একটা দুঃসাহসিক কাজ।
উইনাইটেড স্টেটসের জনসংখ্যা চল্লিশ কোটিতে এসে থিতু হয়েছিল।
এক উজ্জ্বল সকালে শিকাগোর মাতৃসদনে, একজন লোক, নাম এডওয়ার্ড কে উয়েলিং জুনিয়র অপেক্ষা করছিল তার স্ত্রীর প্রসবের জন্য। সে একাই অপেক্ষা করছিল। একদিনে এখন আর বেশি বাচ্চা জন্ম নেয় না।
উয়েলিংয়ের বয়স ছাপ্পান্ন, সে প্রায় যুবক একশো ঊনত্রিশ বছরের গড় জনসংখ্যার মধ্যে।
এক্সরেতে দেখা গেছে, তার স্ত্রী একসঙ্গে তিনটি সন্তান জন্ম দিতে চলেছে। এই ওদের প্রথম সন্তান সম্ভাবনা।
যুবক উয়েলিং তার চেয়ারের ওপর ঝুঁকে পড়েছিল, ওর মাথা ওর হাতের ওপর। ও এত বিধ্বস্ত, এমন স্থবির, এমন বিবর্ণ হয়ে বসে ছিল যে প্রায় অদৃশ্য হয়েই ছিল। আর এই ছদ্মবেশ বেশ মানানসই হয়েছে, কারণ ওয়েটিং রুমটাও ভরে ছিল বিস্রস্ত আর নীতিভ্রষ্ট বাতাসে। চেয়ার আর অ্যাশট্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে দেওয়াল থেকে। ধুলো ঝাড়ার কাপড়ে মেঝে ঢেকে রয়েছে।
ঘরটা নতুন করে সাজানো হয়েছে। সাজানো হয়েছে এক স্বেচ্ছামৃত্যুকামীর স্মৃতিসৌধ হিসেবে।
এক খ্যাপাটে বুড়ো, প্রায় দুশো বছর বয়স, একটা মইয়ের ধাপে বসেছিল, একটা ম্যুরাল তৈরি করছিল যেটা তার পছন্দ নয়। আগে যখন মানুষ দৃশ্যত বুড়ো হতো, ওর বয়েস তখন পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি মনে হতো। বয়স তাকে ততটুকুই স্পর্শ করেছে যতটুকু বয়সের চিকিৎসা আবিষ্কারের আগে করতে পেরেছে।
যে ম্যুরাল সে করছিল তাতে এক নিখুঁত বাগান দেখাচ্ছিল। নারী পুরুষ সবাই সাদা পোশাকে, ডাক্তার আর নার্স, মাটি কোপানো, পোঁতা চারাগাছ, কীটনাশক আর সার ছড়ানো।
নারী পুরুষ বেগুনি ইউনিফর্মে আগাছা তুলছিল, বুড়ো হয়ে যাওয়া আর রোগাক্রান্ত গাছ তুলে ফেলছিল, পাতা ছাঁটছিল, আগাছাগুলো পোড়ানোর চুল্লিতে নিয়ে যাচ্ছিল।
না না, কক্ষনও না – এমনকি মধ্যযুগের হল্যান্ড কিংবা প্রাচীন জাপানেও এমন কোনো বাগান ছিল না, যেটা এর থেকে বেশি গোছানো, বা এর থেকে বেশি পরিচর্যা পেয়েছে এমন। এমন উর্বরা মাটি, আলো, জল, বাতাস আর পুষ্টি যা প্রতিটি গাছ তার প্রয়োজন মতো পাচ্ছে।
হাসপাতালের এক আর্দালি করিডোরে নেমে আসে মৃদুস্বরে একটা জনপ্রিয় গান গাইতে গাইতে –
‘আমার চুমু তোমার যদি না ভালো লাগে, সোনা
তা’লে আমি কী করব শোনো,
আমি বেগুনি পোশাকের সেই মেয়েটাকে দেখতে যাব,
এই বেদনার পৃথিবীকে বিদায় জানাব।
আমার ভালোবাসা যদি তুমি না চাও, সোনা,
এই এত বড়ো দুনিয়াটা নিয়ে আমি কী করব বলো?
আমি এই গ্রহটাকে ছেড়ে যাব,
এক মিষ্টি শিশুকে এই স্থান ছেড়ে দেব।’

আর্দালি ম্যুরাল আর শিল্পীর দিকে দেখল। “একদম আসলের মতো,” ও বলে, “আমি প্রায় দেখতে পাচ্ছি যে আমি এর মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছি।”
“তোমার এ কথা মনে হলো কেন যে তুমি এর মধ্যে নেই?” শিল্পী বলল। তারপর একটা বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে বলল, “এটার নাম ‘জীবনের সুখী বাগান’, তুমি জানো।”
“বাহ্, এ তো ডক্টর হিৎজ,” আর্দালি বলল।
*
ও বলছিল সাদা পোশাকের এক পুরুষের কথা, যার মুখটা ডক্টর বেঞ্জামিন হিৎজের মতো, যিনি হাসপাতালের চিফ অবস্টেট্রিশিয়ন। হিৎজকে দারুণ সুন্দর দেখতে।
“আরও অনেক মুখ এখনও বসবে,” আর্দালি বলল। ও বোঝাতে চাইল যে মুরালে এখনও অনেকগুলো দেহের মুখটা খালি আছে। সেই সমস্ত শূন্যতা পূর্ণ হবে হয় হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের মুখাবয়ব দিয়ে অথবা শিকাগোর ‘রাষ্ট্রীয় পরিসমাপ্তি সংস্থা’-এর গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের মুখাবয়ব দিয়ে।
“কোনও কিছুর মতো ছবি বানাতে পারা ব্যাপারটা হেব্বি,’’ আর্দালি বলল।
শিল্পীর মুখ বিরক্তিতে ভরে উঠল। “তোমার মনে হয় আমি এই জঞ্জালটার জন্য গর্বিত?” সে বলল। “তোমার মনে হয় সত্যি জীবন এমন বলে আমি মনে করি?”
“তোমার কী মনে হয়, জীবন কেমন?” আর্দালি বলল।
শিল্পী মাটিতে পড়ে থাকা একটা ঝাড়ু দেখিয়ে বলল, “ওটা বরং তার একটা ভালো ছবি। ওটাকে বাঁধিয়ে নাও, তুমি বরং এর চেয়ে একটা সৎ ছবি পাবে।”
“তুমি একটা বুড়ো ভাম।” আর্দালি বলল।
“কেন? সেটার কি অপরাধ?” শিল্পী জিজ্ঞেস করল।
আর্দালি কাঁধ ঝাঁকায়। “যদি তোমার এখানে ভালো না লাগে, দাদু –” বলে, সে তার কথা শেষ করে একটা টেলিফোন নম্বর টেপে— যে নম্বরটা সেই সব মানুষদের কল করার জন্য যারা আর বাঁচতে চায় না। জিরো নম্বরটা সে জোরে জোরে উচ্চারণ করে “নট”।
নম্বরটা হলো, “টু বি আর জিরো টু বি”।
এটা একটা সংস্থার টেলিফোন নম্বর যাদের কাল্পনিক ডাকনামগুলোর মধ্যে আছে : ‘অটোম্যাট’, ‘বার্ডল্যান্ড’, ‘ক্যানারি’, ‘ক্যাটবক্স’, ‘ডিলুজার’, ‘ইজি-গো’, ‘গুডবাই, মাদার’, ‘হ্যাপি হুলিগান’, ‘কিস-মি-কুইক’, ‘লাকি পিয়ের’, ‘শিপডিপ’, ‘ওয়্যারিং ব্লেন্ডর’, ‘উইপ-নো-মোর’ আর ‘হোয়াই ওয়রি?’
“টু বি অর নট টু বি” হলো পৌরসভার গ্যাস চেম্বারের নম্বর, যেটা চালায় ‘রাষ্ট্রীয় পরিসমাপ্তি সংস্থা’।
*
শিল্পী আর্দালিকে তাচ্ছিল্য করে বলল, “শোনো হে, আমি যখন বুঝতে পারব যে এটাই যাওয়ার সময়, তখন শিপডিপকে ডাকব না।”
“নিজেই করবে, অ্যাঁ?” আর্দালি বলল। “ঘাঁটা ব্যাপার, দাদু। তোমার পরে যাদের এলাকা খালি করার আছে তাদের কথা একটু ভাববে না?”
শিল্পী একটা অশ্লীল ভঙ্গি করে বুঝিয়ে দিল যে, ‘শেষের সে-দিন’-এর সময় যারা বেঁচে থাকবে তাদের জন্য তার কিছু যায় আসে না। বলল, “সে যদি বলো তবে, দুনিয়া এর জন্যে একটা ভালো ব্যবস্থা করতে পারে, আরও বেশি ঘাঁটা।”
আর্দালি হেসে চলে গেল।
উয়েলিং, সেই হবু বাবা মাথা না তুলেই কিছু একটা বিড়বিড় করল তারপর আবার চুপ করে গেল।
এক কুৎসিত, ভয়ানক মহিলা ছুঁচলো হিলের জুতো পরে লম্বা পা ফেলে ওয়েটিং রুমে এল। তার জুতো, স্টকিংস, রেইন কোট, ব্যাগ, বিদেশি টুপি সব বেগুনি রঙের। এই বেগুনি রংটাকে শিল্পী বলে, ‘শেষ বিচারের দিনের আঙুরের রঙ।’
তার বেগুনি ব্যাগে মেডেলের মতো একটা ধাতব চাকতিতে রাষ্ট্রীয় পরিসমাপ্তি সংস্থার পরিষেবা বিভাগের একটা প্রতীক করা, একটা ঘূর্ণায়মান দরজার ওপরে একটা ঈগল বসে আছে।
মহিলার মুখে অজস্র লোম – চোখে পড়বেই এমন এক গোঁফের রেখা। গ্যাস চেম্বারের সহায়িকাদের একটা আগ্রহজনক ব্যাপার হলো, তারা যতই সুন্দরী আর লালিত্যময় হোন না কেন, সশস্ত্র বাহিনীতে ঢোকার বছর পাঁচেকের মধ্যেই এই আগাছাটি জন্মে যায়।
“এখানে আসার জন্যেই আমাকে বলা হলো?” সে শিল্পীকে বলে।
“সেটার বেশিরভাগটাই নির্ভর করবে যে তুমি কী কাজে এসেছ,” সে বলল। “তোমার নিশ্চয়ই একটা বাচ্চা হবে না, হবে কি?”
“ওরা তো আমাকে বলল আমাকে কোনও একটা ছবির জন্য কিছু পোজ দিতে হবে,” সে বলল। “আমার নাম লিওরা ডানকান।” বলে সে অপেক্ষা করতে লাগল।
“তুমি কি সেই আক্রমণকারীদের একজন?” শিল্পী বলল।
“কী?” সে বলে।
“বাদ দাও।” শিল্পী বলে।
“এটা সত্যিই একটা সুন্দর ছবি,” লিওরা বলল। “ঠিক যেন স্বর্গ বা ওই রকম কিছু।”
“ওই রকম কিছু,” শিল্পী বলে। সে তার তামাক রাখার পকেট থেকে একটা নামের তালিকা বের করে। “ডানকান, ডানকান, ডানকান,” তালিকায় চোখ রেখে খুঁজতে খুঁজতে সে বলে। “হ্যাঁ – এই তো তুমি। তুমিই অমর হওয়ার অধিকারী। যে কোনও একটা মুখহীন দেহ বেছে নাও যেখানে তোমার মুণ্ডুটা তুমি বসাতে চাও। তোমার কাছে অবশ্যি বেশি বেছে নেওয়ার সুযোগ আর নেই।”
সে শীতল চোখে গোটা ম্যুরালটা দেখল। “ওহ, এই সবকটাই আমার কাছে সমান। আমি আর্টের কিছু বুঝি না।”
“একটা দেহ, একটা শরীর তো?” শিল্পী বলে, “বেশ। একজন সেরা শিল্পী হিসেবে আমি তোমাকে বলছি, এই দেখ, এই দেহটা নাও, এখানে।” সে দেখায় একটা মুখাবয়বহীন মহিলার দেহ, যে খানিক শুকনো ঘাস বয়ে নিয়ে জঞ্জাল পোড়ানোর চুল্লির দিকে যাচ্ছে।
“আচ্ছা,” লিওরা ডানকান বলে, “ওরা তো সেই জঞ্জাল জ্বালানোর লোক, তাই না? মানে, আমি তো চাকরি করি। আমি কিছু জ্বালাই না।”
শিল্পী ব্যঙ্গ করে হাততালি দেয়। “এই যে বললে আর্ট সম্পর্কে তুমি কিছু জানো না, তার পরেই তোমার কথায় দেখছি তুমি এ ব্যাপারে আমার থেকে ভালো জানো! বটেই তো, ঘাসের আঁটি বওয়ার লোক ব্যাপারটা তো একজন সহায়িকার জন্যে ঠিক নয়! একজন লুকোনো বন্দুকবাজ কিংবা গাছের শুকনো ডাল কাটার লোক ব্যাপারটা বরং তোমার সঙ্গে যাবে।” সে বেগুনি পোশাকের আরেকজনকে দেখায় যে করাত দিয়ে আপেল গাছের একটা শুকনো ডাল কাটছে। “এটা কেমন?” সে বলে, “ওঁকে কি তোমার একটুও পছন্দ হয়?”
“আরিব্বাস –” সে বলে, আর লজ্জায় লাল আর বিনয়ী হয়ে ওঠে। — “ওটা—ওটা হলে আমি ঠিক ডক্টর হিৎজের পাশে থাকব।”
“তোমার সেটা খারাপ লাগবে না?” শিল্পী বলে।
“কী যে বলো, এক্কেবারে না!” সে বলে, “সেটা – সেটা তো ভীষণ সম্মানের।”
“ওহ, তুমি ওঁকে পছন্দ করো?” সে বলল।
“কে ওঁকে পছন্দ করে না?” হিৎজের ছবিতে একবার পুজো করার মতো হাত নাড়ে সে। ছবিটা রোদ-লাগা চামড়া, সাদাচুলের সর্বশক্তিমান জিউসের ছবি, দুশো চল্লিশ বছর বয়স। “কে ওঁকে পছন্দ করে না?” সে আবার বলে। “উনিই দায়িত্ব নিয়ে শিকাগোর প্রথম গ্যাস চেম্বারটা তৈরি করেন।”
“এর থেকে বেশি আনন্দ আমার আর কিছুই হতে পারে না যে,” শিল্পী বলল, “তোমাকে আমি ওর পাশে চিরস্থায়ী করতে পারব। করাত দিয়ে একটা ডাল কেটে নেওয়া মহিলাটি – সেটাই তোমায় সবচেয়ে মানাবে তো?”
“ওটাই আমার কাজের সঙ্গে মানাবে,” মহিলা বলল। তার কাজ সম্পর্কে সে বেশ গর্বিত। সে যা করে সেটা হলো, সে যখন মানুষ খুন করে সে সময় তাদের একটু স্বস্তি দেওয়া।
*
আর যখন লিওরা ডানকান ছবির জন্য পোজ দিচ্ছিল, ওয়েটিং রুমে ডক্টর হিৎজ নিজে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি সাত ফুট লম্বা, তিনি গুরত্বপূর্ণ, প্রশংসাসূচক, আনন্দময় গলায় কথা বলেন।
“বেশ, মিস ডানকান! মিস ডানকান!” ইয়ার্কি করে বললেন, “তুমি এখানে কী করছ? এখানে তো মানুষ বাস করে না। এখানে বরং তারা আসে!”
“আমরা একই ছবিতে থাকতে চলেছি, একসঙ্গে,” লজ্জিতভাবে মহিলা বলল।
“খুব ভালো!” ডক্টর হিৎজ বললেন, “একই ছবিতে, না?”
“অবশ্যই, আমি আপনার সঙ্গে থাকতে পেরে খুবই গর্বিত,” সে বলল।
“তাহলে শোনো,” তিনি বললেন, “আমিও সম্মানিত এটাতে তোমার সঙ্গে থাকতে পেরে। তোমার মতো নারীকে ছাড়া, এই যে অভূতপূর্ব পৃথিবীটা আমরা পেয়েছি, সেটা সম্ভব হতো না।”
তিনি লিওরাকে স্যালুট করলেন আর প্রসূতি কক্ষের দরজার দিকে গেলেন। “আন্দাজ করো তো এখনই কী জন্মালো?” তিনি বললেন।
“পারব না।” সে বলল।
“তিনটে বাচ্চা একসঙ্গে।” তিনি বললেন।
“তিনটে!” – তিনটে বাচ্চা জন্মাবার আইনি অর্থ মনে করে সে চমকে প্রায় চিৎকার করে উঠল।
আইন অনুসারে, কোনও সদ্যজাত বাচ্চা বাঁচবে না, যদি না সেই বাচ্চার মা-বাবা এমন একজনকে খুঁজে পান যিনি তার বদলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে মরে যেতে রাজি থাকবেন। তিনটে বাচ্চা, যদি তাদের সবাইকে বাঁচাতে হয় তাহলে তিনজন হাজির করতে হবে।
“বাবা-মার কি তিনজন স্বেচ্ছাসেবক আছে?” লিওরা ডানকান জিজ্ঞেস করল।
“শেষ পর্যন্ত আমি যা শুনেছিলাম,” ডক্টর হিৎজ বলেন, “ওদের মাত্র একজন আছে, আর দুজনের জন্য টানাটানি চলছে।”
“আমার মনে হয় না ওরা জোগাড় করতে পারবে,” লিওরা বলে। “আমাদের সঙ্গে কেউ তিনটে অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখেনি। একটার বেশি আজ হবে না, যদি না কেউ আমি আসার পরে কল করে থাকে। নাম কী?”
“উয়েলিং,” অপেক্ষারত বাবা উত্তর দেয়, বসে থেকে থেকে জমে যাওয়া লোকটির লাল চোখ। “এডওয়ার্ড কে উয়েলিং জুনিয়র, হলো এই সুখী হবু বাবার নাম।
সে তার ডান হাত তোলে, দেয়ালের একটা দাগের দিকে তাকিয়ে দুর্ভাগার মতো কর্কশ হাসি দিয়ে বলে, “উপস্থিত।”
“ওহ্ মিস্টার উয়েলিং,” ডক্টর হিৎজ বলেন, “আমি আপনাকে দেখিনি।”
“এক অদৃশ্য মানুষ,” উয়েলিং বলে।
“ওরা আমাকে ফোন করেছিল যে আপনার একসঙ্গে তিনটে সন্তান হয়েছে,” ডক্টর হিৎজ বললেন। “তারা সব্বাই ভালো আছে, তাদের মা-ও। আমি ওদের দেখতে যাচ্ছি।”
“হুররে,” উয়েলিং বলল, কিন্তু ফাঁপা গলায়।
“গলা শুনে তো মনে হচ্ছে না যে খুশি হয়েছ,” ডক্টর হিৎজ বললেন।
“আমার ভিতরের মানুষটা কি খুশি হতে পারে না?” উয়েলিং বললো হাতটাত নেড়ে, যেন তার কিছু যায় আসে না, যেন খুব সহজ ব্যাপার একটা। “আমায় শুধু যা করতে হবে তা হলো, ওই তিনজনের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হবে যে বাঁচবে, তারপর আমার দাদুকে হ্যাপি হুলিগানের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, আর রিসিপ্টটা নিয়ে ফেরত আসতে হবে।”
*
ডক্টর হিৎজ উয়েলিংএর দিকে ফিরে কড়া গলায় বললেন, “তুমি জন্ম নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করো না, উয়েলিং?”
“আমি এটাকে ভীষণ মানি,” উয়েলিং শক্ত হয়ে বলল।
“তুমি কি সেই আগেকার সুন্দর দিনে ফিরে যেতে চাও, যখন বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল কুড়ি বিলিয়ন – হতে চলেছিল চল্লিশ বিলিয়ন, তারপর আশি বিলিয়ন, তারপর একশো ষাট বিলিয়ন? তুমি জানো মিস্টার উয়েলিং, ড্রুপেলেট কী?” হিৎজ বললেন।
“না,” উয়েলিং হতাশ ভাবে বলে।
“ড্রুপেলেট হলো, মিস্টার উয়েলিং, এক-একটা কোয়া, ব্ল্যাকবেরির এক-একটা শাঁসালো কোয়া,” ডক্টর হিৎজ বলেন, “জন্ম নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মানুষ এখন এই মাটিতে, এই বুড়ো গ্রহটার গায়ে ওই ব্ল্যাকবেরির ফুলো ফুলো কোয়াগুলোর মতো লেগে থাকত! এটা ভেবো।”
উয়েলিং একইভাবে দেওয়ালের ওই একই জায়গায় তাকিয়ে থাকল।
“দুহাজার সালে,” ডক্টর হিৎজ বললেন, “বিজ্ঞানীরা এগিয়ে এসে জোর করে বোঝানোর আগে সেখানে এমনকি যথেষ্ট পানীয় জল অবধি ছিল না, সামুদ্রিক লতাপাতা ছাড়া খাবার ছিল না কিছু – আর এখনও মানুষ তাদের বাচ্চা হওয়ার অধিকারের কথা বলে যায় কুকুর-বেড়ালের মতো। তার ওপর তাদের নাকি অধিকার, সম্ভব হলে চিরকাল বেঁচে থাকা।”
“আমি ওই বাচ্চাগুলোকে চাই,” শান্তভাবে উয়েলিং বলে, “ওই তিনটে বাচ্চাকেই।”
“অবশ্যই তুমি চাও,” ডক্টর হিৎজ বলেন, “সেটাই মানবিক।”
“আর এটাও চাই না যে আমার দাদু মারা যাক,” উয়েলিং বলল।
“নিকট আত্মীয়কে কেউই ক্যাটবক্সের কাছে দিয়ে আসতে খুশি হয় না,” ডক্টর হিৎজ নরম গলায় সমব্যথীর মতো বলেন।
“লোকজনের এরকম বলা উচিত না,” লিওরা ডানকান বলে ওঠে।
“কী বলা উচিত না?” ডক্টর হিৎজ বলেন।
“লোকজনের ওটাকে এই সব ক্যাটবক্সের মতো নামে ডাকা উচিত না,” সে বলে, “এতে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যায়।”
“তুমি একদম ঠিক বলেছ,” ডক্টর হিৎজ বলেন, “সরি, তুমি আমাকে ক্ষমা করো।” তিনি নিজেকে সংশোধন করে নেন, আর পৌরসভার গ্যাস চেম্বারের সরকারি নামটা বলেন যেটা কেউ কোনও দিন ব্যবহার করে না। “আমার বলা উচিত ছিল, ‘নৈতিক আত্মহননের কলাভবন’, হিৎজ বললেন।
“এটা অনেক বেশি ভালো শোনায়,” লিওরা ডানকান বলে।
“তোমার এই সন্তানটি – ওদের মধ্যে যেই একটিকে তুমি রাখতে চাও, মিস্টার উয়েলিং,” ডক্টর হিৎজ বলেন, “সেই ছেলে বা মেয়েটি বাঁচতে চলেছে এক সুখী, প্রশস্ত, পরিচ্ছন্ন, ধনী গ্রহে, আর তার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের। ওই ম্যুরালের মতো একটা বাগানে সে বাঁচবে।” তিনি মাথা নাড়েন। “দুই শতক আগে, যখন আমি যুবক ছিলাম, এটা একটা নরকের মতো ছিল, কেউ ভাবত না যে সে আর কুড়ি বছর বাঁচতে পারবে এখানে। এখন এই শান্তি আর প্রাচুর্য যে এই শতাব্দীতে আমাদের কাছে এসেছে তাতে সেই কল্পনাটা বিচরণের স্থান পাচ্ছে।”
তিনি হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন।
কিন্তু সেই হাসি মুছে গেল উয়েলিং একটা রিভলবার বের করেছে দেখে।
এক গুলিতে উয়েলিং ডক্টর হিৎজকে মেরে ফেলল। “এই তো একজনের জায়গা হলো – অনেক, যথেষ্ট বড়ো জায়গা,” সে বলে।
তারপর সে গুলি করল লিওরা ডানকানকে। “এটা কেবল একটা মৃত্যু,” যখন ডানকান পরে গেল তখন তাকে সে বলল। “এই তো! দুজনের জায়গা হলো।”
কেউ দৌড়ে এলো না। কেউ আপাতদৃষ্টিতে শব্দটা শোনেনি।
শিল্পী সেই মইয়ের ওপর বসে সেই দুঃখজনক দৃশ্যটি দেখল।
*
শিল্পী জীবনের এই শোকাবহ ধাঁধার কথা ভেবে আলোড়িত হলো যে, জীবন চায় জন্মাতে, একবার জন্মালে জীবন ফলবান হতে চায়… নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চায়, বাঁচতে চায় যত বেশিদিন সম্ভব – আর সেই সব হবে একটা ছোট্ট গ্রহে যেটাকে চিরকাল থেকে যেতে হবে।
সমস্ত উত্তর যা শিল্পী ভাবতে পারত তার সবই ভয়ানক। এমনকি একটা ক্যাটবক্স, একটা হ্যাপি হুলিগান্স, একটা ইজি গো-র থেকেও বেশি ভয়ানক। সে যুদ্ধের কথা ভাবল। সে প্লেগের কথা ভাবল। সে অনাহারের কথা ভাবল।
সে জানত যে সে আর কক্ষনও আঁকতে পারবে না। সে তার তুলিটাকে মেঝেতে ঝাড়নের ওপরে পরে যেতে দিল। তারপরে সে সিদ্ধান্ত নিল যে সে এই জীবন থেকে অনেক পেয়েছে, এই ‘জীবনের সুখী বাগান’ থেকেও, আর সে সেই মই থেকে নেমে এলো।
সে উয়েলিংয়ের পিস্তলটা নিল আর আন্তরিক ভাবে নিজেকে গুলি করতে চাইল।
কিন্তু তার সেই স্নায়ুর জোর ছিল না।
আর তারপরে ওয়েটিং রুমের কোণে টেলিফোন বুথটা দেখতে পেল। সে ওটার কাছে গেল, মুখস্থ হয়ে যাওয়া নম্বরটা ডায়াল করল, “টু বি নট টু বি।”
“রাষ্ট্রীয় সমাপ্তিকরণ আয়োগ,” এক সহায়িকা উষ্ণ কণ্ঠস্বরে বলল।
“একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট কী করে পেতে পারি?” খুব সচেতন উচ্চারণে সে জিজ্ঞেস করল।
“আমরা আপনাকে আজ সন্ধের দিকে বোধহয় ব্যবস্থা করতে পারব, স্যর,” সহায়িকা বলল। “এমনকি এটা আগেও হতে পারে যদি কেউ ক্যানসেল করে।”
“ঠিক আছে,” শিল্পী বলল, “যদি আপনি দয়া করে ব্যবস্থা করে দেন।” শিল্পী নিজের নাম তাকে বানান করে বলে।
“ধন্যবাদ, স্যর,” সহায়িকা বলল। “আপনার শহর আপনাকে ধন্যবাদ জানায়; আপনার দেশ আপনাকে ধন্যবাদ জানায়; আপনার গ্রহ আপনাকে ধন্যবাদ জানায়। কিন্তু সবচেয়ে আন্তরিক ধন্যবাদ আপনাকে জানাচ্ছে আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।”

কণিষ্ক ভট্টাচার্য

কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক। জন্ম কলকাতায় ১৯৭৬ সালে। পড়াশোনা যাদবপুর ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পেশা শিক্ষকতা। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে তিনটি অনুবাদ গ্রন্থ রয়েছে। প্রকাশিত গল্প সংকলন তিনটি। ভারতের ও বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। kanishka.mailbox@gmail.com

Exit mobile version