মধ্যরাতের শহর। ঘুমিয়ে আছে। এই শহরেরই কোনো এক অন্ধকার ঘরের কোণে একজন মানুষ জেগে আছে। দেয়ালের সঙ্গে কথা বলছে। মৃত মানুষের কণ্ঠ শুনছে অথবা এমন কোনো সত্য উচ্চারণ করছে, যেটি দিনের আলোয় উচ্চারণ করা সভ্য মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক। বাইরে থেকে তাকে দেখে আমরা হয়তো বলতে পারি—লোকটি বদ্ধ উন্মাদ। কিন্তু যদি তার কথার ভেতরে এমন কোনো সত্য লুকিয়ে থাকে, যা সুস্থ বলে স্বীকৃত মানুষেরা শুনতে চায় না; যদি তার অসংলগ্ন বাক্যের ফাঁকে ফাঁকে সভ্যতার সুসংগঠিত মিথ্যেগুলো হঠাৎ নগ্ন হয়ে ধরা দেয়; আর আমরা যাকে উন্মাদনা বলছি, সেটিই যদি হয়ে ওঠে এমন এক ভাঙা আয়না, যেখানে সমাজ নিজের সুস্থ মুখটি দেখতে গিয়ে তার বিকৃত প্রতিবিম্ব আবিষ্কার করে বসে—এখানেই ‘উন্মাদনা’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিসর অতিক্রম করে সাহিত্য, দর্শন, শিল্প ও ক্ষমতা-সম্পর্কের বহুস্তরীয় গভীর নন্দনতাত্ত্বিক জিজ্ঞাসায় পরিণত হয়।
শেক্সপিয়রের হ্যামলেটের দিকে তাকালেই এই নন্দনতাত্ত্বিক প্রশ্নটি বারবার আমাদের সামনে আসে। আর আখ্যানভাগে হঠাৎ প্রিন্স হ্যামলেটের সামনে আসে তার প্রয়াত পিতার প্রেতাত্মা। সে পুত্র হ্যামলেটকে জানায় তার হত্যার বৃত্তান্ত। রাজদরবারের চারদিকে ছদ্মবেশ, গুপ্তচরবৃত্তি, বিশ্বাসঘাতকতা ও নৈতিক পচন। এমন এক পরিস্থিতিতে হ্যামলেট নিজেই উন্মাদের অভিনয় বেছে নেয়। কিন্তু এ অভিনয়ের কোথায় সমাপ্তি আর মানসিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনাই বা কোথা থেকে শুরু—শেক্সপিয়র সেই রেখাটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রাখেন। হ্যামলেটের তথাকথিত ‘madness’ তাই একই সঙ্গে ‘মুখ ও মুখোশ’ এবং সত্য-উন্মোচনের এক নান্দনিক কৌশল।
দুই.
মার্কিন কবি সিলভিয়া প্লাথ বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে মানসিক রোগ ও আত্মহত্যার মতো সামাজিক নিষিদ্ধ বিষয়গুলোকে তাঁর ‘কনফেশনাল পোয়েট্রি’ বা স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার মূল উপজীব্য করে তোলেন। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও বিষণ্ণতার মধ্য দিয়ে গিয়েও তিনি অত্যন্ত সৃজনশীলভাবে এই বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। তাঁর ‘লেডি লাজারাস’ কবিতায় তিনি আত্মহত্যার চেষ্টাকে একদিকে একটি রূপক প্রদর্শনী হিসেবে উপস্থাপন করে সমাজ ও চিকিৎসকদের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছেন, অপরদিকে কবির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে লেখা ‘টিউলিপস’ কবিতায় তিনি বাস্তব পৃথিবীর যন্ত্রণা ও দায়িত্ব থেকে মুক্তির এবং শূন্যতার গভীরে ডুবে থাকার এক অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা ফুটিয়ে তুলেছেন।
অবশ্য উন্মাদনার প্রশ্নে সভ্যতার সবচেয়ে অস্বস্তিকর আর ধোঁয়াশাময় বিষয়ের ওপরে আলোকসম্পাত করেছিলেন মিশেল ফুকো। Madness and Civilization গ্রন্থে তিনি কেবল মানসিক ব্যাধির চিকিৎসা-বৈজ্ঞানিক ইতিহাস লেখেননি; অনুসন্ধান করেছেন ইউরোপীয় সমাজ বিভিন্ন সময়ে কীভাবে ‘reason’ এবং ‘unreason’-এর সীমানা নির্মাণ করেছে এবং সেই সীমানার বাইরে থাকা মানুষকে কীভাবে বিচ্ছিন্ন, আবদ্ধ ও নীরব করেছে। তাঁর ঐতিহাসিক বিবরণের বিভিন্ন দিক নিয়ে পরবর্তী গবেষণায় বিতর্ক থাকলেও মৌল প্রশ্নটি প্রবল—উন্মাদনা কি কেবল একটি চিরস্থির প্রাকৃতিক শ্রেণি, যাকে বিজ্ঞান একদিন শনাক্ত করেছে, না কি সমাজ, প্রতিষ্ঠান, জ্ঞান ও ক্ষমতা নির্ধারণ করে দেয় কোন আচরণটি স্বাভাবিক আর কোনটিকে অস্বাভাবিক বলে গণ্য করা হবে? নির্বাসন, confinement, asylum, চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ—এসবের মধ্য দিয়ে ‘পাগল’ মানুষ ক্রমশ এমন এক object-এ পরিণত হতে পারে, যার সম্পর্কে অন্যেরা কথা বলে, অথচ যার নিজের কণ্ঠ ক্রমশ অশ্রুত থেকে যায়। এখানেই ফুকোর ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি উন্মোচিত হয় : যে-প্রতিষ্ঠান সংজ্ঞা নির্ধারণ করে, সে শুধু ব্যাধির নাম দেয় না; স্বাভাবিকতার সীমানাতেও অস্বাভাবিক ভাঙন ধরায়।
এই ভাঙনের আরও তীব্র দার্শনিক রূপ নীৎশের মধ্যে মেলে। যদিও তাঁর শেষ জীবনের মানসিক বিপর্যয়কে তাঁর দর্শনের ব্যাখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত; তাঁর চিন্তার শক্তি ও পরবর্তী অসুস্থতাকে সরল ‘কারণ ও ফল'(cause and effect)-এর সম্পর্কে বাঁধা যায় না। কিন্তু তাঁর দর্শন নিজেই সভ্যতার তথাকথিত সুস্থ মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড হাতুড়ি। The Birth of Tragedy-তে তিনি গ্রিক শিল্পের ভেতরে দুটি নন্দনশক্তি দেখেছিলেন—Apollonian এবং Dionysian। অ্যাপোলোনীয় হলো মাপ, সীমা, স্বচ্ছতা, রূপ, আত্মসংযম; ডায়োনিসীয় হলো উন্মত্ততা, সংগীত, নেশা, সীমাভঙ্গ, ব্যক্তিসত্তার সাময়িক বিলোপ। সভ্যতা যদি কেবল অ্যাপোলোনীয় হতে চায়—পরিপাটি, নিয়ন্ত্রিত, যুক্তিসিদ্ধ—তবে সে মানুষের অস্তিত্বের অভ্যন্তরীণ অন্ধকারের অর্ধেকটিকে নির্বাসিত করে। গ্রিক ট্র্যাজেডির মহত্ত্ব নীৎশের কাছে এই কারণে যে, সেখানে রূপ ও উন্মত্ততা, স্বপ্ন ও আতঙ্ক, সৌন্দর্য ও ধ্বংস পাশাপাশি সহাবস্থান করে।
‘পাগলামির নন্দন’ বুঝতে এই ডায়োনিসীয় সূত্রটি গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প কখনো শৃঙ্খলা নির্মাণ করে, আবার কখনো শৃঙ্খলার মুখোশ ছিঁড়ে দেয়। একটি কবিতা ব্যাকরণ মেনে চলেও অর্থের ব্যাকরণ ভাঙতে পারে; একটি চিত্র মানুষের মুখ বিকৃত করেও মানুষের সত্যকে আরও তীব্র করতে পারে; একটি নাটক যুক্তির পৃথিবীতে এমন চরিত্র হাজির করতে পারে যার অসংলগ্ন কথাই সবচেয়ে সঙ্গত।
তিন.
এইখানেই উন্মাদনার ভাষা থেকে আরেকটি আপাত-অর্থহীন অথচ নন্দনতাত্ত্বিকভাবে উর্বর অঞ্চলে প্রবেশ করা যায়—সেটি হলো nonsense। জ্যঁ-জ্যঁ লেসারক্লে তাঁর Philosophy of Nonsense-এ ভাষার নিছক ব্যর্থতা কিংবা অর্থের শূন্যস্থান হিসেবে ননসেন্সকে অবলোকন করেন না; লুইস ক্যারল ও এডওয়ার্ড লিয়ারের মতো লেখকদের রচনার ভিতর দিয়ে তিনি দেখান, ভাষা যখন তার স্বীকৃত যুক্তি, ব্যাকরণ ও অর্থের সীমা নিয়ে খেলতে শুরু করে, তখন সেই ভাঙন থেকেই অন্য ধরনের অর্থের সম্ভাবনা জন্ম নিতে পারে। ননসেন্স অর্থের মৃত্যু নয়; কখনো তা অর্থের প্রাচুর্য—একটি শব্দ অভিধানে যে পরিমাণ অর্থ বহন করার অনুমতি পেয়েছে, সাহিত্য তাকে তার চেয়েও দূরে ঠেলে দেয়। ভাষা তখন যোগাযোগের অনুগত বাহন না থেকে নিজেই হয়ে ওঠে ঘটনা। শব্দ তখন আর শুধু কোনো বস্তুকে নির্দেশ করে না; ধ্বনি, ছন্দ, দ্ব্যর্থতা, ব্যাকরণিক বিপর্যয় ও অপ্রত্যাশিত সংযোগের মধ্য দিয়ে সে এমন একটি ভাষিক ভূদৃশ্য নির্মাণ করে, যেখানে প্রচলিত যৌক্তিক পরিকাঠামো সাময়িকভাবে তার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব হারায়।
লেসারক্লের এই পাঠ ‘পাগলামির ভাষা’ সম্পর্কে আরও সূক্ষ্মভাবে ভাবতে শেখায়। Nonsense এবং madness এক নয়; কিন্তু সভ্যতার যুক্তিকেন্দ্রিক ভাষা উভয়কেই প্রায় একই সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিতে চেয়েছে—যেখানে বাক্য আর অনুমোদিত অর্থের বিধি মেনে চলে না। অথচ সাহিত্য বারবার দেখিয়েছে, একটি বাক্য প্রচলিত অর্থের পথ থেকে সরে গিয়েও নন্দনতাত্ত্বিকভাবে গভীর হতে পারে; আপাত-অসংলগ্ন শব্দসমষ্টিও মানুষের এমন কোনো অনুভবের কাছে পৌঁছাতে পারে –যেখানে সরল বিবৃতির প্রবেশাধিকার নেই। লুইস ক্যারলের এলিস যখন এমন এক জগতে প্রবেশ করে যেখানে শব্দ, পরিচয়, আকার, সময় ও যুক্তির প্রচলিত নিয়ম ক্রমাগত বদলে যায়, আজব জায়গা তখন শুধু শিশুসাহিত্যের কৌতুকলোক হয়ে থাকে না; হয়ে ওঠে যুক্তির স্বৈরনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে ভাষার এক কার্নিভ্যাল। প্রশ্ন জাগে—ভাষা কি কেবল আমাদের চিন্তাকে প্রকাশ করে, না কি ভাষার নিয়মই অনেকাংশে নির্ধারণ করে আমরা কীভাবে চিন্তা করব? আর সেই নিয়ম ভেঙে গেলে অর্থ বিলুপ্ত হয়, না কি এতদিন অদৃশ্য থাকা অন্য অর্থগুলো হঠাৎ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে?
এইখানে লেসারক্লেকে ফুকোর পাশে রাখলে আরেকটি দরজা খুলে যায়। ফুকো জিজ্ঞেস করেন, সমাজ কোন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায় যুক্তি ও যুক্তিহীনতার সীমা টানে; লেসারক্লে দেখান, ভাষার ভিতরেও সেন্স ও ননসেন্সের সীমা নির্মিত হয়। একদিকে সমাজ বলে—এই আচরণ স্বাভাবিক, আর ওটি অস্বাভাবিক; অন্যদিকে ভাষিক রীতি বলে—এই বাক্য অর্থপূর্ণ, আর অন্যটি অর্থহীন। সাহিত্য যেন সেই দুই সীমারেখারই অবাধ্য সন্তান।
এই ভাষিক ভাঙনের সঙ্গে নীৎশের ডায়োনিসীয় নন্দনেরও গোপন আত্মীয়তা রয়েছে। অ্যাপোলোনীয় রূপ সীমা টানে, পরিমাপ করে, বিন্যাস দেয়; ডায়োনিসীয় শক্তি সেই সীমাকে তরল করে। ননসেন্স ভাষার ভেতরে কখনো অনুরূপ কাজ করে—বাক্যরীতি (syntax০ থাকে, আবার তাকে ব্যঙ্গও করে; পরিচিত শব্দের উপস্থিতি থাকলেও অভিধানের স্থির অর্থ থেকে সে সরে যায়; সেখানে যুক্তির কাঠামোও দেখা যায়, অথচ তার ভেতরে যুক্তির পা প্রায়শই পিছলে যায়। ফলে ননসেন্সকে অ্যাবসার্ডের সঙ্গে একাকার করে দেখলে চলবে না। ননসেন্স প্রধানত ভাষার অর্থ-উৎপাদনের নিয়মকে বিপর্যস্ত করে; অ্যাবসার্ড মানুষের অর্থের আকাঙ্ক্ষা ও উত্তরহীন বিশ্বের সংঘর্ষকে প্রকাশ করে অবলীলায়। প্রথমটি ভাষার সীমানায় বিদ্রোহ, দ্বিতীয়টিও বিদ্রোহ ,তবে অস্তিত্বের সীমানায়। কিন্তু উভয়ের নন্দনই আমাদের পরিচিত নিশ্চয়তা থেকে উৎখাত করে, যখন আমরা নিশ্চিতরূপে ধরে নিই পৃথিবী অবশ্যই আমাদের বোধের নিয়ম মেনে চলবে, কিন্তু বাস্তবে সেটি আর ক্রিয়াশীল থাকে না।
কাম্যুর কাছে অ্যাবসার্ডের উৎস আরও গভীরে; মানুষ সবকিছুরই অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে চায়, কিন্তু মহাবিশ্ব তার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা স্বীকার করে না। মানুষের এই অর্থের অনুসন্ধিৎসা এবং বিশ্বের নীরবতার সংঘর্ষেই জন্ম নেয় অ্যাবসার্ড। এই নীরবতার সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ নয়, সচেতনভাবে বেঁচে থাকাই হলো সিসিফাসের পাথর আবার পাহাড়ে ঠেলে তোলা।
বেকেটের Waiting for Godot-এ সংকটটি আরও নিরাভরণ। দু’জন মানুষ অপেক্ষা করে এমন একজনের জন্য, যে কখনোই আসে না; কথোপকথন চলে, সময় বয়ে যায়, পুনরাবৃত্তি ঘটে, অথচ প্রচলিত নাটকের প্রত্যাশিত হ্যাপি এন্ডিং যেন অনুপস্থিত। ‘কিছু না ঘটার’ মধ্যেই অমীমাংসিত নাটকের পর্দা নাটকীয়ভাবে নেমে যায় তামাশার রঙ্গশালায়। সভ্যতা আমাদের শেখায় প্রতিটি যাত্রার একটি গন্তব্য থাকবে, প্রতিটি প্রতীক্ষার প্রহর শেষে কেউ আসবে, প্রতিটি প্রশ্নের একটি উত্তর থাকবে–অথচ এর বিপরীতে বেকেট শুধু একটি অনাড়ম্বর প্রশ্ন রাখেন—যদি কোনো উত্তর না থাকে? তখন অপেক্ষাই হয়ে ওঠে জীবনের প্রতিচ্ছবি, আর ম্যাড়মেড়ে পুনরাবৃত্তিই হয়ে ওঠে সময়ের দৃশ্যমান অন্ধকার।
চিত্রকলায় গয়া এই প্রশ্নকে আরও অন্ধকারে নিয়ে যান। তাঁর The Sleep of Reason Produces Monsters যেন আলোকায়নের আত্মবিশ্বাসের পাশে ঝুলে থাকা এক সতর্ক ঘণ্টা। যুক্তি ঘুমালে দানব জন্মায়—কিন্তু শুধু যুক্তির আলো জ্বালিয়েই কি মানুষের সমস্ত অন্ধকার দূর করা যায়? মানুষের ভেতরে ভয় আছে, কামনা আছে, হিংসা আছে, স্বপ্ন আছে, হতাশা আছে, বিষাদের প্রচ্ছায়া আছে, আছে আত্মহননের প্রবৃত্তি । আর ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বে সামাজিক শৃঙ্খলা গড়ে ওঠে প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণ ও অবদমনের বিনিময়ে; ফলে সভ্যতা যেমন আমাদের নিরাপত্তা দেয়, আবার অস্বস্তিতেও ফেলে। পরিপাটি সভ্যতার চকচকে মেঝের নিচে তাই একটি অন্ধকার ভূগর্ভ থেকে যায়। আত্মহননের পথ বেছে নেন কবি সিলভিয়া প্লাথ। একই পথের পথিক হন নোবেলজয়ী কথাসাহিত্যিক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতাও (অবশ্য তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে)। তখন প্রশ্নটি অনিবার্যভাবে সামাজিক ও নৈতিক হয়ে ওঠে : ম্যাডনেস কখন সমাজশাসিত মূল্যবোধ ও তথাকথিত সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে? এর একক উত্তর নয় বরং অনেক অন্তর্ভুক্তির মধ্যে খুঁজে নিতে হয়:
যখন ‘স্বাভাবিকতা’ ক্ষমতার সুবিধাজনক সংজ্ঞায় পরিণত হয়; যখন প্রশ্ন না করাকে সুস্থতা, আনুগত্যকে শিষ্টতা, ভিন্নতাকে বিকৃতি এবং প্রতিবাদকে অসংযম বলে চিহ্নিত করা হয়। ইতিহাসে নারী, দরিদ্র, উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক মানুষকে বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসা, নৈতিকতা বা শৃঙ্খলার ভাষায় ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রতিষ্ঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রবণতা রয়েছে। ফুকোর গুরুত্ব এখানেই—তিনি রোগের বাস্তবতা অস্বীকার করতে বলেন না; বরং রোগ সম্পর্কে জ্ঞান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্কও পরীক্ষা করতে বলেন। চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু চিকিৎসার ভাষা যেন মানুষের কণ্ঠ মুছে না দেয়; বুৎপত্তিগত শ্রেণিবিন্যাসের প্রয়োজন হতেই পারে, কিন্তু শ্রেণিবিন্যাস যেন মানুষটির সমগ্র পরিচয় হয়ে না ওঠে।
এখানেই শিল্প হচ্ছে সভ্যতার এক বিকল্প শ্রবণযন্ত্র। সমাজ যেখানে অসংলগ্নকে শোনে, শিল্প সেখানে নিটোল ছন্দ খুঁজে পায়; সমাজ যেখানে বিকৃতি দেখে, শিল্প সেখানে অভিজ্ঞতার নতুন রূপ আবিষ্কার করে। কিন্তু এই বক্তব্যেরও একটি বিপজ্জনক প্রান্ত রয়ে যায়। যন্ত্রণাকে মহিমান্বিত করলে বাস্তব কষ্ট আড়াল হয়ে যায়। ভ্যান গঘকে ভালোবাসার অর্থ তাঁর মানসিক যন্ত্রণাকে কারো জন্য কামনা করা নয়; নীৎশের দর্শনের শক্তিকে বোঝার অর্থ তাঁর অসুস্থতাকে প্রতিভার প্রমাণ হিসেবে জাহির করা নয়। উন্মাদ প্রতিভার (mad genius) রোমান্টিক মিথ আকর্ষণীয় হলেও তার বিভ্রান্তির জালে জড়িয়ে পড়া নয়। সৃজনের জন্য মানুষকে ভেঙে পড়তে হয় না। বরং শিল্পের বিস্ময়কর ক্ষমতা এই যে, মানুষ কখনো ভাঙনের অভিজ্ঞতাকেও এমন একটি রূপ দিতে পারে, যা ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে অতিক্রম করে সমষ্টিগত উপলব্ধির বাহন হয়ে ওঠে। নন্দনতত্ত্বের দিক থেকে এই রূপান্তরটিই মুখ্য। কাঁচা যন্ত্রণা শিল্প নয়; যন্ত্রণা যখন রূপ, ছন্দ, রং, প্রতীক, দূরত্ব ও বিন্যাস লাভ করে, তখনই তা নান্দনিক অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। নীৎশের ডায়োনিসীয় বিশৃঙ্খলাকে অ্যাপোলোনীয় রূপের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হতে হয়; হ্যামলেটের অন্তর্গত বিপর্যয়কে শেক্সপিয়রের নাট্যকাঠামো পেতে হয়; ভ্যান গঘের অস্থির দৃষ্টিকে রং ও তুলির ছন্দে, মুঙ্কের আতঙ্ককে রেখার কম্পনে শরীর নিতে হয়। মহান শিল্প তাই বিশৃঙ্খলাকে অস্বীকার করে না, আবার তার কাছে আত্মসমর্পণও করে না— শিল্প বিশৃঙ্খলার জন্য এমন একটি রূপ নির্মাণ করে, যার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আমরা নিজেদের অচেনা অন্ধকারকে চিনে নিতে পারি অবলীলায়। নন্দন সম্ভবত বিশৃঙ্খলার অনুপস্থিতি নয়; বিশৃঙ্খলাকে অনুভবযোগ্য রূপ দেওয়ার শিল্প।
আর অ্যাবসার্ডিটির নন্দন জন্ম নেয় নৈমিত্তিক অসামঞ্জস্যের অভিজ্ঞতায়—যার জন্য থাকে না কোনো প্রস্তুতি। মানুষ খোঁজে কারণ, পৃথিবী দেয় আকস্মিকতা; মানুষ চায় ন্যায় , ইতিহাস তাকে প্রত্যক্ষদর্শী করে হত্যাযজ্ঞের ; স্থায়িত্ব চায় মন, শরীর তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়; সে। নিজের একটি স্থির পরিচয় চায়, অথচ নিজের মনই থেকে যায় তার কাছে অপরিচিত। সমাজ, সভ্যতা এই অসামঞ্জস্যের ওপর দৈনন্দিন স্বাভাবিকতার একটি পর্দা টাঙিয়ে রাখে। সেই স্বাভাবিকতার পর্দার বিপরীতে বেকেট অপেক্ষাকে শূন্যতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন, কামু মহাবিশ্বের নীরবতার বিপরীতে মানুষের অর্থতৃষ্ণাকে শোনান, নীৎশে প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের মূর্তিতে হাতুড়ি ঠেকান, ফুকো জানতে চান সেই মূর্তির নির্মাতা কারা। আর হ্যামলেট রাজদরবারের মাঝখানে পাগলের মুখোশ পরে এমন সত্য উচ্চারণ করেন, যা তথাকথিত সুস্থ ভাষায় বলা নিরাপদ নয়। এইখানেই ম্যাডনেস, ননসেন্স এবং অ্যাবসার্ডিটি পরস্পরের কাছাকাছি এসেও নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে আর স্বাভাবিকতার সামাজিক পরিসরকে প্রশ্নবিদ্ধ করে; একদিকে ভাষিক অর্থের হৈ হুল্লোড়কে আরও অস্থির করে তোলে, অপরদিকে অর্থপ্রত্যাশী মানুষের সামনে মহাবিশ্বের নীরব সৌন্দর্যকে দাঁড় করিয়ে দেয় নন্দনের বিমুগ্ধতায়।
চার.
নন্দনভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ঝটপট কয়েকটি দৃশ্যপট ভাবা যাক। সন্ধ্যা নেমে আসছে পশ্চিমের জানালায়। একটি পুরোনো মঞ্চে হ্যামলেট উন্মাদের মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে—ওফেলিয়ার হাত থেকে ফুল ঝরে ঝরে পড়ছে; নীৎশের ডায়োনিসীয় সংগীতের দূরবর্তী ঢেউ এসে লাগছে সভ্যতার পরিপাটি প্রাচীরে; ভ্যান গঘের আকাশে তারাগুলো স্থির থাকতে অস্বীকার করছে; মুঙ্কের সেতুর উপরে একটি মুখ পৃথিবীর সমস্ত নীরব আতঙ্ককে দীর্ঘ চিৎকারে রূপ দিয়েছে; ক্যারলের আজব দেশে শব্দগুলো অভিধানের শাসন এড়িয়ে নিজেদের অর্থ নিয়ে খেলছে; কাফকার ঘরে গ্রেগর সামসা এমন এক শরীরে জেগে উঠেছে, যাকে তার পরিবার আর মানুষ বলে চিনতে চায় না; বেকেটের নির্জন প্রান্তরে দুজন মানুষ অপেক্ষা করছে এমন কারও জন্য, যে সম্ভবত আসবে না; আর ফুকোর ইতিহাসের অন্ধকার করিডরে বহুদিনের বন্ধ দরজার ওপারে রয়ে গেছে সেইসব কণ্ঠ, যাদের সম্পর্কে সভ্যতা বিস্তর কথা বলেছে, কিন্তু যাদের নিজেদের কথা শোনার অবকাশ দিয়েছে খুব কমই।
সবশেষে, এই অদ্ভুত আলোআধারির পরাবাস্তব গোধূলিতে দাঁড়িয়ে উন্মাদনার নন্দন সম্পর্কে আমার অল্পদর্শী বিবেচনায় সবচেয়ে জরুরি কথাটি বলা যাক এভাবে : এটি সেই অর্থে কোনো বৈতালিক সৌন্দর্য নয়, এমনকি সম্পর্কিত যাতনার রোমান্টিক অতিরঞ্জনও নয়; এটি যেন চিরচেনা পৃথিবীকে অপ্রচল অপরদিক থেকে দেখবার বিপ্রতীপ বিরস অভিজ্ঞতা। দৃষ্টির সেই উল্টোরথের পরিভ্রমণে আমরা সাদা চোখের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, প্রজ্ঞা দিয়ে যেসব আলোকিত অঞ্চলকে ইতোপূর্বে ‘স্বাভাবিক’ বলে তার চারদিকে সুদৃঢ় প্রাচীর তুলে আড়াল করে রেখেছিলাম, এখন তার ভেতরে হঠাৎ অবিশ্বাসী অবাক চোখে প্রত্যক্ষ করছি দ্ব্যর্থবোধকতা, দ্বিধা, সংশয়, ভয়, দমন, অসংগতি আর প্রগাঢ় অন্ধকার; আর যে শিল্পস্রষ্টাকে সদলবলে আমরা উন্মাদ বলে নির্বাসিত করেছিলাম, এখন তার রচিত কোনো ভাঙা বাক্যাংশ কিংবা অসম্পূর্ণ তুলির আঁচড় হয়তো আমাদের অনুচ্চারিত সব মৌলিক প্রশ্ন নীরবে বহন করে চলেছে কাল থেকে কালান্তরে। সেকারণে উন্মাদনা এবং সভ্যতার মাঝখানের নন্দনরেখাটি পাথরে খোদাই করা চিরস্থায়ী কোনো সীমান্ত নয়—বরং মানুষের ইতিহাস, ভাষাবোধ, জ্ঞান ও ক্ষমতা-সম্পর্কের প্রবল প্রতাপকে পাশ কাটিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা কিছু কিম্ভূত অর্থহীন অস্ফুট প্রলাপ—যেটি বিজ্ঞজনরা না চাইলেও চক্রক্রমিকভাবে ফিরে ফিরে আসে চির-বর্তমানতার সত্যান্বেষী নোম্যানস্ ল্যান্ডে।
তথ্যসূত্র
১. Foucault, Michel. Madness and Civilization: A History of Insanity in the Age of Reason. Trans. Richard Howard. New York: Vintage Books, 1988.
২. Nietzsche, Friedrich. The Birth of Tragedy. Trans. Ronald Speirs. Cambridge: Cambridge University Press, 1999.
৩. Lecercle, Jean-Jacques. Philosophy of Nonsense: The Intuitions of Victorian Nonsense Literature. London/New York: Routledge, 1994.
৪. Freud, Sigmund. Civilization and Its Discontents. Trans. James Strachey. New York: W. W. Norton, 1961.
৫. Goya, Francisco de. The Sleep of Reason Produces Monsters (El sueño de la razón produce monstruos), Plate 43, Los Caprichos, 1799.
৬. অনলাইনের বিভিন্ন উৎস।

