তীরন্দাজ অনুবাদ | ছোটগল্প
সমকালীন ইরানের ফারসি কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান কথাশিল্পী জালালে আলে আহমাদের জন্ম ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে পুরোনো তেহরানের সাইয়েদ নাসিরুদ্দীন মহল্লায়। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে গিলানের আসালেনে নির্বাসিত অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পাঁচটি গল্পগ্রন্থে তাঁর প্রকাশিত মোট গল্পের সংখ্যা ছিচল্লিশ। প্রথম গল্প ‘যিয়ারাত’, প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে সুখান সাময়িকীতে। ওই বছরই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দিদ ভা বাজদিদ’। দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘আয রানজিকে মি ভারিম’ প্রকাশিত হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে। তৃতীয় গল্পগ্রন্থ ‘সেতার’ প্রকাশিত হয় ১৯৪৮-এ। চতুর্থ গল্পগ্রন্থ ‘যানে জিয়াদি’ প্রকাশিত হয় ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে এবং পঞ্চম ও শেষ গল্পগ্রন্থ ‘পাঞ্জ দাস্তান’ প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর, ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে। নিম্নবিত্ত মানুষের দুঃখ-বেদনা নিয়ে গল্প সাজিয়েছেন তিনি। সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের জীবন-সংগ্রামের ছবি এঁকেছেন মমতা দিয়ে। গল্পের ভাষাও খুব সহজ-সরল। অলি-গলির মানুষের মুখের ভাষায় গল্প বুনেছেন আলে আহমাদ। তাঁর গল্পের পাত্র-পাত্রীরা বঞ্চিত, নিপীড়িত, দরিদ্র জীবন সংগ্রামী মানুষ। তাদের মুখের প্রচলিত ভাষাই আলে আহমাদ ব্যবহার করেছেন তাঁর গদ্যে। বিশেষ করে পুরোনো তেহরানের প্রচলিত আঞ্চলিক শব্দরাজি তাঁর গল্পের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আলে আহমাদ মূলত ঐতিহ্য-অনুসারী লেখক। প্রচলিত ধর্মচিন্তা, বংশমর্যাদা এবং ইরানের প্রাচীন স্বদেশি ও আঞ্চলিক সমাজের সেইসব চিত্রই তার গল্পে উপস্থাপিত হয়েছে, যেগুলো ঐতিহ্যগত, রাজনৈতিক ও সামাজিক আকৃতি ও প্রকরণগত দিক থেকে ট্র্যাডিশনাল ইরানের প্রতিনিধি; অর্থাৎ এই সমাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু পরিবার, বাবা যার প্রধান আর সন্তানরা তার অধীনস্ত, স্ত্রী ঐতিহ্যগতভাবেই মা এবং গৃহিণীর আসনে। এসব পরিবারে নারী-পুরুষের মধ্যে আবেগ-অনুভূতির কোনো সম্পর্ক নেই। গল্পে সমাজের ওই সব ধর্মীয় ও প্রাচীন পরিবারের চিত্রই তিনি এঁকেছেন, যারা আধুনিক নগর সভ্যতার নানা সমস্যা মোকাবেলায় অসহায় এবং অপারগ। ‘আমেরিকান স্বামী’ আলে আহমাদের পঞ্চম এবং সর্বশেষ গল্পগ্রন্থ ‘পাঞ্জ দাস্তান’-এর ‘শোওহারে আমরেকায়ী’ গল্পের অনুবাদ।
আমেরিকান স্বামী
`… ভদকা? না। ধন্যবাদ। ভদকা সহ্য হয় না। হুইস্কি হলে চলতো। গ্লাসের তলায় এই একটু। সোডা আছে? স্যরি। আসলে ওই নোংরা কুকুরটার স্বভাবের প্রভাব আমার উপরও পড়েছে। যদি জানতেন ও কী পরিমাণ হুইস্কি আর সোডা খেতো। আমি যতদিন পাপার বাড়িতে ছিলাম, আসলে ওগুলোতে ঠোঁট ছোঁয়াইনি। পাপা নিজেও খেতেন না। কোনো ড্রিংক্সই না। পাক্কা ইমানদার বা ধার্মিক মানুষ ছিলেন না, তবে ভালোমানুষ। আসলে আমাদের পরিবারে এর রেওয়াজ ছিল না। কিন্তু ওই নোংরাটা, আমাকে প্রথম যে জিনিসটা শিখিয়েছিল তা হচ্ছে হুইস্কি আর সোডা বানানো। কাজ থেকে ফিরেই, বারান্দায় হুইস্কি কিংবা সোডা হাতে থাকতোই। হাত ধোঁয়ার আগেই। যদিও আমি জানতাম সে ওই হাত দিয়ে কী কাজ করে।… অবশ্য মাঝেমধ্যে বাড়িতে না থাকলে হুইস্কি চেখে দেখতে চাইতাম। বিশেষ করে সেই সময়ে, যখন আমাদের মেয়েটা পৃথিবীতে আসেনি। একাকিত্বের কারণে উদ্যম হারিয়ে ফেলতাম। কিন্তু ভালো লাগতো না। বিশ্রীভাবে গলা জ্বলতো। ও যতই পীড়াপীড়ি করতো ওর সঙ্গে খেতে, লাভ হতো না কিছুই। কিন্তু যখন গর্ভবতী হলাম, বিয়ার খাওয়ার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করতো। বলতো, তোমার দুধের জন্য উপকারী এটা। তবে হুইস্কি খাইনি কখনও। শেষ পর্যন্ত অভ্যাস করিনি। অবশ্য ওইদিন, যেদিন ওর কাজ সম্পর্কে জানতে পারলাম, অনিচ্ছা সত্ত্বেও হুইস্কি টেনেছিলাম। তাও মাত্র এক পেগ আমার জন্য ঢেলেছিলাম আর এক পেগ ওর ওই গার্লফ্রেন্ডের জন্য। মানে যে ছিল ওর আগের বাগদত্তার মতো। আসলে সে-ই আমাকে জানাতে এসেছিল এবং আমরা দুজনে মনের সুখ-দুঃখের কথা বলার জন্যই হুইস্কি নিয়ে বসেছিলাম। সে বলছিল এখন আর কান্নাকাটি করো না, কী হবে এসব করে? ওর কথাটা ভাব। শিক্ষিত হোক আর হ্যান্ডসামই হোক, হয়তো দেখতে চলাফেরাও ভদ্রলোকের মতো, আয়-রোজগারও ভালো, ইংরেজি ক্লাসেও যায়। যা-ই হোক, সবাইতো আর ভদ্রলোক হয় না। ওই সময়ে এরকম?… আসলে যদি হতোই বিশ্বাস করতো? এই যে তরুণ শিক্ষার্থীরা এদেশে পড়ে আছে, এই যে সব ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার… কিন্ত শেষ পর্যন্ত তাদের কপালে এমন দুর্ভাগ্য জোটে, ইউরোপীয় অথবা আমেরিকান মেয়ে বিয়ে করে। তাদের মহল্লার পোস্টম্যানের মেয়ে অথবা সুপার মার্কেটের সেলস গার্লকে। অথবা ডেন্টিস্টদের অ্যাসিসটেন্টকে, যে হয়তো জীবনে একবারমাত্র তুলার ভেতর দাঁত নিয়েছে। সেই মেয়েদের কী পোজপাজ আর কী ভাব, যদি দেখতে! যেন সে-ই সোজান হিওয়ার্ড কিংবা শার্লি মাকলিন অথবা এলিজাবেথ টেলর। সেকথা কী আর বলবো তোমাকে। গত পরশু রাতে এই রকম এক মহিলাকে দেখলাম। দুমাস হয় এক ইরানি যুবকের সাথে বিয়ে হয়েছে এবং পনের দিন হয় এসেছে। তার স্বামীকে টেলিগ্রাম করেছিল, চলে আস। সংসদের প্রতিনিধি হও। আমাদের বাড়িওয়ালাকেও খবর দিয়েছিল যাতে ওই বিদেশিনীকে একা থাকতে না হয়। এবং দুঃখ-সুখের কথা বলার জন্য একজন স্বভাষী পাওয়া যায়। এইতো গত সপ্তাহেই। মেয়েটা তাদের দুজনের সাথে টেক্সাসের ভাষায় কথা বলছিল… না, হেসো না। ঠাট্টা করছি না। মুখের এমন ভাব করছিল, কী আর বলবো। তখনো হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে ছিল। বোঝাই যাচ্ছিল, প্রতিদিন একগাদা বাসনপত্র মাজে। কিন্তু তখন কী বলছিল জান? বলছিল, আমরা তোমাদের জন্য সভ্যতা নিয়ে এসেছি। আমরা তোমাদের গ্যাস লাইটের ব্যবহার শিখিয়েছি… এইসব কথাবার্তা। আর তার হাতগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল তখনও তারা খোদ টেক্সাসেই গাদা গাদা কাপড় ওয়াশটাবেই ধুঁতো। অথচ তখন এইসব কথা বলছিল। এক রাখালের মেয়ে। এমন কেউ না যে, তেল কোম্পানির মালিকের ঘরে জন্মেছে। আর তাদের অধীনের কর্মচারীটারীও কেউ না। না। যারা অন্যদের গরু চড়ায় সেই রকম একজন। অবশ্য আমি তাকে কিছুই বলিনি। তবে একটা লোক আড্ডার মধ্যে ছিল, সে অশুদ্ধ ইংরেজিতে বলা শুরু করল, তুমি যেসব কথা বলছ এগুলোই যদি সভ্যতা হয় তাহলে তো এইসব কোম্পানি খুব সস্তায় এইসব ওয়াশিং মেশিনের সাথে আমাদের জন্য তোমাদেরকে উপহার হিসেবে পাঠায়। অবশ্য মেয়েটা তার কথা বুঝতে পারছিল না। মানে, এই ছোটোলোকটার ইংরেজি বুঝতে পারছিল না। নিরুপায় হয়ে আমিই তাকে অনুবাদ করে বুঝিয়ে দিলাম। ওই সময়, যখন ওই ছোটোলোকটার কথার জবাব দেওয়া হচ্ছিল, আমাকে লক্ষ্য করে সে বলতে শুরু করল, নিশ্চয় খারাপ চরিত্রের ছিল না। হয়তো বাজে কিছু করেছ যে জন্যে তোমার স্বামী তোমাকে তালাক দিয়েছে। এই রকম সোজাসাপটা কথা। আমি ওই ছোটো লোকটার কথার দ্রুত সমুচিত জবাব দেবার জন্য এবং ওই মেয়েটাকে তার অসহায়ত্ব থেকে উদ্ধার করার জন্য খোলামনে তাকে বললাম, আমেরিকায় ছিলাম এবং আমেরিকান স্বামীও বিয়ে করেছিলাম। ডিভোর্স করে চলে এসেছি। তাকে এই কথাও বললাম আমার স্বামী কী কাজ করতো, যে জন্যে আমি তাকে ডিভোর্স করেছি, জান, তার জবাবে সে কী বলল? বলল, এইটা তো দোষের কিছু না। লজ্জারও কোনো কাজ না।… নিশ্চয় তার পরিবারের কেউ এমন প্রতারণা করেছে, যাতে তোমার সন্তান তার উত্তরাধীকারী হতে না পারে। অথবা নিশ্চয় তুমি ছিলে দুশ্চরিত্রা। এইসব কথাবার্তা। এরকমভাবেই একটা অবস্থায় পৌঁছল। সে তো এইটাই চেয়েছিল। ভালোই জানা আছে। তার স্বামী ছিল সংসদ প্রতিনিধি। আসলে যদি এই জিল্লতিটা না হতো, এই প্রতারণাটা না করতো, আমার মতো মেয়ে নিজেকে আর আগুনে জ্বালাতো না… না, না, ধন্যবাদ। আমাকে বেশি দিও না। আমার অবস্থা খারাপ করে দেবে। খালিপেট আর তার মধ্যে হুইস্কি। এই গ্লাসের তলায় একটু, ব্যাস। যদি এক স্লাইস পনির হতো খারাপ হতো না।… ধন্যবাদ। এমা! এই পনির? এত সাদা কেন? কী তেতো! কোথাকার? লিকওয়ানী? কোথায় হয়?… চিনি না। এই একটু… আসলে আমি তেমন পছন্দ করি না। ওই পেস্তার সঙ্গেই ভালো লাগে। ধন্যবাদ! ও…, কী যেন বলছিলাম? হ্যাঁ, আমেরিকনদের ক্লাবেই ওর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। একবছর হয়েছিল আমি ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাশে যেতাম। কী রকম প্রেশার জানই তো। ডিপ্লোমা শেষ করে গ্রুপ কম্পিটিশনে নাম লিখিয়েছি মাত্র। তারপর কী হয় জানই তো। বিশ-ত্রিশ হাজার ছাত্রের মধ্যে পাশ করা কীভাবে সম্ভব? পাপাই বলেছিলেন, ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাশে ভর্তি হ। সময়ও আনন্দে কাটবে আর একটা বিদেশি ভাষাও শিখলি। তখন ওই বদমাইশটা ছিল সেই ক্লাশের শিক্ষক। বেশ লম্বা। হ্যান্ডসাম। সোনালি চুল। পরিপূর্ণ এক আমেরিকান। কী তার পারফরমেন্স ছিল। সমস্ত হোমটাস্ক একাই দেখতো। ভালোই। অন্যদের চেয়ে আমরা তাকেই পছন্দ করতাম। সেই থেকে শুরু। খুব ভদ্রও ছিল। প্রথমে আমাকে একটা আর্ট এক্সিবিশনে নিমন্ত্রণ করল। আব্বাস আবাদের নতুন ক্লাবে। কী সব ছবি। শরীর ছাড়া একটা মাথা এঁকে রেখেছে। অথবা কোণায় কোণায় ছোপ ছোপ রঙ লাগিয়ে রেখেছে। কিংবা মানুষের আকৃতির নামে আসলে এঁকেছে একটা বালিশ। মাথার ওপরে একটা গামলা। কোনোটা আবার দু’মিটার কাপড়ের মাঝখানে বাদামি রঙের দু’টা রেখা টানা। এইসব আরকি। পাপা আর মামকেও নিমন্ত্রণ করেছিল, যাতে তাঁদের মন গলাতে পারে। আবার নিজের গাড়ি দিয়ে আমাদের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। সে কী ভদ্রতা। গাড়ির দরজা পর্যন্ত খুলে দিল। এইসব। তাও আবার সেই সময় যখন পাপা এবং মাম কারোরই গাড়ি ছিল না। ভালই মনে হচ্ছিল। সেই রাত থেকেই তার কার্যসিদ্ধি শুরু হয়েছিল। তারপর আমাকে একদিন ড্যান্স পার্টিতে দাওয়াত করল। তাদের একটা উৎসবে। বোধ হয় ‘থ্যাংস গিভিং ডে’ ছিল। এহ্! জান না কেমনে? একে তো আমেরিকা আর একটাই তো ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’। মানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবস। ওইদিন আমেরিকানরা বেলুনের সর্বশেষ লাল চামড়াটাও শেষ করে ফেলে। শেষমেশ পাপা অনুমতি দিলেন। আর দেবেনই বা না কেন? ক্লাশের বাইরে ল্যাংগুয়েজ প্র্যাকটিস করার জন্য আমার তো আর কেউ ছিল না। আসলে ল্যাংগুয়েজ তো প্র্যাকটিস না করা পর্যন্ত কোনো উপকার পাওয়া যায় না। তার ওপর আমরা ঠিক করেছিলাম, আমি তাকে ফারসি শেখাব। অবশ্য সেটা হবে ক্লাশের বাইরে। সে কারণেই সপ্তাহে একদিন সে আমাদের বাসায় আসতো। আমরা প্রমিজ করেছিলাম। জান না সেই অনুষ্ঠানে কী আয়োজন ছিল। মিষ্টি লাউয়ের মধ্যে ছিদ্র করে তাতে চোখ, মাথা, মুখ এসব বানিয়ে সেগুলোর ভেতর লাইট লাগিয়েছিল। আর সেকী নাচ। তখন আমি কিছু কিছু ইংরেজি শিখেছি মাত্র। কোনো অনুষ্ঠানে অপরিচিতের মতো চুপ মেরে থাকি না। তাছাড়া অনেক ইরানিও ছিল সেই অনুষ্ঠানে। কিন্তু রাতে এত পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও বিয়ার খাইনি। এইটুকুতেই যেন সে খুশি হয়েছিল। যখন আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে গেল, মামকে বলল, এমন মেয়ে থাকার জন্য আপনাদের অভিনন্দন। আমিই সেটা মামকে অনুবাদ করে বললাম। তখন একটুআধটু অনুবাদ করতে পারি। এইভাবে আট মাস আমরা একসাথে ছিলাম। একসাথে লেকে নৌকা চালাতে গেছি। সিনেমায় গেছি। জাদুঘরে গেছি। শপিংয়ে গেছি। শামিরান এবং শাহ্ আব্দুল আজিম মাজারে গেছি। আরো কত জায়গায়। ও না থাকলে যেগুলো আমার জীবনেও দেখা হতো না। খ্রিসমাসের রাতে আমাদের ওর বাড়িতে দাওয়াত করতো। খ্রিসমাস চিন তো নাকি? পাপা ও মামও ছিলেন। ফাফারও ছিল। চেনো না? আমার ভাই। ফারিদুন। দু’টা রান্না করা টার্কি ওর জন্য খোদ লস এঞ্জেলস থেকে পাঠিয়েছিল… এহ্! তাহলে তুমি চেনোটা কী? ওখানেই তো হলিউড। শুধু ওর একার জন্যই এসব পাঠানো হতো না। ওদের সবার জন্যই পাঠাতো। যাতে ওদের নিজেদেরকে প্রবাসী বলে মনে না হয়। যখন ওইসব নোংরা লোকদের বিশেষ কাজে তেহরান পাঠাতো, তখন তারা টার্কি, বিয়ার, সিগারেট, হুইস্কি এবং চকলেট এগুলো সবই নিজেরা পেতো। বিশ্বাস করো যদি নরঘাতকও হতো তাও আমি রাজি ছিলাম। চোর-বাটপার হলেও। তাও যদি এই কাজ না করতো। ধন্যবাদ। আর একটু হুইস্কি দাও তো। এই গ্লাসের তলায় একটু। যেন সে আমেরিকান না। তারা ‘বারবান’ খেতো। মাটির মতো স্বাদ। হ্যাঁ, হ্যাঁ এইটা ‘স্কচ’। খুব ফিটফাট। পুরো দস্তুর ইংরেজদের মতো। ও… কী যেন বলছিলাম? হ্যাঁ, ওই রাতেই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল সে। ডিনারের টেবিলে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব। আমি নিজেই তখন এর অনুবাদক। মজার না? এই পর্যন্ত কেউ এভাবে বিয়ে করেনি। প্রথমে আমাদের প্লেটে টার্কি তুলে দিল। তারপর শ্যাম্পেনের বোতল খুলে পাপা আর মামের জন্য ঢালল। তারপর সবার জন্যই ঢালল। অবশ্য মাম খেলেন না। তবে পাপা খেলেন। আমি নিজেও ঠোঁট ছোঁয়ালাম। প্রথমে খুব কড়া এবং তেতো লাগছিল। তবে তেতো ভাবটা চলে গিয়ে মিষ্টতাই মুখে লেগে রইল শেষ পর্যন্ত। তারপর কথাটা পাড়ল ও, তোমার পাপাকে বলো, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। পঁইপঁই করে সবকিছু বলার জন্য পীড়াপীড়ি করল আমাকে, সামরিক বাহিনীতে চাকরি করছে। আয়কর দেয়। রক্তের গ্রুপ বি পজেটিভ। কোনো রোগবালাই নেই। মাসে পনের শ’ ডলার বেতন পায়। দেশে ফিরে গেলেও আট শ’ ডলার করে পাবে। ওয়াশিংটনে নিজের বাড়ি আছে। কোনো ভাড়াটাড়া বা কিস্তিটিস্তি দিতে হয় না। বাবা-মা লসএঞ্জেলসে থাকে। ওর উপর তাঁরা কেউ নির্ভরশীল নন। এইসব নানান কথা। পাপাতো সেই প্রথম রাত থেকেই রাজি ছিলেন। নিজেই আমাকে বলেছিলেন, সতর্ক থেকো মেয়ে। হাজারে একটা মেয়েও আমেরিকান স্ত্রী হতে পারে না। হেলাফেলা না। তাঁর এসব কথা এখনো আমার কানে বাজে। পাপা বললেন, তুমি যেটা ভালো বুঝো। তোমার স্বামীর সাথে তুমিই বসবাস করবে। তুমি ওর কাছ থেকে এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নাও ভেবেচিন্তে দেখার জন্য। তাই করলাম। অবশ্য ওই প্রথম দিনই কাজ যা হবার হয়ে গেছিল। আমাদের পরিবারের সবাই জানতো। দু’ তিনবার দাওয়াত-পার্টি ওইসবও হয়েছিল। খালাতো বোন, চাচাতো বোনদের কী ঈর্ষা! কী গাল ফুলানি, এই ঘটনার জন্য। সবাই আমার সাথে আড়ি দিল। পাপা ঠিকই বলেছিলেন। হেলাফেলা না। সব মেয়েই ওকে আশা করতো। কিন্তু ওতো আমাকেই প্রপোজ করেছিল। তার মানে কি এই ছিল যে, আমি ত্যাগ স্বীকার করে আমার জায়গায় আর একটা মেয়েকে ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো? এর মধ্যে আবার দাদু শুধু চিমটি কাটতো। বলতো, আমাদের পরিবারে কাশী আছে, ইস্পাহানী আছে, বুশাহরী আছে। তাদের সবাইকেই তো চিনতাম। কিন্তু আমেরিকান কেউ তো ছিল না। চিনবো কেমন করে। জামাইরে তো তার পরিবারে এবং তার বাড়িতে, পাড়া-প্রতিবেশিদের কাছেও নিয়ে যেতে পারবো না।… পুরানো সংস্কারপন্থী বুড়িদের মতো এইসব কথাবার্তা। আমাদের আক্দেও এলেন না। সোজা মাশাদে চলে গেলেন। যাতে আক্দে না থাকতে হয়। কিন্তু আমি সবই হজম করেছিলাম। পরিচিত কাজীকে খবর দিয়েছিলাম। পরিবারের সদস্যই সব। আর অল্প ক’জন ছিল আমেরিকান। আক্দ অনুষ্ঠানের কত ছবি তুলল। আমার স্বামীর এক বন্ধু ভিডিও করল। কিন্তু এইসব আমেরিকানদের মানুষ বিশ্বাস করে! সব কিছুই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাচ্ছিল। কী সব প্যাঁচগোছের প্রশ্ন করছিল। মানে, আমি তখন বিয়ের কনে। তাদের কেউ হলে কথা ছিল। এইটার নাম কী? ক্বান্দ এরকম করে বানায় কেন? রুটির ওপর কী লিখেছে? ধুপ-ধূনা কোত্থেকে আনে?… যাই হোক, অনুষ্ঠান শেষ হলো। ওই আক্দের অনুষ্ঠানেই আমাদের পরিবারের দু’জন সদস্যকে তাদের কোম্পানিতে ড্রাইভার হিসেবে চাকরি দেবার জন্য বলা হলো। এক লক্ষ তুমান মোহরানা ধার্য করা হলো। সে ওই আক্দরে অনুষ্ঠানেই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ কলেমা পড়ল। কী কষ্টে। লা ইলাহা বলানোর সময় কী হাসাহাসি করেছিলাম।… যাতে শরিয়াত মোতাবেক আক্দ হয়। পেশা? যদিও ছিল ইংরেজির শিক্ষক, কিন্তু কাবিন নামায় লিখেছিল আইনজীবী। দূতাবাসের সদস্যদের মধ্য থেকে দু’জন সাক্ষীও হয়েছিল। ওই যে মিথ্যা বলেছিল তাতেই আমি ওকে জেলে পুরতে পারতাম এবং ক্ষতিপূরণও দাবি করতে পারতাম। আমার মেয়ের জন্য যে চারশ ডলার খরচ দেয়, কমছে কম তার চেয়ে আরো ছয়শ ডলার দিতে বাধ্য করতে পারতাম। কিন্তু লাভ কী তাতে? আসলে ওকে দেখার আমার আর কোনো আগ্রহই ছিল না। ওর সাথে আর একঘণ্টাও থাকতে চাচ্ছিলাম না। তাও তো যা হোক শেষমেশ বাচ্চাটাকে দিতে রাজি হয়েছিল। না হলে ওদের আইনে তো বাচ্চাকে ওর কাছে রেখে দিতে পারতো। আমার মোহরানাও আমি মাফ করে দিয়েছিলাম। মরা ধোঁয়ানি, ওর পয়সা সুদ্ধা ওকে নিয়া যাক! যদি জানতে কোন পথে টাকা-পয়সা রোজগার করতো? এই টাকা-পয়সা কি সোনার চেন বানিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখবো? নাকি পোলাও-কোর্মা কিনে খাবো? এই কথাগুলো ওইদিন ওই মহিলাও বলছিল। ওর পুরোনো গার্লফ্রেন্ড। মানে ওর বান্ধবী। বাগদত্তা না কী যেন! ওই প্রথম আর ওই শেষ তাকে দেখেছিলাম। লসএঞ্জেলস থেকে প্লেনে সোজা চলে এসেছিল ওয়াশিংটন। আর এয়ারপোর্ট থেকে একটা ভাড়া ট্যাক্সি নিয়ে সোজা আমাদের বাসায়। আমি ওয়াশিংটনে ছিলাম, দু’বছর হয়েছে তখন। এর মধ্যে ওর পরিবারের কোনো খোঁজ-খবরই ছিল না। ও বলতো, অনেক দূরের পথ। আর সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত থাকে। এইসব কথাবার্তা। আমিও আরামেই ছিলাম। ছাল নাই কুত্তার বাঘা ফাল। মাঝে মধ্যে আমি চিঠিপত্র দিতাম অথবা তারা দিত। তাদের জন্য আমাদের মেয়ের ছবিও পাঠিয়েছিলাম। তারাও মেয়ের জন্মদিনে উপহার পাঠিয়েছিল, আমরাও মেয়ের এক বছরের ছবি পাঠিয়েছিলাম এবং তারপর থেকে ওই মহিলার আসার আগ পর্যন্ত তাদের আর কোনো খোঁজ-খবর ছিল না। মাহিলা সালাম-অভিনন্দন জানিয়ে নিজের পরিচয় দিল, খুবই ভদ্রতার সাথে। বলল, একা একা আপনার খারাপ লাগে না? বাহ্ কী সুন্দর মেয়ে! এই ধরনের কথাবার্তা। আমি ওয়াশিংমেশিনটা ঠিক করতে যাচ্ছিলাম, যেটার জায়গায় খারাপ হয়ে ছিল। সে কেনো রকম দ্বিধা-সংকোচ না করেই আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল। তারপর দু’জনে মিলে সেটা ঠিক করে তার ভেতর কাপড় দিয়ে তাকে নিয়ে বসতে গেলাম। তার দুঃখ-সুখের কথা শুনতে। বলল, সে ছিল ওর বাগদত্তা। সেই অবস্থায়ই ওকে কোরিয়ার যুদ্ধে পাঠানো হলো এবং যুদ্ধ শেষ হলে সে আর লসএঞ্জেলস ফিরে যায়নি। এই ওয়াশিংটনেই চাকরি নিয়েছে। খোদাই জানেন, ওরা কোরিয়ার যুবকদের কী পরিমাণ কষ্ট দিয়েছে যে, ফিরে এসে তারা এরকম কাজ করতেও রাজি হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী ধরনের কাজ? বিস্ময়ে সে হতবাক হয়ে গেল, আমি এখনও আমার স্বামী কী কাজ করে তা জানি না! আয়-রোজগার অনুপাতে কাজটা অবশ্যই লজ্জার নয়। কিন্তু ওর পরিবারে সবাই ওর এই কাজের জন্যই ওর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং ও তাদের যতই বলেছে কোনোই লাভ হয়নি।… তখন আমার মনটা রসুন আর সিরকার মতো জ্বলছিল। জল্লাদের কাজ করে নাতো আবার! নাকি গ্যাস চেম্বার কিংবা বৈদ্যুতিক চেয়ারের কর্মচারী! এই ধরনের কাজও যদি হতো তাহলেও তো কাজ যা-ই থাকুক বেতন তো একরকম মোটামুটি পেতো। কিন্তু তার ওই কাজে? নিজের নামটাও ডুবিয়েছে আর আমাদের চোখও কালো করেছে। বলতে বলতে মহিলা নিজেই উঠে গিয়ে দেরাজ থেকে হুইস্কির বোতলটা বের করে আনল। এক গ্লাস ঢেলে আমাকে দিল আর নিজের জন্যও এক গ্লাস ঢেলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করল, ও হচ্ছে তার তৃতীয় বাগদত্তা। প্রথম জন কোরিয়ার যুদ্ধে নিহত হয়েছে। দ্বিতীয় জন গেছে ভিয়েনাতে। ও একাই শুধু বেঁচে ফিরেছে। সে আরো বলছিল, আসলে জানারও উপায় নেই যে, কেনই বা যারা ফিরে এসেছে তারা এ ধরনের আজব আজব অপরিচিত সব কাজ করতে রাজি হচ্ছে। বোকা অথবা উন্মাদ কিংবা চোর অথবা ঘাতক এসব হচ্ছে … আর আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, এখনো পর্যন্ত কেন আমি বুঝতে পারিনি যে, আমার স্বামী আসলে কী কাজ করে। আমি তো আর দাসী-বাঁদি শ্রেণির মেয়ে না। গ্র্যাজুয়েশন ছিল। বাবা-মাও ছিল। রূপবতীও ছিলাম। এইসব কথাবার্তা।… ধন্যবাদ আপনাকে। একেবারে খারাপ না। আপনাদের মেহমান-টেহমানও তো কেউ আসেনি। হঠাৎই আমার গলাটা শুকিয়ে আসছিল। খারাপটা ছিল এই যে, এরই মধ্যে মহিলা আমার মনের মধ্যে ঠাঁই করে নিয়েছিল। রূপবতী আর স্মার্ট মেয়ে। আরো বলছিল, সাত বছর ধরে লসএঞ্জেলসে সে কি স্বামীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে নাকি সিনেমার কোনো তারকাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, নিজেও বলতে পারবে না। তারপর আমরা দু’জন এক সঙ্গে উঠে গিয়ে কাপড়গুলো মেলে দিলাম। মেয়েকে তার ওয়াকারসহ ওয়াশিংমেশিনের পেছনে রেখে স্বামীর কর্মস্থলের দিকে রওনা হলাম। আসলে তখনো পর্যন্ত আমার বিশ্বস হচ্ছিল না। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না। গ্রথমে গেলাম ওর অফিসে। রিসিপশনে শুভেচ্ছা বিনিময় হতেই বলল, বলুন আপনাদের কী চাই? কোন পার্কের কোন ছবিটা এবং কী গাছ আর কোন ঘাস? যদি না-ই জানেন এখানে কী কাজ হয়, তবে কী আপনাদের ধারণা এর ভেতর মৌমাছির ঘর বানায়। সব জিনিসই মাপ মতো হয়। বিভিন্ন ডিজাইনের এবং বিভিন্ন মাপের। কব্জাগুলো এবং দু’পাশের হাতল, ওপরে ফুলের তোড়া এবং কী কাঠের চান আর তার ওপরে কাপড় দিতে হবে কি না? আর কী কী আনুষ্ঠানিকতা এবং লাশ বহন করবে যে ঘোড়ার গাড়িটা, তাতে ক’টা ঘোড়া থাকবে অথবা আপনি চাইলে ট্যাক্সিতেও নিয়ে যাই, যেটা একটু সস্তা এবং ট্যাক্সিরও সিস্টেম আছে। বিদায় সম্ভাষণের জন্য ক’জন লোক চান এবং তাদের একেক জন পারিশ্রমিক অনুপাতে আন্তরিকতা দেখাবে এবং প্রত্যেকেই নিজেদেরকে কোন সম্প্রদায়ের লোক মনে করবে আর কোন পোশাকে এবং কোন গির্জায় যেতে হবে… আমি বলছি এককথা আর আপনি শুনছেন আরেক কথা। তাদের অফিসের কোণায় কোণায় আবার ছোটো ছোটো প্রচারপত্র এবং দিয়াশলাই আর টিস্যু পেপারও রাখা ছিল। তাতে ঝলমলে ছবি আর বিস্তারিত বর্ণনাও ছাপানো ছিল। যেমন কোনোটায় লেখা – ‘মখমলে অনন্ত নিদ্রা।’ কোনোটাতে লেখা – ‘অমুক পার্ক বেহেস্তের বাগান।’ এইধরনের আরকি। কর্মচারীরা আমাদের চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে লাগল, একার জন্য চাচ্ছেন নাকি সপরিবারের জন্য? কয়জন? আপনার খরচ লাগবে – যদি ফ্যামিলির সবার জন্য হয় তাহলে খরচ পঞ্চাশ শতাংশ কমে যাবে। আর যদি বলেন কিস্তিতে দিবেন তাও পারবেন…। আমার অন্তরটা সত্যি সত্যিই যেন ফেটে যাচ্ছিল। আসলে আমার ধারণাই ছিল না যে, আমার স্বামী এইসব কাজ করতে পারে। অথচ সে বলেছিল আইনজীবী। আসলে সে ছিল একটা মিথ্যুক। শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের পরিচয় দিলে আমার স্বামীর কর্মস্থলের ঠিকানা পেলাম। আমাদের সম্পর্কে তাদের খারাপ ধারণা দূর করতে বললাম, ইনি তার বোন, লসএঞ্জেলস থেকে এসেছেন। বিকেলেই চলে যাবেন। ওর সাথে খুবই দরকার। আমি জানতাম না আমার স্বামী আজ কোন সাইটে কাজ করছে।… আমরা বাইরে বের হয়ে ওর কর্মস্থলে গেলাম। আমি যদি সামসাদ গাছের সারির পেছনে ওকে না দেখতাম তাহলে আমার বিশ্বাসই হতো না। ওর হাত দু’টা ছিল ওপরে তোলা। কাজের ইউনিফরম পরা ছিল, ঘাস মাপ-জোক করছিল আর তার চারকোণে চিহ্ন দিয়ে দিয়ে পরে বৈদ্যুতিক গাঁইতিটা স্টার্ট দিয়ে চিহ্নিত জায়গাটার ভেতর গর্ত করে পাশেরটার দিকে যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে দু’জন কৃষ্ণাঙ্গ লোক এসে মাটির ওপরের ঘাসগুলো চেঁছে ছোটো একটা ট্রাকে নিয়ে তুলছিল। আবার আমার স্বামী এসে গাঁইতি দিয়ে গর্ত করছিল আর ওই কৃষ্ণাঙ্গ দু’জন সেই মাটিগুলো তুলে নিয়ে অন্য আর একটা ট্রাকে ভরছিল। এইভাবে আমার স্বামী একবার নিচে যাচ্ছিল একবার ওপরে আসছিল। আর তার পেছন পেছন ওই কৃষ্ণাঙ্গদের একজন ছোটাছুটি করছিল। তবে তাদের তিনজনের পোশাকই ছিল একই রকম। আর কী মনোযোগের সাথে কাজ করছিল তারা! একটু মাটিও পাশের ঘাসে পড়ে নষ্ট হতে দিচ্ছিল না। আমরা দু’জন ওভাবেই প্রায় আধাঘণ্টা ধরে গাড়ির ভেতর বসে রাস্তার পাশের সামসাদ গাছের সারির ভেতর দিয়ে তাদের দেখছিলাম আর ঝরঝর করে কাঁদছিলাম। আমাদের গাড়ির পাশ দিয়ে ট্রাকগুলো আসা যাওয়া করছিল। মাটি আর ঘাস বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল অথবা আরো নতুন নতুন কফিন এনে গর্ত খোঁড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘাসের ওপর সারি দিয়ে রাখছিল। ওই সময় ভিয়েতনাম থেকে নিয়ে আসা হচ্ছিল ওগুলোকে। দলে দলে। দিনে দু’শ তিন’শটা করে। আর তারা এদের নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিল। আমার স্বামীর গ্রুপ ছাড়াও আরো দশ বারটা গ্রুপ কাজ করছিল। সবকটা গ্রুপই পার্কের এক পাশে কাজ করছিল। কী বিশাল পার্ক। যেটার নাম আরলিংটন। নিশ্চয় শুনে থাকবে। একটাই আমেরিকার রাজধানী আর একটাইতো আরলিংটন। সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত। আসলেই একটাই আমেরিকা আর একটাই আরলিংটন। জান, এসব ওইদিনই মহিলা আমাকে বলেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকেই এই জায়গাটা বিখ্যাত হয়ে ছিল। কেনেডিও ওখানেই সমাহিত। কত লোকজন দেখতে যায়। গার্ড অব অনার দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে। যারা বিভিন্ন সময়ে কুচকাওয়াজ করে। চারপাশ ঘাসে ঢাকা। ছোটো ছোটো টিলা। আর দূর-দূরান্তের প্রতিটা উঁচু ঘাসের ঢিবিতে নানা রকমের বৃক্ষ আর সামসাদ গাছে ভরা। প্রতেকটা সমাধির মাথার কাছে শ্বেত পাথরের নামফলকে মৃত ব্যক্তির নাম-পরিচয় লেখা। এপাশে কর্নেলদের সমাধি। ওই অংশে মেজরদের। আর সাধারণ সৈন্যদের সমাধি ওই পাশে। মহিলা বলছিল, দেখুন সবই সৈনিকদের সামরিক পদমর্যাদা। আমি বলছি এককথা আর তুমি শুনছো আরেক কথা। বলছিল আমাদের আমেরিকানদের সমস্ত প্রচেষ্টা এই আরলিংটনে এসে শেষ হয়…। কী অহংকার করছিল সে! সাত বছর অপেক্ষা করেছে আর তিনজন বাগদাতাকে হারিয়েছে সে। দু’জনের সমাধি ওখানে দেখাল। কেনেডির সমাধিও। আর যেখানে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় সেই জায়গাটাও। তারপর আমরা ফিরে এলাম। আমার আর কোনো কিছুই দেখার মতো ধৈর্য হচ্ছিল না। দুপুরের খাবার আমরা বাইরেই খেলাম। তারপর আমরা সিনেমায় গেলাম। কারণ আমার মেয়েটা খুব কান্নাকাটি করছিল। আমি আসলে বুঝতেও পারছিলাম না তার কী হয়েছে। বিকেলে চারটার সময় আমাকে বাড়ির গেটে নামিয়ে দিয়ে সে চলে গেল। ডিসকাউন্টে রিটার্ন টিকেট কিনেছিল, তাই ওইদিন না গিয়ে তার উপায়ও ছিল না। জানো, শেষ যে কথাটা সে বলেছিল সেটা কী? বলেছিল, এই যুদ্ধে বিশ্বের প্রতি যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে আমাদের বিশ্ব তাদের ভুলে গেছে… আমার স্বামী যখন সন্ধ্যায় ফিরল বিষয়টা তখন তাকে বললাম। মানে মহিলাটা যে চলে গেছে আর আমি ওই চিন্তাতেই ছিলাম এবং আমার বন্ধু অথবা পরিচিত ইরানিদের সাথে টেলিফোনে পরামর্শ করছিলাম। আমার সেই প্রথম দিনটার কথা মনে পড়ে গেল। যেদিন ও আমাকে অনেক পীড়াপীড়ি করে মাসখারাবাদ দেখতে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের বিয়ের আগে। আমার ধারণা ছিল আমরা গোলেস্তান জাদুঘর দেখতে যাচ্ছি। আসলে আমি তখনও জানতাম না যে, মাসখারাবাদটা আসলে কী এবং কোথায়? বলেছিই তো, যদি ও না থাকতো, তাহলে আমি এই তেহরানের অনেক জায়গাই চিনতাম না এবং ওইদিন পর্যন্তও আমি জানতাম না। ওদের অফিসের ড্রাইভার অবশ্য জানতো। আমি ছিলাম একজন অনুবাদকের মতো। আমাদের কাফন-দাফনের নিয়মকানুন সম্পর্কেও জানতে চাচ্ছিল। আমিও বিষয়টা জানতাম না। ড্রাইভারটাও ছিল আর্মেনীয়, সে-ও আমাদের নিয়মকানুন জানতো না। তবে সে মাসখারাবাদের একজন দারোয়ানকে ধরে নিয়ে এল। সে-ই সব বলছিল আর আমি অনুবাদ করছিলাম। আসলে ওই সময় আমার মাথায়ই আসছিল না যে, এইসব প্রশ্নের উদ্দেশ্য কী। তবে আমার মনে আছে ,দাদু এই বিষয়টাকে কবর দেয়ার জন্য একটা বাহানা করেছিল। এর মানে কী? বেনামাজি একটা লোক, আসছে অন্যের মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে, আর সেই সময় কি না তাকে নিয়ে রওনা হলো মাসখারাবাদে?… আমার মনে আছে, সেদিন ও ছাড়াও ওর সাথে আরো একজন আমেরিকান ছিল, আর আমি দারোয়ানের ব্যাখ্যাটা তাদের দুজনকেই অনুবাদ করে বলছিলাম এবং সে-ই প্রথমে আমার স্বামীকে বলেছিল, দেখেছ। কফিনটা পর্যন্ত দেয় না। এক টুকরো কাপড় পেঁচিয়ে দেয় যাতে ঠাণ্ডা না লাগে।… আমি তাকে চিনতাম। পরিকল্পনা সংস্থার উপদেষ্টা ছিল সে। এ রকম একটা হাবভাব করছিল যেন এ বিষয় নিয়ে সংস্থার সাথে কথা বলছে। আমাকে বলো, আসলে আমি কি এসব কথা ওইদিন ভাবতে পারতাম না? আমার মনে আছে, ওইদিন যখন তারা বুঝতে পারল যে আমরা কফিন ব্যবহার করি না, তখন আমাকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করল, আমরা বিয়ের কনে অথবা বরের মতো সাজিয়ে কফিনে রাখি। আর যদি বয়স্ক হয়, তাহলে মুখে তুলো দিয়ে চুলে বেনি করে দেই। আর এসবের খরচ তারাই বহন করে। ওইদিন সন্ধ্যায়ই আমি বিষয়টা দাদুকে বলেছিলাম যে, ব্যাপারটা কেমন খটকা লাগছে। দাদু বলেছিল কবর দেওয়ার কাজই করে লোকটা। তারপরই আমাদের আক্দ ছেড়ে তিনি গেলেন মাশহাদে। কিন্তু আমি আসলে কী বুঝতে পেরেছিলাম, আপনারাই বলুন? বিশ বছরের একটা মেয়ে, সুদর্শন, ধনী এবং অভিজাত এক আমেরিকান ছেলের স্ত্রী হিসেবে যখন হাতে হাত রেখেছে, তখন কি আর সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে? আসলে মাসখারাবাদে আমারই বা কী কাজ ছিল? দাদুর মতো এইসব জায়গার কথা ভাবতে অনেক সময় লেগেছিল আমার। আর ওয়াশিংটনে থাকতে মাঝে মাঝে এমন হতো, বিকেলে ও কাজ থেকে ফিরে বিড়বিড় করে বলত, নিগ্রোরা আমাদের হাত থেকে কাজ কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে আছে, একবার ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কিন্তু নিগ্রোদের কী বিচারের কাজ করার অধিকার আছে? আসলে তখনও কী আমি ভেবেছিলাম যে ল-ইয়ার মানে কাজী, না কি আইনজীবী, না কি বিচার মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট এরকম কিছু একটা। সে যা-ই হোক, দরজা দিয়ে ঢুকতেই তার হাতে হুইস্কির গ্লাসটা দিয়ে এক গ্লাস নিজের জন্যও ঢেলে নিলাম। তারপর মুখোমুখি বসে ঘটনাটা বলতে লাগলাম। সবদিক ভেবে রেখেছিলাম আর সব পরামর্শই। আমার এক ইরানি বন্ধু টেলিফোনে বলেছিল, মনে হচ্ছে এদের সবার কাজই এরকম। আর সবই মানবতার জন্য। তাকে বললাম, তোমার কি এখন সময় আছে স্লোগান দেওয়ার? অবশ্য আমি জানতাম যে তার মনের ভেতরও গভীর দুঃখ ছিল। তার ভিসা বাতিল হয়ে গিয়েছিল। না ছিল দেশে ফিরে যাবার অনুমতি আর না ছিল আমেরিকায় থাকার। এবং সে তার নাগরিকত্বও বাতিল করতে চাচ্ছিল, যাতে মিশরের নাগরিক হতে পারে। আমারও আর তাকে একথা বলার মতো মওকা ছিল না যে, যদি এরকমই হয়ে থাকে তাহলে আমেরিকাতে রয়েছে কেন? তাদের মধ্যে একজন ছিল খুব হ্যান্ডসাম যুবক। আমি বহুবার আশা করেছিলাম, ইশ! যদি তার স্ত্রী হতে পারতাম। জানো, জবাবে কী বলেছিল? বলেছিল, এ বাবা! আমার মনে হয় তোমার মনের মধ্যে আমেরিকার আনন্দ বইছে! সত্যি। আর জান সে নিজে কী কাজ করতো? কিছুই না। শুধু আমেরিকান নাগরিক, দুটা স্ত্রী ছিল। মনে করো না যে আমি মাতাল হয়ে গেছি আর বেহায়াপনা করছি। দুই স্ত্রীর একজন ছিল শিক্ষিকা, আরেকজন বিমানবালা। প্রত্যেকেরই একটা করে বাড়ি ছিল। আর ওই ভদ্রলোক তিনদিন থাকতো এক স্ত্রীর বাসায় আর আরেক স্ত্রীর বাসায় থাকতো চারদিন। বাদশাহী করে বেড়াতো। না লেখাপড়া করতো, না কোনো আয়-রোজগার ছিল, না কোনো বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করতো। কিন্তু আরব শেখদের মতো ইরানিদেরও সে পথে টানছিল আর তার জীবনের দিকেই ওদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতো, এটাও তো এক ধরণের নোংরামি। হ্যাঁ, এমন অবস্থা যাচ্ছে যে, তেইশ বছর বয়সেই মেয়ের হাত ধরে আমাকে বাধ্য হয়েই দেশে ফিরে যেতে হচ্ছে। তবুও খোদা ওকে মাফ করুন। টেলিফোন শেষ করতেই দেখি দরজায় নক করছে। দরজা খুলতেই দেখি আরেক ইরানি যুবক, যে নিজেই তার পরিচয় দিল। ওই যুবকের বন্ধু এবং সে পাসপোর্ট চাচ্ছে। কে নাকি তাকে বলেছে, আমার কি যেন সমস্যা হয়েছে এবং আমি তাকে কত দিতে পারবো। এইসব কথাবার্তা। তাকে অনুরোধ করলে ভেতরে এলো। দু’জনে আধঘণ্টা বসে বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। স্বামী ফিরে এলে কী চাচ্ছি সেটা বুঝতে পারবে ভেবে স্বস্তি পেলাম। দশটা পর্যন্ত বসে রইলাম। তার সাথে হুইস্কি খেলাম এবং তাকে জানালাম, আমি আমেরিকা আর থাকছি না। যতই পীড়াপীড়ি করল বিষয়টা কোত্থেকে জেনেছি, কিছুই প্রকাশ করলাম না। ও মনে করছিল ওর মা-বাবা অথবা বোন-ভাইদের কেউ একজন শয়তানি করেছে। আমি হা-না কিছুই বললাম না। সে রাতে যতই পীড়াপীড়ি করল, বাইরে ঘুরতে যাবো না সিনেমায় যাবো, না ক্লাবে যাবো; বিষয়টা কাল না হয় সমাধান করা যাবে। কিন্তু আমি তাতে রাজি হলাম না। আমার শেষ কথাটা তাকে বলে মেয়ের রুমে চলে গেলাম এবং ভেতর থেকে শিকল তুলে দিয়ে দৈত্যের মতো পড়ে রইলাম। সত্যিই মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক এখনকার মতো। সকালে কোর্টে গেলাম। জজ সাহেব ছিলেন বেশ রসিক মানুষ। বলছিলেন, এটাতো একটা মামুলি ব্যাপার। এটা তো আর তালাকের কারণ হতে পারে না… তাঁকে বললাম, জজ সাহেব যদি আপনার কোনো মেয়ে থাকতো আপনি কী এরকম লোকের সাথে তাকে বিয়ে দিতেন? তিনি বললেন, দুঃখিত আমার কোনো মেয়ে নেই। বললাম, স্ত্রী? বললেন, স্ত্রী আছে। বললাম, যদি কালই আপনার স্ত্রী এসে বলে, আমার স্বামী তো আগে ছিল শিক্ষক কিন্তু এখন দেখি তা ধুয়ে খেয়েছে, না কি মিথ্যা বলছি। এর মধ্যেই আমার স্বামী আমাদের কথার ভেতর ঢুকে পড়ে আমার কথা কেড়ে নিল। সে চাচ্ছিল না যে তার মিথ্যা বলার ঘটনাটা প্রকাশ পাক। হ্যাঁ শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিয়েছিল। আমার মেয়ের খরচ চালানোর চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরও করেছিল। আর আমার দেশে ফিরে আসার খরচও ওখানেই তার কাছ থেকে আদায় করেছিলাম। হ্যাঁ, খারাপ না। এটাই তো ছিল, আমি আমেরিকান বিয়ে করেছিলাম। ধন্যবাদ আপনাকে! আর এক গ্লাস হুইস্কি। তোমাদের এই মেহমানরা কেন আসে কে জানে… কিন্তু … এই অলস হৃদয়।… ওই মহিলা আমার মতো এ রকম পায়ের তলা ঝাড় দেয় না তো? তার গার্লফ্রেন্ডের কথা বলছি। হ্যাঁ?…’

