সিলভিয়া প্লাথের আত্মহত্যার (ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩) কয়েক মাস আগে, অর্থাৎ ১৯৬২ সালের শেষ দিকে এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন পিটার ওর্। লক্ষণীয়, এখানে তাঁর কোনো কথায় নেই মৃত্যুর প্রগাঢ় ছায়া। বরং প্লাথ অনেক বেশি ঝুঁকে ছিলেন জীবনেরই দিকে। অনুবাদ : অনন্যা সাজিদ
পিটার ওর্ : সিলভিয়া, কীভাবে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন?
সিলভিয়া প্লাথ : কীভাবে শুরু, সত্যি বলতে কি, ঠিক বলতে পারব না। তবে অনেক ছোটোবেলা থেকেই কবিতা লিখে আসছি। ছড়া ছোটোবেলা খুব ভালো লাগত। ভাবতাম বড় হয়ে আমিও ছড়া লিখব। যখন আমার সাড়ে আট বছর বয়স, আমার প্রথম কবিতাটি ছাপা হয় ‘দা বস্টন ট্র্যাভেলার’ পত্রিকায়। সেই থেকে লিখে চলেছি।
ওর্ : শুরুর দিকে কবিতার বিষয়আশয় কী ছিল?
প্লাথ : প্রকৃতি, পাখি, মৌমাছি, ঝর্না, বসন্তকাল… এইসব আর কী। একজন মানুষ যার অন্তর্গত অভিজ্ঞতা বলে কিছু নেই, তার কাছে এগুলিই তখন ছিল বিরাট উপহার। আমি মনে করি, একটি শিশুর কাছে বসন্তের আগমন, আকাশে তারার ছাউনি, প্রথম তুষারপাত — এসবই মহান উপহার।
ওর্ : আচ্ছা এত বছর পর এখন বর্তমানে এমন কোনো বিষয় বা ভাবনা আছে যা আপনাকে লিখতে তাড়িত করে?
প্লাথ : হ্যাঁ, আছে। আমেরিকান ধারণা। রবার্ট লাওয়েলের ‘লাইফ স্টাডিজ’ বইটা পড়ে এই মুহূর্তে আমি বেশ উদ্দীপ্ত। খুব ব্যক্তিগত, খুব আবেগঘন অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন তিনি। রবার্ট লাওয়েলের মানসিক হাসপাতালে থাকাকালীন অভিজ্ঞতার ওপর লেখা কবিতাগুলি আমাকে খুব প্রভাবিত করে। এই ব্যক্তিগত অদ্ভুত ট্যাবুর বিষয়গুলি নিয়ে এখন আমেরিকান কবিতায় বেশ কাজ হচ্ছে। তারপর ধরুন অ্যান সেক্সটন — তাঁর কবিতায় পাই একজন মায়ের অভিজ্ঞতা; একজন মা যে বারবার মনোবৈকল্যে ভুগছে। সেক্সটন অত্যন্ত আবেগ ও অনুভূতিপ্রবণ মহিলা যাঁর কবিতার মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা আমাকে গভীরভাবে প্রাণিত করে।
ওর্ : আপনি একজন কবি হিসেবে এবং ব্যক্তিগতভাবে আটলান্টিকের দুপারেই পা রেখেছেন। আমি ব্যাপারটাকে এভাবেই দেখি… অথচ আপনি একজন আমেরিকান…
প্লাথ : ঠিক, আমার অবস্থানটা অদ্ভুত। তবে আমি একে মেনে নিয়েছি।
আমি একজন রাজনীতিসচেতন মানুষ। এসব কারণেই আমার লেখায় রাজনীতি এসেছে।
ওর্ : কোন দিকে আপনার পক্ষপাতটা বেশি?
প্লাথ : দেখুন, ভাষাগত দিক থেকে আমি একজন আমেরিকান। আমার উচ্চারণ আমেরিকান, কথা বলার ধরন, আদবকায়দা — আমেরিকান। আমি একজন পুরোনোপন্থী আমেরিকান। সম্ভবত সে কারণেই আমি এখন ইংল্যান্ডে আছি এবং ইংল্যান্ডেই থাকব।
রুচি ও পছন্দের দিক থেকে আমি প্রায় পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে আছি। আমার পছন্দের কবিরা প্রায় সবাই আমেরিকার। ইংল্যান্ডের কবিরা আমাকে খুব কমই উদ্দীপ্ত করতে পারে।
ওর্ : তাহলে আপনি কি মনে করেন যে সমসাময়িক ইংরেজি কবিতা আমেরিকান কবিতার থেকে অনেক পিছিয়ে?
প্লাথ : ব্রিটিশ সমালোচক ও প্রবন্ধকার আলভারেজের একটা লেখা আছে। ইংল্যান্ডের মানুষদের অতি ভদ্রতার বিপদ নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সত্য। আমি বলতে পারি যে, আমি নিজে খুব একটা ভদ্র নই। এই যে নম্রতা, বিনয়, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি —এই ব্যাপারগুলো… সারা ইংল্যান্ডে এরকম মানুষের সংখ্যাই বেশি… এই ব্যাপারগুলো বাইরে আপাতভাবে যতটা বিপজ্জনক, ভেতরে ভেতরে তার থেকে অনেক বেশি ভয়ঙ্কর।
হৃদয়ের কোনো তুচ্ছ এবং সামান্য অনুভূতি কখনো কবিতা হতে পারে না।
ওর্ : এসব সত্ত্বেও আপনার কি মনে হয় না এখনও অসংখ্য ইংরেজ কবি আছেন যাঁরা সেই চাপের মুখে, সেই ভয়ের মধ্যেও কাজ করে যাচ্ছেন, যাকে বিশিষ্ট অর্থে বলা যেতে পারে ‘ইংরেজি সাহিত্য’?
প্লাথ : হ্যাঁ, আমি স্বীকার করি। যখন কেমব্রিজে ছিলাম তখনই বিষয়টা অনুভব করেছি। অল্পবয়সী মেয়েরা আমাকে এসে বলত — ‘কীভাবে তুমি কবিতা লিখতে সাহস করো, কীভাবে কবিতা ছাপাতে সাহস করো? জানো না কী সাংঘাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় এখানে, কারুর কবিতা প্রকাশিত হলে? এবং মজার ব্যাপার হলো, কবিতা না কি কবিতা হিসেবে সমালোচিত হয় না।
আমার মনে পড়ে একবার আমার একটা লেখা এই বলে একজন নিন্দা করেছিল যে, সেটি জন ডানের মতো শুরু হয়েছে কিন্তু জন ডানের মতো শেষ হয়নি। সেই মুহূর্তে আমি প্রথম অনুভব করি ‘ইংরেজি সাহিত্যের চাপটা আসলে কী’। আমার মনে হয় ইংল্যান্ডে, ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সাহিত্যসমালোচনার যে ব্যবস্থা চলছে, তা একধরনের বিকলাঙ্গ ব্যবস্থা। আমেরিকাতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা কাদের দিয়ে শুরু করি — টি এস এলিয়ট, ডিলান টমাস, ইয়েটস… এই তো… শেক্সপীয়র থেকে যান পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে। আমি এটা কতটা মন থেকে মানি জানি না, তবে আমার মনে হয় কেউ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে ততটা ভয় পাবে না যতটা ভয় পাবে ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে।
ওর্ : আপনি বলছেন সিলভিয়া যে আপনি নিজেকে একজন খাঁটি আমেরিকান বলে মনে করেন। কিন্তু যখন আপনার ‘ড্যাডি’ কবিতাটি শুনি, যা দাহাউ আউশউইটজ বা মাইন কাম্ফের কথা বলে, তখন মনে হয় না এভাবে কোনো খাঁটি আমেরিকান লিখতে পারবে। কেননা, তাদের কাছে এই শব্দগুলির, বিশেষ বিশেষ নামগুলির তেমন কোনো অর্থ নেই। মানে আটলান্টিকের ওপারে আর কি। তাই না?
প্লাথ : আসলে আপনি আমাকে একজন গড়পড়তা সাধারণ আমেরিকান ধরে নিয়ে কথাটা বললেন। আমি পারিবারিক দিক থেকে আসলে জার্মান এবং অস্ট্রিয়ান। একদিক থেকে আমি প্রথম প্রজন্মের আমেরিকান, অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রজন্মের আমেরিকান। তাই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের ব্যাপারে আমার তীব্র আবেগ রয়েছে। এছাড়া আমি একজন রাজনীতিসচেতন মানুষ। এসব কারণেই আমার লেখায় বিষয়গুলো এসেছে।
রবার্ট লাওয়েলের মানসিক হাসপাতালে থাকাকালীন অভিজ্ঞতার ওপর লেখা কবিতাগুলি আমাকে খুব প্রভাবিত করে।
ওর্ : কবি হিসেবে ইতিহাসের প্রতি আপনার আগ্রহ কতটা?
প্লাথ : আমি অবশ্যই ইতিহাসবিদ নই। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ইতিহাসের প্রতি আমার আগ্রহ তত বাড়ছে। আর এখন আমি খুব বেশি করে ইতিহাস পড়ছি। এই মুহূর্তে আমার নেপোলিয়ানকে ঘিরে দারুণ আগ্রহ। এছাড়া আমার যুদ্ধবিগ্রহ, গ্যালিপালি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এসব বিষয়েও আগ্রহ দিনে দিনে বাড়ছে। মনে হচ্ছে যত বয়স বাড়ছে, আমি আরও বেশি ইতিহাসসচেতন হয়ে পড়ছি। আমার বয়স যখন ছিল কুড়ির দিকে, ইতিহাস নিয়ে আমার কোনো ঝোঁকই ছিল না।
ওর্ : এখন কবিতা কীভাবে আসে — বই থেকে না কি নিজের জীবন থেকে?
প্লাথ : না না, আমি বলব আমার কবিতা মনের অনুভূতিপ্রবণ ও আবেগঘন অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসে। তাৎক্ষণিকভাবে। তবে হৃদয়ের কোনো তুচ্ছ এবং সামান্য অনুভূতি কখনো কবিতা হতে পারে না। অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। এমনকি জীবনের ভয়ানক ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতাগুলি — যেমন উন্মাদনা নিপীড়নকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং বুদ্ধিদীপ্তভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। কবিতা লেখার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির বিরাট ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সেগুলি যেন নার্সিসিস্ট হয়ে না যায়। আয়নায় শুধু নিজের ছবিই দেখা না হয়ে যায়। আমি মনে করি সেগুলি হবে প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা। অনেক বড় মাপের ঘটনার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক — যেমন হিরোসিমা বা দাহাউ।
একটা সময় তো আমি অডেন বলতে পাগল ছিলাম। যা লিখতাম তাই অডেনের মতোই হয়ে যেত। এখন আমি আরও পেছনের দিকে যাচ্ছি। উইলিয়াম ব্লেক আবার পড়ে দেখছি। তাছাড়া শেক্সপীয়র একজন।
ওর্ : তার মানে প্রাচীন নিরাভরণ কাঁচা আবেগের পেছনে বুদ্ধিদীপ্ত শৃঙ্খলা থাকতে হবে?
প্লাথ : আমি সেটাই মনে করি। একজন শিক্ষাব্রতী হিসেবে, যার পিএইচডি ও অধ্যাপক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, আমার একটা দিক তো এইসব অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিনকে শ্রদ্ধা করেই বেড়ে ওঠা, যতক্ষণ না তাদের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়ে।
ওর্ : সেইসব লেখকের কথা বলুন যাঁরা আপনাকে প্রভাবিত করেছে। যাঁরা আপনার কাছে অনেক বড় ব্যাপার।
প্লাথ : সেরকম লেখকের সংখ্যা কম। খুঁজে বের করে বলা কঠিন। যখন কলেজে পড়তাম তখন আধুনিক কবিদের লেখা পড়ে মুগ্ধ হতাম, বিচলিত হয়ে যেতাম — যেমন ডিলান টমাস, ডব্লিউ বি ইয়েটস, ডব্লিউ এইচ অডেন। একটা সময় তো আমি অডেন বলতে পাগল ছিলাম। যা লিখতাম তাই অডেনের মতোই হয়ে যেত। এখন আমি আরও পেছনের দিকে যাচ্ছি। উইলিয়াম ব্লেক আবার পড়ে দেখছি। তাছাড়া শেক্সপীয়র একজন। এটা ধরে নেওয়া যায়, কেউ কবি হলে শেক্সপীয়রের দ্বারা প্রভাবিত হবে।
ওর্ : সিলভিয়া, যে কেউ লক্ষ্য করলে দেখতে পাবে যে আপনার কবিতা পড়লে এবং শুনলে দুটো দিক খুব দ্রুত ও স্পষ্টভাবে উঠে আসে। একটা হচ্ছে ঝরঝরে ভাষা ও প্রাঞ্জলতা, যার একটা দিক হলো সেগুলি যখন পড়া হচ্ছে তারও একটা আলাদা অভিঘাত তৈরি হচ্ছে শ্রোতার মনে। আপনি কি সচেতনভাবেই এমন কবিতা লেখেন যা পড়তেও সহজ লাগবে এবং শুনলেও অর্থবহ হবে?
প্লাথ : আমার আগের দিককার লেখায় এটা ছিল না। যেমন ‘দ্য কলোসাস’ বইটির কবিতাগুলি এখন আর আমি চিৎকার করে পড়তে পারি না। আবৃত্তি করার জন্য আমি কবিতাগুলি লিখিনি। এগুলি নিভৃতে পড়ার জন্য। যে কবিতাগুলি আমি এক্ষুনি পড়লাম, যে কবিতাগুলি এই সময়ে লেখা, সে সম্পর্কে আমি বলতে চাই, জোরে জোরে পড়ার কবিতা। আমার কবিতা লেখার ক্ষেত্রে এটাই হচ্ছে নতুন ঝোঁক বলতে পারেন। আমি একথা নিজেকেও বলতে চাই এবং জোরগলায়, চিৎকার করে।
প্লাথ : আবৃত্তিযোগ্য হলেই কি ভালো কবিতা হবে?
প্লাথ : হ্যাঁ, এখন আমি তাই মনে করি। এই যে কবিতা রেকর্ড করা হচ্ছে, প্রকাশ্যে মঞ্চে পড়া হচ্ছে, কবিদের কথাবার্তা রেকর্ড হচ্ছে, এসব খুব সুন্দর ব্যাপার। এই ব্যাপারটা বেশ উত্তেজক বলেও মনে হয়। মনে হয় এ হচ্ছে সেই যুগে ফিরে যাওয়ার একটা প্রস্তুতি যখন কবিরা মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন, কবিতা বলতেন — সরাসরি।
আমার মনে হয় উপন্যাসে আপনি প্রাত্যাহিক জীবনের প্রতিটি তুচ্ছতম জিনিসও — যেমন টুথব্রাশ আনতে পারেন, কবিতায় এটা করা কঠিন।
ওর্ : কিংবা কবি গান গেয়ে শোনাতেন।
প্লাথ : হ্যাঁ, একদম ঠিক, গান গেয়ে শোনাতেন।
ওর্ : আচ্ছা, কবিতাকে সরিয়ে রেখে প্রশ্ন করছি, আর কোনো বিষয়ে কী আপনি লিখতে চান বা লিখেছেন।
প্লাথ : গদ্যের দিকে আমার বরাবরের ঝোঁক রয়েছে। কৈশোরে আমি ছোটোগল্প লিখতাম ও ছাপাতাম। আমি সবসময় চাইতাম
আমার সবচেয়ে ভালো লাগে তেমন মানুষকে যাদের কিছু গূঢ় বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে এবং যারা আমাকে কিছু শেখাতে পারবে। যেমন আমাদের অঞ্চলের এক ধাইমা আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে মৌমাছি প্রতিপালন করতে হয়।
একটা বড় ‘ছোট গল্প’ লিখতে। উপন্যাস লিখতে। এখন আমি সমীহ করার মতো একটা বয়সে পৌঁছেছি, জীবনের অনেক ঘাতপ্রতিঘাত অভিজ্ঞতা হয়েছে, এখন আমার গদ্যের প্রতি, বিশেষ করে উপন্যাসের প্রতি টান অনেক বেড়েছে। আমার মনে হয় উপন্যাসে আপনি প্রাত্যাহিক জীবনের প্রতিটি তুচ্ছতম জিনিসও — যেমন টুথব্রাশ আনতে পারেন, কবিতায় এটা করা কঠিন। কবিতা একটি অত্যন্ত কঠোর নির্মম ডিসিপ্লিন, যেখানে অত্যন্ত ছোট পরিসরের মধ্যে অনেক দ্রুত অনেক দূরে যেতে হয়। তাই কেন্দ্র থেকে দূরের সীমান্তবর্তী বিষয়কে যত দূর সম্ভব ছেঁটে ফেলতে হয়। এই ব্যাপারটা আমাকে কষ্ট দেয়। আমি একজন নারী। জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যাপারগুলিতে আমার অসীম আগ্রহ। উপন্যাসে আমি অনেক বেশি জীবনকে খুঁজে পাই। হয়তো তত তীব্র নয়, কিন্তু অনেক বেশি; তাই আমি এখন উপন্যাস লেখায় বেশি আগ্রহ বোধ করছি।
ওর্ : এটা অনেকটা ডক্টর জনসনের ধারণার মতো, তাই না? তিনি বলতেন কয়েকটা জিনিস আছে কবিতার সঙ্গে যায়, আবার কয়েকটা যায় না।
প্লাথ : না, কবি হিসেবে আমি বলব কবিতায় সব কিছুই আসতে পারে। তবে আমি টুথব্রাশ আনতে পারব না। সত্যিই পারব না।
ওর্ : কবি ও লেখকদের সঙ্গ আপনার ভালো লাগে। তাঁদের সঙ্গে থাকতে, সময় কাটাতে…
প্লাথ : আমি ডাক্তার, ধাই, আইনজীবীদের সঙ্গে মিশতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করি, কিন্তু লেখকদের সঙ্গে না। লেখক ও শিল্পী অত্যন্ত বেশি মাত্রায় নার্সিসিস্ট হয়। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে তেমন মানুষকে যাদের কিছু গূঢ় বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে এবং যারা আমাকে কিছু শেখাতে পারবে। যেমন আমাদের অঞ্চলের এক ধাইমা আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে মৌমাছি প্রতিপালন করতে হয়। তিনি কিন্তু আমার কবিতার বিন্দুবিসর্গ বোঝেন না। কবিদের চাইতে তাঁকে বেশি পছন্দ করি। তারপর ধরুন আমার বন্ধুদের মধ্যে আছে এমন অনেক মানুষ যারা নৌকো সম্বন্ধে অনেক কিছু জানে অথবা কোনো খেলা সম্পর্কে। আবার এমন অনেকে আছে যারা জানে কীভাবে শরীরকে কেটে সেখান থেকে একটা অঙ্গকে সরিয়ে ফেলতে হয়। আমি এইসব বাস্তব ক্রিয়াকলাপে পারদর্শীদের বেশি পছন্দ করি। কবিরা তো বাতাসে বসবাস করেন। আমি তেমন লোককে পছন্দ করি যে আমাকে বাস্তব কিছু শেখাতে পারবে।
ওর্ : এমন কোনো পেশা আছে কবিতা না লিখে যা আপনি পেতে চান? কেননা কবিতা লিখে সাফল্য পেতে হলে ব্যক্তিগত জীবনের অনেকটাই কবিতাকে দিতে হয়। কোনো আক্ষেপ আছে জীবনে অন্য কোনো কাজ করা হল না বলে?
প্লাথ : জীবনে যদি অন্য কিছু করতাম তাহলে সেটা হতো ডাক্তারি। এর অবস্থান অবশ্য লেখার একেবারে বিপরীত মেরুতে। আমার যৌবনের প্রিয় বন্ধুদের প্রায় সবাই ছিল ডাক্তার। আমি ডাক্তারদের মতো সাদা কাপড়ের স্কার্ফ পরতাম আর সদ্যোজাত শিশুদের নার্সারি আর শবব্যবচ্ছেদের ঘরগুলোতে ঘুরে বেড়াতাম। এটা আমাকে মুগ্ধ করত। কিন্তু ডাক্তারি পড়তে গেলে আর ডাক্তারির সব শিখতে গেলে যে শৃঙ্খলার মধ্যে থাকা প্রয়োজন, সেটা আমার কোনোদিন ছিল না। তবে আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিই এই বলে যে, আমি কত কত ডাক্তারকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। ডাক্তার হওয়ার চেয়ে ডাক্তারদের সম্বন্ধে লিখতে আমি বেশি আনন্দ পাই।
ওর্ : কিন্তু কবিতা লেখা তো আপনার জীবনে গভীর তৃপ্তি এনে দিয়েছে?
প্লাথ : ওহ্, তৃপ্তি! আমি কবিতা ছাড়া বাঁচবই না। কবিতা আমার কাছে রুটি বা পানির মতো। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস। যখন আমি কবিতা লিখি বা একটা লিখে ফেলেছি, তখন নিজেকে আমার ভীষণ পরিতৃপ্ত লাগে। আনন্দ হয়। একটা কবিতা লেখার পর আমি কবিতা লিখনরত কবির কাছ থেকে সরে গিয়ে হয়ে যাই বিশ্রামরত কবি; দুটো কিন্তু এক জিনিস নয়। তবে আমার মনে হয়, কবিতা লিখতে পারার অভিজ্ঞতাটা আশ্চর্য আনন্দের, বিস্ময়কর রকমের আনন্দের।

