শ্রী চিন্ময় (Sri Chinmoy) ছিলেন একজন ভারতীয় আধ্যাত্মিক গুরু, দার্শনিক, কবি, লেখক, শিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ ও ক্রীড়াবিদ। তাঁর জীবন, দর্শন ও বহুমুখী কার্যক্রম মানবজাতির আত্ম-অনুসন্ধান ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত ছিল।
তাঁর পুরো নাম চিন্ময় কুমার ঘোষ। তিনি ১৯৩১ সালের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার শাখপুরা গ্রামে (যা বর্তমানে পটিয়া উপজেলার অন্তর্গত) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শ্রী শশধর ঘোষ এবং মাতা যোগমায়া দেবী। দুজনেই ধার্মিক ও উদার মানসিকতার মানুষ ছিলেন। তিনি সাত ভাই-বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন। চিন্ময়ের বয়স যখন মাত্র ১১ তখন তাঁর পিতা-মাতা দুজনেই প্রয়াত হন।
১৯৪৪ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তার ভাইবোনদের সাথে পণ্ডিচেরীর শ্রী অরবিন্দ আশ্রমে যোগ দেন। সেখানে তিনি ২০ বছর কঠোর সাধনায় কাটান। এই সময়ে তিনি গভীর ধ্যানে মগ্ন হতেন, বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করতেন, খেলাধুলায় অংশ নিতেন এবং আশ্রমের কুটির শিল্পে কাজ করতেন। অল্প বয়সেই তিনি আধ্যাত্মিকতার গভীরে প্রবেশ করেন। উচ্চতর ধ্যানের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। আশ্রমের জীবন তাঁকে একটি সুষম জীবনধারা বিকাশে সহায়তা করে, যেখানে মন, হৃদয়, প্রাণশক্তি এবং শরীর – সবকিছুর সম্মিলিত উন্নতি সাধিত হয়।
১৯৬৪ সালে তিনি ভারত ত্যাগ করে নিউইয়র্ক সিটিতে বসবাস শুরু করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমা জগতে পূর্বের আধ্যাত্মিক জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া, মানুষের মধ্যে ঈশ্বরস্বরূপ আত্মার জাগরণ ঘটানো। নিউইয়র্ক থেকেই তাঁর আন্তর্জাতিক কর্মধারার সূচনা হয়। সেখানে তিনি যোগ সাধনা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রচার শুরু করেন। নিউইয়র্কের কুইন্স শহরে তিনি তাঁর প্রথম ধ্যানকেন্দ্র শ্রী চিন্ময় সেন্টার স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে তাঁর শিক্ষা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রায় ৬০টি দেশে ৭ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী তাঁর আধ্যাত্মিক নির্দেশনায় জীবনযাপন করে।
শ্রী চিন্ময় তাঁর আধ্যাত্মিক নির্দেশনার জন্য কোনো অর্থ গ্রহণ করতেন না। তিনি বিনামূল্যে কনসার্ট, বক্তৃতা এবং জনসমক্ষে ধ্যান অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, যা তিনি তাঁর ‘পিস-ড্রিমার’ কার্যক্রম, আন্তঃধর্মীয় আলোচনা এবং ‘শ্রী চিন্ময় ওয়াননেস-হোম পিস রান’-এর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ‘পিস রান’ বিশ্বের বৃহত্তম মশাল দৌড়গুলোর মধ্যে একটি, যেখানে শান্তির মশাল হাতে নিয়ে দৌড়বিদরা বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ করেন এবং স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে শান্তি ও ঐক্যের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত করেন।
শ্রী চিন্ময়ের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আত্মসমর্পণ ও ঈশ্বরানুভব। প্রেম, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের পথে আত্মিক অগ্রগতি সাধন করাই এই দর্শনের লক্ষ্য। তিনি দিব্যপ্রেমকে আত্ম-উৎসর্গ ও আত্ম-সম্প্রসারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ঈশ্বরকে চেনা যায় হৃদয়ের মাধ্যমে, আত্মসমর্পণের মাধ্যমে।
তাঁর দর্শন বহির্জীবন ও অন্তর্জীবনের মধ্যে এক সুষম সমন্বয়ের উপর গুরুত্বারোপ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি পরিপূর্ণ জীবনের জন্য বাইরের কার্যকলাপ এবং ভেতরের আধ্যাত্মিকতা উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, “আমাদের দর্শন বাইরের জীবন বা ভেতরের জীবনকে অস্বীকার করে না। বেশিরভাগ মানুষ ভেতরের জীবনকে অস্বীকার করে। তারা মনে করে যে পৃথিবীতে যতক্ষণ তারা টিকে থাকতে পারে, ততক্ষণ ভেতরের জীবন গুরুত্বপূর্ণ নয়। আবার, কিছু মানুষ আছে যারা মনে করে যে বাইরের জীবন প্রয়োজনীয় নয়। তারা মনে করে যে হিমালয়ের গুহায় প্রবেশ করে নির্জন জীবনযাপন করাই শ্রেয়, কারণ বাইরের জীবন বেদনাদায়ক আর ভুল বোঝাবুঝিতে পূর্ণ। আমরা নির্জন জীবন বা তথাকথিত আধুনিক জীবন, যা যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল, সেগুলির কোনোটিতেই বিশ্বাস করি না। আমরা বাইরের জীবন এবং ভেতরের জীবনকে সমন্বিত ও সুসংহত করার চেষ্টা করি। বাইরের জীবন একটি সুন্দর ফুলের মতো এবং ভেতরের জীবন তার সুগন্ধ। যদি সুগন্ধ না থাকে, তাহলে আমরা ফুলের কদর করতে পারি না। আবার, যদি ফুল না থাকে, তাহলে সুগন্ধ কিভাবে হবে? সুতরাং ভেতরের জীবন এবং বাইরের জীবন একসাথে চলতে হবে।”
তিনি আত্ম-উত্তরণ বা ‘Self-Transcendence’-এর ধারণায় বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। এর অর্থ হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে ক্রমাগত উন্নত থেকে উন্নততর স্তরে পৌঁছানো – নিজের পূর্বের অর্জনকে ছাড়িয়ে যাওয়া, অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা নয়, বরং নিজের ভেতরের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া। এই দর্শন মানবজাতির অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে উন্মোচন করার পথ দেখায়। “পৃথিবীই স্বর্গের রূপান্তরভূমি” — একথা তিনি বিশ্বাস করতেন। চূড়ান্ত মুক্তি এই জীবনের মধ্যেই সম্ভব।
শ্রী চিন্ময় আত্মিক উন্নয়নের জন্য যে-পথ অবলম্বন করেন, তাকে বলা যায় ‘ভক্তিময় রাজযোগ’। তিনি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধ্যানে বসতেন। যোগব্যায়াম ও ক্রীড়াচর্চাকে গুরুত্ব দিতেন। ঈশ্বরের প্রতি প্রীতিময় আকাঙ্ক্ষা তথা প্রতিটি কাজের মধ্যে ঈশ্বর-স্মরণ ছিল তাঁর। নীরবতা ও অন্তর্জগতে প্রবেশ ছিল তাঁর অন্বিষ্ট। তাঁর রচনায় বারবার উঠে আসে নীরবতার প্রশান্তি ও গহনের কথা। তিনি বলেন, “Silence is the eloquent expression of the inexpressible.”
তিনি কর্ম ও শিল্পকে সাধনার অঙ্গ হিসেবে দেখতেন। তাঁর দৃষ্টিতে, সেবামূলক কর্ম হলো প্রার্থনার একটি রূপ। সমস্ত জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গের ঊর্ধ্বে মানবতা এক ও অভিন্ন—এই ছিল তাঁর অটল বিশ্বাস। শ্রী চিন্ময় ছিলেন জাতিসংঘের বিশেষ আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতা। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন The Peace Meditation at the United Nations (১৯৭০), যেখানে কূটনীতিক, রাষ্ট্রদূত ও কর্মকর্তারা শান্তি ও অন্তর্জাগরণের জন্য ধ্যান করতেন।
তিনি রচনা করেছেন ১,৫০০-র বেশি বই, যার মধ্যে রয়েছে কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, প্রবচন, ভক্তিমূলক গান ও অনুপ্রেরণামূলক লেখা। তাঁর কাব্যভাষা সহজ, হৃদয়গ্রাহী, কিন্তু গভীর আধ্যাত্মিক বোধে পূর্ণ। অনেক সময় তাঁর কবিতাকে বলে ‘মন্ত্র-কবিতা’, কারণ তার ধ্বনি ও স্পন্দন হৃদয়ে ঈশ্বরচেতনার প্রকাশ ঘটায়।
শ্রী চিন্ময়ের কবিতা মূলত চারটি ধারায় বিভক্ত :
ক) ধ্যান-কবিতা : যেখানে আছে নীরব আত্মার সাথে ঈশ্বরের মিলন ও মুক্তির সন্ধান।
খ) প্রার্থনা-কবিতা : নম্রতা, আত্মসমর্পণ ও ভক্তির সুরে রচিত।
গ) মানবিক বেদনা ও পুনর্জাগরণের কবিতা : পৃথিবীর দুঃখ, হতাশা ও মৃত্যুকে অতিক্রম করে আশার আলোকপাত ঘটেছে।
ঘ) অন্তর্জাগরণ ও উপলব্ধির কবিতা : সীমার ভেতর অসীম, জীবনের মধ্যে ঈশ্বর, অন্তরের মধ্যে চিরন্তন উপলব্ধির কবিতা।
তিনি হাজার হাজার ছবি এঁকেছেন। এই ছবিকে তিনি বলেছেন ঝরনা-প্রবাহিত শিল্প। তিনি ভেতরের অনুভূতি ও আত্মার ভেতর থেকে উৎসারিত রঙ ও রূপ দিয়ে ছবি আঁকতেন। তাঁর চিত্রকর্মগুলি আধ্যাত্মিকতার দৃশ্যমান প্রকাশ।
চিন্ময় ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতজ্ঞ। তিনি ২১ হাজারেরও বেশি বাংলা গান এবং প্রায় ৭ হাজার ইংরেজি গান রচনা করেছেন। তাঁর গানগুলো ঈশ্বরকে আহ্বান ও আরাধনার সুরে ভরা। এগুলো প্রায়শই ধ্যানের সময় পরিবেশিত হতো এবং শ্রোতাদের মনে গভীর শান্তি এনে দিত।
শ্রী চিন্ময় বিশ্বাস করতেন, খেলাধুলা এবং আধ্যাত্মিকতা একে অপরের পরিপূরক। তিনি নিজেই একজন উৎসাহী দৌড়বিদ ছিলেন এবং ৫৪ বছর বয়সে ভারোত্তোলন শুরু করেন। তিনি ২২টি ম্যারাথন ও ৫টি আল্ট্রা-ম্যারাথন সম্পন্ন করেছেন। ভারোত্তোলনে তাঁর অর্জন অনেককে বিস্মিত করেছে এবং তিনি দেখিয়েছেন যে প্রার্থনা ও ধ্যান একজন ব্যক্তির শারীরিক ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে পারে।
শ্রী চিন্ময় ১১ অক্টোবর ২০০৭ সালে নিউইয়র্কে পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্য, সংগীত, ধ্যানচর্চা ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের বার্তা আজও অগণিত অনুসারীর জীবনকে প্রভাবিত করে যাচ্ছে। তিনি একাধারে ঈশ্বরভক্ত, বিশ্বনাগরিক, ধ্যানী ও স্রষ্টা—যাঁর কাজের পরিসর কবিতা থেকে আন্তর্জাতিক শান্তির কূটনীতিতে প্রসারিত।
শ্রী চিন্ময় ছিলেন বিবিধ গুণের এক অলৌকিক সংমিশ্রণ : একাধারে দার্শনিক, কবি, চিত্রশিল্পী, সংগীতকার, ক্রীড়াবিদ ও আধ্যাত্মিক গুরু। তাঁর জীবনসাধনা ছিল একান্তভাবে বিশ্বমানবের মধ্যে ঈশ্বরের আবির্ভাব ঘটানো। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় : “আমি পৃথিবীতে এসেছি পৃথিবীকে ভালোবাসতে। আমি পৃথিবীতে এসেছি পৃথিবীকে সেবা করতে।”
শ্রী চিন্ময়ের কিছু সারগর্ভ উজ্জ্বল ভাববচন :
১
বিশ্বশান্তি অর্জিত হতে পারে,
যখন প্রতিটি মানুষের মধ্যে,
শক্তির প্রতি ভালোবাসা নয়,
ভালোবাসার শক্তি স্থান করে নেবে।
২.
ভালোবাসা বোঝার বিষয় নয়।
ভালোবাসা অনুভবের বিষয় নয়।
ভালোবাসা দেওয়া-নেওয়ার বিষয় নয়।
ভালোবাসা শুধু হয়ে ওঠার বিষয়,
আর চিরকাল তা হয়ে থাকার বিষয়।
৩.
যদি তোমার অন্তরে শান্তি থাকে,
তাহলে বাইরের বাস্তবতার দাস হতে
কেউ তোমাকে বাধ্য করতে পারবে না।
৪.
যতক্ষণ তোমার হৃদয়
এক ক্রমবর্ধমান অভিলাষের শিখা হয়ে থাকে,
ততক্ষণ তোমার দুর্বলতাগুলো কী,
তাতে কিছু যায় আসে না।
৫.
আমি এই পৃথিবীতে
কিছু প্রমাণ করতে আসিনি।
আমি এই পৃথিবীতে এসেছি
সবাইকে এবং সবকিছুকে ভালোবাসতে।
৬.
আমি ধ্যান করি,
যাতে আমার সমগ্র সত্তাকে
শান্তির সর্বশক্তিমান ক্ষমতা দিয়ে
আচ্ছন্ন করতে পারি।
৭.
আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত
আমার হৃদয়-গোলাপের
মধুর-সুগন্ধ হয়ে উঠুক।
৮.
শুধুমাত্র আমাদের ইতিবাচক চিন্তাভাবনার মাধ্যমে,
অন্যদের ইতিবাচক গুণাবলীকে সামনে আনার মাধ্যমে,
এই পৃথিবী উন্নতি করতে সক্ষম হবে।
৯.
নীরবতা হলো অব্যক্তের বাগ্মিতাপূর্ণ প্রকাশ।
১০.
বাইরের জীবনে সরলতা সুন্দর।
অন্তরের জীবনে সরলতা অজেয়।
১১.
সূর্য সবার জন্য কিরণ দেয়।
কেউ কেউ এর সদ্ব্যবহার করে,
আর কেউ কেউ করে না।
১২.
পৃথিবীকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করো না।
তুমি ব্যর্থ হবে।
পৃথিবীকে ভালোবাসার চেষ্টা করো।
দেখো, পৃথিবী পরিবর্তিত হয়েছে।
চিরকালের জন্য পরিবর্তিত হয়েছে।
১৩.
আমাদের অন্তরের শান্তি দিগন্তহীন;
সীমাহীন আকাশের মতো,
তা সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে।
১৪.
তোমার হৃদয়কে ভালোবাসার সমুদ্র হতে হবে।
তোমার মনকে অনাসক্তির নদী হতে হবে।
১৫.
মাস কেটে গেল,
আর ঋষি কেবল ঈশ্বরের কাছে
শান্তি, আলো ও আনন্দের জন্য প্রার্থনা করছিলেন।
১৬.
জীবনে সফল হওয়ার একটাই পথ:
জীবনের উজ্জ্বল, উজ্জ্বলতর, উজ্জ্বলতম
দিকটার দিকে সবসময় তাকাও।
১৭.
কোনো চিন্তাকে তোমার অভ্যন্তরীণ স্থিরতা
নষ্ট করতে দিও না।
১৮.
আমার মনকে প্রতি মুহূর্তে শান্ত করতে হবে,
আমার পরম প্রিয় প্রভুর আশীর্বাদপূর্ণ উপস্থিতি
অনুভব করার জন্য।
শ্রী চিন্ময়ের কিছু কবিতা
পরম
চিন্তাহীন, রূপহীন, কেবল আমি আছি;
মনের ইচ্ছা ও ভাবনা সব থেমে গেছে।
প্রকৃতির নৃত্যের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি,
আমি সেই আমি যাকে খুঁজেছি এতদিন।
নির্মল আনন্দের শুদ্ধ পরম রাজ্য;
জ্ঞাতা ও জানার বাইরে।
অবশেষে আমি উপভোগ করি মহান বিশ্রাম;
আমি একা, সম্মুখে কেবল এক ও অদ্বিতীয়।
জীবনের গোপন পথ আমি পার হয়েছি,
আমি নিজেই লক্ষ্যে রূপান্তরিত।
চিরসত্য আজ উন্মোচিত :
আমি পথ, আমি ঈশ্বর-আত্মা।
আমার আত্মা সকল উচ্চতা জানে,
সূর্যের কেন্দ্রস্থলে আমি নীরব।
সময় ও কর্মের সঙ্গে আমি আর কিছু লেনদেন করি না;
আমার মহাজাগতিক লীলা শেষ।
সোনার বাঁশি
এক সাগর শান্তি, আনন্দ আর আলো
আমি জানি, তা আমার নাগালের বাইরে।
আমার অন্তরে ঝড়ো অশ্রুর রাত
প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়।
আমি চিৎকার করি, কিন্তু বৃথা;
অসহায় আমি, পৃথিবী নিষ্ঠুর।
কে আছে এমন বলশালী আত্মা
যে আমার দুঃখ ভাগ করে নেবে?
শুধু মৃত্যুর বিষণ্ন ছায়া পাই।
আমি সময়ের সাগরে এক ভেলা,
আমার বৈঠা ধুয়ে গেছে ঢেউয়ে।
কীভাবে পৌঁছব আমি সেই চিরন্তন
ঈশ্বরের দিনের দেশে?
কিন্তু শোনো! শুনি তোমার সোনালি বাঁশির সুর
তার সুরে স্বর্গ নেমে আসে।
আজ আমি নিরাপদ, হে পরম!
মৃত্যু দূরে, রাতের কালো মুছে গেছে।
অমরতা
আমার অঙ্গে অঙ্গে অনুভব করি তাঁর অসীম করুণা;
হৃদয়ের গভীরে সত্য দীপ্তিময়।
ঈশ্বরের গোপন উচ্চতায় আমার আত্মা উঠে চলে;
নেই আর দুঃখ, নেই মৃত্যু।
মৃত্যুর দিনরাত্রি আর নড়াতে পারে না আমাকে;
এক উচ্চতর আলো ধারণ করে আমার আত্মা।
সন্দেহ ও দুঃখ দূর হয়েছে চিরতরে,
আলোকদৃষ্টি দিয়ে আমি দেখি আমার আরাধ্য লক্ষ্য।
পৃথিবীতে থেকেও আমি উর্ধ্বে;
নিঃশেষ প্রশান্তির মহাসাগরে আমার বাস।
আমার মন এক গভীর কেন্দ্র,
অপরিমেয় চেতনার ধারা।
সময়ের বেগে আমি খুঁজে পাই চিরকাল;
বাজাই আমি তাঁর রসময় বাঁশি।
অসম্ভব কাজও এখন সম্ভব মনে হয়;
জন্ম-মৃত্যুর শিকলে আজ দীপ্ত অমরতা।
প্রলয়
অন্তরে-বাইরে আমি বিস্তীর্ণ ব্রহ্মাণ্ড;
আনন্দময় গতিতে ধরি ও ছাড়ি সব।
জন্মহীন-মৃত্যুহীন চেতনাত্মা
চুপচাপ থাকে, শুনে আমার ডাক।
আমি সৃষ্টিকারী, আমি ধ্বংসকারী,
দুঃখ-সুখ সব আমার খেলা।
আমি মুখ লুকাই সত্যের,
সোনালি আবরণে, দেখি রাত ও দিনের সাপ-খেলা।
আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে আনন্দ-চেতনাকে ছুঁই;
আমি সূর্যের প্রেমময় সন্তান।
ইচ্ছায় আমি গড়ি ও ভাঙি আমার শরীর-প্রতীক,
আনন্দে ভরে দেখি বিশ্বের ছায়াহীন খেলা।
শূন্যতা ও অনন্তের মাঝখানে
ঘটনাহীন জীবন,
তবে প্রমাণের দম্ভে ভরপুর।
অস্পষ্টতা :
এ-ই আমার আসল নাম।
নিজের মধ্যেই সম্পূর্ণ
আমি রয়েছি।
কাউকে জড়াই না
ভালোবাসার বন্ধনে।
আমার যোগ্য গুরু
কেউই নয়।
আমি সম্পূর্ণ একা
ব্যর্থতা ও হতাশার মাঝে।
আমি এক লাল সূতা
শূন্যতার
আর অনন্ততার মাঝে।
হে পরম, আত্মসমর্পণ শেখাও
হে পরম, শেখাও আত্মসমর্পণ,
দাও আমার হৃদয়ে প্রেম!
আমার হৃদয় যেন গ্রহণ করে ঐক্যের প্রেম,
সমগ্র জগৎকে আপন করে।
আমি চাই না, তিনটি জগতের কারও
হৃদয়ে থাক কষ্টভোগের ছায়া।
চিন্তার অতীত সুন্দর তুমি
চিন্তার অতীত, মনের অতীত
হে সুন্দরতম! তুমি বিরাজমান।
এই দেহ, প্রাণ, মন ও হৃদয়
করো পূর্ণ তোমার আলোর ছায়ায়।
সকল সাফল্যে যেন থাকে পূর্ণতা
শরণ নিই তোমার দেব-পদতলে।
ধরণীরে ভালোবেসে
পৃথিবীকে ভালোবেসে
আমি এসেছি এই অন্ধকার জীবনে,
হাসিমুখে
এই গভীর গম্ভীর জগৎ রূপান্তরের আশায়।
এ খেলা আমার নয়
এ তোমারই বিশ্ব-নাট্য।
আমি তোমায় প্রণতি জানাই
বারংবার।
ঘুমিয়ে থাকা আমার প্রাণের দ্বার ভেঙে
মা, আজ আমার হৃদয় জয় করো চিরতরে।
দিব্য জীবন আসবে
দিব্য জীবন আসবে।
মানুষের মুখে ফুটবে হাসি।
সব দেবতারা নেমে আসবে,
ভালোবেসে আমাদের এই পৃথিবীকে।
অন্তরে মোর অনন্ত রূপ
আমার ভিতরে রয়ে গেছে
অসীম সৌন্দর্যের সব রূপ।
বাইরে আমি নিরর্থক, অকার্যকর,
তবুও, হে বিশ্বপালক,
তুমি আমাকে করো তোমার,
তোমার একান্ত নিজস্ব।
অণুতে রেণুতে
অণুতে, রেণুতে, মানুষের শরীরে
আমার জীবন প্রবাহিত।
আমি সৌন্দর্য, আমি অপরিবর্তনীয়।
অমৃত আমি পান করি
একা, নিজ আনন্দে।
বসিয়াছ ভালো
আমি বিশ্বাস করতেও রাজি
যে তুমি ভালোবাসো এই জগতের দ্বৈত খেলা।
তবে বলো তো,
দারিদ্র্য, দুঃখ, ব্যঙ্গ, মৃত্যুর বেদনা
সৃষ্টি করেছে কে, যদি না তুমি?
সত্য আমার প্রাণ
সত্যই আমার প্রাণ,
সত্যই আমার ধ্যান।
আমি চিরকাল খুঁজি
সেই চির-ঊর্ধ্বগত সত্য।
এই সত্যের নেই কোন অন্ত,
এই সত্য নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যায়
অনন্তের আলোর মাঝে।
সীমা মিলে যাক
সীমা মিশে যাক
অসীমের বুকে,
আনন্দ-সাগরে।
আমার হৃদয়ের বীণা বাজাক
পরমানন্দের গান
চরম উচ্চতার গান।
সীমার মাঝে
অসীম আমাকে গ্রহণ করেছে
কিন্তু আমি পারি না অসীমকে ধারণ করতে।
নেই কোনো ভাষা, নেই আশা।
হারিয়ে ফেলেছি স্মৃতির আলো।
তবু আমার পুরাতন পুণ্যজীবন
আমাকে দেখায় মহান নীরবতার আলো।
সব জীবন আপন
সব মানুষের জীবনই
আমার কাছে প্রিয়।
কেউই আমার কাছে অপরিচিত নয়।
এই সমগ্র জগত আমার
আমার আত্মার বস্ত্র, আমার শান্তির পরিচ্ছদ।
নীরবতা
নীরবতা, নীরবতা,
তুমি আমার আত্মার
ঊষার অনন্ততা।
নীরবতা, নীরবতা,
তুমি আমার দেহের রাতের
আশাবাদী লতা।

