গতরাতে উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের তাণ্ডব কতটা নির্দয় ছিল, পরিস্থিতি দেখেই সেটা বোঝা যায়। মনে হয়, এই ক্ষত সারিয়ে তুলতে অনেকটা সময় লাগবে প্রকৃতির। মেঘনার পানি যেন নদীতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না তখন। লক্ষ্মীপুরের রামগতি এলাকার নদী পাড়ের প্রায় সব গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে গেছে গতকালের আকস্মিক বন্যা। রমিজ মুন্সি ঘর থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকান। আকাশ এখনো মেঘে ভারী হয়ে আছে। পুরো বড়খেড়ী গ্রামে হাঁটু পর্যন্ত পানি। গ্রামের অনেক বড় গাছই বাতাসের তাণ্ডবে ভেঙে পড়েছে। যতদূর চোখ যায় গাছের বড় বড় ডালপালা ভেঙে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে। পানি না নামা পর্যন্ত এ সবে হাত দেওয়া যাবে না আর। রমিজ মুন্সির বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট খালটার ওপাশে একটি খালি ভিটে। চার-পাঁচ বছর আগে এ ভিটেতে রমিজ মুন্সি গোলাপজানকে আপাতত থাকতে দিয়েছিলেন। যাতায়াতের জন্য একটি বাঁশের সাঁকোও করে দেওয়া হয়েছিল তখন। গোলাপজান তখন এলাকার মানুষের সাহায্য-সহযোগিতায় নিজের থাকার জন্য একটি ঝুপড়ির মতো তৈরি করে নিয়েছিল কোনোরকমে। গোলাপজান একা। জগতে তার এখন কেউ নেই।
প্রায় পনেরো-ষোলো বছর আগে মেঘনার পাড়ে বড়খেড়ী ইউনিয়নেরই রঘুনাথপুর গ্রামে ছিল গোলাপজানের বাড়ি। স্বামী আর এক পুত্র নিয়ে সংসার ছিল তার। ছেলে মোবারক শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েই জন্মেছিল। তার পেছনে সময় দিতেই দিন যেত গোলাপজানের। ফলে দ্বিতীয় সন্তান নিয়ে আর কখনো ভাবা হয়নি তাদের। সেবার হঠাৎ নদীর ভাঙন ছিল তীব্র। রাতের পর রাত নির্ঘুম সময় কাটত এলাকাবাসীর। এই বুঝি প্রমত্তা মেঘনা জোয়ার শেষে ভাটার টানে ভেঙে নিয়ে যাবে পুরো লোকালয়। ক্রমেই নদীতে ঢেউ বাড়ছিল, মানুষের মনে উৎকণ্ঠাও বাড়ছিল। ঘরবাড়ি আর স্বজন হারিয়ে কতজন যে নিঃস্ব আর নিঃসঙ্গ হয়েছিল সেবার, তার খবর কেউ রাখেনি শেষমেশ।
সেই সময়ে, কোনো এক বিকেলে গোলাপজান বড়খেড়ী গ্রামে, তার বোনের বাড়িতে গেছিল। অনেক দিন ধরেই বোনটার অসুখ। কিছুতেই জ্বর সারে না তার। বোনকে দেখতে গিয়ে সেই রাতে সেখানেই থেকে যায় গোলাপজান। বাড়িতে তার স্বামী দিলদার মিয়া রাতের খাবার শেষ করতে বেশি দেরি করে না আর। বাজারে একটি চালের আড়তে কাজ করে সে। কাজ থেকে ফিরে রাত আটটা নাগাদ বাপ-ছেলে রাতের খাবার খায় সেদিন। গোলাপজানের রান্না করা রেখে যাওয়া মুরগির মাংস আর ডাল দিয়েই খাওয়া সারে তারা। খাওয়া শেষে ছেলেকে বাথরুমে নিয়ে যায় দিলদার। বিশ-বাইশ বছর বয়সী ছেলে, অথচ এখনো কোলে তুলেই বাথরুমে নিতে হয় তাকে। ছেলের দু-পা অবশ। দিলদার মিয়া ইদানীং আর পারে না। এত ওজনের ছেলেকে কোলে নিতে তার শরীর আর সাহস করে না। মোবারককে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে দিলদার মিয়া হেঁটে মেঘনার পাড়ে যায়। পরিষ্কার আকাশ। আকাশ জুড়ে চাঁদের আলো ছড়ানো। মাত্র তো পূর্ণিমা শেষ হলো। দিলদার মিয়া পানির স্রোত খেয়াল করে। দূরে তাকায়। একটা সময় যেখানে ছিল তার আরো অনেক কিছুই। এখন নদীর ভাঙন বাড়ির প্রায় পঞ্চাশ গজের কাছাকাছি। দিলদার মিয়া কী একটা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। মুহূর্তে তা বিলীন হয়ে যায় হাওয়ায়। আজ কি তবে কেবল মেঘনার পানি নয়, তাদের নিয়তিতে আঘাত করবে এই উন্মত্ত হাওয়াও! গ্রামের কবরস্থান অনেক দিন আগেই ভাঙনে বিলীন হয়ে মিশে গেছে মেঘনায়। দিলদার মিয়ার মা-বাপের কবর ছিল সেখানে। এখন প্রতি জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে কেবল হাত তুলেই দোয়া করে মরহুম বাবা-মায়ের আত্মার শান্তির জন্য।
কবরগুলো হারিয়ে গেছে নদীগর্ভে, মেঘনা গিলে খেয়েছে সব। এমন আরো আকাশ-পাতাল ভাবনা নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে দিলদার মিয়া। নীরবে শুয়ে পড়ে ছেলের পাশে। খেয়াল করে মোবারক ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতর অন্ধকারে মিশে থাকে বাইরের রহস্যঘন চাঁদের আলো। সেই আলো-আঁধারিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তন্দ্রায় জড়িয়ে আসে দুচোখ। গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় দিলদার মিয়া। কিন্তু উন্মত্ত মেঘনা নির্ঘুম, সে ক্ষুধার্ত শিকারির মতো এগিয়ে আসে ধীরে, চুপিসারে গিলে নেয় জনপদ।
পরদিন সকালে গোলাপজানকে খবর পাঠানো হলে প্রায় পাগলের মতো ছুটে আসে সে। গতকাল দুপুরে যে ভিটে থেকে সে বের হয়েছিল, আজ তার কোনো চিহ্নও কোথাও অবশিষ্ট নেই আর। মেঘনা গিলে খেয়েছে তার ভিটে, ঘর আর স্বামী-সন্তান। সব দেখে-শুনে জ্ঞান হারায় গোলাপজান। দুই দিন প্রায় চেতন-অচেতনের মাঝামাঝি অবস্থায় থেকে অবশেষে জ্ঞান ফেরে তার। তখন বার বার সে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় মেঘনায়। নদীর গভীরে গিয়ে সে ফিরিয়ে আনতে চায় স্বামী-সন্তানকে। নিজেকে সে বার বার ভর্ৎসনা করে, অভিশাপ দেয়। আফসোস করে এই বলে যে, কেন সে রাতেই ফিরে এল না বাড়িতে। তাহলে তো আজ তাকে এমন পরিণতি দেখতে হতো না। হতাশায়, যন্ত্রণায়, কষ্টে মুষড়ে পড়ে সে।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম আর কঠিন। চাবুকের তীব্র ঘায়ে সে কাটিয়ে দেয় সব ভাবালুতা। দিন যেতে যেতে গোলাপজানও ক্রমশ ফিরে আসে বাস্তবতায়। শুরু হয় তার নতুন জীবন।
নতুন জীবনে পরনের কাপড়টাই তার একমাত্র সম্বল। বড়খেড়ী আর রঘুনাথপুর গ্রামে মানুষের বাড়িতে কাজ করা শুরু করে গোলাপজান। থাকার জায়গাও কিছুদিন পর পর পাল্টায়। কদিন এই আত্মীয়ের বাড়িতে তো আর কদিন অন্য আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে ঠাঁই নিতে হয় তাকে। সারাদিন অমানুষিক খাটুনির পর রাতে বিছানায় এলিয়ে পড়া শরীর বিশ্রাম খোঁজে। সে ঘুমের ঘোরে আগের মতো আর হাতড়ে দেখে না পাশে কোনো আপনজন শুয়ে আছে কি না। তার নিঃসঙ্গ জীবন তাকে নতুন এক গোলাপজানে পরিণত করে। শরীরের ক্লান্তি তার চোখে গভীর ঘুম নামায়, তাকে সাময়িকভাবে নিশ্চিন্ত রাখে। প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে অনেক রাত পর্যন্ত আর ঘুমাতে পারে না সে। মনের ভেতরে কী এক আতঙ্ক এসে ভর করে। মনে হয়, এই বুঝি মেঘনা এসে তাকেও ডুবিয়ে দেবে। কত-শত প্রলোভন, নোংরা ইঙ্গিত উপেক্ষা করে এতটা বছর টিকে আছে সে। নিজেকে সময়ের স্রোতে ভাসতে দেয়নি হতচ্ছাড়া মেঘনার মতো। মেঘনা যখন হঠাৎ তার চোখের সামনে পড়ে, কী এক প্রবল আক্রোশে সে নীরবে ঝগড়া করে মেঘনার সাথে। এভাবেই কাটছে গোলাপজানের প্রায় এগারো বছরের বেশি দীর্ঘ নিঃসঙ্গ জীবনের দিনগুলো। এখন শরীরে বার্ধক্য ভর করেছে। মানুষের বাড়িতে আর আগের মতো কাজ করার শক্তি নেই শরীরে। গোলাপজান বলতে পারে না তার সঠিক বয়স। সে বলে, স্বাধীনতার সময় খুব ছোট ছিল সে। যুদ্ধের সময় পরিবারের সাথে এদিক-ওদিক লুকিয়ে থাকতে হতো তাদের। একটা সময় রমিজ মুন্সির বাড়িতে কাজ করত সে। রমিজ মুন্সির লক্ষ্মীপুরে অনেক ধরনের ব্যবসা আছে। গোলাপজানের ব্যাপারে এলাকার ওয়ার্ড মেম্বার রমিজ মুন্সির সঙ্গে কথা বললে তিনিই স্বেচ্ছায় তার বাড়ির পাশে খালের ওপারে পড়ে থাকা ভিটেতে গোলাপজানকে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। তখন থেকেই গোলাপজান এই ভিটেতে আছে। বার্ধ্যকের সাথে সাথে তার শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা অসুখ। মাসের পর মাস কাশি আর ভালো হয় না গোলাপজানের। শরীরও নুয়ে পড়েছে বয়সের ভারে। কোমড়ে মাঝে মাঝে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। আজকাল লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটে গোলাপজান। এখন সে দূরের গ্রামে গিয়ে ভিক্ষে করে। নিজের এলাকায় ভিক্ষে করে না গোলাপজান। এতে আত্মীয়দের, পাড়ার লোকেদের নাকি সম্মানহানী হয়। অথচ দুটো আশ্বাসবাক্য নিয়ে কেউ এসে তাকে বলে না, আমরা তোমার পাশে আছি। তোমার এই নিঃসঙ্গ জীবনে আমরাই তোমার সঙ্গী।
শেষ বিকেলে দশ বারো হাত বাঁশের সাঁকোটা পেরিয়ে গোলাপজান যখন প্রবেশ করে তার কুঁড়েঘরে, তখন তার মনে হয়, এই অচেনা দ্বীপে একাকী আরেকটি রাত পার করার নির্বাসন শুরু হলো তার। কোনোরকমে হাঁড়িতে একমুঠো চাল আর দুয়েকটি আলু একসাথে রান্না করে রাতের খাওয়া সারে গোলাপজান। খানিকটা খাবার রেখে দেয় সকালের জন্য। গৃহের কাজে খালের ঘোলা পানি আর খাবারের জন্য মু্ন্সি বাড়ির টিউবওয়েল থেকে প্লাস্টিকের বোতলে আনা পানি ব্যবহার করে। সকালে শরীর ভালো লাগলে তাড়াতাড়ি বের হয় ঘর থেকে। একেকদিন দূরের এক-এক গ্রামে যায় ভিক্ষে করতে। সারাদিন অনেক মানুষের সঙ্গে তার কথোপকথন হয়, কিন্তু কথা হয় না কারো সঙ্গে। তার কথা শুরু হয় যখন রাতের আঁধারে ছেঁড়া, ময়লা, শক্ত বালিশটায় সে মাথা রাখে, তখন। প্রতিদিন তার কথা শুরু হয় কুপিটা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেওয়ার পর। অন্ধকারে। জীবনের শেষ সময়ে এসে সে বুঝে গেছে মানুষের জীবনটা আসলে বেদনা আর একাকীত্বের। সে কথা বলে অন্ধকারের সঙ্গে, রাতের আঁধারে গাছ থেকে পাতাদের ঝরে পড়ার শব্দের সঙ্গে, উড়ে যাওয়া পাখিদের ডানার ঝাপটানির সঙ্গে, খালে বয়ে যাওয়া পানির শব্দের সঙ্গে, দূর থেকে ভেসে আসা শেয়ালের চিৎকারের সঙ্গে, শেষ বিকেলে ভিক্ষে শেষে পাওয়া পয়সার শব্দের সঙ্গে, আর কথা বলে ভোরের আযানের ধ্বনির সঙ্গে। এভাবেই রাত শেষ হয়ে তার জীবনে শুরু হয় নতুন এক সংগ্রামমুখর সকালের। ভিক্ষে পেলে খাবার জোটে, না পেলে খালি পেটে রাত কাটে।
ঝড়ের তাণ্ডবের পরদিন গ্রামের সকলে যে যার মতো ব্যস্ত সময় কাটায়। জোয়ারের পানি একই রকম আছে। কমার কোন সম্ভাবনা নেই। গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় লোকজন একত্রিত হয়ে দলে দলে কাজ শুরু করে। দুপুরের পর সরকারি লোকজন গ্রামে আসে, সাথে এনজিওর লোকজনও দেখা যায়। তারা ক্ষয়ক্ষতির পরিমান নিরুপণ করার চেষ্টা করে। প্রত্যেকেই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। কোনো কোনো মাটির ঘর আংশিক বা পুরো ভেঙে গেছে। আজ রাতটা অন্ধকারেই কাটাতে হবে সবার। বিদ্যুতের খুঁটি অনেক জায়গায় উপড়ে গেছে। এগুলো ঠিকঠাক না করা পর্যন্ত বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া যাবে না। বিকেলের দিকে ইউনিয়ন পরিষদে জরুরি সভা বসে। দ্রুততম সময়ে আবারও স্বাভাবিক জনজীবনে ফিরে আসতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। এত কিছুর মধ্যেও কেউ কেউ কানে কানে কথা বলে, কীভাবে বেশি ক্ষয়ক্ষতি দেখিয়ে সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য নেওয়া যায়। শুধু খালের ওপারে একাকী পড়ে থাকা গোলাপজানের কথা ভুলেও কারো মনে পড়ে না। সেই রাত শেষ হয়ে নতুন এক সকাল উঁকি দেয় গাঁয়ে।
ঝড়ের পরের দ্বিতীয় দিনে সকালের ব্যস্ততা আগের দিনের চেয়ে কিছুটা কমে যায়। মুন্সি বাড়ির লোকজনের এবার মনে পড়ে গোলাপজানের কথা। এ দুদিন কেউ খেয়ালই করেনি ঝড়ের তাণ্ডবে খালের ওপরের বাঁশের সাঁকোটা ভেঙে গেছে কখন। তাহলে গতকাল পুরো একটা দিন গোলাপজান কোথায় ছিল! ঘর থেকে কি তবে বের হতে পারেনি সে? কেউ তো গ্রামে তাকে দেখেওনি! এ মুহূর্তে গোলাপজানের ঘরে গিয়ে দেখার সুযোগও নেই। কিন্তু কিছু তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এবার এলাকায় শুরু হয় তোড়জোড়। এপার থেকে চিৎকার করে গোলাপজানকে ডাকা হয়। কিন্তু ওপারের ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে না। শেষে এক একটি সাঁকো বসানোর ব্যবস্থা করা হয়। এরই মধ্যে নানাজনে নানারকম মতামত দিতে থাকে। কেউ বলে, হয়তো অন্য গ্রামে ভিক্ষে করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি গোলাপজান। সেখানেই আছে হয়তো।
কেউ বলে, গোলাপজান তো কানেও ভালো করে শোনে না। হয়তো ঘরের ভেতরই ঘুমাচ্ছে সে। সেজন্যই শুনতে পাচ্ছে না। আরো কত কথা চলে অকারণ। সাঁকো বসিয়ে গ্রামের লোকজন খালের ওপারে মুন্সি বাড়ির ভিটেতে গিয়ে গোলাপজানের ঘরের দরজা খোলে অগত্যা। তারা দেখে, গোলাপজানের শরীর মাটিতে বিছিয়ে রাখা মাদুরের ওপর নুয়ে আছে। প্রার্থনারত, কঙ্কালসর্বস্ব, বয়স্ক এক মানবীর শরীর। গোলাপজানকে দেখতে আসা লোকজনের মধ্যে কয়েকজন নারীও ছিল। তাদের কেউ গোলাপজানের উপুড় হয়ে থাকা শরীরটা আলতোভাবে ঘুরিয়ে দেয়। দেখে মনে হয়, পরম শান্তিতে গোলাপজান ঘুমোচ্ছে। এত ঝড়-ঝঞ্ঝা তার ঘুমে কোনো ব্যাঘাতই ঘটাতে পারেনি। ঝড় পুরো এলাকা লণ্ডভণ্ড করে দিলেও গোলাপজানের ঘরে এতটুকু আঁচ লাগেনি। ভিটের চারপাশের গাছগুলো পরম মমতায় আগলে রেখেছে গোলাপজানকে। যেন তারা বলছে, মা, তুমি ঘুমোও। আমরা আছি। তোমার কোন ভয় নেই। ঘর বলতে কোনোরকমে তৈরি করা ছোট ঝুপড়ির মতো একটা অবয়ব মাত্র। ভালো করে একজন লোক সোজা হয়ে দাঁড়িয়েও থাকতে পারে না যার ভেতরে।
মাথা নুইয়ে ভেতরে ঢোকা গ্রামবাসী তেমন নুয়ে থেকেই একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে পরস্পরকে কী একটা বোঝানোর চেষ্টা করে। তাদের একান্ত চাওয়া, অনন্ত ঘুমে আচ্ছন্ন গোলাপজানের এই ঘুমের কোনো ব্যাঘাত যেন না ঘটে। গোলাপজান এখানে কখনো এত শান্তিতে ঘুমোয়নি আগে। এমন ঘুম গোলাপজানের জীবনে দ্বিতীয়বার আর আসবে না। গোলাপজান হয়তো তখন স্বপ্ন দেখে, মেঘনার প্রচণ্ড তাণ্ডব তার ঘুমন্ত স্বামী আর সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অথবা, শেষ মুহূর্তে জীবনের নিভে যাওয়া আলোর ছটায় দিলদার মিয়া আধো ঘুমে, আধো জাগরণে ঘুমন্ত ছেলেকে জাগিয়ে কোলে তুলে নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার শেষ সুযোগটুকু খুঁজছে। কিংবা, বাপ-ছেলে নিবিড় জড়াজড়িতে পরস্পরের দিকে ভয়ার্ত, নিষ্পলক চোখে চেয়ে থেকে তলিয়ে যাচ্ছে মেঘনার গভীরে। তাদের পিছু পিছু গোলাপজানও ঝাঁপিয়ে পড়ছে মেঘনায়। ডুবে যেতে যেতে খুঁজছে হারিয়ে যাওয়া স্বামী আর সন্তানকে। কোথাও পাচ্ছে না তাদের। এভাবে কেন তারা ছেড়ে গেল গোলাপজানকে একাকী রেখে! এই নিঃসঙ্গ জীবন গোলাপজান আর বইতে পারছে না যে! গোলাপজান নদী হয়ে বয়ে যায়, খুঁজে যায় প্রান্ত থেকে প্রান্তে। স্বপ্নে কেউ যেন তাকে বলে, নদী একবারে পথ হারালে কখনো ফেরে না…
গোলাপজান | প্রদীপ আচার্য | ছোটগল্প

